• সোমবার, ২৫ জানুয়ারি ২০২১, ১১ মাঘ ১৪২৭

ভ্রমণ

প্রকৃতির রূপসী কইন্যা আড়াইহাজারের চৌদ্দারচর

  • অরণ্য সৌরভ
  • প্রকাশিত ০৮ জানুয়ারি ২০২১

‘নদী তুমি কোথা হতে আসিয়াছ?’ বিজ্ঞানাচার্য জগদীশ চন্দ্র বসুর লেখাটি অনেকেই পড়ে থাকবেন, পড়েছেন কবিগুরুর চিত্র-বিচিত্র কাব্যে লেখা আমাদের ছোট নদী/ চলে বাঁকে বাঁকে/বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে। নদী এমনই-দেখলেই আমাদের মুগ্ধতা বাড়ে। পঞ্জিকা মতে, বর্ষা মৌসুম শেষ হয়ে শরৎ-হেমন্ত বহু আগে বিদায় নিয়ে এখন শীতকাল চলছে। এমন দিনে ঘুরে আসতে পারেন নারায়ণগঞ্জ জেলাধীন আড়াইহাজারের মেঘনার চর বা চৌদ্দারচরে।

শীতকাল মানেই ঘোরাঘুরি আর ভ্রমণের সুযোগ। তবে সময়ের অভাবে অনেকেই কক্সবাজার, সিলেট, রাঙামাটি যেতে পারেন না। যদিও ভাবছেন কাছে কোথাও থেকে ঘুরে আসবেন যেখানে রয়েছে প্রকৃতির সখ্য, তবে আপনার জন্য ঢাকার অদূরেই রয়েছে অনন্য সুন্দর আড়াইহাজারের মেঘনার চর। নারায়ণগঞ্জ জেলার প্রাকৃতিক শোভা সমৃদ্ধ আড়াইহাজার উপজেলার এই চরের সৌন্দর্য সত্যিই মুগ্ধ করার মতো। এই শীতে পরিবার-পরিজন অথবা বন্ধুদের নিয়ে ঘুরে আসতে পারেন ঢাকার অদূরেই আড়াইহাজার থেকে। একদিনের ভ্রমণের জন্য দারুণ একটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জায়গা এটি। হুটহাট প্ল্যানে অল্প সময়েই ঘুরে আসতে পারবেন আড়াইহাজার মেঘনার চর থেকে।

আড়াইহাজার উপজেলার সর্বপূর্বে খাককান্দা ও কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে চলে গেছে মেঘনা নদী। মেঘনার করালগ্রাসে কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়নের মধ্যাচর গ্রামের অনেকাংশ নদীতে বিলীন হতে হতে খাককান্দার কাছে মেঘনা নদীর মাঝখানে পড়েছে বিশাল চর। সেই চর ধীরে ধীরে স্থায়ী হয়েছে বেশ কয়েক বছর যাবৎ। সেখানে এখন কৃষক ফসল ফলাতে পারে। কিন্তু কয়েক বছর যাবৎ দেখা যাচ্ছে চৌদ্দারচরে বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের আনাগোনা। আর তারা সকলেই আসে এখানে ঘুরতে, নিজেকে প্রশান্তির বাতাসে ডুবাতে, প্রকৃতির সাথে মিশে যেতে।

ঢাকা থেকে মাত্র দেড়-দুই ঘণ্টায় যাওয়া যায় আড়াইহাজারে। এখানে রয়েছে মেঘনা নদীর মাঝখানে জেগে ওঠা সাড়ে তিন কিলোমিটার লম্বা চৌদ্দারচর। অনেকটাই কুয়াকাটার মতো দেখতে। বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে এরকম মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ দেখা যায় না ঢাকা শহরের আশপাশে। এখানে দেখতে পাবেন নদীর চার পাশের বিস্তীর্ণ সরিষা ক্ষেত, খিরা ক্ষেত, বাঙ্গি ক্ষেত। চৌদ্দারচরের অনাবিল সৌন্দর্য আর মেঘনার উচ্ছল জলরাশি আপনাকে আন্দোলিত করে তুলবে। দারুণ স্বচ্ছ নীলাভ জল রয়েছে এখানে। মেঘনার এই জলে ইচ্ছেমতো দাপাদাপি করতে পারবেন। পানি ঘোলা হবে না।

ভাটার সময় এখানে ১০-১৫ ফিট বালির চর থাকে। এখানে বালি অনেক শক্ত তাই কোনো চোরাবালির ভয় নেই। চরের বুক জুড়ে ছুটে চলে হাঁসের দল, উড়ে চলে কাক, ঈগল ও গাঙচিল, সাদাবকের স্নিগ্ধতা আর রাজহাঁসের রাজত্ব এই বালুর বুকে। হাঁটতে হাঁটতে দেখা মেলে শামুক ও ঝিনুকের। খোলা আকাশে পাখির মেলা আর মাঝে মাঝে ট্রলার আর জাহাজের শব্দ এখানে সৃষ্টি করে অনাবিল সৌন্দর্যের এক দৃশ্য।

বর্ষা বেশি হলে এই চর ডুবে যায়। আবার বর্ষা কমে গেলে এই চর ভেসে ওঠে। বাচ্চাদের জন্যও দারুণ এক জায়গা এটি। চরের ছাগল ছানাদের নিয়ে খেলা করে, বালিতে খেলা করে, শামুক ঝিনুক কুড়িয়ে প্রচুর আনন্দ পাবে তারা। আর নদীতে ঘোরার সময় নানান রকম শীতের পাখির ওড়াউড়ি তো আছেই। এখানকার নরম ঘাস আর গ্রামীণ মেঠোপথের সৌন্দর্য আগতদের মুগ্ধ করে। সূর্যাস্তের সময় গোধূলির সোনালি আলোয় পুরো চর মোহনীয় রূপধারণ করে।

নদীর বুকে টুপ করে নেমে আসা রাতের অন্ধকারে চাঁদের রুপালি আলো দেখতে কার না ভালো লাগে! মুগ্ধ করা সেই আলোয় কোথাও ঘুরতে যেতে চান? তাহলে এবারের শীতের পূর্ণিমায় ঘুরে আসতে পারেন নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার মেঘনার চর থেকে। জোছনা যাপনের জন্য খোলা নদীর চেয়ে ভালো আর কিছু নেই। যদিও বা কুয়াশার কারণে জোছনাবিলাস খানিকটা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই বলে কি সেই জোছনার সৌন্দর্য থেমে থাকবে?

নদীর জলে আকাশ ভরা পূর্ণিমার আলোর সৌন্দর্য বর্ণনাতীত। এ শুধু দেখবার, এ শুধু অনুভবের। চরে গেলেই সেখানে পাবেন একদিকে মেঘনা নদীর বিশাল জলরাশি। অপরদিকে তীরের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে বালুময় প্রান্তর। মাঝখানের নির্জন চরে বসে রুপালি জোছনার আলোতে ভেসে যাবেন অন্যরকম এক মায়াবী জালে। বিশাল জলরাশি নিয়ে বয়ে চলা খরস্রোতা মেঘনা নদীর সাথেই রয়েছে বিস্তীর্ণ সমতল ভূমি। কেউ ইচ্ছে করলে বিশাল ট্রলার ভাড়া নিয়ে ভেসে বেড়াতে পারেন মেঘনার বুকে। রাতে থাকতে পারেন ওই ট্রলারেই। ঘুরতে ঘুরতে দেখবেন নদীর পাশের মানুষের জীবন ধারা, জেলেদের মাছ ধরা, পাশে দিয়ে ছুটে চলা শত শত জাহাজ, হঠাৎ করেই পাশ থেকে নেমে আসবে রাজহাঁস, দেশি হাঁসের ঝাঁক, উড়তে থাকে নানা প্রজাতির পাখি। এক অপরূপ দৃশ্য যা আপনার মন ভোলাতে বাধ্য করবেই। বছরের যে-কোনো মৌসুমেই ভ্রমণ করতে পারবেন তবে বিশেষ করে চর অঞ্চলের ভ্রমণ স্বাদ নিতে চাইলে বর্ষা বা শীতকাল সবচেয়ে উপযোগী সময়।

কয়েক বছর যাবৎ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের ীিড় দেখা যায় চৌদ্দারচরে। দিন যাচ্ছে আর মানুষের আনাগোনা বাড়ছে চরে বালিময় স্থানে। বর্তমানে পর্যটনকেন্দ্রের মতো তেমন সুযোগ-সুবিধা না থাকায় ভ্রমণকারীদের মুখোমুখি হতে হচ্ছে নানান সমস্যার। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আড়াইহাজারের মেঘনার চর তথা চৌদ্দারচর হয়ে উঠতে পারে আরেক কুয়াকাটা।

 

যেভাবে যাবেন

সায়েদাবাদ থেকে অভিলাষ পরিবহনের বাসে করে মদনপুর হয়ে যেতে পারেন আড়াইহাজারে। ভাড়া নেবে ৬৫ টাকা। অথবা গুলিস্তান থেকে দোয়েল/স্বদেশ পরিবহন এ মদনপুুর যেতে পারেন। ভাড়া নেবে ৪৫ টাকা। এরপর সেখান থেকে আড়াইহাজার যাবেন সিএনজিতে। ভাড়া ৫০ টাকা। এছাড়া কলাবাগান থেকে মেঘলা পরিবহনের বাস ছাড়ে। ভাড়া ৬৫ টাকা। গাউছিয়া নেমে একটু সামনে গিয়ে লোকাল সিএনজিতে যেতে হবে আড়াইহাজার বাজার। ভাড়া নেবে ৩০ টাকা। এছাড়া কুড়িল ফ্লাইওভার থেকে আড়াইহাজার চৌরাস্তা বিআরটিসি এসি বাস যায়। ভাড়া ৯০ টাকা। যেভাবেই যান এরপর আড়াইহাজার থানার মোড় থেকে সিএনজিতে খাগকান্দা ঘাট যেতে হবে। ভাড়া ৪০ টাকা। ঘাটের সাথেই চৌদ্দারচর দেখা যায়। লোকাল ট্রলারে ২০ টাকা নেবে। তা ছাড়া ট্রলার রিজার্ভ নিয়ে মনমতো ঘুরতে পারেন। আকার, ধরনভেদে ২০০-৪০০ টাকা ঘণ্টা নেবে।

 

কখন/কোন সময় যাবেন

ঋতু বা মৌসুম অনুযায়ী রূপবৈচিত্র্য ভিন্ন রকম হয়ে থাকে। তবে বর্ষায় মেঘনা নদী ভরপুর থাকে বলে অনেকেই তখন ভ্রমণ করতে চান না। বলা যায় নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত চৌদ্দারচর বা মেঘনার চর ভ্রমণের উপযুক্ত সময়। কারণ তখন নদী শান্ত থাকে। মেঘনার চরে চোরাবালির কোনো ভয় নেই। কারণ এখানকার বালি বেশ শক্ত। ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময় শীত। শীতে চরে নানান রকমের শস্য ক্ষেত দেখা যায়। তখন হরেক রকমের পাখির ভিড় জমে।

আড়াইহাজার উপজেলায় চৌদ্দারচর ছাড়াও আরো অনেক চর আছে। আপনি চাইলে নৌকা নিয়ে এসব চরে যেতে পারবেন। চৌদ্দারচরের আশপাশে অন্যান্য দর্শনীয় স্থানের মধ্যে রয়েছে অনেকগুলো দর্শনীয় স্থান। ঐতিহাসিক স্থানের মধ্যে রয়েছে-শতবর্ষী পুুরোনো স্কুল, জমিদারবাড়ি, বটগাছ ইত্যাদি। এছাড়া যাওয়ার পথে লতব্দী, উচিৎপুরা, মাহমুদপুরের রাস্তার পাশেই কাতান শাড়ির শিল্প, থ্রি-পিস, গামছা শিল্পের তাঁতঘর চোখে পড়বে। স্বল্পমূল্যে সেগুলো কিনতেও পারবেন।

থাকা-খাওয়া

থাকার জন্য আড়াইহাজার বা চৌদ্দারচরে তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। দিনে গিয়ে দিনে ফিরে আসা ভালো। তবে কেউ একান্তই থাকতে চাইলে আড়াইহাজারের জেলা পরিষদ ডাকবাংলোতে থাকতে পারবেন। মোবাইল নম্বর ০১৯১৭-০০৮-৪৯৬। মেঘনার চরে কোনো খাবারের দোকান নেই। খাওয়ার জন্য আপনাকে নিকটস্থ আড়াইহাজার বাজারে আসতে হবে। আড়াইহাজার বাজারে খাবারের বেশ কিছু দোকান আছে। এখানে আপনি দুপুুরের খাবার খেয়ে নিতে পারবেন। এ ছাড়া আড়াইহাজার বাজারে জিয়ার ডালপুুরি, আলুপুুরি, নোয়াপাড়া ব্র্যাকের পাশে ডালপুুরি, গোপালদি বাজারে নাজিমুদ্দিন হোটেলের গরুর মাংস ও বোরহানির স্বাদ নিতে পারেন।

সতর্কতা ও নোট

আড়াইহাজার বা চৌদ্দারচর কোনো পর্যটন এলাকা না। সম্পূর্ণ নদীকেন্দ্রিক একটি জনপদ। যারা সাদামাটা প্রকৃতি পছন্দ করেন, তাদের ভালো লাগবে। সাঁতার না জানলে নদীতে নামা উচিত না। প্রয়োজনে লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার করতে পারেন। বর্ষায় মেঘনা নদীতে পানির স্রোত অনেক বেশি ও নদী উত্তাল থাকে। পরিবার নিয়ে যেতে চাইলে বর্ষায় না যাওয়াই ভালো। ভ্রমণের সময় স্থানীয় মানুষজন ও নৌকার মাঝির সাথে ভালো ব্যবহার করুন। যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলবেন না; এটা শুধু ভ্রমণে গিয়ে নয়, দেশের কোথাও করবেন না। 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads