• শুক্রবার, ১৮ জুন ২০২১, ৪ আষাঢ় ১৪২৮

বাজেট

আসন্ন বাজেটে বিদেশি ঋণ

রেকর্ড অর্থ পাওয়ার প্রত্যাশা

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ০১ জুন ২০২১

আসন্ন ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে ঘাটতি মেটাতে বিদেশি ঋণ থেকে রেকর্ড পরিমাণ অর্থ পাওয়ার আশা করছে সরকার। ওই অর্থের পরিমাণ ১ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা (প্রায় ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার), যা গত বছরের চেয়ে ৩৫ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি। কারণ মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট মন্দা থেকে বের হয়ে আসতে বাংলাদেশের দিকে উদার হাতে এগিয়ে এসেছে উন্নয়ন অংশীদাররা।

মহামারীর বড় চ্যালেঞ্জের মধ্যেই টানা দ্বিতীয়বারের মতো বাজেট নিয়ে কাজ করছে অর্থ মন্ত্রণালয়। ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে ঘাটতি ধরা হচ্ছে প্রায় ২ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতির এই পরিমাণ সংশোধিত চলতি বাজেটের তুলনায় ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। বাজেট প্রণয়নে জড়িত কর্মকর্তারা বলছেন, ঘাটতির অর্থ জোগাতে নতুন বাজেটে সরকার ব্যাংকিং খাতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিদেশি ঋণ বাড়াতে যাচ্ছে।

জানা গেছে, আগামী অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে ৭৬ হাজার ৭৪৮ কোটি টাকা ঋণ গ্রহণের পরিকল্পনা আছে সরকারের। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় এই হার ৬ দশমিক ২ শতাংশ কম। নতুন বাজেটে বৈদেশিক অর্থায়নের লক্ষ্যমাত্রা ৯৭ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা, যা চলতি বাজেটের তুলনায় ৩৬ দশমিক ৬৯ শতাংশ বেশি। চলতি বাজেটে বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তা হিসেবে ৯২ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা পাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। তথ্য বলছে, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায় কমে যাওয়ায় বাজেটে বিদেশি ঋণ বাড়ছে। সহজে বিদেশি ঋণ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়াটাও এর আরেকটি কারণ।

আগামী বাজেটে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হচ্ছে না। ২০২১-২২ বাজেটে এনবিআরকে তিন লাখ ৩০ হাজার ৭৮ কোটি টাকার লক্ষ্য দেওয়া হচ্ছে। চলতি বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা তিন লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। বাড়ছে মাত্র ৭৮ কোটি টাকা। ফলে আগামী বাজেটের সিংহভাগ অর্থের জোগান আসবে বিদেশি উৎস থেকে। অবশ্য এই মুহূর্তে প্রায় ৫০ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বৈদেশিক অনুদান পাইপলাইনে রয়েছে। এ ছাড়াও বিশ্ব ব্যাংক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ও অন্যান্য উন্নয়ন অংশীদাররা মহামারীর মধ্যে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে বাংলাদেশকে বাজেট সহায়তা দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান মো. আবদুল মজিদ বলেন, বাজেট বাস্তবায়নে বিদেশি নির্ভরতা বাড়ছে। এটা এক অর্থে ভালো। আরেক অর্থে মন্দ। যে কোনো প্রকল্পের জন্য বিদেশি ঋণের যথাযথ ব্যবহার ও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করা গেলে একদিকে খরচ কম হয়; অন্যদিকে কাজের মানও ভালো হয়। একইসঙ্গে অভ্যন্তরীণ উৎস- যেমন ব্যাংক খাতের ওপর চাপ কমে। তবে বিদেশি ঋণ যথাযথ ব্যবহার ও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করা না গেলে হিতে বিপরীত হয়।

এদিকে দেশের ব্যাংকগুলো প্রয়োজনের অতিরিক্ত তারল্য নিয়ে বসে থাকলেও মহামারীতে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় ঋণ দেওয়ার উপযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পাচ্ছে না সরকার। আসন্ন বাজেটে অর্থায়নের জন্য ব্যাংকগুলো ৭৬ হাজার কোটি টাকা দেবে, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় ৪ দশমিক ৪ শতাংশ কম। ব্যাংক ছাড়াও অন্যান্য উৎস থেকে ৩৭ হাজার কোটি টাকা আহরণ করবে সরকার।

বাজেটের তথ্য বলছে, এবারের বাজেট ঘাটতির হার (সরকারের আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান) হবে জিডিপির ৬ দশমিক ১ শতাংশ, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মতে, এই ঘাটতির হার ৫ শতাংশের মধ্যে থাকা উচিত। এই হারকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বলে বিবেচনা করা হয়। অবশ্য প্রায় প্রতিবছরই বাংলাদেশে বাজেটের খসড়া তৈরির সময় ৫ শতাংশ ঘাটতি ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু প্রতি অর্থবছরের শেষে প্রকৃত ঘাটতি দাঁড়ায় ৪ শতাংশের মতো। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষক ড. জায়েদ বখত বলেন, জাতীয় সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়ার চেয়ে সরকারের জন্য বিদেশি ঋণ অনেক সস্তা। আর ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে বেসরকারি খাত কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়। যে কারণে কম খরচের উৎস হিসেবে বৈদেশিক ঋণকে এবার বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তার মতে, বাজেটের ঘাটতি পূরণের জন্য বৈদেশিক ঋণের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। যদিও চলতি অর্থবছরে সরকারের যে ঋণের স্থিতি রয়েছে, তার ৬৩ শতাংশ অভ্যন্তরীণ উৎস এবং বাকি ৩৭ শতাংশ বিদেশি ঋণ। সার্বিকভাবে বৈদেশিক ঋণের যে স্থিতি রয়েছে, তার বড় অংশই বিশ্বব্যাংকের ঋণ। হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, সার্বিক ঋণ স্থিতির মধ্যে বিশ্বব্যাংকের ৩৮ শতাংশ, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ২৪ দশমিক ৫০ শতাংশ, জাপানের ১৭ শতাংশ, চীনের ৩ শতাংশ, ভারতীয় ঋণ ১ শতাংশ উল্লেখযোগ্য।

এদিকে বিদেশি ঋণ পাওয়া গেলেও সেই তুলনায় খরচ করতে পারছে না সরকার। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় জুলাই থেকে মার্চ- এই ৯ মাসে সরকারি টাকা খরচ হয়েছে প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণ থেকে খরচ হয়েছে সাড়ে ২৯ হাজার কোটি টাকা।

উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সরকার প্রতিবছর কতটি ঋণচুক্তি সই করছে, আর কী পরিমাণ অর্থ ছাড় হচ্ছে, তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে ইআরডির প্রতিবেদনে। তাতে দেখা গেছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছর উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে মোট ৭০৫ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি সই হয়েছে। ওই বছরে ছাড় হয়েছে ৩৫৬ কোটি ডলার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১ হাজার ৭৯৬ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি সই হয়। সেই বছর ৩৬২ কোটি ডলার ছাড় হয়।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads