• শনিবার, ৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
মিশন থানচি টু পদ্মঝিরি

সংগৃহীত ছবি

ভ্রমণ

মিশন থানচি টু পদ্মঝিরি

  • প্রকাশিত ২৩ নভেম্বর ২০১৯

আমাদের যাত্রা ছিল বান্দরবান জেলার থানচি উপজেলার রেমাক্রি ইউনিয়নের নাফাখুম এবং দুর্গম নাক্ষিয়ং-এর দেবতাপাহাড়, আমিয়াখুম, ভেলাখুম, সাতভাইখুম।

প্রথমম দিন কুমিল্লা থেকে রাত ১২টা ৪৫ মিনিটে সৌদিয়া বাসে (টিকিট ৬২০) যাত্রা শুরু করে সকাল ৬টায় বান্দরবান শহরে পৌঁছে যাই। বাস থেকে নেমে নাস্তা শেষ করে চান্দের গাড়ি রিজার্ভ (৫৫০০ টাকা) করে থানচির উদ্দেশে রওনা দিই। যেতে যেতে পথে চাঁদ উঠেছিল না মেঘের সমুদ্র দেখা মিলছিল এই সমুদ্রের বর্ণনা হয়তো লিখে বা ক্যামেরাবন্দি করে বোঝানো যাবে না স্বয়ং নিজ চোখে না দেখলে।

বেলা ১১টার দিকে আমরা থানচি পৌঁছে যাই, থানচি থেকে ১০-১২ কিমি আগে বিজিবি চেকপোস্ট পড়ে, সেখানে আমাদের সবার আইডি কার্ডের ফটোকপি জমা দিয়ে নাম-ঠিকানা লিখে এন্ট্রি করতে হয়। বিজিবির একটা ক্যাফে আছে ওখানে। স্থানীয় বাগানের একদম ফ্রেশ পেঁপে, কমলার জুস পাওয়া যায়, চাইলে ট্রাই করে দেখতে পারেন। কয়েকদিন আগে থেকেই ১৩০০০ টাকা দিয়ে লোকাল গাইড + নৌকা (আপ-ডাউন) ৩ দিনের জন্য ঠিক করে রেখেছিলাম। আমাদের গাইড ছিলেন রাফায়েল দাদা। আমিয়াখুম, ভেলাখুম, সাতভাইখুম, দেবতা পাহাড় যাওয়ার ২টা পথ আছে। একটা হলো পদ্মঝিরি হয়ে ৭-৮ ঘণ্টা  ট্রেকিং করে থুইশাপাড়া দিয়ে, আর একটা হল রেমাক্রি হয়ে নাফাখুম দিয়ে জিন্নাপাড়া-থুইশা পাড়া হয়ে, দুই পথের মজা নেওয়ার জন্য আমরা রেমাক্রি হয়ে যায় ফেরার সময় পদ্মঝিরি হয়ে ব্যাক করি, তো গাইড ওইভাবেই সব ঠিক করে রেখেছিল। থানচি পৌঁছানোর পর রাফায়েল দাদার মাধ্যমে থানা, বিজিবি থেকে সব ধরনের ফর্মালিটিস পূরণ করে আগামী ৩/৪ দিনের জন্য বাসায় শেষ বারের মতো কথা বলি।

কারণ সাঙ্গু নদীতে একটু এগিয়ে গিলে আপনি নেটওয়ার্কে বাইরে চলে যাবেন, বেলা ১টার দিকে লাইফ জ্যাকেট, পানি, স্যালাইন, গ্লুকাজ, শুকনো খাবার কিনে নৌকায় উঠে পলাম সাংঙু নদী দিয়ে রেমাক্রি যাওয়ার জন্য। কেননা পরে আর তেমন কোনো খাবার কিনতে পাওয়া যাবে না।। সাঙ্গু নদী আর বড় পাথরের অপরূপ দৃশ্য দেখতে দেখতে ২/৩ ঘণ্টা অতিক্রম করার পরেই আমরা পৌঁছে গেলাম রেমাক্রি, গাইড আমাদের থাকার জন্য রেমাক্রিতে একটা কটেজ ঠিক করে রেখেছিল, খাওয়ার ব্যবস্থাও ওখানেই। রেমাক্রি পৌছে সাঙ্গু নদীতে রেমাক্রি ঝিরিতে কিছুক্ষণ ঝাঁপাঝাঁপি করে সেদিনের মতো বিশ্রাম। রাতে রেমাক্রি বাজারে কিছুক্ষণ ঘুরে কটেজে আসলাম, এরপর আকাশের তারা গুনতে গুনতে আর দূর থেকে আসা রেমাক্রি ঝিরির মৃদু গর্জন শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পরলাম। মনে হলো জীবন এত সুন্দর কেন!

দ্বিতীয় দিনে আমরা রেমাক্রি থেকে নাফাখুমের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করব। যাই হোক সকালে রেমাক্রি বাজার থেকে পরোটা ডিম ভাজি দিয়ে নাস্তা করলাম। এরপর কটেজের আনুষঙ্গিক খরচ শেষ করে ব্যাগসহ সকাল ৮টায় নাফাখুমের উদ্দেশে রওনা দিলাম। পাহাড়ের পাদদেশ ঘেঁষে বড় ছোট ঝিরিপথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ দেখামিল আরাকান আর্মির। দৃষ্টির অগোচরে আরাকান আর্মির নাম শুধু বইয়ের পাতা বা খবরে কাগজেই পড়েছিলাম। কিন্তু হঠাৎ সামনে আসাতেই অস্ত্রধারী বাহিনী দেখে যেমন আনন্দে আত্মাহারা হলাম তেমনই অনিশ্চিত ঝুঁকিতে বুকের ভেতর দুরুদুরু করে কাঁপছিল। হয়তো তখনই থেমে যেতে জীবন প্রদীপটা কিন্তু সৌভাগ্য আমাদের তারা যথেষ্ট শান্তকামী এবং তাদের বিষয় ধারণাটা ভুল তার হিংস্র নয়। প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর নাফাখুমের অপার সৌন্দর্য দেখে কোথায় যেন সব ক্লান্তি উড়ে গেল। বাংলার নায়াগ্রার ঠান্ডা হিমশীতল পানিতে গোসল করে রোদ পোহানো হলো কিছুক্ষণ। এরপর শুকনো কিছু খাবার খেয়ে রওনা দিলাম জিনাপাড়ার উদ্দেশে। সূর্য ততক্ষণে মধ্যগগনে। ঘড়িতে বাজে ১টা ৪৫ মিনিট। এমনিতেই টানা হাঁটার পর গোসল, তারপর আবার হাঁটা। শরীর যেন চলতেই চায় না। কষ্ট হলেও হেলেদুলে হাঁটতে হাঁটতে বিকাল ৫টায় জিনাপাড়াতে পৌঁছালাম। চারদিকে পাহাড় আর নেটওয়ার্কের চিহ্ন মাত্র নেই। এরপর সন্ধ্যায় চায়ের দোকানে বসে সারাদিনের ক্লান্তি ভুলে গান, আড্ডা আর রাতে ঝিঁঝি পোকার আওয়াজ কি যে অসম্ভব সুন্দর অনুভূতি যা লিখতে গেলে হাজার রাত পার হয়ে যাবে।

তৃতীয় দিনে ভোর ৬টায় নাস্তা করে কটেজ বিল মিটিয়ে থুইসাপাড়ার উদ্দেশে রওন দিই। থুইসাপাড়া পৌঁছে কটেজে ব্যাগ রেখে আমাদের মূল সফর শুরু হলো (গাইড আগে থেকে কটেজ ঠিক করে রেখেছিল থুইসাপাড়ায়)। গাইড আগের রাতে জানিয়ে দিয়েছিলেন আজকে তিনটি পাহাড় পার হতে হবে। এর মধ্যে একটি দেবতা পাহাড় যার নাম শুনলেই মেরুদণ্ড দিয়ে ছোটখাটো শীতল স্রোত বয়ে যায়। জেনে রাখা ভালো আমরা যেগুলোকে পাহাড় বলি স্থানীয়রা সেটাকে টিলা বলে। থুইসাপাড়া থেকে সকাল ৮টায় আমরা আমিয়াখুমের উদ্দেশে রওনা দিলাম। আগের দিন টানা হাঁটার কারণে দেবতা পাহাড় পৌঁছানোর পূর্বেই আমাদের দলের একজন প্রকৃতির কাছে হার মেনে ফেরত চলে গেল। বাকি সদস্য নিয়ে দেবতা পাহাড় যখন পৌঁছালাম তখন আমাদের আনন্দ দেখে কে! এরপর শুরু হলো প্রতি পদে পদে বিপদ আর রোমাঞ্চ। একবার পা হড়কে গেলে কি হবে তা আর ভাবতে চাই না। দেবতা পাহাড় থেকে আমিয়াখুমের সেই গর্জন নতুন করে উদ্দীপনা তৈরি করল আমাদের মাঝে। তারপর সম্পূর্ণ খাড়া একটি পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে মাটির রাস্তা ধরে নামতে আমাদের মোটামুটি ১ ঘণ্টা ৩০ মিনিটের মতো সময় লাগল। এরপর হাতের ডান দিকে কিছুক্ষণ হেঁটে ভেলাখুমের দিকে যাওয়া শুরু করলাম। উঁচু-নিচু পাথরের মাঝ দিয়ে পাথুরে রাস্তা দিয়ে সতর্কতার সাথে হেঁটে সবুজ স্বচ্ছ শান্ত জলধারার এক পাড়ে এসে দাঁড়ালাম। এখান থেকে আমাদের ভেলায় করে যাত্রা শুরু হবে। রাফায়েল দাদা আগেই ভেলা ঠিক করে রেখেছিলেন। ভেলাখুমের জলরাশি আর দুপুরের কড়া রোদ মিলেমিশে এক অন্যরকম অনুভূতি।

ভেলাখুম দেখা শেষে যে পথে এসেছি ওই পথেই ১৫ মিনিট হাঁটলেই দেখা মিলবে আমিয়াখুম, আমিয়াখুমের সামনে প্রবল জলরাশির কাছে গিয়ে সব কষ্ট সার্থক মনে হলো। একটু আগালেই দেখা মিলবে সাতভাইখুম, এরপর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে এরপর বেশ বড় কিছু পাথরের ওপর দিয়ে হক্ষ্যংমুখে গোসল করে আমরা দেবতা পাহাড়ের দিকে যাত্রা শুরু করলাম। এখন শরীরে বিন্দুমাত্র শক্তি নেই। কীভাবে উঠেছি নিজেও জানি না। সময় লাগল প্রায় ৪০ মিনিট। বিকালে পরিশ্রান্ত অবস্থায় থুইসাপাড়া আসার পথে পাহাড়ের মাঝে সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে আসার যে অনুভূতি বেঁচে থাকলে আবার আসার সংকল্প করলাম।

চতুর্থ দিনে অফিসিয়ালি ট্যুর শেষ। কিন্তু পদ্মঝিরি আমাদের ডাকছে। দীর্ঘসময় থুইসাপাড়া থাকায় হঠাৎ কেমন যেন মায়া পড়ে গেছে, স্মার্টফোন আর ইন্টারনেটের যুগে নেটওয়ার্কবিহীন এলাকায় নিয়ম করে সন্ধ্যায় সবাই চা খেতে খেতে আড্ডা দেওয়া আর হবে না। কিন্তু সকল মায়া ত্যাগ করে আমাদের রওনা দিতে হবে। থুইসাপাড়া থেকে পদ্মমুখ পর্যন্ত হাঁটার গতির তারতম্যের বিচারে আসতে সময় লাগে ৬-৮ ঘণ্টা। সকাল ৭টায় থুইসাপাড়া থেকে বিদায় নিয়ে পদ্মঝিরির দিকে হাঁটা শুরু হলো আমাদের। পাঁচটা পাহাড় আর দুই-তিনটা টিলা পার হয়ে হরিশ্চন্দ্রপাড়া পৌঁছাতে বেলা ১টা বেজে গেল। এর মাঝে আমাদের গাইড রাফায়েল দাদা দূর থেকে আমাদের তাজিংডং আর সাকা হাফং পাহাড় দেখিয়ে দিলেন। অফিসিয়ালি তাজিংডং বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়। কিন্তু পাহাড়িদের মতে তাজিংডং সাকা হাফংয়ের অর্ধেকও না।

হরিশ্চন্দ্রপাড়ার জুমঘরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে এখান থেকেই পদ্মঝিরিতে নেমে গেলাম আমরা। আলো-আঁধারি পরিবেশ আর দুই পাহাড়ের মাঝ দিয়ে বয়ে চলা ছোটবড় ঝিরি দিয়ে তৈরি চমৎকার এক পথের নাম পদ্মঝিরি সেই ঝিরির ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বিকাল ৫টায় আমরা পদ্মমুখে পৌঁছে বোটে উঠে থানচিতে চলে আসলাম। অতঃপর চান্দেরগাড়ি রিজার্ভ করে আলীকদম হয়ে চকরিয়া এসে উদ্দেশ্যবিহীনভাবে শহরের এখানে সেখানে ঘুরে রাতের বাসে কুমিল্লা চলে আসলাম।

লেখক: শাহ রাজন

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads