• শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads

ভ্রমণ

গোয়া ভ্রমণ

  • প্রকাশিত ২৪ আগস্ট ২০১৯

ঘুরে এলাম গোয়া সমুদ্রসৈকতের বেশ কয়েকটি জায়গা ও বিচে। এই পুরো ভ্রমণে আমরা তিনজন, ১৩ দিনে, ঢাকা থেকে ট্রেন ও বাসে জার্নি করেছি ৮ হাজার কিলোমিটার। আর তিনজনের একক পরিবারের খরচ হয়েছিল ৫৩-৫৫ হাজার টাকা।

আজকে গোয়া পর্যন্ত যাওয়া-আসা, থাকা-খাওয়া, গোয়ার সৈকতগুলোতে যাতায়াত আর অন্যান্য খরচের কথা বলব। যেহেতু এই খরচেই সবার যত আগ্রহ আর হ্যাঁ রুট, সময় এবং টিকিটও একটা বেশ বড় ইস্যু। তো শুরু করা যাক, কোথায়, কীভাবে আর কত খরচে শুধু গোয়া ঘুরে আবার ঢাকায় ফিরে আসা যায় সেই গল্প।

খোঁজ নিয়ে জানলাম, কলকাতা থেকে গোয়াতে মাত্র একটা ট্রেনই ছেড়ে যায়। সেটা প্রতিদিন না, সপ্তাহে ৩-৪ দিন। অফিস ছুটির ক্যালেন্ডারে চোখ রাখলাম, দেখি ঈদে প্রায় ৭ দিনের একটা ছুটি আছে। দু’একদিন মিলিয়ে নিলে ১০ দিনের মতো হয়ে যাবে। সেই ভাবনা থেকেই ভারতের টিকিট কেটে দেয় আমার এমন এক বন্ধুর কাছ থেকে গোয়ার টিকিট কাটার কথা বলি।

সব ঠিক ছিল গোয়া নিয়ে চার মাস আগে থেকেই টিকিট কেটে রেখেছিলাম, যাওয়া-আসার ঝামেলা না রাখতে। নন-এসি স্লিপার ক্লাসের টিকিটের দাম ভারতীয় ৭৫০ রুপি। কিন্তু আমি ১ হাজার ৩০০ টাকা করে কিনেছিলাম এখানে বসেই। এসি-৩ আর এসি-২ও আছে, সেগুলোর ভাড়া ২ হাজার ৫০০ বা ৪ হাজারের মতো। যেটা আমার একার প্রায় পুরো ট্রিপের বাজেট!

আর প্লেনের খোঁজ নিয়ে দেখেছিলাম বাংলাদেশি টাকায় ৯-১০ হাজারের নিচে গোয়ার টিকিট পাওয়া যায় না ওয়ান ওয়েতেই! বোথ ওয়ে করলে একটু কম পড়ে। সেটাও নির্ভর করে কত আগে টিকিট কাটবেন তার ওপরে।

নির্ধারিত ভ্রমণের আগমুহূর্ত পর্যন্ত যাওয়া নিয়ে নানা রকম অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও রাত ১১টার বাসে ঢাকা থেকে বেনাপোল গিয়েছিলাম রয়্যালের ইকোনমিক ক্লাস এসিতে। ভাড়া নিয়েছিল ১ হাজার টাকা করে। ঠিক সকাল ৬টায় নেমেছিলাম বেনাপোল বন্দরে। ইমিগ্রেশনে ফ্রেশ হয়ে বাংলাদেশের সীমান্ত পেরিয়েছিলাম বেশ আরামেই। কিন্তু ওপারের সীমান্তে গিয়ে বিশাল লাইনে দাঁড়াতে হয়েছিল সেই সকালেই! ১ ঘণ্টারও বেশি সময় পরে ওপারের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে একটু চা খেয়ে অটোতে করে বনগাঁ জনপ্রতি ৩০ রুপি ভাড়া।

বনগাঁ থেকে ২০ রুপি করে বনগাঁ লোকালের টিকিট কেটে স্টেশনে বসে নাশতা সেরে নিলাম তিনজন। ১০টায় ট্রেন এলো, ১০টা ১০-এ ছাড়ল। এবং প্রথমবারের মতো বনগাঁ লোকালও বেশ লেট করে ১টা ১৫ মিনিট বাজাল শিয়ালদহ পৌঁছাতে! যে কারণে কলকাতার নির্ধারিত কর্মপরিকল্পনা উল্টাপাল্টা হয়ে গেল! ট্রেন থেকে নেমে সোজা চলে গেলাম ১২০ রুপি ট্যাক্সি ভাড়া দিয়ে ফেয়ারলি প্যালেস। ঢাকায় ফেরার ট্রেন টিকিট করে রাখতে। কারণ সে সময় ঈদের ছুটি থাকবে, কোনো টিকিট পাওয়া যাবে না। খুব ভালো করেছিলাম এত আগে টিকিট করে সেটা ফেরার সময় অনুভব করেছি।

ওদের ফেয়ারলি প্যালেসের এসিতে বসিয়ে রেখে আমি বড় লাগেজ দুটি নিয়ে চলে গেলাম হাওড়া স্টেশনে। কারণ আমাদের ট্রেন রাত ১২টায় (১১টা ৩০ মিনিটে এলো)। এত লম্বা সময় বিশাল ভারী (তিনজনের ১৩ দিনের কাপড়) দুটি ব্যাগ টানার কোনো মানেই হয় না। এগুলো হাওড়া স্টেশনের লকারে চালান করে দিয়ে হালকা হলাম (লকারে ব্যাগ রাখার জন্য ট্রেনের টিকিট, পাসপোর্ট বাধ্যতামূলক) ৩০ রুপির বিনিময়। উদ্দেশ্য কলকাতা সারা দিন ঘুরে, কাজ করে রাতে ট্রেনে ওঠার আগে প্ল্যাটফর্মে গোসল করে ব্যাগ লকার থেকে নিয়ে নেব। ঝামেলাহীন থাকা যাবে সারা দিন।

ব্যাগ রেখে ফেরি পার হয়ে ওদের ফেয়ারলি প্যালেস থেকে নিতে গিয়ে দেখি তখনো টিকিট দেয়নি। আরো ১৫ মিনিট অপেক্ষার পরে ১ হাজার ৩৪০ রুপি করে মৈত্রী ট্রেনের টিকিট নিয়ে, ট্যাক্সি করে নিউমার্কেট এরিয়ায় চলে এলাম। যাই হোক, সারা দিনের কাজ সেরে, সন্ধ্যার পরে কেএফসি থেকে ১১৫ রুপির রাইস মিল পার্সেল নিয়ে হাওড়া গিয়ে, সবাই মিলে ১০ রুপি দিয়ে জনপ্রতি গোসল করে, খেয়ে-দেয়ে, লকার থেকে ব্যাগ তুলে নিয়ে ট্রেনে উঠে পড়লাম। ট্রেন নির্ধারিত সময়ের বেশ পরে স্টেশনে ঢোকাতে ৩০ মিনিট পরে ঠিক ১২টায় ছাড়ল।

দুর্দান্ত গতিতে এগিয়ে চললেও, উড়িষ্যা, অন্ধপ্রদেশ, কর্ণাটক হয়ে ৪ ঘণ্টা লেটে ৪৪ ঘণ্টা পর গোয়া পৌঁছালাম সন্ধ্যা ৬টায়! ট্রেনে দুদিন আমরা বিভিন্ন স্টেশন থেকে রুটি, পরোটা, ডিম, বিরিয়ানি আর চিকেন দিয়ে সকাল, দুপুর আর রাতের খাবার খেয়েছিলাম। তাতে করে তিনজনের দুদিনে ১ হাজার রুপির মতো খরচ হয়েছিল পানীয়সহ।

আর এই দীর্ঘ জার্নির কারণে ততক্ষণে আমার কথা বাদ ছেলে আর মায়ের অবস্থা কাহিলপ্রায়। তাই দেরি না করে আর দূরের কোনো বিচে না গিয়ে ৫-৬ কিলোমিটার দূরের কোলভা বিচের কাছে হোটেল বিচ রিসোর্টে একটি এসি রুম নিলাম ১ হাজার ৫০০ রুপি করে। সঙ্গে সুইমিংপুলের সুবিধাসহ।

সবকিছু ভালো লেগে যাওয়ায় আর অন্য কোথাও ছোটাছুটি না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ওখানেই থেকে গিয়েছিলাম পরের চার দিন। এই হোটেলের খাবারটা আমাদের দারুণ লেগেছিল। একটা ছোট আকারের (৩০০ গ্রাম) রূপচাঁদা মাছ ভাজা, একটা সামুদ্রিক মাছের ঝোল আর একজনের জন্য পর্যাপ্ত ভাতের প্যাকেজ ১০০ রুপি! ব্যাস এই আমাদের জন্য দারুণ হয়েছিল, বাজেট, স্বাদ আর পরিমাণের সমন্বয়ে।

প্র্রথম দিন সন্ধ্যায় আমরা কোলভা বিচে হেঁটে, বসে আর আরাম করে কাটিয়েছিলাম। পরদিন তুখোড় রোদের কারণে সকালে বিচে না গিয়ে হোটেলের নীল জলের ঠাণ্ডা সুইমিংপুলে ভেসে ভেসে কাটিয়েছিলাম। দুপুরে ভাতঘুম দিয়ে উঠে শেষ বিকালে আবার গিয়েছিলাম বিচে, ছিলাম অনেক রাত পর্যন্ত। রাতের খাবার খেয়েছিলাম বিচ আর হোটেল থেকে বেশ কিছুটা দূরে হেঁটে বেড়াতে বেড়াতে অ্যারাবিয়ান একটা রেস্টুরেন্টে। ১১০ রুপি করে চিকেন ফ্রাইড রাইস দিয়ে।

পরদিন। ৩০০ টাকা করে জনপ্রতি এসি গাড়ির টিকিট করেছিলাম, যেটা হোটেল থেকে ছেড়ে সারা দিনে বেশ কয়েকটা স্পট, বিচ, ডলফিন পয়েন্ট, ফোরট, আর আইসল্যান্ড ঘুরিয়ে, সন্ধ্যায় ক্রুজ সাফারি করিয়েছিল। সব জার্নিটা ছিল দারুণ। তিনজনের এসি শেয়ার গাড়ির ভাড়া পড়েছিল ৯০০ রুপি, যেটা ছোট্ট গাড়ি রিজার্ভ করতে হলে লাগত ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫০০ রুপি। আর যেসব স্পটে ঢোকার বা রাইড উপভোগ করার জন্য বাড়তি টিকিট কাটতে হয় সেটা নিজেদের করতে হয়েছিল।

যেমন ডলফিন পয়েন্টের গভীর সমুদ্রে যেতে বোটে করে জনপ্রতি খরচ হয়েছিল ৩০০ রুপি করে। যদিও আমার কাছে টাকার তুলনায় সময়টা বেশ অল্প মনে হয়েছে, কিন্তু অভিজ্ঞতা, রোমাঞ্চ আর নতুন কিছু দেখার কারণে সেটা উসুল হয়েছিল। আর আমার ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও সেই একই রকম ৩০০ রুপি করে জনপ্রতি দিয়ে ১ ঘণ্টার ক্রুজ সাফারি করেছিলাম ছেলে আর মায়ের ইচ্ছায়। একেবারেই ওয়েস্টার্ন স্টাইলের নাচ-গানের ব্যাপার-স্যাপার। পরিবার নিয়ে তেমন একটা উপভোগ করা যায় না! এসব একা বা ব্যাচেলর হয়ে ভালো করে উপভোগ করা যায়।

সারা দিন নানা জায়গায় ভ্রমণ শেষে হোটেলে ফিরেছিলাম রাত ৯টায়। দারুণ ছিল পুরো ভ্রমণটা। ৪-৫টি একদম অচেনা পরিবারের এক দিনের জন্য বেশ কাছাকাছি হয়ে যাওয়া, রাতে বিদায়বেলায় আবার যার যার তার তার। অনেক মজার একটা ব্যাপার ছিল। পরদিন সাউথ গোয়াতে একই রকম প্যাকেজ ছিল। কিন্তু আমরা হেঁটে হেঁটে পুরনো গোয়া দেখার পক্ষে ছিলাম। আর ছিল কিছু কেনাকাটার ব্যাপার। তা ছাড়া সন্ধ্যায় আমাদের কেরালার ট্রেন আছে। তাই একটু তাড়াতাড়ি স্টেশন পৌঁছে আরাম করার জন্য সেদিন আর কোথাও যাইনি।

শেষ দুপুরে হোটেল থেকে বেরিয়ে ১৫০ রুপির অটো নিয়ে গিয়েছিলাম কেএফসিতে। হেলেদুলে কেএফসিতে বসে সময় কাটিয়ে, ১১৫ রুপির রাইস মিল নিয়ে তিনজন মিলে শেষ বিকালে ১০০ রুপি অটো ভাড়ায় চলে গেলাম স্টেশনে। চমৎকার ঝকঝকে স্টেশনে সমান্তরাল ব্রিজে বসে রইলাম আমাদের কেরালা যাওয়ার ট্রেন আসার আগ পর্যন্ত। এই ছিল আমাদের চার দিনের গোয়া ভ্রমণ আর খরচের বিস্তারিত।

এবার একটু দেখে নেই ঢাকা থেকে গোয়া গিয়ে, চার দিন থেকে-খেয়ে আর একই রকমভাবে ফিরে আসতে আমাদের কেমন খরচ হয়েছিল আর জনপ্রতি কত? সব হিসাব টাকায় কনভার্ট করে দেওয়া হলো। মিরপুর থেকে কল্যাণপুর সিএনজি ১৫০ টাকা, ঢাকা থেকে বেনাপোল বাস ২ হাজার টাকা (দুই সিট), অটোতে বনগাঁ স্টেশন ১১০ টাকা, বনগাঁ লোকালে শিয়ালদহ ৭৫ টাকা, শিয়ালদহ থেকে ফেয়ারলি প্যালেস ১৯০ টাকা, ফেয়ারলি থেকে নিউমার্কেট ১০০ টাকা, নিউমার্কেট থেকে হাওড়া ২১০ টাকা, হাওড়া-গোয়া ট্রেন ৩ হাজার ৯০০ টাকা, দুদিন ট্রেনে খাওয়া ১ হাজার ৬০০ টাকা, স্টেশন থেকে হোটেল ৩৫০ টাকা, হোটেল ভাড়া তিন দিন ৬ হাজার টাকা, নর্থ গোয়া ভ্রমণ ৩ হাজার ৫০০ টাকা, চার দিনের খাওয়া ৩ হাজার টাকা, স্টেশনে যাওয়া ৩৫০ টাকা। মোট ২১ হাজার ৫৩৫ টাকা। জনপ্রতি ৭ হাজার ১৭৮ টাকা। আর যদি একইভাবে ফিরে আসার ট্রেন টিকিট হিসাব করেন তবে ৭১৭৮+১০০০=৮১৭৮ টাকা।

তবে এই খরচ তো আমাদের পারিবারিক হিসাব অনুযায়ী। কিন্তু কেউ যদি একা বা ব্যাচেলর গ্রুপ করে যেতে চান, সেটা কিন্তু আরো দেড় থেকে দুই হাজারে কমিয়ে আনা সম্ভব। যদি ডরমেটরিতে ২৫০ বা ৩০০ টাকা করে থাকেন, অথবা ৬০০-১০০০ টাকার নন-এসির এক রুমে তিনজন থাকেন। লোকাল বাসে করে ৫০ রুপিতেই সাউথ থেকে নর্থ বা নর্থ থেকে সাউথে যেতে পারবেন। অথবা ৩০০ রুপি দিয়ে দুজনে মিলে একটা বাইক বা স্কুটি নিয়ে গোয়ার সব বিচ ঘুরে ঘুরে দেখতে পারেন।

মোটকথা, একজনের সাকুল্যে ৬ থেকে ৮ হাজার টাকায় হয়ে যাবে নন-এসি স্লিপারের ট্রেন টিকিট, গ্রুপ করে ডরমে থাকা আর লোকাল ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করলে। আর গোয়াতে যদি চার দিনের জায়গায় সাত দিন করতে চান, তাহলে এভাবে ট্রাভেল করলে ১০ হাজার যথেষ্ট বলে আমার মনে হয়।

তবে ট্রেনের টিকিট বেশ আগে থেকেই করে রাখবেন যাওয়া-আসার। কলকাতা-গোয়া-কলকাতা বা প্লেনে গেলে তার টিকিট।

 

লিয়াকত হোসেন

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads