• রবিবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২০, ৫ মাঘ ১৪২৬
কুতুবদিয়া, মহেশখালী ও সোনাদিয়া ট্রিপ

সংগৃহীত ছবি

ভ্রমণ

কুতুবদিয়া, মহেশখালী ও সোনাদিয়া ট্রিপ

  • প্রকাশিত ০৪ জানুয়ারি ২০২০

অনেক দিন ধরে স্বপ্ন দেখছিলাম কুতুবদিয়া এবং সোনাদিয়া যাওয়ার, অফিসের চাপ এবং সব মিলিয়ে সময় করে উঠতে পারছিলাম না। বছরের শেষে কোনোমতে ছুটির ব্যবস্থা করলাম।

এবার আসি মূল গল্পে, ২৬ ডিসেম্বর সকাল ৬টায় চলে গেলাম চট্টগ্রামের শাহ আমানত সেতুতে/তৃতীয় কর্ণফুলী সেতু। সেখান থেকে মগনামা ঘাটের ডাইরেক্ট সিএনজি এবং বাস পাওয়া যায় সিএনজি প্রতিজন ১৮০ টাকা এবং বাস প্রতিজন ১৫০ টাকা। ঢাকা থেকে আসলে প্রথমে চট্টগ্রামের গরিবুল্লাহ শাহ/জিইসি মোড়/ চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন নেমে সিএনজিকে নতুন ব্রিজ বললে নিয়ে যাবে শাহ আমানত সেতুতে।

দুই ঘণ্টার মতো জার্নি করার পর পৌঁছে গেলাম মগনামা ঘাটে। মগনামা ঘাট থেকে লাইফ বোট/লাল বোটগুলো ছেড়ে যায় কিছুক্ষণ পর পর, কিছু বোট যায় মালেক শাহ্ দরবার ঘাটে আর কিছু যায় কুতুবদিয়া বড়গোপ ঘাটে। বড়গোপ যাওয়ার বোটে চেপে বসলাম ১৫-২০ মিনিটের জার্নি করেই পৌঁছে গেলাম কুতুবদিয়া বড়গোপ ঘাটে। প্রতি ঘাটে ৩ টাকা করে ঘাট ভাড়া, আর বোট ভাড়া নিবে প্রতিজন ২০ টাকা করে। বড়গোপ ঘাট থেকে ডাইরেক্ট টমটম বা মাহিন্দ্রা পাওয়া যায় ওটাতে করে বড়গোপ বাজারে চলে গেলাম প্রতিজন ১৫ টাকা ।

দুপুরের খাবার-দাবার সারলাম স্থানীয় এক হোটেলে সাগরের বিভিন্ন লোকাল মাছ দিয়ে। খাওয়া দাওয়া বা গাড়ি ঠিক করার সময় অবশ্যই দরদাম করে নেবেন, তাহলে ঝামেলায় পড়ার সুযোগ কম থাকবে। ভরপেট খাওয়া দাওয়া সেরে বেরিয়ে পড়লাম কুতুবদিয়া বাতিঘর এবং উইন্ডমিল দেখার জন্য। বড়গোপ বাজার থেকে মাহিন্দ্রা/টেম্পো/জিপ রিজার্ভ করতে হবে, কারণ ওইন্ডমিল এবং বাতিঘরের ওইদিকে লোকাল কোনো টমটম বা মাহিন্দ্রা যায় না, আমার প্ল্যানিং ছিল উইন্ডমিলের ওখানে ক্যাম্পিং করার, তাই আমরা প্রথমে বাতিঘর দেখবো আর পরে উইন্ডমিলের ওখানে গিয়ে নেমে যাব, এমন শর্তে একটা লম্বা টেম্পো রিজার্ভ করলাম ১২০০ টাকা দিয়ে। বাতিঘরের ওখানে এক ঘণ্টার মতো ঘোরাঘুরি করে চলে গেলাম উইন্ডমিল আমাদের কাঙ্ক্ষিত ক্যাম্পিং স্পটে, ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের কারণে সন্ধ্যার পর থেকে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি এবং সমুদ্রে পানি বেশি থাকায় সাগরের পাড়ে ক্যাম্পিং করা হয়নি, তবে উইন্ডমিলের জিনিসপত্র রাখার জন্য এবং তাদের অফিসিয়াল কার্যক্রমের জন্য একটি দোতালা ভবন রয়েছে ওই ভবনের একটি ফ্লোরে টেন্ট পিচ করে ছিলাম, উইন্ডমিলের নিরাপত্তার দায়িত্বে যারা ছিলেন ওনারা অসাধারণ মনের মানুষ ছিলেন এবং আমরা রাতে ওনাদের টিউবওয়েল এবং বাথরুম ইউজ করেছি। কাসেম ভাইয়ের সঙ্গে (মোবাইল নং ০১৮২৭-৭১৯৯৭৯) যোগাযোগ করে যেতে পারেন যদি কেউ যান, উনি সেখানকার কেয়ারটেকার।

২৭ তারিখে আমাদের গন্তব্য মহেশখালী-ঘটিভাঙ্গা হয়ে সোনাদিয়া। ৮টার মধ্যে রেডি হয়ে বের হয়ে গেলাম আলি আকবর ডেইল ঘাটের উদ্দেশে। বড়গোপ ঘাট থেকে ছেড়ে আসা সার্ভিস বোটটি মহেশখালী হয়ে কক্সবাজার যায়। ৯টা ২০ মিনিটে আলি আকবর ডেইল ঘাটে ভিড়ে এবং ১৫/২০ মিনিটের মতো অপেক্ষা করে যাত্রী এবং মালামাল নিয়ে আবার যাত্রা শুরু করে। উইন্ড মিল থেকে আলি আকবর ডেইল ঘাট পর্যন্ত লোকাল টেম্পো পাওয়া যায় প্রতিজন ভাড়া ১০ টাকা করে। ডেইল ঘাট বাজার থেকে সকালের নাস্তা সেরে বোটে চেপে বসলাম, মহেশখালী নদীর দুপাশের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে ৪ ঘণ্টা রোমাঞ্চকর এক জার্নি শেষে পৌঁছে গেলাম মহেশখালী। ডেইল ঘাট থেকে মহেশখালী পর্যন্ত বোট ভাড়া প্রতিজন ১০০ টাকা এবং ঘাট ভাড়া ৫ টাকা। মহেশখালী পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় দেড়টা হয়ে যায়, মগনামা ঘাট থেকে টমটম নিয়ে চলে যাই গুরুকগাট্টা বাজারে। ঘাট থেকে জনপ্রতি ১০ টাকা টমটম ভাড়া। আলামিন হোটেলে বিভিন্ন আইটেমের সামুদ্রিক মাছ এবং ভর্তা দিয়ে খাওয়া সেরে গুরুকগাট্টা বাজার থেকে একটি রিজার্ভ টমটম (১৫০ টাকা ভাড়া) নিয়ে চলে যাই ঘটিভাঙ্গা বাজারে।

ঘটিভাঙ্গা থেকে জোয়ারের সময় লালবোট ছেড়ে যায় সোনাদিয়ার উদ্দেশে, আপনি যদি ট্রেকিং করতে পছন্দ করেন তাহলে বোটে করে না গিয়ে হেঁটেও চলে যেতে পারবেন সোনাদিয়া। এক ঘণ্টার মতো ট্রেকিং করলেই পৌঁছে যাবেন সোনাদিয়া। বর্ষার সময় কাদা থাকে তাই শীতকালে যাওয়া ভালো। বোটভাড়া প্রতিজন ৩০ টাকা করে। ট্রিপম্যাট যদি বেশি হয়, তাহলে বোট রিজার্ভ করারও সুযোগ রয়েছে। ৮০০/৯০০ টাকা নেবে আসা যাওয়া। বোট ছাড়ার কিছুক্ষণ পর অবাক চোখে তাকিয়ে রইলাম, দুপাশের ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট মাঝখানে বয়ে চলা নদী এবং মাছ ধরার নৌকা এককথায় মনোমুগ্ধকর, যা আপনার মন ছুঁয়ে যেতে বাধ্য। ২০-২৫ মিনিট বোট জার্নি করার পর আমরা পৌঁছে গেলাম সোনাদিয়ার পশ্চিম পাড়ায়। সোনদিয়া পুরো দ্বীপে মোট দুটি পাড়া রয়েছে একটি পূর্ব পাড়া এবং অন্যটি পশ্চিম পাড়া। টিওবির পোস্ট দেখে একজন গাইডের নাম্বার সংগ্রহ করে রেখেছিলাম। গাইডের নাম আলমগীর ভাই (মোবাইল নম্বর ০১৮১৮-৮৫৭৯৫১) অসাধারণ মানুষ। সারাক্ষণ ঠোঁটের কোণে হাসি লেগে থাকে মানুষটার। আলমগীর ভাই মহেশখালী এসে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন সকাল থেকে এবং মহেশখালী থেকে হরেকরকমের মাছ কিনে নিয়ে যান এবং সেগুলো দিয়ে রাতের খাবার সেরে আমরা চলে গেলাম সোনাদিয়া বিচের পাড়ে। আলমগীর ভাইয়ের করা ছোট একটি ঘরে একদম বিচের সাথে লাগানো এই ঘরে অসাধারণ এক সময় কাটালাম। সকাল বেলা একদম ভোর বেলা উঠে বিচের হাজার হাজার লাল কাঁকড়ার ভিড়ে যেন বিচে পা ফেলা দায়। কাঁকড়াগুলোর মাথার উপর দুটি শিং অ্যান্টেনার মতো কাজ করে। বিপদের আভাস পেলেই গর্তে ঢুকে যায়। বহু কষ্টে কয়েকটা ছবি এবং ভিডিও করতে সক্ষম হলাম।

এক ঘণ্টার মতো বিচে ঘোরাঘুরি করে ব্যাগপ্যাক গুছিয়ে এবং নাস্তা করে ৯টার বোট ধরলাম। জোয়ার চলে গেলে আবার বিপত্তি। তাই আর দেরি না করে বোটে করে চলে এলাম ঘটিভাঙ্গায়। ঘটিভাঙ্গা বাজার থেকে মহেশখালী আদিনাথ মন্দির ও স্বর্ণমন্দির এবং চ্যালিয়াতলী বাজার যাওয়ার জন্য ৯০০ টাকা দিয়ে একটি সিএনজি রিজার্ভ করলাম। পূর্ণিমার কারণে স্বর্ণমন্দিরে ঢুকতে পারিনি। তাই আদিনাথ মন্দির এবং পাশে সেলফি ব্রিজ দেখে চ্যালিয়াতলী বাজার/জনতা বাজার চলে এলাম। চ্যালিয়াতলী বাজার থেকে ডাইরেক্ট চকরিয়ার সিএনজি পাওয়া যায় প্রতিজন ৫০ টাকা করে। চকরিয়া বাস টার্মিনাল থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সবদিকের প্রায় সব কোম্পানিরই বাস পাবেন। আমরা চট্টগ্রামের বাস ধরে চলে এলাম। যারা ঢাকা যাবেন, তারা সরাসরি ঢাকা চলে যেতে পারবেন।

সোনাদিয়া বিচ কচ্ছপের প্রাকৃতিক প্রজনন স্থান। ক্যাম্পিং করার সময় অতিরিক্ত আলো জ্বালাবেন না। আলোতে কচ্ছপের সমস্যা হয়। আর যেখানে সেখানে ময়লা বা প্লাস্টিক ফেলে পরিবেশের ক্ষতি করবেন না। সোনাদিয়া বিচ আমাদের দেশের সম্পদ। একে রক্ষা করা আমাদেরই দায়িত্ব।

লেখক: শাহ্ রাজন 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads