• মঙ্গলবার, ২৭ জুলাই ২০২১, ১২ শ্রাবণ ১৪২৮
পেঁয়াজের পুরোনো ‘সিন্ডিকেট’ সক্রিয়

ছবি : সংগৃহীত

পণ্যবাজার

পেঁয়াজের পুরোনো ‘সিন্ডিকেট’ সক্রিয়

কঠোর সরকার

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২০

পেঁয়াজের পুরোনো ‘সিন্ডিকেট’ আবারও সক্রিয়। গত বছর এই সময়ে পেঁয়াজের বাজার উত্তপ্ত হয়েছিল। এবারও অসাধু ব্যবসায়ীরা যেকোনো অজুহাতে পেঁয়াজের বাজার অস্থির করে ফায়দা লুটতে চান।

ইতোমধ্যে চক্রটি নানা অজুহাতে পণ্যটির দাম বাড়িয়েছে কেজিতে ১৫ থেকে ২০ টাকা। ৩০ থেকে ৪০ টাকা কেজি দরের পেঁয়াজ বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৫৫ টাকা দরে। যদিও সরকার অকারণে পেঁয়াজের এই মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার একদিকে টিসিবির মাধ্যমে খোলাবাজারে স্বল্পমূল্যে পেঁয়াজ বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছে, অপরদিকে অসাধু ব্যবসায়ীদের এই সিন্ডিকেটের কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি যেকোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইতোমধ্যেই সরকারের এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে মাঠে কাজ করছে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা।

এর মাঝে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে পেঁয়াজ মজুত রয়েছে, আমদানিও রয়েছে স্বাভাবিক। পেঁয়াজের সংকট বা মূল্যবৃদ্ধির কোনো কারণ নেই। পেঁয়াজের অবৈধ মজুত বা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির মাধ্যমে মূল্য বাড়ানোর চেষ্টা করা হলে সরকার আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশন জানিয়েছে, দেশে প্রতিবছর পেঁয়াজের চাহিদা ২৪ লাখ মেট্রিক টন। এ বছর দেশে পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে ২৩ লাখ ৮২ হাজার মেট্রিক টন। কিন্তু প্রতিবছরই স্বাভাবিক নিয়মে উৎপাদিত পেঁয়াজের ৩০ শতাংশ পচে যায়। সে হিসেবে এ বছর পচে যাওয়া পেঁয়াজের পরিমাণ সাড়ে সাত লাখ মেট্রিক টন। এই ঘাটতি মেটাতে ভারত থেকে ১০ থেকে ১১ লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজ আমদানির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র বলছে, ইতোমধ্যে ভারতের বিভিন্ন সীমান্ত বন্দর দিয়ে ৮ লাখ টনের বেশি পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে। সেই হিসেবে দেশে এখন পেঁয়াজের কোনো ঘাটতি নেই। সরবরাহেও কোনো সমস্যা তৈরি হয়নি।

জানা গেছে, গত বছরের পেঁয়াজ নিয়ে কারসাজির হোতারা এ বছরও নানান অজুহাতে পেঁয়াজের বাজারকে অস্থিতিশীল করতে চাইছে। করোনা পরিস্থিতি, ঘূর্ণিঝড় আম্পান এবং পরবর্তী সময়ে দেশের ৩৩ জেলায় বন্যাকে পুঁজি করে এবারো তারা পেঁয়াজের বাজারে অস্থিতিশীলতা ছড়াতে তৎপর। এসব অজুহাতের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে ভারতে বন্যা, অন্ধ্রপ্রদেশে পেঁয়াজের মোকামে শ্রমিকদের ধর্মঘট ও বাংলাদেশের মাওয়া ঘাটে ফেরি পারাপার বন্ধ থাকা। এসব অজুহাত দেখিয়ে ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজের দাম বাড়াচ্ছেন।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চল বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলার পাশাপাশি ফরিদপুর ও পাবনায় পেঁয়াজ উৎপাদন হয়। এ বছরের মাঠ থেকে সব পেঁয়াজ উঠে গেছে মধ্য ফেব্রুয়ারির আগেই। তখনো দেশে করোনার আবির্ভাব হয়নি। ঘূর্ণিঝড় আম্পান বাংলাদেশে আঘাত হেনেছে ১৬ মে থেকে ২১ মে পর্যন্ত সময়ে। তখন পেঁয়াজ কৃষকের ঘরে, ব্যবসায়ীর আড়তে। আর বন্যায় পেঁয়াজের কোনো ক্ষতি করার সুযোগই পায়নি। কারণ বন্যার সঙ্গে পেঁয়াজের কোনো সম্পর্ক নেই। যেসব জেলার ওপর দিয়ে বন্যা বয়ে গেছে সেসব জেলার মধ্যে ফরিদপুর ও পাবনা উল্লেখযোগ্য। কিন্তু এসব জেলার বন্যা পেঁয়াজে প্রভাব ফেলেনি বলে জানিয়েছে ফরিদপুর ও পাবনার জেলা প্রশাসকদ্বয়।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রমিক নেতারা দাবি করেছেন ভারতের শ্রমিকদের ধর্মঘট কোনোভাবেই পেঁয়াজের বাজারে প্রভাব বিস্তার করেনি। এ ছাড়া মাওয়া ঘাটে ফেরি চলাচল বন্ধ থাকার অজুহাতটিও ঠুনকো। কারণ ওপার থেকে রাজধানীতে আসতে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ফেরি এবং যমুনা সেতু খোলা রয়েছে। এ ছাড়া মাওয়া-শিমুলিয়ার অপর প্রান্ত কাওরাকান্দি ও কাঁঠালবাড়ীতে এই মুহূর্তে যেসব পণ্যবাহী ট্রাক আটকে আছে তার মধ্যে পেঁয়াজের একটি ট্রাকও নেই বলে জানিয়েছেন বিআইডব্লিউটিসির কর্মকর্তা মোখলেসুর রহমান।

ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক অতুল সরকার বলেন, বন্যায় ফরিদপুরের কোথাও পেঁয়াজের ক্ষতি হয়েছে বলে শুনিনি। কারণ বন্যার সঙ্গে পেঁয়াজের কোনো সম্পর্ক নেই। সরবরাহ স্বাভাবিক ছিল। ফরিদপুরের বাজারে পেঁয়াজের দাম এখন নিম্নমুখী।

পাবনার জেলা প্রশাসক কবীর মাহমুদ বলেন, ‘পাবনা পেঁয়াজ উৎপাদনকারী জেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম। করোনা বলেন আর বন্যা বলেন, পেঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এসব অজুহাত এখানে প্রযোজ্য নয়। কারণ, বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জেলা প্রশাসনের টিম বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে মাঠে রয়েছে। আমরা এখন পর্যন্ত বন্যায় পেঁয়াজের ক্ষতি হয়েছে এমন কোনো তথ্য পাইনি। কোনো এলাকার মানুষই বলেনি, যে বন্যায় তার ঘরের পেঁয়াজের ক্ষতি হয়েছে। কাজেই ব্যবসায়ীদের এমন অভিযোগ সঠিক নয়।’

ঢাকার শ্যামবাজারের পেঁয়াজের আড়তদার আমজাদ হোসেন বলেন, মাঝে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি একটু কমে গিয়েছিল। আবার ভারতে বৃষ্টির কারণে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে, এরকম খবরও পাওয়া যাচ্ছিল। তাই আমাদের এখানেও দাম একটু বেড়েছে।

ঢাকার ধানমণ্ডির বাসিন্দা নাজমা আক্তার বলেন, ‘সোমবার সকালে আমি ৬০ টাকা দরে পাঁচ কেজি পেঁয়াজ কিনেছি। সাধারণত দুই কেজি করে কিনি। কিন্তু গত বছরের মতো আবার দাম বেড়ে ৩০০ টাকা পার হয়ে যায় কি না, সেই ভয়ে বেশি করে পেঁয়াজ কিনলাম।’

আরেক ক্রেতা উম্মে সালমা বলেন, ‘বাসায় পেঁয়াজ আছে, তারপরও পাঁচ কেজি কিনে রাখলাম, যদি দাম অনেক বেড়ে যায়, সেই চিন্তা করে। গত বছর যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, সেটা চিন্তা করলেই তো ভয় লাগে। কম খেতে পারি, একেবারে বাদ তো দিতে পারি না।

কলাবাগানের কাঁচা সবজি বিক্রেতা আল আমীন বলেন, ‘আমরা পাইকারিতে যে দরে কিনি, তার সঙ্গে ৪-৫ টাকা লাভ যোগ করে খুচরা বিক্রি করি। রোববার কারওয়ান বাজার থেকে পেঁয়াজ কিনেছি ৫৪ টাকা দরে, তাই সেটা ৬০ টাকা দরে বিক্রি করছি।’

কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ী আবুল হোসেন বলেন, ‘ভারতীয় পেঁয়াজের দাম বাড়লে দেশি পেঁয়াজের দামও বাড়ে। আমরা আমদানিকারক বা শ্যামবাজার থেকে পেঁয়াজ এনে বিক্রি করি। সেখানে যে টাকায় পাব, তার সঙ্গে সামান্য লাভ যোগ করে পাইকারি বিক্রি করি।’

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. জাফর উদ্দিন বলেন, সারা দেশেই পেঁয়াজের সরবরাহ ভালো। কোথাও কোনো সংকট নেই। আমদানি পরিস্থিতিও সন্তোষজনক। কাজেই অসাধু ব্যবসায়ীদের কোনো অজুহাতই গ্রহণযোগ্য নয়। পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধির কোনো কারণ নেই। তিনি বলেন, এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। পেঁয়াজ নিয়ে কোনো ধরনের কারসাজি সহ্য করা হবে না। দেশব্যাপী মনিটরিং চলছে। পেঁয়াজ নিয়ে টালবাহানা করলে কঠোর পদক্ষেপ নেবে সরকার। সচিব জানান, ইতোমধ্যেই ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে নেমেছেন। এটি অব্যাহত থাকবে। আর বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে টিসিবির মাধ্যমে খোলা বাজারে বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসব সিদ্ধান্তের ফলে পেঁয়াজের বাজার নিম্নমুখী হতে শুরু করেছে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads