• সোমবার, ২৫ জানুয়ারি ২০২১, ১১ মাঘ ১৪২৭

ভ্রমণ

ঘুরে আসুন পঞ্চগড়

  • শাহ রাজন
  • প্রকাশিত ১১ ডিসেম্বর ২০২০

উত্তরের রাজধানীখ্যাত ব্যস্ত শহর বগুড়ার রাস্তার দুই পাশের দোকানগুলো একটা একটা করে বন্ধ হচ্ছে, আমি ধীর পায়ে সামনে এগোচ্ছি। কিছু ওষুধের দোকান ছাড়া অন্যসব দোকান বন্ধ হয়ে গেছে বলা যায়। ঘড়িতে সময় রাত ১২টা ছুঁই ছুঁই। মধ্যরাতে একা একা বগুড়ার রাস্তায় হাঁটছি আর চিন্তিত মনে একটা কথাই ভাবছি, পারব তো বাসে উঠতে?

এত চিন্তার কারণ রাতেই যাব হিমালয় কন্যাখ্যাত পঞ্চগড়ে। দেশের সর্বউত্তরের এই জেলায় যাচ্ছি প্রথমবার। সেটাও কি না বগুড়া থেকে। দিনদুয়েক আগে বগুড়া এসেছিলাম, আনাচ-কানাচে ঘুরে বেড়িয়েছি বয়সে অর্ধশত ছুঁই ছুঁই এক তরুণ সেবাস্তিন দাদার সাথে। তিনি রাতে খুলনা চলে যাচ্ছেন, আমার গন্তব্য সমতলের চায়ের দেশ পঞ্চগড়। বগুড়া থেকে রাতে পঞ্চগড় যাওয়ার কোনো বাস সার্ভিস নেই। সন্ধ্যাবেলা এসে কাউন্টারে কাউন্টারে খোঁজ করেছিলাম; কিন্তু উপায় মেলেনি। এক কাউন্টারের ভদ্রলোক সমাধান বাতলে দিলেন। ঢাকা থেকে পঞ্চগড়গামী বাসগুলো মধ্যরাতে বগুড়ার সাতমাথা ক্রস করে যায়, ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে মিলতে পারে তাতে ওঠার সুযোগ। সেই আশায় দাদাকে খুলনার বিআরটিসির চকচকে এসি বাসে তুলে দিয়ে আমি হাত তুলে থামিয়ে টিকিটবিহীন ওঠার জন্য মধ্যরাতে রাস্তায় হাঁটছি।

বগুড়া থেকে ঢাকায় আসার বাসগুলোতে মধ্যরাতে প্রচুর যাত্রী। আর সাতমাথা মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে এই রাতদুপুরে। চারদিকে হাঁকডাক, রাতের নিস্তব্ধতা সেই কবেই উড়ে গেছে। আশপাশে রাস্তায় অসংখ্য দোকানপাট, বিশেষ করে হরেক রকম খাবারের দোকান। কেউ পিঠা বিক্রি করছে, কেউ ঝালমুড়ি, কেউবা তেলেভাজা। এরকম অচেনা জায়গায় রাত্রিতেও কেমন একটা জিজ্ঞাসু চাহনি নিয়ে চারদিকে দেখছিলাম। একবারের জন্যও অনিরাপদ বোধ হয়নি। রাস্তার মাঝখানে সারি সারি ভ্যান নিয়ে কিছুক্ষণ আগেই এসে দাঁড়িয়ে গেল আরো কয়েকটা কাচে ঘেরা খাবারের দোকান। এরই মধ্যে কানে হেডফোন গুঁজে টিওবির সেইন্ট মার্টিন পরিচ্ছন্নতা অভিযান নিয়ে নিয়াজ মোর্শেদ, তানভীর মৃদুল আর মুনীম চৌধুরীর আড্ডা গল্প শুনছিলাম রেডিও থেকে।

ঢাকাগামী অসংখ্য যাত্রীর সাথে এক বাস কাউন্টারে ফ্যানের নিচে বসে আছে আর চোখ তাক করে রেখেছি ঢাকা থেকে আসা বাসের দিকে। একটা একটা বাস আসে আর জিজ্ঞাসু চাহনি নিয়ে এগিয়ে যাই। কয়েকটা বাস যাওয়ার পরে হানিফের এক বাস এলো সামনে লেখা বাংলাবান্ধা। মনে হলো বাংলা ছায়াছবির নায়ক জসীমের মতো লটারি পেয়ে গেছি। হাত তোলার আগেই বাস দাঁড়িয়ে গেল, বুঝলাম এটা তাদের নিয়মিত কার্যক্রম। কঠোর দরদাম করে ৩০০ টাকায় উঠে গেলাম পঞ্চগড়ের বাসে। উত্তরাঞ্চলের বাসগুলোর অবস্থা অন্যান্য অঞ্চল থেকে কিছুটা অবহেলিত থাকে সব সময়ই দেখেছি। সেই ধারাবাহিকতা রক্ষায় বাসের সিটে ক্যাচক্যাচে শব্দ আর সামনের সিটে হাঁটু আটকে যাওয়া নিয়েই পেছনের সিটে বসে একটা ঘুম দিয়ে ফেললাম। ঘুম ভাঙল সুপারভাইজারের ভাড়া চাওয়ার তাগাদায়। কিছুক্ষণ পরে সামনের দিকে একটা সিট মিলল।

ভোর চারটার কাছাকাছি সময়ে পঞ্চগড় পৌঁছে গেল বাস, আরো কিছু সময় পরে তেঁতুলিয়া। যারা বাংলাবান্ধা যাবে তাদেরকে অন্য এক বাসে তুলে দেওয়া হলো আমি তেঁতুলিয়াতে থেকে গেলাম। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে সামনে হেঁটে গেলাম, মোড়ের মসজিদে ফজরের নামাজের জন্য রেডি হচ্ছে মুসল্লিরা আমিও শামিল হলাম। নামাজ শেষে ম্যাপ দেখে হাঁটা শুরু করলাম ডাকবাংলোর দিকে। এর মধ্যে রাস্তায় নেমে গেছে কয়েকজন সাইকেল নিয়ে, হয়তো কোনো কাজে যাচ্ছে। ডাকবাংলোয় উঠার পথে দেখা হলো এক ষাটোর্ধ্ব চাচার সাথে। তার সাথে কথা বলে জানলাম প্রতিদিন ভোরেই আসেন হাঁটাহাঁটি করতে। প্রায়ই দেখা যায় স্লিপিং বুদ্ধকে। চাচার সাথে গল্প করতে করতে ডাকবাংলো এলাকা ঘুরে ঘুরে দেখলাম। ছড়ানো ছিটানো চিপস, বিস্কুটের প্যাকেট দেখে মনে হলো প্রতিদিন অনেক লোকের আগমন ঘটে, যদিও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আবর্জনা না ফেলার জন্য সুন্দর সুন্দর বার্তাসংবলিত পোস্টার লাগানো আছে।

সূর্যোদয়ের আগ পর্যন্ত এখানেই রইলাম, অন্ধকার কেটে গিয়ে আকাশ পরিষ্কার হওয়ার সাথে সাথেই উত্তর-পশ্চিম কোণে হালকা একটা রেখে ভেসে উঠল। কিছুক্ষণ পরে আরো কয়েকজন প্রাতঃভ্রমণকারী আসলেন, উচ্ছ্বাসের সাথে আঙুল প্রদর্শন করে আমাকে দেখালেন ওই যে ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’। তারা জানালেন প্রতি বছর অনেক লোক আসে ঢাকা থেকে, তবে এবার আমাকেই প্রথম দেখেছেন। প্রায় সাতটা পর্যন্ত এখানেই রইলাম, মুগ্ধ হয়ে দেখলাম স্লিপিং বুদ্ধের আবছায়া অবয়ব। মোবাইলের ক্যামেরায় খুব একটা ধরা যায়নি, চর্মচক্ষু যা উপভোগ করেছে তাতে মন বেশ প্রসন্ন হয়েছে। তারপর বেরিয়ে গেলাম বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্টের উদ্দেশে। ডাকবাংলো থেকে বেরিয়েই একটা ভ্যান পেয়ে উঠে গেলাম, কিছুদূর গিয়ে জানলাম তারা আর যাবে না। নেমে গিয়ে মহা নন্দা নদীর পাশ দিয়ে সীমান্তবর্তী সড়ক ধরে হেঁটে হেঁটে গেলাম কিছুক্ষণ। একটা অটো এসে জিজ্ঞেস করাতে বাংলাবান্ধা বলাতে তুলে নিল  রাস্তাটা সীমান্তের পাশ দিয়েই মহা নন্দার সাথে পাল্লা দিয়ে বয়ে গেছে। যদিও মহা নন্দা এখন মৃত প্রায়, পানি শুকিয়ে বালুচরে পরিণত হয়েছে।

সকাল ৮টায় শুরু হয় পোর্টের কার্যক্রম, এর আগেই পৌঁছে গেছি আমি। বিজিবি চেকপোস্টের সামনে গিয়ে সাইনবোর্ড দেখে হতাশ হলাম। বিকাল ৪টা ৩০ থেকে ৫টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত পর্যটকদের জন্য খোলা। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। কয়েক মিটার দূরেই ওপারে বিদেশ, বিএসএফ সদস্যরা প্যারেড করছেন লেফট রাইট। এরই মধ্যে একটা গাড়ি এসে থামল বিজিবির লোকবল নিয়ে, কেন এসেছি জানতে চাইলেন সিনিয়র। পেশাগত পরিচয় দিয়ে আগমনের কারণ জানানোর পরে জিরো পয়েন্ট যাওয়ার অনুমতি দিলেন। জিরো পয়েন্ট গিয়ে খুব ভালো লাগল। এই জিরো পয়েন্ট অনেকের জন্য মাইলফলক। অনেক খ্যাতিমান লোক সাইক্লিং, রানিং, হাঁটা কর্মসূচির সূচনা বা সমাপ্তি এখানে করেছেন। কিছুক্ষণ দাঁড়ালাম, ছবি তুললাম। যেহেতু একাই এসেছি তাই নিজের ছবি তোলার মতো কাউকে পেলাম না, পেছনে তাকিয়ে দেখি বিজিবির দুই সদস্যা এসেছেন আমাকে পাহারা দিতে। তাদেরকেই অনুরোধ করলাম ছবি তুলে দিতে। একজন মোবাইল নিয়ে ক্লিক করতেই সিনিয়রের হাঁক এলো। তারপর চলে এলাম আবার তেঁতুলিয়া।

এবার নাস্তা করে নিয়ে পাশেই একটা মন্দির ঘুরে এলাম, ততক্ষণে স্কুলগামীদের দ্বিচক্রযান রাস্তার দখল নিয়েছে। কাজী অ্যান্ড কাজীর চা বাগান দেখতে রওশনপুর বাজারের লোকাল মাহিন্দ্রায় চেপে বসলাম। রওশনপুর বাজার থেকে ভ্যানে গেলাম সমতলের চা বাগানে। সিলেট, চট্টগ্রামের চা বাগান দেখলেও উত্তরে গড়ে ওঠা সমতলের এই চাবাগান বেশ ভালো লাগল। আনন্দধারা রিসোর্টে প্রবেশ করতে চাইলে অনুমতি নিতে হয় কর্তৃপক্ষ থেকে। জুবায়ের আবদুল্লাহ ভাইয়ের কাছ থেকে ম্যানেজার সাহেবের ফোন নাম্বার নিয়ে কথা বলে অনুমতি নিলাম। সুনসান নীরব একটা জায়গা, সাজানো-গোছানো বাগান। এর মধ্যে কয়েকটি সুন্দর বাগানবাড়ির মতো গোল ভবন। একটা থেকে আরেকটাতে যাওয়ার জন্য সুন্দর কংক্রিটের সেতু, নিচ দিয়ে বয়ে গেছে চপলা তরুণীর মতো এক নদী। কয়েকটি ঘোড়া মনের সুখে ঘাস চিবোচ্ছে।

রোদের প্রাচুর্যতা বাড়ছে, শরীরে ভর করেছে ক্লান্তি। তাই ফিরে যেতে হবে আয়েশের খোঁজে। বের হয়ে এবার মহারাজার দিঘির উদ্দেশে রওনা করলাম। পঞ্চগড়গামী বাসে উঠে নামলাম বোর্ডবাজার সেখানে থেকে অটোরিকশায় গেলাম মহারাজার দিঘি। গাছগাছালিতে ভরা বেশ বড় এক দিঘি। তবে পরিচ্ছন্নতার অভাবে মনে হলো অবহেলিত। বের হয়ে পঞ্চগড় এলাম তপ্ত দুপুরে, ভরপেট খেলাম এক রেস্তোরাঁয়। রওনা দিলাম ঠাকুরগাঁওয়ের উদ্দেশে। আবার আসব পঞ্চগড়, তখন হবে রাত্রি যাপন। এবারের মতো হাঁটা অতিথি হয়ে নয় কথা দিলাম।

এই ভ্রমণটা ছিল গত বছর আজকের দিনে, স্মৃতি হাতড়ে যা মনে ছিল তাই আটকে রাখলাম।

আমার ভ্রমণে সব সময় বার বার ব্যবহার করা যায় এমন পানির বোতল ব্যবহার করি, সিংগেল ইউজ প্লাস্টিকের বোতল ব্যবহার না করার জন্য। চেষ্টা করি প্লাস্টিকের মোড়কের ব্যবহার কমিয়ে আনতে, যদি ব্যবহার করি সেটা নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলার আগ পর্যন্ত নিজের ব্যাগের একটা পকেটে সংরক্ষণ করি। প্রকৃতিকে যতটা সম্ভব কম প্লাস্টিক দিন, তাহলেই ভালো থাকব আমরা।

#উত্তরের পথে প্রান্তরে #WayTo North #Travel Responsibly #Do Not Litter

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads