• শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২০, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭
ads

রাজনীতি

বেফাঁসে লতিফ সিদ্দিকীকে ডিঙিয়েছেন রাঙ্গা

নেপথ্য কারণ খুঁজছে জাপা

  • আফজাল বারী
  • প্রকাশিত ১২ ডিসেম্বর ২০১৯

আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা লতিফ সিদ্দিকীর এমপিত্ব-মন্ত্রিত্ব, দলীয় পদ সবই গেছে। তার সব অর্জনই এখন সাবেক। তিনি এসব খুইয়েছেন দাম্ভিকতা আর ‘জিহ্বার’ কারণে। পবিত্র হজ, প্রধানমন্ত্রীপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়কে নিয়ে বেফাঁস মন্তব্যই কাল হয়েছে তার জন্য। বেফাঁস মন্তব্যে এবার লতিফ সিদ্দিকীকে টপকিয়ে একধাপ ওপরে উঠে গেছেন জাতীয় পার্টির (জাপা) মহাসচিব ও জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ পাকিস্তান দরদি মশিউর রহমান রাঙ্গা এমপি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, গণতন্ত্রের প্রতীক নূর হোসেনসহ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সৈনিকসহ সবাইকে ‘একহাত’ নিয়েছেন পাকিস্তান দরদি রাঙ্গা।

দলীয় ফোরামে বক্তব্য দিয়ে রাঙ্গা বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক মারার অভিযোগ, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে স্বৈরাচারী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ এবং শহীদ নূর হোসেনের বিরুদ্ধে ইয়াবা খাওয়ার অভিযোগ এনে এক বক্তব্যেই সারা বাংলায় আগুন দিয়েছিলেন। তার এ ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্যে ঝড় উঠেছিল সংসদেও। গত ১৩ নভেম্বর জাতীয় সংসদের মাধ্যমে জাতির কাছে আপাতত এক দফা ক্ষমা চেয়েছেন রাঙ্গা। জাতি ক্ষমা করেছে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন রেখেছেন খোদ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেছেন, তাকে (রাঙ্গা) জাতি ক্ষমা করবে কি না প্রশ্ন আছে।

ক্ষমা চেয়েছেন ঠিকই কিন্তু জাপার প্রধান গোলাম মোহাম্মদ (জিএম) কাদের তার লাগাম ধরেননি। নিজেও সাবধান হননি রাঙ্গা। বরং জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার ২৬ দিনের মাথায় এবার যে জোটের মাধ্যমে রাঙ্গা ও তার দল সংসদে গেছে সেই (মহাজোট) জোটের প্রধান দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে নিয়েই কটূক্তি করেছেন। পেঁয়াজ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যের জবাবে গত ৯ ডিসেম্বর এক সভায় জাপা মহাসচিব বলেছেন, ‘পেঁয়াজ ছাড়া রান্না হতে পারলে চাল ছাড়া ভাত হতে পারে, আওয়ামী লীগ ছাড়াও বাংলাদেশ চলতে পারে...।’ তিনি আরো বলেন, ‘পাকিস্তানের নাম শুনলেই আমাদের দেশের কিছু মানুষের গা জ্বলে। সেই পাকিস্তান থেকেই পেঁয়াজ আনতেছে...।’

জাপার দ্বিতীয় প্রধান নেতার একের পর এক বেফাঁস মন্তব্যে দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা রাঙ্গাকে নিয়ে রীতিমতো চটেছেন। সংসদেই রাঙ্গাকে বাঁদরের সঙ্গে তুলনা করেছেন জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশিদ। তার মতোই ক্ষুব্ধ হন সংসদের অন্য সব সদস্য। মুক্তিযুদ্ধের সময়েও পাকিস্তান দরদি ছিলেন রাঙ্গা। কিন্তু রাঙ্গার চলন-বলনে পার্টি জর্জরিত হলেও চেয়ারম্যান কেন নীরব— এ প্রশ্ন এখন ঘরে-বাইরে, এমনকি জোটের মধ্যেও।

সরকার ও মহাজোটের নেতৃত্বে থাকা আওয়ামী লীগ আপাতত রাঙ্গাকে নিয়ে মন্তব্য করছে না। দুই-একজন ছাড়া সোচ্চার হচ্ছেন না জাতীয় পার্টির শীর্ষ ও সিনিয়র নেতারাও। শুধু বলছেন— অপেক্ষা করুন, পরিণতি দেখতে পাবেন। চলতি ডিসেম্বরে জাতীয় পার্টির কাউন্সিল। এই কাউন্সিলের মাধ্যমে লতিফ সিদ্দিকীর মতো পরিণতি ভোগ করতে হবে বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে মন্তব্য করেন পার্টির একাধিক নেতা।

জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশিদ এমপি এ প্রতিবেদককে বলেন, মসিউর রহমান রাঙ্গার বক্তব্য নিয়ে আমরা আবারো বিব্রত। অস্বস্তিতে আছি। ভাবতেও পারছি না শেখ হাসিনাকে স্বৈরাচার, বঙ্গবন্ধুকে গণতন্ত্রের হত্যাকারী, নূর হোসেন নেশাখোর আর আওয়ামী লীগের প্রয়োজন নাই— এমন বক্তব্য দেওয়ার ধৃষ্টতা দেখানোর সাহস সে কোথায় পায়। জাতীয় পার্টি তার এসব বক্তব্যের দায় নেবে না।

বহু ঘটনার নায়ক মসিউর রহমান রাঙ্গা ১৯৫৮ সালের ২২ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক বাড়ি রংপুর জেলার সদর উপজেলার দক্ষিণ গুপ্তপাড়ায়। শিক্ষাজীবনে তিনি বিকম ডিগ্রি অর্জন করেছেন। পড়ালেখা শেষ করে তিনি পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন। পরিবহন মালিকদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতি’র সভাপতি তিনি। রাঙ্গা তার নির্বাচনী এলাকায় (রংপুর-১) ‘গণি মিয়া’ হিসেবে খ্যাত। কারণ ওই আসনে তার নিজস্ব কোনো ইমেজ নেই। বিভিন্ন দল ত্যাগ করে জাপায় এসে এরশাদের আপন ভাগ্নে আসিফ শাহরিয়ারকে সরিয়ে ২০১৪ সালের নির্বাচনে এমপি এবং পরে মন্ত্রী হয়েছিলেন পরিবহন ব্যবসায়ী রাঙ্গা। এর আগে ২০০১ সালে তিনি জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন। ওই সময়ই সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাঙ্গা গোলাপ ফুল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নব্বইয়ে এরশাদের পতনের আগে তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তবে তার রাজনীতি শুরু ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল জাকের পার্টি দিয়ে। নিজেকে এরশাদের ভাগ্নে হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন রাঙ্গা। যদিও তিনি তার আপন ভাগ্নে নন। পার্টিতে নেতিবাচক নানামুখী ভূমিকার কারণে তিনি দফায় দফায় অবাঞ্ছিত ঘোষিত হয়েছেন। ২০১৮ সালে দলের দীর্ঘ সময়ের মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদারকে পদ থেকে সরানো হলে শূন্যস্থানে বসেন রাঙ্গা। চাউর ছিল পরিস্থিতি তৈরির নেপথ্যে ছিলেন এই ব্যক্তিটি। এদিকে এরশাদের মৃত্যুর পরও ‘বরের ঘরে মাসি আর কনের ঘরে পিসি’র ভূমিকায় নামেন এমপি রাঙ্গা। ছিলেন বিরোধে লিপ্ত চেয়ারম্যান জি এম কাদের এবং কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদের পক্ষেও। এ নিয়ে দলের ভেতরে-বাইরে ক্ষোভ আছে। রাঙ্গা প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে ‘সানাই’ ঝঞ্ঝাট পোহাতে হয়েছে জাপাকে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads