• শুক্রবার, ২২ অক্টোবর ২০২১, ৬ কার্তিক ১৪২৮
ভরা মৌসুমেও বিপুল চাল আমদানি

সংগৃহীত ছবি

আমদানি-রফতানি

নিয়ন্ত্রণহীন চালের বাজার #আমদানির মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য সরকারের

ভরা মৌসুমেও বিপুল চাল আমদানি

  • মোহসিন কবির
  • প্রকাশিত ২৩ আগস্ট ২০২১

চলতি বছর বোরো মৌসুমে দেশে ধান উৎপাদন হয়েছে রেকর্ড পরিমাণ। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী এবার ২ কোটি ৭ লাখ ৮৪ হাজার ৫০৮ টন বোরো ধান উৎপাদন হয়েছে, যা এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ। গত বছর উৎপাদন হয়েছিল ১ কোটি ৯৬ লাখ টন। অর্থাৎ, গতবছরের তুলনায় এ বছর ১১ লাখ টনেরও বেশি ধান উৎপাদন হয়েছে। এরইমধ্যে বাজারে নতুন ধানের চাল এসে গেছে। কিন্তু ধানের বাম্পার ফলন সত্ত্বেও কমেনি চালের দাম। উল্টো গত কয়েকদিনে নতুন করে বেড়েছে চালের দাম। চালের বাজার নিয়ন্ত্রণের দোহাই দিয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয় প্রতিবেশী দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ চাল আমদানির অনুমতি দিয়েছে। গত ১৮ এবং ২১ আগস্ট দু-দফায় খাদ্য মন্ত্রণালয় ১৬৩ টি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৮ লাখ ৯ হাজার মেট্রিক টন চাল আমদানির অনুমতি দিয়েছে।

গত ২১ আগস্ট ৯২ টি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে আমদানির জন্য বরাদ্দ দিয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। ৯২টি প্রতিষ্ঠান মোট তিন লাখ ৯১ হাজার মেট্রিক টন সিদ্ধ ও আতপ চাল আমদানি করবে। এর মধ্যে নন-বাসমতি সেদ্ধ চাল তিন লাখ ৫৮ হাজার টন এবং আতপ চাল ৩৩ হাজার টন। এর আগে গত ১৮ আগস্ট প্রথম দফায় ৭১টি প্রতিষ্ঠানকে চার লাখ ১৮ হাজার টন চাল আমদানির অনুমতি দিয়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। আগামী ২৫ আগস্ট পর্যন্ত চাল আমদানির জন্য আরো বেশকিছু প্রতিষ্ঠান আবেদন করবে বলে খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, চলতি অর্থ বছরে সরকারি ও বেসরকারিভাবে প্রায় ১৩ লাখ ৫৯ হাজার মেট্রিক টন চাল আমদানি করেছে। এছাড়া, চলতি বছর শুধুমাত্র জুলাই থেকে ১৯ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ ১৭ হাজার মেট্রিক টন চাল আমদানি করেছে।  

খাদ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, মূলত চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে আনার লক্ষ্যেই বিপুল পরিমাণে আমদানি করা হচ্ছে। গত ১৬ আগস্ট খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার জানান, ‘আমদানির চাল দেশে আসলে দাম কমে যাবে।’ কিন্তু গত বছরের অভিজ্ঞতা বলছে, দেশে চাল আমদানির পরও বাজার নিয়ন্ত্রণে আসেনি। একারণে মন্ত্রীর আশ্বাসে আস্থা রাখতে পারছেন না সাধারণ মানুষ।

তাদের অভিযোগ, সরকার আন্তরিক হলে বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভবপর হতো। এজন্য বিদেশ থেকে এত বিপুল পরিমাণে চাল আমদানির প্রয়োজন হতো না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে মাথাপিছু দৈনিক চাল খাওয়ার পরিমাণ ৪১৬ গ্রাম। যদিও পরিসংখ্যান ব্যুরোর এই হিসাবে গড়মিল রয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, জনপ্রতি দৈনিক চাল গ্রহণের পরিমাণ এরচেয়েও কম। তবে এই হিসাবেই দেশে ১৭ কোটি জনসংখ্যার জন্য বার্ষিক চালের চাহিদা সেক্ষেত্রে ২ কোটি ৫৮ লাখ ৪০ হাজার টন। যা তিনটি মৌসুমে উৎপাদিত ধান-চাল দিয়েই পূরণ করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিদায়ী ধান উৎপাদন মৌসুমে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) এক গবেষণা প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হয়, অভ্যন্তরীণ খাদ্য চাহিদা পূরণ করেও চলতি বছরের জুন পর্যন্ত কমপক্ষে ৩০ লাখ টন চাল উদ্বৃত্ত থাকবে। সেখানে বলা হয়েছে, অতিবৃষ্টিতে কয়েক দফা বন্যায় ৩৫টি জেলার আমন ধান ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সারা বছরের উৎপাদন ও চাহিদা বিবেচনা করলে দেশে খাদ্য ঘাটতির ‘আপাতত কোনো আশঙ্কা নেই’।

অথচ ব্রির গত বছরের আগস্টে প্রকাশ করা এই প্রতিবেদনের পূর্বাভাস গত বছর নভেম্বরেই ভুল প্রমাণিত হয়। চলতি বছর জুন পর্যন্ত ৩০ লাখ টন চাল উদ্বৃত্ত থাকা তো দূরের কথা, জানুয়ারিতেই সংকটের আশংকায় সরকার জি-টুি-জি (দুই সরকারের মধ্যে লেনদেন) পদ্ধতিতে সাড়ে চার লাখ টন চাল আমদানি করতে বাধ্য হয়। রপ্তানিমুখী বাংলাদেশ এখন চাল আমদানির পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছে বেসরকারি খাতেও। পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের মধ্যে বাংলাদেশেই এখন চালের দাম সর্বোচ্চ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এএফও) সর্বশেষ প্রতিবেদন এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দৈনিক খাদ্যশস্য প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই সব দেশে চালের দাম কমেছে। ফলে বাংলাদেশ মোটা চাল আমদানি করলে প্রতিকেজি দাম পড়বে ৩৩ থেকে ৪০ টাকার মধ্যে, যা বাংলাদেশের বর্তমান বাজারদরের চেয়ে অনেক কম।

সরকারি সংস্থা টিসিবির হিসাবে এখন মোটা চালই বিক্রি হচ্ছে ৪৭-৫৫ টাকা কেজি দরে। ফলে বাজারের অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষণীয়। সাধারণত বোরো মৌসুম এলে চালের দাম কমে। ২০২০ সালজুড়ে বেশি দামে চাল কেনা মানুষ অপেক্ষায় ছিলেন বোরো মৌসুমের। তবে এবার এপ্রিল-মে মাসে বোরো ধান উঠার পরও চালের দাম তেমন একটা কমেনি; বরং মৌসুম শেষ না হতেই বাড়তে শুরু করে। এখনো বাড়ছে। টিসিবি বলছে, ঢাকায় গত এক সপ্তাহে মোটা চালের দাম বেড়েছে ৬ শতাংশের মতো। রাজধানীর ছোট বাজার ও পাড়া-মহল্লার মুদিদোকানে এখন ভালো মানের এক কেজি মোটা চাল কিনতে ৫০ টাকা লাগে। এর চেয়ে কিছুটা কম দামে চাল পাওয়া যায় বড় বাজারে এবং বেশি পরিমাণ অর্থাৎ পাইকারিতে কিনলে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads