• শনিবার, ১৭ এপ্রিল ২০২১, ৪ বৈশাখ ১৪২৮

রাজনীতি

আওয়ামী লীগের তৃণমূলে মানা হচ্ছে না গঠনতন্ত্র!

যথেচ্ছ বহিষ্কার ও পদায়নের অভিযোগ

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১

যে কোনো সংগঠন চালাতে হলে গঠনতন্ত্র অপরিহার্য। গঠনতন্ত্র মেনে হয় সংগঠনের সব কাজ। কিন্তু ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের বিভিন্ন ইউনিটের নেতারা সংগঠন পরিচালনায় গঠনতন্ত্রের তোয়াক্কা করেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। মন্ত্রী-এমপি থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক, বেশিরভাগেরই অনীহা গঠনতন্ত্রের বিধি প্রতিপালনে। নিজের কর্তৃত্ব রক্ষায় স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগও রয়েছে অনেকের বিরুদ্ধে। কেন্দ্রীয় নির্দেশনারও পরোয়া করেন না তারা। বিশেষ করে বহিষ্কারে গঠনতন্ত্রের বিধি মানেন না কেউ। আবার জানেনও না অনেকে।

সম্প্রতি বেশ কয়েকটি জেলা শাখার কার্যক্রম ও নেতাদের গতিবিধি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, নিজের স্বার্থের বাইরে কারোরই ধার ধারেন না জেলা-উপজেলা পর্যায়ের নেতারা। নিজের কর্তৃত্ব রক্ষায় তারা যখন যা খুশি করেন। এক্ষেত্রে গঠনতন্ত্র বা কোনো নির্দেশনা বাধা হয়ে দাঁড়ালেও তারা এর তোয়াক্কা করেন না। নিজের শাখা ও অধীনস্থ শাখায় পদায়ন ও বহিষ্কার, শাখা কমিটি গঠন ও বিলুপ্তিতে তারা কর্তৃত্ব রক্ষার বিষয়টিই প্রাধান্য দেন। এমনকি গ্রুপিংয়ের প্রয়োজনে যখন-তখন সহযোগী ও অঙ্গ সংগঠনেরও কমিটি গঠন ও কমিটি বিলুপ্ত করে ফেলেন এমপি বা আওয়ামী লীগ নেতারা। এ বিষয়ে বারবার কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে নোটিশ দেওয়া হলেও আশানুরূপ ফল মিলছে না। 

নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক কার্যক্রম নিয়ে খুবই বিব্রত দলের নেতা-কর্মীরা। বসুরহাট পৌরসভার মেয়র ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আবদুল কাদের মির্জাকে দল থেকে অব্যাহতি দেওয়া নিয়ে জেলা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক দুই মেরুতে অবস্থান করছেন। এলাকা থেকে জেলা সভাপতি খায়রুল চৌধুরী সেলিম বলেন, বিষয়টি আওয়ামী লীগ সভাপতির টেবিলে। তিনি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন। আর ঢাকা থেকে ফেসবুক লাইভে জেলার সাধারণ সম্পাদক সংসদ সদস্য একরামুল করিম চৌধুরী বলেন, তাকে (কাদের মির্জা) অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া সারাদেশে দল থেকে বহিষ্কারের বহু ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে গত উপজেলা, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা নির্বাচনগুলোর সময় পাইকারি হারে বহিষ্কার করা হয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে মানা হয়নি গঠনতন্ত্র। গত ২৩ জানুয়ারি ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মশিউর রহমান জোয়ার্দারসহ তিনজনকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। বহিষ্কৃত অন্য দুই নেতা হলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম এবং পৌর মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা শাহিনুর রহমান রিন্টু।

২৮ জানুয়ারি মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সোহেল রানা মিঠুকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শাহাবুদ্দিন আহম্মেদ মোল্লা ও সাধারণ সম্পাদক কাজল কৃষ্ণ দে স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ বহিষ্কারাদেশ জানানো হয়। ২৯ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল পৌরসভা নির্বাচনে দল মনোনীত নৌকার প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ায় পাঁচজনকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের যৌথ স্বাক্ষরে তাদের বহিষ্কার করা হয়। এসব বহিষ্কার নিয়ে সংশ্লিষ্ট নেতাদের কাছে জানতে চাইলে তারা দাবি করেন, গঠনতন্ত্র মেনেই বহিষ্কার করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে গঠনতন্ত্রের যে ধারা তারা উল্লেখ করেন, সেটির বিষয়ে তাদের ব্যাখ্যার সঙ্গে কেন্দ্রীয় নেতাদের ব্যাখ্যার মিল পাওয়া যায় না। সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক মহল মনে করেন, হয়তো বেশিরভাগ নেতা জানেন না দলের বহিষ্কার প্রক্রিয়া, বা জানলেও তারা মানেন না।

এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক দীপক কুমার রায় বলেন, দলের গঠনতন্ত্রের ৪৭/১১ অনুযায়ী (পাঁচজনকে) বহিষ্কার করে কেন্দ্রকে অবহিত করেছি। আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রের বিধান হলো : জেলা শাখা বহিষ্কারের প্রস্তাবনা কেন্দ্রে পাঠাবে। কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় সেটি অনুমোদন হলে কার্যকর হবে। অন্যথায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রস্তাবনা বাতিল হয়ে যাবে।  এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, আমাদের বহিষ্কার সঠিক না হলে কেন্দ্র জানাতো। এক মাস হয়ে গেল, কেন্দ্র তো কিছু জানায়নি। তার মানে আমরা সঠিক।

প্রশ্নবিদ্ধ পন্থায় বহিষ্কৃত নেতারা হেয়প্রতিপন্ন হওয়াসহ নানা কারণে এটি মেনে নেন, বা এ নিয়ে কোনো কথা বলেন না। নীরবতার পথ বেছে নেন। এ বিষয়ে মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত সাংগঠনিক সম্পাদক সোহেল রানা মিঠু বলেন, বহিষ্কারের বিষয়ে আমার জানা নেই। আমি দল থেকে অব্যাহতি নিয়েই নির্বাচন করতে নামছি, নির্বাচন করব। দলে বহিষ্কার করলে কি আমার ভোট কমে যাবে?

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় একাধিক নেতা বলেন, বিষয়টি দুই পক্ষের; বহিষ্কারকারী ও বহিষ্কৃতের। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, দুই পক্ষের কেউই গঠনতন্ত্র মানে না- তাহলে আমরা ব্যবস্থা নেবো কীভাবে? কারণ বহিষ্কারে যেমন সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া আছে, তেমনি এর বিরুদ্ধে আপিল করারও সুযোগ আছে। আর জেলা ইউনিটের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক নিয়ম না মেনে বহিষ্কার করলে তো সেটি কার্যকরই নয়। এটির বিরুদ্ধে তো যে কোনো সময় কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ আছে।’

আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক ড. সেলিম মাহমুদ বলেন, প্রতিটি সংগঠনই গঠনতন্ত্র অনুযায়ী চলে। পদায়ন ও বহিষ্কার- দুটোই গঠনতন্ত্রে বর্ণিত নিয়মে হবে। দলে যে কোনো পর্যায়ের বহিষ্কারের যে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের। যে কাউকেই বহিষ্কারের ক্ষেত্রে গঠনতন্ত্রের পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। জেলা সভাপতি বললেই হবে না। জেলা সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে এমন কোনো ক্ষমতা দেওয়া হয়নি যে- তারা গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন করে কিছু করবেন। গঠনতন্ত্রে বলা আছে, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কার বিরুদ্ধে, কোন প্রেক্ষিতে কীভাবে নেওয়া হবে? তারা যদি গঠনতন্ত্র অনুসরণ না করেন, তাহলে সেটি সঠিক হবে না বা কার্যকর হবে না।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আফজাল হোসেন বলেন, বহিষ্কারের বিষয়ে নির্দেশনা গঠতন্ত্রে পরিষ্কার উল্লেখ আছে। এর পূর্ণাঙ্গ ক্ষমতা দলের কার্যনির্বাহী কমিটির হাতে ন্যস্ত। জেলা কমিটি কেন্দ্রের কাছে বহিষ্কারের সুপারিশ প্রেরণ করতে পারে। তাদের বহিষ্কারের ক্ষমতা নেই।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads