• বৃহস্পতিবার, ৩০ জুন ২০২২, ১৬ আষাঢ় ১৪২৯
আয় বাড়াতে চাপে এনবিআর

সংগৃহীত ছবি

রাজস্ব

আয় বাড়াতে চাপে এনবিআর

  • এম এ বাবর
  • প্রকাশিত ১৫ মে ২০২২

লক্ষ্য অর্জনে বারবার বিফল হওয়ার পরও প্রতিবছরই বাড়ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) লক্ষ্যমাত্রা। চলতি অর্থবছরে (২০২১-২০২২) সম্ভাব্য ঘাটতি প্রায় ৫৮ হাজার কোটি টাকা। এরপরও আসন্ন অর্থবছরের (২০২২-২৩) বাজেটে এনবিআরকে দেওয়া হচ্ছে বিশাল লক্ষ্যমাত্রা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এনবিআরের বিকল্প আয়ের উৎস তৈরি না করে বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করায় দেশের মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় প্রভাব পড়বে। এতে মুদ্রাস্ফীতি আশঙ্কাজনক হারে বাড়বে। জনসাধারণের জীবনমানের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। এমনকি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। তাদের মতে, এভাবেই সরকারের ব্যয় সক্ষমতা কমে দায়ভার বাড়ছে। তাই এনবিআরকে পুনর্গঠন প্রয়োজন। একই সঙ্গে ধনীদের করহার বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন হ্রাস করা পরামর্শ তাদের।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন বাজেটের প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ছয় লাখ ৭৭ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের চেয়ে ৭৪ হাজার ১৮৩ কোটি টাকা বেশি। যদিও এটাই চূড়ান্ত নয়। এর মধ্যে আয় চার লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা এবং ঘাটতি দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে আয় ধরা হয়েছিল তিন লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা এবং ঘাটতি বাজেট ছিল দুই লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। সে হিসাবে আগামী বাজেটে আয় ও ঘাটতি উভয়ই বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে দিন শেষে ঘাটতিই বাড়বে বলে মনে করছেন আর্থিক খাত বিশ্লেষকরা।

প্রাথমিক বাজেট পরিকল্পনায় এনবিআরকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে তিন লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। যা জিডিপির ৮ দশমিক ৪০ শতাংশ। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের মূল বাজেটে এই লক্ষ্যমাত্রা ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। সে হিসাবে নতুন বাজেটে কেবল এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ছে ৪০ হাজার কোটি টাকা, যা গত বছরের চেয়ে প্রায় ১২ শতাংশ বেশি। গত মার্চ পর্যন্ত সংস্থাটি আদায় করেছে দুই লাখ চার হাজার আট কোটি টাকা। প্রতি প্রান্তিকে গড়ে আদায় হয়েছে ৬৮ হাজার দুই কোটি ৭১ লাখ টাকা। তবে পরিমাণে বাড়লেও জিডিপি অনুপাতে এই পরিমাণ কিছুটা কমেছে। কারণ চলতি অর্থবছরের এই রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা জিডিপির ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ।

এনবিআরের অধীন রাজস্ব আদায়ের উপখাতগুলোর মধ্যে আয়কর খাতে ১ লাখ ১৭ হাজার ৯৪৬ কোটি টাকা, শুল্ক খাতে ৪২ হাজার ৪৫৬ কোটি টাকা, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) খাতে ২ লাখ ৪ হাজার ৭৫ কোটি টাকা এবং অন্যান্য খাতে ৫ হাজার ৫২৩ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।

এই হিসাবে বছর শেষে এনবিআরের আদায়ের পরিমাণ দাঁড়াবে দুই লাখ ৭২ হাজার ১০ কোটি টাকা। সেক্ষেত্রে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়াবে ৫৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা। বিগত অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি ছিল ৪১ হাজার কোটি টাকা এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে ছিল ৮৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা।

এদিকে নিয়মিত রাজস্ব ঘাটতি বাড়লেও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতায় বরাদ্দ আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বেতন-ভাতায় সরকারের ব্যয় ছিল ২৮ হাজার ৮২০ কোটি টাকা। চলতি বাজেটে সেটি বেড়ে দাঁড়ায় ৬৯ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা। আগামী বাজেটে এই খাতে বরাদ্দ আরো বাড়িয়ে ৭৬ হাজার ৪১২ কোটি টাকা করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই ব্যয় চলতি অর্থবছরের চেয়ে ৮ দশমিক ৭২ শতাংশ বেশি।

এছাড়া বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা খাতেও বরাদ্দ অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। আগামী বাজেটে এডিপির সম্ভাব্য আকার হতে পারে দুই লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে এই খাতে বরাদ্দ আছে দুই লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। তবে গত কয়েক বছর যাবত এনবিআরে উচ্চমাত্রার লক্ষ্য নির্ধারণ ও অর্জনে ব্যর্থতার বিষয়টিকে সতর্ক বার্তা হিসেবে দেখছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এনবিআরের বিকল্প আয়ের উৎস তৈরি না করে বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করায় দেশের মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় প্রভাব পড়বে। এমনকি আগামী বাজেটে মুদ্রাস্ফীতির হার চলতি অর্থবছরের ৫ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ দশমিক ৫ নির্ধারণ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। কিন্তু মুদ্রাস্ফীতিকে কোনোক্রমেই এই সীমায় আটকে রাখা সম্ভব হবে না। কারণ সরকারি হিসাব মতেই দেশের মুদ্রাস্ফীতির হার ৬ দশমিক ১ শতাংশ।

যদিও বেসরকারি হিসাব বলছে, এটি ১০ শতাংশের ওপর। এমন প্রেক্ষাপটে আরেক ধাপ মুদ্রাস্ফীতি হলে তা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলবে। ইতোমধ্যে এর প্রভাবও পড়তে শুরু করেছে। ডলারের বিপরীতে টাকার মান ক্রমাগত নিচের দিকে।

অর্থনীতির এমন পরিস্থিতিতে আসন্ন বাজেটের প্রভাব কেমন হতে পারে, তা জানতে চাওয়া হয় অর্থনীতিবিদ ড. রেজা কিবরিয়ার কাছে। তিনি বলেন, লক্ষ্য অর্জনে বারবার বিফল হওয়ার পরও প্রতিবছরই বাড়ছে এনবিআরের আদায় লক্ষ্যমাত্রা। এভাবে সংস্থাটির ঘারে আয়ের বোঝা চাপিয়ে দিলে মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পাবে। ফলে জনসাধারণের জীবনমানের ওপর আরো প্রভাব পড়বে। কারণ মুদ্রাস্ফীতি হলো জনগণের ওপর সরকারের এক ধরনের গোপন ট্যাক্স। তাছাড়া আমদানি বৃদ্ধির ফলে এটি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও প্রভাব ফেলবে।

এ থেকে পরিত্রাণের উপায় সম্পর্কে বলেন, ধনীদের করহার বাড়াতে হবে। তারা যথাযথ কর আদায় করছে না। এছাড়া সরকারি চাকরিজীবীদের বেতনও হ্রাস করা গেলে পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দেওয়া যেতে পারে।’

এদিকে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বারবার ব্যর্থতায় এনবিআরের মৌলিক পুনর্গঠন করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ও ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, এনবিআরের রাজস্ব ঘাটতি এখন নিয়মিত একটা বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে আমরা বলছি আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ছে কিন্তু অপরদিকে দেখা যাচ্ছে সে অনুপাতে রাজস্ব বাড়ছে না। এই সমস্যা চিহ্নিত করা খুবই প্রয়োজন ছিল।

এই ব্যর্থতার প্রভাব সম্পর্কে বলেন, সরকারের ব্যয় করার সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। সরকার যথোপযুক্ত ফাইন্যান্সিং করতে পারছে না, ব্যাপক হারে ঋণ নিয়ে দায়ভার বাড়ছে। এ থেকে বের হয়ে আসা সরকারের পক্ষে মুশকিল হবে।

সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী ৯ জুন জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করবেন, যা হবে স্বাধীন বাংলাদেশের ৫২তম এবং বর্তমান সরকারের টানা ১৪তম ও বর্তমান অর্থমন্ত্রীর চতুর্থ বাজেট।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads