• সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২০, ২৯ আষাঢ় ১৪২৭
ads

রাজনীতি

ময়ূরীদের শুধু ফটোসেশনেই ডাকে বিএনপি

  • আফজাল বারী
  • প্রকাশিত ১১ ডিসেম্বর ২০১৯

বড় অসহায় হয়ে পড়েছেন বৃদ্ধ ময়ূরী। ৬ বছর আগে চোখের সামনে থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে কর্মক্ষম একমাত্র ছেলে মুন্নাকে। পুত্রশোকে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চলে গেছেন স্বামী মিজানুর রহমানও। শোকে কাতর ময়ূরী কাঁদতে কাঁদতে এখন অন্ধপ্রায়। অভাব-অনটনে মেয়ের সংসারে ময়ূরী এখন বোঝা। রাজধানীর দক্ষিণখানে মেয়ের বাসায় মৃত্যু কামনায় দিন কাটাচ্ছেন তিনি।

ছাত্রদল বিমানবন্দর শাখার যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন মুন্না। ২০১৩ সালে ৪ ডিসেম্বর গুম হন তিনি। শুরুর দিকে বিএনপির পক্ষ থেকে আর্থিক সহযোগিতা করা হতো। দলে মহানুভব মানুষগুলো এগিয়ে এসেছিলেন। খোঁজ-খবর রাখা হতো ময়ূরীর। বিএনপি আয়োজিত সভা-সমাবেশ ডাকা হতো। গণমাধ্যমগুলো তথ্যের প্রয়োজনে খবর নিত। গণমাধ্যমকর্মীরাও সহযোগিতা করেছেন। দিন যত যাচ্ছে সহযোগিতার হাতগুলো গুটিয়ে নিচ্ছেন সবাই। এখন আর কেউ খবর রাখে না ময়ূরীদের। ক্ষুব্ধ ময়ূরী এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘পোলায় বিএনপি পার্টি করত, পার্টির লোকেরা ঈদের আগে কিছু সাহায্য দিত, এখন আর দেয় না। মেয়ের ওপরই আছি। বাবা বাইচ্যা আছি মরার জন্য, আমি তো দেইখ্যা যেতে পারছি না, মরণের পরে আমার পোলায় যেন কব্বরে মাটি দিতে পারে। সরকারের কাছে এই দাবি করছি।’

এই বৃদ্ধার মতো সাগরে ভাসছে কিশোরী লামিমা মীম। বয়স এখন ১২ বছর। বয়স অনুযায়ী এখন পড়ার কথা ষষ্ঠ শ্রেণীতে। কিন্তু সে পড়ছে সবেমাত্র ক্লাস থ্রিতে। এরই মধ্যে বাবার সন্ধানে মীম হারিয়েছে তিনটি ক্লাস। শুধু তা-ই নয়, সামনের দিনে বাবার হদিস মিলবে কি না পড়ালেখাই বা হবে কি না তা নিয়ে শঙ্কায় দিনাতিপাত করছে কিশোরী মীম। একমাত্র কর্মক্ষম মায়ের ওপর ভরসা করে সামনে এগুচ্ছে সে। এ চিত্র তেজগাঁওয়ের শাহীনবাগ এলাকার গুম হওয়া গাড়ির চালক কাওসারের পরিবারের।

ঢাকার ষাটোর্ধ্ব ময়ূরী, কিশোরী লামিমা, যশোরের হীরা খাতুনের মতো দেশজুড়ে শুধু গুম হওয়া পরিবারের সংখ্যা ২১টি। এদের বেশিরভাগই বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলমসহ দুই-চারটি পরিবার সচ্ছল বা সক্ষম হলেও বেশিরভাগ পরিবারের চোখেমুখে শুধুই ক্ষোভ আর হতাশার ছাপ। পরিবারের সদস্যহারাদের আর্থিক সংকট ধীরে ধীরে প্রকট আকার ধারণ করছে। টাকার অভাবে কারো চিকিৎসা হচ্ছে না, কারো সন্তানের লেখাপড়া হচ্ছে না, আবার কারো দুবেলা খাবারও বন্ধ হওয়ার উপক্রম।

পরিবারগুলো মিলে ‘মায়ের ডাক’ নামে একটি ব্যানারে একত্র হয়েছে। আন্তর্জাতিক বা দেশীয় গুম দিবসে কর্মসূচি নিয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে জমায়েত হয়। সাধ্যমতো সাহায্য সহায়তা করে পরস্পরের জন্য। লামিমার স্কুলে ভর্তি হওয়ার মতো টাকা ছিল না। এই পরিবারগুলোর আর্থিক সহায়তা দিয়েই ভর্তি হয়েছে সে। কিন্তু যে দলটি (বিএনপি) গুম পরিবারকে কেন্দ্র করে দেশ-বিদেশে সরকারবিরোধী কর্মসূচি দিয়ে থাকে, মঞ্চে ফটোসেশন করে পরিবারগুলো নিয়ে, তাদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে, সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার হাততালি পাওয়ার মতো প্রতিশ্রুতি দেয়; বাস্তবে তার গরমিল। গত ঈদুল ফিতরে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে একটি করে ‘গিফ্ট বক্স’ দেওয়া হয়েছে পরিবারগুলোকে। এতেই শেষ। সারা বছরে আর কোনো খবর রাখেন না স্থানীয় বা কেন্দ্রীয় নেতারা।

‘মায়ের ডাক’ নিয়ে কাজ করা বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার সমিতির চেয়ারম্যান মঞ্জুর হোসেন ঈশা এ প্রতিবেদককে বলেন, বিএনপি পরিবারগুলোকে শুধুই ফটোসেশনের জন্য ডাকে। ৬ বছর আগে যখন গুম হলো এর এক-দুই বছর মাঝেমধ্যে খোঁজ রাখত। তাদের কোনো কর্মসূচি হলে মঞ্চে ডাকা হতো। চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া মুক্ত থাকাকালে আন্তর্জাতিক গুম দিবসে খবর নিতেন। এখন আর সেদিকে তাকায় না বিএনপি।

তিনি জানান, গত ৪ ডিসেম্বর ছিল সাজেদুল ইসলাম সুমনসহ ৮ জনের গুম দিবস। ওইদিন বিএনপির লোকজন তারেক রহমানের মেয়ে জায়মা রহমানের (বার-এট-ল ডিগ্রি অর্জন করেছেন) জন্য কত কিছু করেছে। কিন্তু সুমনদের পরিবারে খবর পর্যন্ত নেয়নি। অন্ধ ময়ূরীর চোখের চিকিৎসা ব্যয়ভার বহনের মতো লোক মিলছে না বিএনপির মতো দলে? মুখে গুম হওয়াদের নামও বলতে কৃপণতা করে। আবার অনেক নেতা তাদের নামই ভুলে গেছেন। বিএনপি নেতারা ‘কাজের বেলায় কাজি কাজ ফুরালেই পাজি’।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads