• শুক্রবার, ২২ অক্টোবর ২০২১, ৬ কার্তিক ১৪২৮

আমদানি-রফতানি

বিপাকে আমদানি-রপ্তানি

  • মোহসিন কবির
  • প্রকাশিত ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১

করোনার কারণে আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনে জাহাজ ও কন্টেইনার ভাড়া চার থেকে পাঁচগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি সম্প্রতি ডলারের দামও বেড়েছে। ফলে বিপুল পরিমাণে আমদানি ও রপ্তানি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় দিশাহারা হয়ে পড়েছেন আমদানি ও রপ্তানিকারকরা। বিশেষ করে খাদ্য রপ্তানিকারকরা বিদেশে পণ্য পাঠাতে কন্টেইনার পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, বাংলাদেশ থেকে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে ফ্রেইড ফরোয়ার্ড কোম্পানির মধ্যে ম্যারস্ক বাংলাদেশ লিমিটেডের কন্টেইনার সবচেয়ে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু গত ৩ মাস ধরে তারা কন্টেইনার সাপোর্ট অনেক কমিয়ে দিয়েছে। কী কারণে বন্ধ করা হয়েছে তাও তারা বলছেন না। আন্তর্জাতিক ফ্রেইট ফরোয়ার্ডিং এই কোম্পানির দক্ষিণ এশিয়ার অঞ্চলের অফিস ভারতের পুনে অবস্থিত। সেখানে কর্মরত ভারতীয় কর্মকর্তারা বাংলাদেশে কন্টেইনার সেবা বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলছেন না।

ইউনিফাইড লজিস্টিকস লিমিটেডের এক্সিকিউটিভ অপারেশন কর্মকর্তা গোলাম রাব্বি মোরতুজা বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘আমরা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি, কিন্তু কেন তারা আমাদের দেশে সার্ভিস বন্ধ করেছে তা নিয়ে মুখ খুলছেন না। সেখানকার একজন মার্কেটিং কর্মকর্তা চিরঞ্জীব জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে কিছু কন্টেইনার তারা ছাড়ার কথা জানিয়েছে, যেগুলো শুধুমাত্র তাদের জন্য যাদের সাথে তাদের কন্ট্রাক্ট রয়েছে।’

খাদ্যপণ্য বাংলাদেশের অন্যতম রপ্তানি পণ্য। কিন্তু ম্যারস্ক তাদেরকে কোনো কন্টেইনার দিচ্ছে না বললেই চলে। গোলাম রাব্বি বলেন, আগে যে ৮০০ বা ৯০০ ডলারে বাহরাইনের এক কন্টেইনার পণ্য পাঠাতে পারতাম, এখন সেই কন্টেইনার ৩ হাজার ডলারেও মিলছে না। এছাড়া, লন্ডনে এক কন্টেইনারে এক কন্টেইনার মাল পাঠাতাম ৩ থেকে ৪ হাজার ডলারে। আর এখন সেই ফ্রেইডটা দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ডলারে অর্থাৎ, প্রায় ৫ গুণ। ব্যয় বৃদ্ধির ফলে অনেকেই সাময়িকভাবে বিদেশে পণ্য পাঠানো কমিয়ে দিয়েছেন কিংবা বন্ধ রাখছেন। কিন্তু বিদেশে যাদের শো-রুম রয়েছে তাদেরকে বাধ্য হয়ে বেশি খরচেই বিদেশে পণ্য পাঠাতে হচ্ছে।

শাকিল এন্টারপ্রাইজ এর স্বত্ত্বাধিকারী কে এস শাকিল জানান, কানাডার টরেন্টোয় তাদের পারিবারিকভাবে পরিচালিত একটি সুপারশপ রয়েছে। যেটি তার ছোট ভাই পরিচালনা করছেন। বাংলাদেশ থেকে তিনি সেখানে বিভিন্ন খাদ্যপণ্য পাঠান।

পরিবহন খরচ বৃদ্ধির বিষয়ে তিনি বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ২০ ফুটের কন্টেইনারে সাড়ে চার হাজার ডলারে পণ্য পাঠালেও এবার তা ১০ হাজার ডলারে পৌঁছেছে। এবার গতবারের চেয়ে বেশি পণ্য পাঠাতে হচ্ছে তাই ৪০ ফুটের কন্টেইনার লাগবে। গতবার এই সাইজের কন্টেইনারে খরচ পড়তো ৭ হাজার ডলার। কিন্তু এবছর লাগছে ১৫ হাজার ডলার। শাকিল জানান, নিজেদের শো-রুমের ব্যবসা সচল রাখতে পরিবহন খরচ বৃদ্ধি সত্ত্বেও পণ্য পাঠাতে হচ্ছে।

কন্টেইনার সংকটে পণ্য পরিবহনে ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে যেমনি উদ্বিগ্ন রপ্তানিকারকরা তেমনি ডলারের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে বিপাকে আমদানিকারকরা। ডলারের দাম ৪০ পয়সা বেড়ে, এখন প্রায় ৮৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া, এলসির (লেটার অব ক্রেডিট) দর ০.৩০ পয়সা বেড়ে এখন প্রায় ৮৫.২৫ টাকায় পৌঁছেছে। ডলারের দাম বৃদ্ধির জন্য আমদানি বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি প্রবাসী আয় প্রবাহ কমে যাওয়াকে চিহ্নিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা। ক্রমেই ডলারের দাম বৃদ্ধিতে চাপের মুখে পড়েছেন আমদানিকারকরা।

বাংলাদেশ ফুড স্টাফ অ্যান্ড সাপ্লাইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন-বাফিসা-র সভাপতি এবং বসুমতি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিএম গোলাম নবী বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘বাফিসার অধীনে আমরা শিশুখাদ্য, ডায়বেটিস রোগীদের জন্য বিশেষ ধরনের ফুড সাপ্লিমেন্ট থেকে শুরু করে অসংখ্য পণ্য আমদানি করে থাকি। ডলারের দাম বৃদ্ধির ফলে নিশ্চিতভাবেই এসব পণ্যের দাম বাড়বে।’

তিনি আরো বলেন, ‘ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন হলে আমদানি ব্যয়টা দুদিক থেকে বেড়ে যায়। একদিকে পণ্যের দাম বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে, আমদানিকৃত পণ্যের অ্যাসেসমেন্ট ভ্যালু যখন টাকার অঙ্কে হয় তখনও দাম বেড়ে যাবে। ফলে স্থানীয় বাজারে এর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।’

বিমান থেকে শুরু করে প্রতিরক্ষা খাতের বিভিন্ন মেশিনারিজ এবং টুলস আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ক্লিয়ার এজ টেকনোলজি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদুর রহমান এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘আমি যদি ১ লাখ ডলারের একটি পণ্য আমদানি করি, ডলারের দাম বৃদ্ধির কারণে ওই পণ্যে ১ লাখ টাকা বেড়ে যাবে। এই পণ্যটা যখন দেশের বাজারে বিক্রি করি তখন স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যাচ্ছে। এমনিতেই আমাদের শিপিং কস্ট বর্তমানে বেশি। তাদেরকে ডলারেই পে করতে হয়। সেখানেও পণ্যের দামটা বেড়ে যাচ্ছে।’

সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল হওয়ার কারণে ডলারের দাম বাড়ছে। গত জুলাইয়ে আমদানি ব্যয় ২১.৬৩ শতাংশের উচ্চগতি লক্ষ্য করা যায়, সে তুলনায় রপ্তানিতে হয় ১০.৫৪ শতাংশের নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি। যা ডলারের চাহিদা বৃদ্ধি ও তার ফলে মুদ্রা বাজারে সংকটের পেছনে ভূমিকা রাখে।

গত অর্থবছরের (২০২০-২১) প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্টে) রেমিট্যান্স ৫০ শতাংশের রেকর্ড প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেলেও চলতি অর্থবছরের (২০২১-২২) একই সময়ে রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি ১৯ শতাংশ কমেছে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads