• মঙ্গলবার, ৭ ডিসেম্বর ২০২১, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭
রপ্তানি পণ্যে জালিয়াতি করলে জেল

সংগৃহীত ছবি

আমদানি-রফতানি

রপ্তানি পণ্যে জালিয়াতি করলে জেল

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ০৩ অক্টোবর ২০২১

দেশে রপ্তানি পণ্য ও সেবার মান নিয়ন্ত্রণে একটি নতুন আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে এই আইনের একটি খসড়া তৈরি করা হয়েছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘রপ্তানি (মান নিয়ন্ত্রণ, পরীক্ষণ ও সনদ প্রদান) আইন ২০২১।’

খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এ আইনের বিধান অমান্য করে দেশ থেকে মানহীন পণ্য বিদেশে রপ্তানির চেষ্টা করছে বলে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়, অথবা কর্তপক্ষের রপ্তানি সনদ জালিয়াতি করে বিদেশে পণ্য রপ্তানি করে, তাহলে এর জন্য অভিযুক্ত ব্যক্তিকে কারাদণ্ড দেওয়া হবে। একই সঙ্গে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে গুনতে হবে জরিমানাও।

আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, এ ধরনের অপরাধ আদালতে প্রমাণ হলে প্রথমবার ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের পাশাপাশি এক বছরের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। দ্বিতীয়বার হলে অর্থদণ্ড হবে তিন লাখ টাকা এবং তার সঙ্গে ভোগ করতে হবে দুই বছরের কারাদণ্ড।

নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীল সরকারি সংস্থার কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর যদি এ অপরাধের সঙ্গে যোগসাজশ থাকে, তারও ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড ও দুই বছরের কারাদণ্ড হবে।

আবার কর্তপক্ষের কোনো সিদ্ধান্ত বা ল্যাবে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত যদি দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিদর্শক বা তদন্তসংশ্লিষ্ট কেউ অভিযুক্ত রপ্তানিকারকের কাছে আগাম ফাঁস করে দেয়, তাহলে তাকে ছয় মাস কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। পাশাপাশি গুণতে হবে ২৫ হাজার টাকার অর্থদণ্ডও। এ ছাড়া রপ্তানির ক্ষেত্রে এ ধরনের অপরাধ কোনো কোম্পানি কর্তৃক সংঘটিত হলে অপরাধ সংঘটনের সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত কোম্পানির পরিচালক, সচিব, ব্যবস্থাপকসহ সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা ওই অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হবেন। তবে এ আইন নিয়ে এখনই মুখ খুলতে চান না বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা।

বর্তমানে দেশে রপ্তানি খাতের বিকাশ, বৈদেশিক বাজার সম্প্রসারণে কাজ করছে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো বা ইপিবি। অনুসরণ করা হচ্ছে প্রতি তিন বছর পর পর প্রণীত রপ্তানি উন্নয়ন নীতিমালার দিকনির্দেশনা। এর বাইরে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো খুব বেশি কাজ করতে পারে না।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের রপ্তানি উইংয়ের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর বাইরেও রপ্তানিকারকদের সরকারের বিভিন্ন সংস্থার শরণাপন্ন হতে হয়। এক সংস্থার সঙ্গে আরেক সংস্থার সমন্বয় দুরূহ হয়ে পড়ে। এতে রপ্তানিকারকের সময় এবং খরচ দুটোই যেমন বেশি লাগে, তেমনি একই কারণে পণ্যের মান রক্ষার ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীল সংস্থাগুলোর দুর্বলতা দেখা যায়। সরাসরি শাস্তির আওতায় আনা যায় না। সব দিক বিবেচনা করেই আইন এবং কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার দিকে এগোচ্ছে সরকার।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো সূত্র মতে, আইনের এ খসড়ার ওপর এখন চলবে অংশীজনদের মতামত গ্রহণ, আংশিক সংযোজন, বিয়োজন এবং ভেটিংয়ের কাজ। এরপর তা মন্ত্রিসভায় উত্থাপন হবে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) মহাপরিচালক-২ খালিদ মামুন চৌধুরী জানান, ‘দেশ এগোচ্ছে। রপ্তানি খাতও সম্প্রসারণ হচ্ছে। বাড়ছে রপ্তানিকারকের সংখ্যাও। রপ্তানিখাতকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিচালনা করতে সরকার প্রয়োজন মনে করলে এ ধরনের একটি আইন তৈরি করতেই পারে।’

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর পরিচালক (নীতি ও পরিকল্পনা) মো. আবুল কালাম আজাদ এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, বাংলাদেশ রপ্তানি সনদ প্রদান কর্তৃপক্ষ গঠন হলে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর কর্মকাণ্ডে কোনো ব্যাঘাত ঘটবে না। বরং এতে রপ্তানি খাত একটি শৃঙ্খলায় আসবে এবং পণ্যমান নিয়ন্ত্রণ ও জালিয়াতি প্রতিরোধ সহজ হবে।

জানা গেছে, বিদেশে মানহীন পণ্য রপ্তানির চালান ধরা পড়লে কিংবা রপ্তানির ক্ষেত্রে সনদ জালিয়াতির ঘটনা ঘটলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের ভাবমূর্তি। তবে এসব ক্ষেত্রে দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আইন দেশে নেই।  অথচ এ ধরনের ঘটনায় বিদেশি নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কড়াকড়ির কারণে ভোগান্তির শিকার হতে হয় ওই খাতের অন্য সব রপ্তানিকারককে। কখনো কখনো পড়তে হয় নিষেধাজ্ঞার মুখেও। ফলে বন্ধ হয়ে যায় সংশ্লিষ্ট দেশ বা অঞ্চলে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ধারাবাহিকতা।

ভবিষ্যতে এ ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়াতে চায় সরকার। তা ছাড়া স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের প্রেক্ষাপটে রপ্তানি বাণিজ্যের মানোন্নয়নের মাধ্যমে সক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া বিকল্প কোনো পথ খোলা নেই বাংলাদেশের সামনে। আবার মানসম্মত দেশের পণ্য রপ্তানি হলে এর কারণে বিদেশে চাহিদা ও সুনাম দুটোই বাড়ে বাংলাদেশের। সে তাগিদ থেকেও রপ্তানি পণ্য ও সেবার মান উন্নয়নের কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এর অংশ হিসেবে দেশে রপ্তানি পণ্য ও সেবার মান নিয়ন্ত্রণে একটি নতুন আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে।

রপ্তানি (মান নিয়ন্ত্রণ, পরীক্ষণ ও সনদ প্রদান) আইন ২০২১-এর খসড়া পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য আনতে রপ্তানিকৃত সব পণ্যের জন্য এক বা একাধিক স্ট্যান্ডার্ড স্পেসিফিকেশন নির্ধারণ করা হবে। এর পাশাপাশি গঠন করা হবে ‘বাংলাদেশ এক্সপোর্ট সার্টিফিকেশন অথরিটি’, যা রপ্তানি পরিদর্শন, মান নিয়ন্ত্রণ ও সনদ প্রদান কাউন্সিল নামে পরিচিতি পাবে।

তবে এ তিনটি উইংই গঠিত হবে পৃথকভাবে এবং এদের কার্যক্রম পরিচালনা হবে স্বতন্ত্রভাবে, যেখানে রপ্তানি পণ্য ও সেবার চালান পরিদর্শন করবে শুধু ‘রপ্তানি পরিদর্শন বোর্ড।’ এদের পরিদর্শন প্রতিবেদন ও সংগৃহিত রপ্তানি চালানের নমুনা পাঠানোর ভিত্তিতে ল্যাবরেটরিতে মান নিশ্চিত করবে ‘মান নিয়ন্ত্রণ বোর্ড’। সব শেষে এ দুইটি বোর্ড বা সংস্থার সুপারিশের ভিত্তিতে রপ্তানিকারকের অনুকূলে রপ্তানি সনদ প্রদান করবে এক্সপোর্ট সার্টিফিকেশন অথরিটি।

এর আগে পণ্যমান খারাপ হওয়ার অভিযোগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে দেশের পান-সুপারি রপ্তানিকে টানা ছয় বছর নিষেধাজ্ঞায় পড়তে হয়। চিংড়ি রপ্তানিতেও উঠেছে মানহীনতার অভিযোগ। সম্প্রতি জাপান থেকে ফেরত এসেছে স্কয়ারের মোড়কে রপ্তানি হওয়া চানাচুরের একটি চালান। এর আগে মানহীনতার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত আসে এ কোম্পানির মোড়কে যাওয়া রাঁধুনী মাংসের মসলা ও রাঁধুনী সরিষার তেল।

এ আইনের অধীনে দায়িত্বশীল সংস্থার সিদ্ধান্ত বা আদেশের বিরুদ্ধে আপিল কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল দায়ের করতে পারবে সংক্ষুব্ধরা। রপ্তানির আগে সব পণ্যের মান নিশ্চিত করতে পরিদর্শন কাউন্সিলের পাঠানো টিমের পরিদর্শন ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা সাপেক্ষে মান উত্তীর্ণের সনদ নিতে হবে।

তবে যেসব কোম্পানির আন্তর্জাতিক সুনাম রয়েছে এবং আমদানিকারক দেশে যাদের বিরুদ্ধে কখনও কোনো প্রশ্ন উত্থাপিত হয়নি কিংবা বৈদেশিক উদ্যোক্তার মাধ্যমে শতভাগ রপ্তানিতে নিয়োজিত যেসব প্রতিষ্ঠান, তাদেরকে পরিদর্শকদের পরিদর্শন থেকে অব্যাহতি দেওয়া যাবে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads