• সোমবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ১ পৌষ ১৪২৬

ভ্রমণ

ভুটান ভ্রমণ

  • প্রকাশিত ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯

সাহাবুদ্দীন শরীফ

 

 

ঘুরতে আমার খুব ভালো লাগে। ভালোলাগার অন্যতম কারণ, ঘুরতে গেলে পড়া লাগে না, স্কুলে ফাঁকি দেওয়া যায়। যখন বাসা থেকে একা এদিক-সেদিক যাওয়ার বিষয়ে বাধা দেওয়া বন্ধ করে দিল, এরপর থেকেই দেশের এদিক-সেদিক ঘুরেছি, ঘুরছি।

ফোবজিকা

যথারীতি গিয়ে পৌঁছালাম রাতে, আশপাশ দেখার সুযোগ হলো না সেদিনও, তাদের ফার্মহাউজটি দোতলা, নিচতলা এখনো থাকার উপযোগী হয়নি, সুতরাং আমাদের থাকার জায়গা হলো দোতলায়, ঘরের ভেতরের কন্ডিশন অনেকটা আমাদের মতোই, কাঠের সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠতেই প্রথমে একটি খোলা বারান্দা এবং সেটি পার হতেই একটি ড্রয়িংরুম এবং সেটিকে ঘিরে ৪-৫টা শোবার ঘর। এত রিমোট একটি এরিয়াতে এমন সুন্দর ঘর আর এর বিছানাগুলো আমাদের কল্পনারও বাইরে ছিল। বলে রাখি রিমোট এরিয়া বলেই এসব স্থানে লোকাল গাড়ি খুব একটি মেলে না, কিন্তু প্রায় প্রতিটি কৃষক পরিবারেরই নিজেদের ছোট ছোট কার আছে এবং মহিলারাও পটু ড্রাইভিংয়ে। এখানে আছে মোবাইল নেটওয়ার্ক আর ৮০ শতাংশ এলাকায় ফোরজি সেবা।

ভুটানের অন্যসব জায়গাতে আমরা কিছু জানা ইংরেজি আর হিন্দি মিলিয়ে কথোপকথনে পার পেয়ে গেলেও ধরাটা খেলাম এখানে এসে। এই ঘরের মালিক-মালকিনরা না জানে ইংরেজি, না হিন্দি। আমাদের গাইড কাম ড্রাইভার আরুন তার দক্ষ হাতে গাড়ি সামলানোর মতো করে এখানেও আমাদের সামলে নিল, দোভাষীর দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে। ঘন ডাল, সাদা ভাত, কম ঝালের কিন্তু অনেক বড় এক ধরনের মরিচ ভাজা এবং মিক্সড একটি সবজি দিয়ে সারলাম স্মরণকালের শ্রেষ্ঠ একটি রাতের খাবার, অসাধারণ তাদের রন্ধনশৈলী। এদের খাবারের দাম একটু বেশি হওয়ায় আগে থেকেই প্ল্যান ছিল পরদিন দুপুরে এখানে না খাওয়ার। অতঃপর রাতে খাওয়ার পর মাজেদ ভাই জানিয়ে দিলেন যত দামই হোক, পরদিন সকালে ফোবজিকা সাইড সিয়িং করে দুপুরে এখানেই খাব। সব শেষে মাঝ রাতে সবার অংশগ্রহণে শুরু হলো সংগীত পর্ব, ৩য় দিনের এপিসোড ৩-এর আসর। সবচে বেশি মজা করে গান গেয়েছিলাম আমরা সেদিন। আর সব শেষেরও শেষে ঘুমাতে গেলাম, সকালে উঠে চক্ষু চড়কগাছ, না কিছু খোয়া যায়নি, শুধু দৃষ্টি ছাড়া।

আগের প্রতিটি থাকার জায়গা পাহাড়ের ওপরে হলেও এই বাংলো অনেকটা সমতলে, পাহাড় বেয়ে নেমে আসা একটি ভ্যালির মাঝখানে আর তার চারদিকে ক্ষেত, আলুর ক্ষেত। সবুজের সমারোহের মাঝখানে একটি বাড়ি, উফ সে যে কি ছোট জুড়ানী। বিছানা থেকে চোখ মেলতেই চোখ গিয়ে আটকাচ্ছে দূরের ক্ষেত, তার পরের ভ্যালি অথবা তারও পরের পাহাড়ে। ঘরের ভেতর বেশিক্ষণ নিজেদের আটকে রাখা গেল না, সারি সারি পাইন গাছে ভরা পাহাড়ের মাঝের পথ পাড়ি দিয়ে আমরা উপত্যকা/ভ্যালির রাস্তার দিকে এগিয়ে গেলাম, আরো অনেকদূর এই উপত্যকার মাঝখান দিয়ে হেঁটে গেলাম আমরা। এতদূরের পাহাড়েও ঘন ঘন পাইন গাছের বাগান এবং তাদের বেড়ে ওঠার প্রয়াস দেখে অনুভব করলাম কেন ভুটান একটি কার্বন নেগেটিভ দেশ। কাশ্মীর কিংবা সুইজারল্যান্ড না যাওয়া আমি ফোবজিকা ভ্যালিকে তাদের সঙ্গে তুলনায় দাঁড় করালাম, ভ্যালিতে দেখা ঘোড়াগুলোও আমার তুলনার মাত্রা বাড়িয়ে দিল যেন। বিস্তীর্ণ সবুজ ভ্যালিতে আমরা দুপুর পর্যন্ত দুরন্তপনায় মেতে উঠেছিলাম। এমন সৌন্দর্যতে বিমোহিত হয়ে আমরা যেন ফিরতেই চাইছিলাম না, ফিরতামও না, যদি আরুন গাড়ি নিয়ে আমাদের নিয়ে না আসত, আর এই লেখা লেখার জন্যও ফিরে আসাটা দরকার ছিল, না হয় আপনারা জানতেন কি করে? ফার্মহাউজে ফিরে আবার সেই অমৃত দিয়ে লাঞ্চ সারলাম, শেষে বড় পাতিল থেকে ঢেলে এক মগ চা, তাদের বিদায় দিয়ে ফিরে চললাম। পথে ফোবজিকার খুব কাছে একটি মনস্ট্রি দেখতে গেলাম, অধিকাংশই কাঠের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই মনস্ট্রির বয়স কম করে হলেও হাজার খানেক হবে, হাজার বছর আগেও এখানকার মানুষ কতখানি শৈল্পিক ছিল, এর নির্মাণশৈলী দেখে ধারণা করা যায়। কিছু সময় পর এবার ফেরার পালা, উদ্দেশ্য এবার পুনাখা।

(চলবে)

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads