• শনিবার, ২৫ জুন ২০২২, ১১ আষাঢ় ১৪২৯
কমছে না চালের দাম

সংগৃহীত ছবি

পণ্যবাজার

কমছে না চালের দাম

  • গাজী শরীফ মাহমুদ
  • প্রকাশিত ০৮ ডিসেম্বর ২০২১

চাল উৎপাদনে বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশ থেকে এগিয়ে বাংলাদেশ। কিন্তু কয়েক বছর ধরে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, সরবরাহে ঘাটতিসহ নানা অজুহাতে কমছে না চালের দাম। কৃষকদের কাছ থেকে ধান মজুত করে সারা বছর মুনাফা করছে একশ্রেণির মিল মালিক ও ব্যবসায়ীরা। যেখানে এক কেজি চাল উৎপাদনে খরচ হয় ৩৩ টাকা। অথচ বাজারে এই চাল ৫২-৫৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। এরপরও চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না।  

কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে চলতি বছর বোরো মৌসুমে প্রতি কেজি চালের উৎপাদন খরচ ছিল ৩৩ টাকা। আর সরকার প্রতি কেজি চাল ৪০ টাকা ও ধান ২৭ টাকা দরে কেনার ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু বাজারে ধানের দাম সরকারের সংগ্রহ মূল্যের চেয়ে চার-পাঁচ টাকা কমে বিক্রি হচ্ছে। আর ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দৈনিক খাদ্য পরিস্থিতি প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতি কেজি মোটা চাল ৫২ থেকে ৫৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ উৎপাদন বেড়ে যাওয়ার এই সুফল যাচ্ছে চাল-কল মালিক ও ব্যবসায়ীদের পকেটে। কৃষকেরা সরকার ঘোষিত ধানের দাম পাচ্ছেন না।

কৃষকরা বলছে, ৩০০ টাকার বীজ কিনে ৩৩ শতক জমিতে আমন আবাদ করা হয়। আষাঢ় মাসে চারা করতে বীজতলা চাষ ও শ্রমিকসহ খরচ হয়েছে এক হাজার টাকা। ভাদ্র মাসের প্রথম দিকে চারা রোপণের জন্য জমি চাষাবাদে খরচ হয়েছে এক হাজার টাকা। ৫০০ টাকা মজুরিতে তিন শ্রমিক দিয়ে চারা রোপণে খরচ হয়েছে এক হাজার ৫০০ টাকা। ক্ষেতে নিড়ানি দিতে ৪০০ টাকা মজুরিতে তিন শ্রমিকের পেছনে খরচ এক হাজার ২০০ টাকা। প্রতি কেজি ২০ টাকা দরে ইউরিয়া সার প্রয়োগে খরচ হয়েছে ২০০ টাকা, ধান পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে রক্ষায় কীটনাশক ব্যবহারে খরচ হয়েছে এক হাজার ২০০ টাকা। সর্বশেষ ধান কাটা ও মাড়াইয়ে ৫০০ টাকা মজুরিতে পাঁচ শ্রমিকের পেছনে খরচ হয়েছে এক হাজার ৫০০ টাকা। তিন শতক জমিতে ১২ মণ ধান উৎপাদনে খরচ হয়েছে আট হাজার ৯০০ টাকা। সব হিসাবে মিলিয়ে প্রতিমণ ধান উৎপাদনে খরচ হয়েছে ৭৪১ টাকা।

বাজারে এখন প্রতিমণ আমন ধান বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৫০ টাকা। হিসাবে ওই কৃষকের প্রতিমণ ধান উৎপাদনে খরচ বাদে আয় ৩০৯ টাকা। কৃষক আরো জানান, এবার প্রত্যেক কৃষকের আমন ধানের ফলন ভালো হয়েছে। বাজার দর ভালো থাকায় কৃষক লাভবান হচ্ছেন। তিনি আগামীতে আরোা বেশি জমিতে ধান আবাদের কথা ভাবছেন।

কৃষকরা জানিয়েছে, এক একর জমিতে আমন ধান আবাদ করে প্রতিমণে উৎপাদন খরচ পড়েছে ৭৯৮ টাকা এবং বিক্রি করে পাচ্ছেন এক হাজার ৫০ টাকা। অনেক কৃষক ধার করে ধান চাষ করেন। ধারের টাকা পরিশোধ করতে ধান কাটার সঙ্গে সঙ্গে কম দামে বিক্রি করে দেন। সহজশর্তে কৃষিঋণের ব্যবস্থা করলে লাভবান হতেন কৃষকরা।

ফুলপুরের বালিয়া গ্রামের কৃষক সালাম মিয়া জানান, কৃষি উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে কৃষককে চাষাবাদে বেশি বেশি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি। এ ব্যাপারে কৃষি বিভাগকে আরো আন্তরিক হয়ে কৃষকের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

সদরের গোপালনগর গ্রামের কৃষক তালেব উদ্দীন আমন মৌসুমে ৩০ শতক জমিতে আবাদ করে সাড়ে ১২ মণ ধান পেয়েছেন। প্রতি মণ ধান উৎপাদনে তার খরচ ৭২০ টাকা। খরচ বাদে প্রতি মণ ধান উৎপাদন করে তিনি লাভ করছেন ৩৩০ টাকা। তালেব উদ্দীন প্রতি মণ ধান থেকে চাল তৈরি করে পেয়েছেন ২৬ কেজি। সে হিসাবে ২৬ কেজির দাম হয় ১২৪৮ টাকা।

তারাকান্দার বালিখা গ্রামের কৃষক শামসুল হক জানান, ধানের উন্নতজাত আসায় আগের চেয়ে অনেক বেশি ফলন হয়। তবে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় কৃষকরা তেমন লাভবান হচ্ছেন না। উৎপাদন খরচ কমাতে সরকারকে আরো পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি।

কৃষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি মণ ধান উৎপাদনে খরচ ৭২০ টাকা। এক মণ ধান সেদ্ধ করে শুকিয়ে ভাঙাতে খরচ হয় ১৫০ টাকা। সবমিলে খরচ ৮৭০ টাকা। হিসাবে চালের কেজি পড়ে ৩৩ টাকা।

এদিকে, বাজার ঘুরে দেখা যায়, এসব চাল মজুত করে ৫২ থেকে ৫৫ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করছে মিল-কল মালিকরা। হিসাবে প্রতি কেজি চালে তাদের মুনাফা ২২ থেকে ২৫ টাকা।

কৃষক তালেব উদ্দীন জানান, ধান ঘরে তুলে পাইকারদের কাছে সরাসরি বিক্রি করে দেওয়া ভালো। ধান থেকে চাল বানিয়ে বিক্রি করলে তেমন লাভ হয় না।

এদিকে, প্রতি কেজি ধানের দাম ২৭ টাকা এবং চালের দাম ৪০ টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার। প্রকৃতপক্ষে কৃষকের জন্য এমন দাম নির্ধারণ হলেও বেশি মুনাফা মিল মালিকদের পকেটেই যায়।

এদিকে, ময়মনসিংহের রাইস মিল মালিকরা বর্তমানে এক হাজার ৫০ টাকা মণে আমন ধান কিনছেন। সদরের শম্ভুগঞ্জ হাজী অটোরাইস মিলের মালিক হাজী মোহাম্মদ এরশাদ আলী বলেন, বর্তমানে এক হাজার ২০ টাকা দরে ধান কিনছি। রাইস মিল পর্যন্ত আনতে শ্রমিক এবং গাড়ি বাবদ খরচসহ মণ পড়ছে ১০৫০ টাকা। প্রতি মণ ধান ভাঙতে খরচ হয় ৫০ টাকা। সবমিলে প্রতি মণে খরচ ১১০০ টাকা। প্রতি মণ ধান থেকে চাল হয় ২৬ কেজি। পাইকারি বাজার দর অনুযায়ী ২৬ কেজি চালের দাম ১০৫০ টাকা। হিসাবে প্রতি মণ ধান থেকে চাল তৈরি করে ৫০ টাকা লোকসান গুনতে হয়। 

সরকার আগে থেকে ধানের এবং চালের দাম নির্ধারণ করে দেওয়ায় ধানের দাম বেড়ে গেছে। এবার কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনে মিল মালিকরা সরকারি গুদামে চাল দিতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না।

ময়মনসিংহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. মতিউজ্জামান বলেন, জেলার প্রকৃত কৃষকদের তালিকা খাদ্য অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। তালিকা অনুযায়ী ধান সংগ্রহ করলে সরকারের বেঁধে দেওয়া ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করতে পারবেন কৃষক। সেই সঙ্গে লাভবান হবেন।

ময়মনসিংহ খাদ্য অধিদপ্তরের খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, এবার আমন মৌসুমে প্রতি কেজি ধানের দাম ২৭ টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার। ১৪ হাজার মেট্রিক টন ধান সংগ্রহ করা হবে। কৃষকের অ্যাপ নামে একটি অ্যাপ চালু করেছে খাদ্য অধিদপ্তর। অ্যাপের মাধ্যমে কৃষকরা আবেদন করলে বাছাই করে ধান কেনা হবে। এবার কৃষকরা ন্যায্যমূল্যে ধান বিক্রি করতে পারবেন এবং লাভবান হবেন।

 দেশের চালের বাজার হাতেগোনা কিছু চালকল-মালিক নিয়ন্ত্রণ করেন। তারা ধান কেনা, চাল প্রক্রিয়াজাত করা থেকে শুরু করে দেশের ভেতরে বাজারজাত করা নিয়ন্ত্রণ করেন। এমনকি চাল আমদানি-রপ্তানিও তাদের নিয়ন্ত্রণে। ফলে দেশে চালের উৎপাদন বেড়ে গেলে কৃষকদের চেয়ে ওই চাল-কল মালিক গোষ্ঠীর লাভ বেশি হয়। 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads