• মঙ্গলবার, ১২ নভেম্বর ২০১৯, ২৭ কার্তিক ১৪২৬
ads

রাজনীতি

অনুপ্রবেশকারীদের ভিড়ে চট্টগ্রামে মূল আ.লীগ নিশ্চিহ্নের পথে

  • চট্টগ্রাম ব্যুরো
  • প্রকাশিত ০৬ নভেম্বর ২০১৯

আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক এবং দলের মুখপাত্র ড. হাছান মাহমুদ গত শুক্রবার নগরীতে এক অনুষ্ঠান শেষে জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারীদের প্রাথমিক তালিকা করে আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে জমা দেওয়া হয়েছে। তিনি নির্দেশ দিলেই বাদ দেওয়া হবে আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারী বিতর্কিত নেতাদের। এ ঘোষণার পরপরই নড়েচড়ে বসেছেন অনুপ্রবেশকারী নেতারা।

সূত্র জানায়, চট্টগ্রামের সাতকানিয়া-লোহাগাড়া, বাঁশখালী, বোয়ালখালী, পটিয়া, আনোয়ারা-কর্ণফুলী, ফটিকছড়ি উপজেলায় জামায়াত-শিবির, বিএনপি, জাতীয় পার্টি থেকে অনেক নেতা এখন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা হয়ে উঠেছেন। তাদের কারণে প্রকৃত আওয়ামী লীগার এবং আওয়ামী রাজনীতিতে দুঃসময়ে ভূমিকা রেখেছেন তারা অবহেলিত।

চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলা জাতীয় পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. সৈয়দ আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে এখন আনোয়ারা উপজেলা শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দ্বিতীয়বারের মতো দায়িত্ব পালন করছেন। ৬নং আনোয়ারা সদর ইউনিয়ন পরিষদেরও চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগের প্রয়াত প্রেসিডিয়াম সদস্য আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর গাড়িবহরে হামলাকারী বিএনপি নেতা মো. মহিউদ্দীন বর্তমানে ২নং বারশত ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার কথায় চলে এখন বারশত ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ। নিজেকে এখন দাবি করেন প্রয়াত বাবুপুত্র ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের একান্ত সহচর হিসেবে।

আশিষনাথ আনোয়ারা উপজেলা জাতীয় পার্টির সক্রিয় নেতা ছিলেন। আখতারুজ্জামান বাবুর মৃত্যুর পর আওয়ামী লীগ দ্বিতীয়বারের মতো সরকার গঠন করলে তিনি আনোয়ারা উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের উপজেলা কমিটির সহসভাপতি পদ বাগিয়ে নেন। এর কিছুদিন পর চাতরী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কমিটি ঘোষণা হলে অনেক সিনিয়র ও ত্যাগী নেতাকে বাদ দিয়ে আশিষনাথকে ইউনিয়ন কমিটির সাধারণ সম্পাদক মনোনীত করে উপজেলা আওয়ামী লীগ। ১১নং জুইদণ্ডী আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল জলিল দক্ষিণ জেলা জাকের পার্টির সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন এবং সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দীন ছিলেন ইসলামী ছাত্রসেনার নেতা। দুজনের কেউ এর আগে আওয়ামী লীগের কোনো পদে ছিলেন না।

কর্ণফুলী উপজেলা বিএনপি নেতা ইঞ্জিনিয়ার এম এ মালেক কর্ণফুলী উপজেলা পরিষদ গঠন হওয়ার পর আওয়ামী লীগ প্রার্থী ফারুক চৌধুরীর নির্বাচনী প্রচারণায় দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মোসলেম উদ্দীন আসলে তার হাতে ফুল দিয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি কর্ণফুলী উপজেলা চেয়ারম্যান ফারুক চৌধুরীর আস্থাভাজন ও প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা।

ফটিকছড়ির মুজিবুল হক চৌধুরী ছিলেন সালাহ উদ্দীন কাদের চৌধুরীর আস্থাভাজন এনডিপি নেতা। বর্তমানে তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা। চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগ নেতা লিয়াকত হত্যা মামলার আসামি জামায়াত নেতা নুরুল আলম এখন ফটিকছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য।

বাঁশখালী উপজেলার খানখানাবাদ ইউনিয়নে নৌকা প্রতীকে বিজয়ী বদরুদ্দিন চৌধুরী একসময় শিবিরের দাপুটে নেতা ছিলেন। তার ফেসবুক আইডিতেও এর প্রমাণ মিলেছে। এখন সে খানখানাবাদ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রক। বাঁশখালী পৌরসভার শেখ মুজতবা আলী চৌধুরী মিশু বছর তিনেক আগেও ছিলেন পৌরসভা বিএনপির সহসভাপতি। এখন তিনি আওয়ামী লীগের দাপুটে নেতা। দল পাল্টিয়ে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে সংসদ সদস্যের পাশের চেয়ারেই বেশি দেখা যায় তাকে। আগামী পৌরসভা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হতে তিনি তৎপর বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

সাতকানিয়া পৌরসভার সাবেক মেয়র মাহমুদুর রহমান ছিলেন পৌর বিএনপির সভাপতি ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির সহসভাপতি। কয়েক বছর আগে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে এখন তিনি প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা।

লোহাগড়া উপজেলা এলডিপির সভাপতি জিয়াউল হক চৌধুরী বাবুল এলডিপির মনোনীত উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলেন। সদ্য সমাপ্ত উপজেলা নির্বাচনের আগে এলডিপি থেকে পদত্যাগ করে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থী হওয়ার জন্য দৌড়ঝাঁপ করলেও শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন না পেলেও লোহাগাড়ার প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা বনে গেছেন বাবুল।

চন্দনাইশ উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল জব্বার চৌধুরী এলডিপির মনোনীত চেয়ারম্যান ছিলেন। কর্নেল অলির সাথে মনোমালিন্য হওয়ায় তাকে এলডিপি থেকে বহিষ্কার করলে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন। গত উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন না পেলেও স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি। স্থানীয় সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম চৌধুরীর সঙ্গে আওয়ামী লীগের সব অনুষ্ঠানে তার সক্রিয় অবস্থান দেখা যায়।

শুধু এ উপজেলায় না, এরকম প্রায় উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের হাজার হাজার নেতাকর্মী অনুপ্রবেশ করেছে।

তারা ক্ষমতার গন্ধে এখন আওয়ামী লীগে থাকলেও ক্ষমতা হারানোর পর থাকবে না বলে মনে করছেন প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতারা। তাদের ধারণা এখন এসব অনুপ্রবেশকারী হাইব্রিডদের কারণে দলে আমাদের জায়গা না হলেও দল ক্ষমতায় না থাকলে তখন আমরা আবারো জায়গা পাব। তাই আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দলের ভেতর শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছেন। সেটা কার্যকর করে এসব আগাছাদের দল থেকে অব্যাহতি দেওয়ার দাবি জানান তারা।

চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুস সালাম জানান, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটি তালিকা করছে অনুপ্রবেশকারীদের। তবে আমাদের এখনো কোনো তালিকা দেয়নি এবং অনুপ্রবেশকারীদের তালিকা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়নি। কেন্দ্রীয় কমিটির করা তালিকা আমাদের কাছে পাঠানো হবে বলে শুনেছি। তবে অন্য দল থেকে যারা ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগে প্রবেশ করেছে তারা নেতৃত্বে আসতে না পারে সে বিষয়ে নির্দেশনা দিয়ে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান বলেন, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ অনুপ্রবেশকারীদের যে তালিকা করার উদ্যোগ নিয়েছে আমরা এ উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। আমরা চাই তৃণমূল পর্যায়ে থেকে এমপি পদে পর্যন্ত যারা আছে অনুপ্রবেশকারী সুযোগসন্ধানী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। শুধু চুনোপুঁটি না ধরে রাঘববোয়ালদেরও তালিকা করে ব্যবস্থা নিলে তৃণমূল পর্যায়ে দলের সত্যিকারের নেতাকর্মীরা চাঙা হবে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads