• বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৯, ২ কার্তিক ১৪২৬
ads

ভ্রমণ

কেন ভ্রমণ করবেন

  • প্রীনন পাখোয়াজ
  • প্রকাশিত ২৬ জানুয়ারি ২০১৯

মানুষ চির যাযাবর। মানুষের রক্তে রয়েছে ভ্রমণের নেশা। অজানাকে জানার, অদেখাকে দেখার কৌতূহল মানুষের চিরন্তন। বিশাল এই পৃথিবীর চারদিকে কত কী দেখার, জানার রয়েছে, কত রহস্য রয়েছে লুকিয়ে। সেই অপরিচয়ের দুস্তর মহাসমুদ্রের অদৃশ্য তরঙ্গ প্রতিনিয়ত আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকে। সেই অজানাকে জানার জন্যে আমাদের অসীম আগ্রহ, অনন্ত উৎকণ্ঠা। এই দুর্নিবার আকর্ষণে আমরা রুদ্ধ দুয়ার খুলে বের হয়ে পড়ি অজানার সন্ধানে।

দেশ ভ্রমণ আমাদের মনে অনাবিল আনন্দ, একঘেয়েমি দূর করে। এর সঙ্গে সঙ্গে নানান বিষয়ে শিক্ষাও দেয়। আমরা স্কুলে ভূগোল, ইতিহাস পড়ে পুঁথিগত কিছু বিদ্যা আয়ত্ত করি ঠিকই কিন্তু সেই জ্ঞান ঠিক পরিপূর্ণ নয়। কারণ পৃথিবী মানচিত্রের কতগুলো রেখা নয়, বহু মানুষের কলরব মুখরিত সজীব সুন্দর বৈচিত্র্যময় এক ভূখণ্ড। এই ভূখণ্ডকে জানার জন্য প্রয়োজন দেশ ভ্রমণ। ইতিহাস ও ভূগোলের বাইরে অবাধ উন্মুক্ত খোলা আকাশের নিচে জীবন্ত দেশটি দেখে, তার অধিবাসীদের প্রত্যক্ষ স্পর্শ লাভ করে, তাদের জীবনধারা সম্পর্কে আমরা যে জ্ঞান লাভ করি, সেই জ্ঞানই  প্রকৃত জ্ঞান।

হূদয়ের প্রসারতা ও মনের গতি আনে ভ্রমণ। বদ্ধ ঘরের কোণে থাকতে থাকতে এবং একই কাজ করতে করতে মানুষের মনে একঘেয়েমি আসে। তখন কোনো কাজে মন বসে না, মন হাঁপিয়ে ওঠে। বদ্ধ ঘরের দুয়ার ঠেলে মানুষ বের হয়ে পড়ে মুক্তির আনন্দে। বহু মানুষের পদচিহ্ন অঙ্কিত তীর্থে তীর্থে ভ্রমণ করে, অজানা কাহিনী শুনে সে জানতে পারে নিজের দেশকে। পাহাড়-পর্বত, নদী, গিরি, অরণ্যের অনির্বচনীয় সৌন্দর্য মানুষের মনের প্রসারতা বাড়ায়। চলাই জীবন, জীবনের আরেক নাম চলা। যে জীবন চলতে জানে না, সে জীবন বদ্ধ জলাশয়ের মতো। ভ্রমণ আমাদের দেয় গতি, এই গতির আনন্দে মানুষ উষর মরু, উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দেয়। দুর্লঙ্ঘ্য গিরিশৃঙ্গ অতিক্রম করে অতীশ দীপঙ্কর তিব্বতে যান বৌদ্ধধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে। ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির সম্যক জ্ঞান অর্জনের জন্য সুদূর চীন থেকে ফা-হিয়েন, হিউয়েন সাঙ এসেছিলেন ভারতবর্ষে। অজানা দেশ জয়ের আনন্দে কলম্বাস জীবন বাজি রেখে পাড়ি দিয়েছিলেন মহাসমুদ্র। ভাস্কো-দা-গামা, কলম্বাস, মার্কোপোলো প্রমুখ বিখ্যাত বিখ্যাত পর্যটকদের দুঃসাহসিক পর্যটনের ফলে আজ পৃথিবীর বহু দুর্গম দেশ-দেশান্তর মানুষের জ্ঞানের পরিধির মধ্যে এসে গেছে। তাদের দুর্বার আবিষ্কারের নেশা পৃথিবীর কত নামহীন গিরি-নদী, কত অজানা অরণ্য, মরুভূমি, কত তুষারাচ্ছন্ন মেরুপ্রদেশ আবিষ্কৃত হয়ে মানুষের জ্ঞানভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে।

বর্তমানে দেশভ্রমণ শিক্ষার একটি অপরিহার্য অঙ্গরূপে স্বীকৃত। দেশ ভ্রমণের মাধ্যমে দেশের ভৌগোলিক পরিচিতি, প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সেখানকার মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে পরিচিত হওয়ার ফলে মনের প্রসারতা যেমন বাড়ে, তেমনি পারস্পরিক আদান-প্রদানের ফলে একটা অখণ্ড সার্বভৌমত্বের মনোভাব সৃষ্টি হয়। এর ফলে আমরা যে একই ভূখণ্ডের অধিবাসী, পরস্পর ভাই ভাই এই সংস্কৃতিবোধেরও জন্ম হয়। প্রকৃত দেশভ্রমণ সৌভ্রাতৃত্ব বোধের জন্ম দেয় তা স্বামী বিবেকানন্দের বাণী থেকেও জানা যায়। ‘সমগ্র ভারতবাসী আমার ভাই’ হিমালয় থেকে কন্যাকুমারিকা ভ্রমণের পরে তিনি একথা বলেছিলেন।

ভ্রমণেই আনন্দ, ভ্রমণেই মুক্তি। মুক্তির আনন্দেই দেশ-বিদেশের বহু মানুষ বেরিয়ে পড়ে শত বিপদ মাথায় নিয়ে। বদ্ধ ঘরের কোণে যে মন হাঁপিয়ে ওঠে, প্রকৃতির উন্মুখ প্রান্তরে সে প্রাণভরে নিঃশ্বাস নেয়। শুধু যে মনের আনন্দ হয় তা নয়, স্বাস্থ্যেরও উন্নতি ঘটে। নতুন করে কাজে উদ্দীপনা পায়, আর প্রকৃতির অফুরন্ত জ্ঞানের ভান্ডার থেকে জ্ঞান আহরণ করে মানুষ নিজেকে সমৃদ্ধ করে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads