• শুক্রবার, ২২ অক্টোবর ২০২১, ৬ কার্তিক ১৪২৮

আমদানি-রফতানি

আমদানিনির্ভর কালির ব্যবসা

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ২৮ আগস্ট ২০২১

দেশে প্রতিবছর প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার কালির ব্যবসা হয়; যার প্রায় শতভাগ আমদানিনির্ভর। সংশ্লিষ্টরা জানান, কোরিয়া, জাপান, জার্মান, রাশিয়া, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান, চীন, কাজাখস্তানসহ প্রায় ২৫টি দেশ থেকে বিভিন্ন ব্র্যান্ড ও নন-ব্র্যান্ডের কালি বাংলাদেশে আমদানি করা হয়। দেশে কালির ব্যবহার সবচেয়ে বেশি হয় লেখা ও মুদ্রণের কাজে।

কালি উৎপাদনে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের অভাবে মূলত এই ব্যবসা এখনো আমদানিনির্ভর বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ কালি প্রস্তুতকারক মালিক সমিতি ও প্রিন্টিং ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি কালির ব্যবহার হয় ম্যানুয়াল প্রিন্টিং প্রেসে। সাধারণত বই, পত্রিকা, পোস্টার, প্যাকেজিং ডিসপ্লে, ব্যানার, বিভিন্ন রশিদ বইসহ নানা ধরনের কাজে এই কালি ব্যবহূত হয়।

প্রিন্টিং ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান শহীদ সেরনিয়াবাত বলেন, সারা দেশে ছোট-বড় প্রায় ১৫ হাজার প্রিন্টিং প্রেস রয়েছে। এই প্রেসগুলোতে বছরে প্রায় ২,০০০ কোটি টাকার বিভিন্ন রকম কালি ব্যবহার করা হয়। যার প্রায় শতভাগ বিদেশি কালি। তিনি বলেন, শুধু রাজধানীতেই প্রায় ২,০০০ প্রেস রয়েছে।

দেশের বড় প্রিন্টিং প্রেসগুলোর মধ্যে অন্যতম ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড। কয়েক বছর ধরে তারা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বই মুদ্রণের কাজ করে আসছে। এছাড়া নিজেদের তিনটি ও আরো কয়েকটি পত্রিকা নিয়মিত ছাপানো হয় এই প্রতিষ্ঠানটির প্রেসে। প্রতিষ্ঠানটির একটি সূত্র জানায়, প্রতিবছর এখানে প্রায় ১০০ কোটি টাকার বিভিন্ন রকম কালির ব্যবহার করতে হয়। যার পুরোটাই কোরিয়া, জার্মানি ও চীন থেকে আমদানি করে থাকে প্রতিষ্ঠানটি।

বাংলাদেশ কালি প্রস্তুতকারক মালিক সমিতির সভাপতি এম এ মোমেন বলেন, দেশে প্রায় ৮০টি ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা কালি রপ্তানি করে। আর একটি মাত্র দেশীয় প্রতিষ্ঠান কালি উৎপাদন করে। 

সংগঠনটি জানান, বাংলাদেশে ফুজি ইঙ্ক, আকিজ গ্রুপের নেবুলা ইঙ্ক লিমিটেড, এআর ট্রেডিং কোং, মাস্টারপ্যাক লিমিটেড, খান ডাইটেক, নিউ রেজুলি স্ক্রিন প্রিন্টিং, পাইরিমেটেক্স, পিলক্রো গ্লোবাল, কিউর প্রোডাক্ট, রোশফি সিম্বল বিজনেস কোং, স্বচ্ছ ট্রেড হাউস বাংলাদেশ, এসকে ট্রেড লিংক, রয়েল ইঙ্ক, নিসান ইঙ্ক-নিসান পেইন্ট এন্ড অটোল্যাকিউয়ার কোং এবং এভারটেক্স ইঙ্ক ইন্টারন্যাশনাল কালি আমদানির শীর্ষে রয়েছে।

মুদ্রণ কাজের পরেই সবচেয়ে বেশি ব্যবহূত হয় কম্পিউটার থেকে প্রিন্ট দেওয়ার কাজে ব্যবহূত লেজার প্রিন্টার ও ইঙ্কজেট প্রিন্টারের কালি। দেশে প্রায় ৭০টি প্রতিষ্ঠান এই প্রিন্টারের কালি আমদানি করে। তারা প্রতি বছর প্রায় ৮৫০ কোটি টাকার কালি আমদানি করে। আকিজ গ্রুপের নেবুলা ইঙ্ক লিমিটেড, মাস্টারপ্যাক লিমিটেড, নিউ রেজুলি স্ক্রিন প্রিন্টিং, পিলক্রো গ্লোবাল, এসকে ট্রেড লিংক, রয়েল ইঙ্ক, নিসান ইঙ্ক-নিসান পেইন্ট, এভারটেক্স ইঙ্ক ইন্টারন্যাশনাল ও সোভিয়েত মেশিনারিজ লিমিটেড এই রপ্তানিতে এগিয়ে।

নিউ রেজুলি স্ক্রিন প্রিন্টিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসিফ আহসান বলেন, শুধু তার প্রতিষ্ঠানই প্রতিবছর ১০০ কোটি টাকার বেশি প্রিন্টারের কালি আমদানি করে থাকে। আগের চেয়ে দিন দিন এই কালির চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে তিনি জানান। আসিফ আহসান বলেন, কম্পিউটারের ব্যবহার যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে সেই হারে তাদের ব্যবসাও বাড়ছে। কারণ, এখন বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি অফিস, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও অনেকেই ব্যক্তিগত কাজে কম্পিউটার থেকেই নিয়মিত প্রিন্ট দেয়। ফলে এই কালি আমদানির ব্যবসাও বাড়ছে।

জানা যায়, দেশে প্রায় ৪০টি কলম তৈরির প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ম্যাটাডোর বলপেন ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান শাহ আলম বলেন, এই প্রতিষ্ঠানে ২৩ রকম বলপেন ও জেলপেন উৎপাদন করা হয়। দেশীয় বাজারে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার কলম সরবরাহ করে থাকে প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়াও আরো ১৫০ কোটি টাকার কলম প্রায় ১১ দেশে রপ্তানি করে প্রতিষ্ঠানটি।

টোকা ইঙ্ক বাংলাদেশ লিমিটেড ২০১৫ সাল থেকে প্রিন্টিং ও কলমের কালি উৎপাদনের কাজ হাতে নেয়। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ মোমেন বলেন, প্রতিবছর প্রায় ১০ কোটি টাকার কালি উৎপাদন ও সরবরাহ করা হয় দেশীয় বাজারে।

বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি করে তা থেকেই প্রস্তুত করা হয় কালি। তবে কাঁচামাল আমদানি ব্যয়বহুল হওয়ায় প্রত্যাশিত ব্যবসা হচ্ছে না বলে জানান তিনি। তবে ভবিষ্যতে এই ব্যবসায় ভালো করা সম্ভব বলে উল্লেখ করেন এম এ মোমেন।

রাজধানীর ওয়ারি এলাকায় শত বছরের পুরানো প্রিন্টিং প্রেস বৈশাখী প্রিন্টিং প্রেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোবারক হোসেন বলেন, বিদেশি কালির মান অনেক ভালো। এ ছাড়া প্রেসে কালির কুইক সেটিং, কুইক ড্রাইং, অধিক গ্লস, অধিক ছাপা ও ব্যবহারে সহজ বলেই এখন পর্যন্ত রপ্তানি করা কালিই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) কেমিক্যাল রিসার্চ ডিভিশনের প্রিন্সিপাল সায়েন্টিফিক অফিসার হেমায়েত হোসেন বলেন, কলম বা প্রিন্টার বা ছাপাখানার জন্য যে কালি উৎপাদন হয়, তার মূল উপাদান হলো কার্বন। যা বাংলাদেশে সংগ্রহ করা বেশ কঠিন ব্যপার।

তিনি বলেন, প্রিন্টারের কালির জন্য গাম অ্যারাবিক, সোদক ফেরাস সালফেট বা আয়রন (২), গ্যালিয়িক এসিড, ইথিলিন গ্লাইকল, প্রপিল গ্লাইকল এবং ফেনাল বা কার্বলিক এসিড বাংলাদেশের বাজারে পাওয়া যায় না। কালি উৎপাদনের এই কাঁচামালগুলো উন্নত দেশগুলোতে সহজেই পাওয়া যায়। এসব উপাদান কাঁচামাল হিসেবে আমদানি করে প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যয়বহুল।

শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন বলেন, দেশের বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান কালি আমদানির কাজ করে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এই ধরনের শিল্প প্রতিষ্ঠায় তেমন কোনো উদ্যোগ বা প্রস্তাব আমার দায়িত্ব পালনকালে মন্ত্রণালয়ে আসেনি। তিনি বলেন, তবে দুই একটা বিদেশি প্রতিষ্ঠান কালি প্রক্রিয়াজাতকরণের অনুমতি নিয়েছে। দেশীয় কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কালি তৈরির উদ্যোগ নিলে মন্ত্রণালয় আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করবে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads