• রবিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৯, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ads

রাজনীতি

কী কথা হলো সেখানে

সাবেক সামরিক কর্মকর্তার বাসায় বিএনপির ১০ নেতার বৈঠক

  • আফজাল বারী
  • প্রকাশিত ০৯ নভেম্বর ২০১৯

সাবেক এক সামরিক কর্মকর্তার বাসভবনে বৈঠকে বসেছিলেন বিএনপির শীর্ষ ১০ নেতা। গতকাল শুক্রবার সকালে রাজধানীর গুলশানে ওই বৈঠকে মিলিত হওয়া ১০ নেতা ছাড়াও আরো কয়েকজনকে নিয়ে চলছে নানা গুঞ্জন। তাদের কেউ পদবঞ্চিত, কেউ মনোনয়নবঞ্চিত, আবার কেউ শীর্ষ নেতার কাছ থেকে মানসিকভাবে পীড়াপ্রাপ্ত। ২০০৭ সালে সেনাশাসিত জরুরি সরকারের আমলে তারা বিএনপি থেকে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মাইনাস করতে আদাজল খেয়ে উঠেছিলেন ‘সংস্কারপন্থি’ নামক মঞ্চে। কিন্তু যে কারণেই হোক সে সময় তারা সফল হননি। তবে দলে তারা চিহ্নিত হয়ে থাকলেন। হয়ে গেলেন দলে কোণঠাসা।

দলের বর্তমান পরিস্থিতি এবং কোনো কোনো সিনিয়র নেতার দল থেকে সরে পড়ার প্রেক্ষাপটে চলছে নানান আলোচনা, বৈঠক। তেমনই একটি বৈঠক ছিল গতকাল গুলশানে ওই সামরিক কর্মকর্তার বাসভবনে। কী সিদ্ধান্ত হলো ওই বৈঠকে? সেটা জানতেই এখন অপেক্ষার পালা। রাজনীতির অঙ্গনেও আলোচনা— কী ঘটতে যাচ্ছে বিএনপিতে। আবার কোন ঝড়ো হাওয়ার পূর্বাভাস? এর আগে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন দলের প্রভাবশালী দুই নেতা।

একযুগ আগে দেশের রাজনীতি বড় ধরনের একটা ধাক্কায় পড়েছিল। এবার ফের সেই ধাক্কা লেগেছে শুধু বিএনপির ওপর। দলটি এখন কান্ডারিবিহীনই বলা চলে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাবন্দি, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও যোজন যোজন দূরে। দলের টপ টু বটম নেতাদের এখন জিজ্ঞাসা— কে সামাল দেবেন রাজনৈতিক বৈরী পরিস্থিতি? দৃশ্যত ঘটনা ঘটাচ্ছেন দলীয় নেতারাই। তবে মুখ খুলছেন না কেউই। যা হচ্ছে একে অপরকে পাশ কাটিয়ে, চুপিসারে কিংবা চার দেয়ালের ভেতরে।

এদিকে এক এক করে দলের ডজন ডজন নেতা পদ ছেড়েছেন। গুঞ্জন আছে, দলকে গুডবাই জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন আরো অনেকে। এমন পরিস্থিতি ছিল ১/১১-এর সময়। এখন তো দেশ কোনো অরাজনৈতিক শক্তির কবলেও নয়। তাহলে কেন আকস্মিক টর্নেডো?

দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা কিছু না বললেও মধ্য ও প্রান্তিক পর্যায়ের নেতাকর্মীরা ঠিকই আন্দাজ করতে পারছেন। দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলছেন, যারা পদত্যাগ করেছেন তারা বয়ঃবৃদ্ধ। দলের জন্য অবদান রাখতে পারছেন না বা পারবেন না। কিন্তু প্রান্তিক নেতাদের হিসাব এবং মন্তব্য আলাদা। তারা বলছেন, দল গঠনের সময় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও খান্দানি পরিবারের ওইসব লোককে উৎসাহ দিয়ে দলে এনেছিলেন। যথাস্থানে তাদের যথাযথ ব্যবহার করেছেন। পরে খালেদা জিয়াও তাদের সম্মান দিয়েছেন। কিন্তু এখন ওইসব নেতাকে বিএনপিতে পাত্তাই দেওয়া হচ্ছে না। যারা এমপি, মন্ত্রী-উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেছেন, এলাকায় দলের পক্ষে জনমত গড়ে তুলেছেন সেখানে এখন নবাগত, কম শিক্ষিত ও ধনকুবের উঠতি নেতাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। দলীয় কমিটি চাপিয়ে দেওয়া হয় ওপর থেকে। এ কারণে স্থানীয় নেতারা পদত্যাগের মতো সিদ্ধান্ত নেন। উদাহরণ সিলেটের মেয়র আরিফুল, রেজ্জাকসহ চারজন।

স্থানীয় নেতাকর্মীরা জিয়াউর রহমানের আনা ওইসব নেতাকে আইডল হিসেবে ধরেই এগুচ্ছিলেন। বর্তমানে ওইসব প্রবীণ নেতাকে কেন্দ্র থেকে অবদমন করা হচ্ছে বিভিন্নভাবে। ফলে স্থানীয় নেতাকর্মীরাও দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছেন। অতীতেও একই কারণে ত্যাগী, খ্যাতিমান ও দক্ষ সংগঠক চলে গেছেন। আবার দলের ভেতরে থেকেও অনেকে তাদের ক্ষোভের কথা ‘টক-শো’ বা দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে অকপটে বলেছেন।

বিএনপির সাবেক নেতা এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদের অতীত উক্তি— ‘বিএনপি রাজাকার নির্ভরশীল দল’, প্রয়াত তরিকুল ইসলামের বিশ্লেষণ ছিল— ‘পিয়ন দারোয়ানরা চালায় বিএনপি’, সদ্যপদত্যাগী লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমানের পর্যবেক্ষণ— ‘বিএনপি করার চেয়ে বাড়ির চাকর হওয়া ভালো’, সাবেক এমপি সৈয়দা পাপিয়ার মতে, ‘বিএনপি এখন চোরবাটপাড়ে ভরে গেছে’, প্রয়াত এম কে আনোয়ারের মন্তব্য— ‘বিএনপি চালায় রানি আর যুবরাজ’, সাবেক এমপি আক্তারুজ্জামান রঞ্জনের উক্তি— ‘সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বেয়াদব তারেক রহমান’।

এদিকে দলের অর্ধসহস্রাধিক সংখ্যক সদস্যকে ‘ঢাউস’ কমিটিতে স্থান দিলেও স্থানীয় রাজনীতিতে অপােক্তয় করার জন্য ফুঁসে উঠেছেন সিনিয়র নেতারা। তাদের অভিযোগ, জনবিচ্ছিন্ন, ‘স্বশিক্ষিত’, নবাগতদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে দলীয় রাজনীতি। সিনিয়রদের নির্বাচনী আসনে সমান্তরাল নেতা তৈরি করে নতুন নতুন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ইনাম আহমেদ চৌধুরীর আসনে সিলেটে মনোনয়ন দেওয়া হয় ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ফয়সাল আহম্মেদ চৌধুরীকে। ওই সময় ইনাম আহমেদ চৌধুরীকে বিষয়টি জানানোরও প্রয়োজন মনে করেনি কেন্দ্রীয় বিএনপি। ফলে তিনি চলে গেছেন প্রতিপক্ষের দরজায়। বিএনপির ওই নেতা এখন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য। একই ঘটনা শমসের মবিন চৌধুরীর বেলায়ও। তার মতে, জিয়াউর রহমানের আদর্শ থেকে বিএনপি এখন অনেকটাই দূরে। এসব বিবেচনায় নিয়েই ইতোমধ্যে ডজন নেতা দল ত্যাগ করেছেন। অবশ্য তাদের নিয়ে নানা প্রশ্ন তোলা হচ্ছে।

দিনের ব্যবধানে নতুন উপসর্গ দেখা দিচ্ছে বিএনপিতে। গুরুত্বপর্ণ দুই নেতার পদত্যাগের আলোচনা শেষ হতে না হতেই গতকাল শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে ১১টা পর্যন্ত গুলশান-২ এলাকায় আলতাফ হোসেন চৌধুরীর বাসায় এক গোপন বৈঠক হয়। এ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সদ্য পদত্যাগী বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক সেনাপ্রধান লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর, ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, সাবেক এমপি আশরাফ উদ্দিন নিজাম, সর্দার সাখাওয়াত হোসেন বকুল, সাবেক এমপি নজির হোসেন ও সাবেক দফতর সম্পাদক মফিকুল হাসান তৃপ্তি। বৈঠকে থাকার কথা থাকলেও দলের ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান শারীরিক অসুস্থতার কারণে থাকতে পারেনি। তবে ফোনে কথা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সাবেক আরেক সেনা কর্মকর্তা। তবে গতকাল শুক্রবারের বৈঠকে কী বিষয়ে আলাপ-আলোচনা হয়েছে বা আলোচনায় কোন কোন বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে, সে বিষয়ে সরাসরি কিছু বলছেন না বৈঠকে অংশ নেওয়া নেতারা। সুতরাং প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে এই বৈঠক আয়োজনের উদ্দেশ্য নিয়ে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নজির হোসেন বাংলাদেশের খবরের কাছে বিষয়টি এড়িয়ে যান। তিনি বলেন, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে দল ঐক্যবদ্ধ আছে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads