• শুক্রবার, ২০ মে ২০২২, ৬ জৈষ্ঠ ১৪২৯
আপ্যায়নের টাকা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার পকেটে

সংগৃহীত ছবি

সারা দেশ

আপ্যায়নের টাকা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার পকেটে

  • প্রকাশিত ২৪ নভেম্বর ২০২১

আতাউর রহমান রাজু, উল্লাপাড়া (সিরাজগঞ্জ)

নানা অনিয়ম-দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ উঠেছে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে। কর্মচারীদের ভাতার টাকা আত্মসাৎ, করোনায় বরাদ্দ হওয়া সুরক্ষাসামগ্রী লোপাট, কোভিড-১৯ টিকাদান কর্মসূচিতে আপ্যায়নের জন্য বরাদ্দকৃত টাকা আত্মসাৎ এবং ভুয়া করোনা রোগী হাসপাতালে ভর্তি দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ, হাসপাতালের ফলজ ও বনজ গাছ বিক্রি ছাড়াও কর্মচারীদের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে এ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। এসব অনিয়মের ফিরিস্তি তুলে ধরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহা-পরিচালক বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ করেছে উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ৭৩ জন স্বাস্থ্য সহকারী ও ৬২ জন সিএইচসিপি।

অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. আনোয়ার হোসেন করোনাকালীন সিএইচসিপি ও স্বাস্থ্য সহকারীদের জন্য বরাদ্দ হওয়া সকল সুরক্ষাসামগ্রী লোপাট ও হাসপাতালে ভুয়া করোনা রোগী ভর্তি দেখিয়ে বরাদ্দকৃত টাকা আত্মসাৎ করেছেন। জাতীয় কৃমি নিয়ন্ত্রণ সপ্তাহ উপলক্ষে প্রায় ৬শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানের সঙ্গে এডভোকেসি মিটিং না করেই  মিটিংয়ের নামে সম্মানী ভাতা ও আপ্যায়নের টাকা তুলে নিয়েছেন। অপরদিকে কোভিড-১৯ টিকাদান কর্মসূচিতে আপ্যায়নের জন্য বরাদ্দকৃত প্রায় ১৬ লাখ টাকা আত্মসাৎ এবং ভ্যাট, অডিটসহ নানা অজুহাতে সকল ধরনের প্রশিক্ষণের সম্মানি ভাতা কেটে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

চলতি বছরের শুরুতে ৪র্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর কর্মসূচির (এইচপিএনএসপি) আওতায় উপজেলার ৬৫টি কমিউনিটি ক্লিনিকে মাল্টি পারপাস হেলথ ভলেন্টিয়ার (এমএইচভি) পদে ৪৫৭ জন নিয়োগ দেওয়া হয়। এসব পদে নিয়োগের নামেও প্রায় তিন লাখ টাকা হাতিয়ে নেন তিনি। এমএইচভি পদে নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে ৩৬ জন বিভিন্ন কারণে চাকরি ছেড়ে দেন। কিন্তু প্রকল্প থেকে তাদের এখনো ভাতা দেওয়া হচ্ছে। এই ৩৬ জনের ৬ মাসের সম্মানি ভাতা ৭ লাখ ৭৭ হাজার ৬শ টাকা ইতিমধ্যে তুলে নিয়ে আত্মসাৎ করেছেন এই

আপ্যায়নের টাকা স্বাস্থ্য

 

স্বাস্থ্য কর্মকর্তা।

আবার এ ভাতার টাকা উত্তোলন করতেও প্রতিজনের কাছ থেকে মাসিক ২শ টাকা হারে কেটে নেন তিনি। গত ৬ মাসের ভাতার  মোট ৫ লাখ ৫ হাজার ২শ টাকা কর্তন করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। এমএইচভি পদে দ্বিতীয় ধাপে ৪ মাসের সম্মানি ভাতার টাকার মধ্যে তিনি ৩ মাসের টাকা প্রদান করেন। বাকি এক মাসের সম্মানি ভাতার টাকাও আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভুগীরা। এছাড়াও উপজেলা হাসপাতালে ট্রমা সেন্টার ভেঙ্গে বিশাল হলরুমের সমান করে নিজের বিলাসবহুল অফিস রুম তৈরি করেছেন। হাসপাতাল চত্বরের বেশকিছু গাছ কেটে বিক্রি করা হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

লিখিত অভিযোগে আরো বলা হয়, স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন এমটি (ইপিআই), এএইচআই, সিএইচসিপি, এইচএসহ বিভিন্ন পদে পদায়ন ও বদলির ফরোয়ার্ডিংয়ে টাকা ছাড়া স্বাক্ষর করেন না। এছাড়াও সর্বস্তরের স্বাস্থ্যকর্মী ও চিকিৎসকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, অসদাচরণ এবং বেতন বন্ধের হুমকি দিয়ে স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগে নৈরাজ্য ও ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন এ কর্মকর্তা।

উল্লাপাড়া পূর্ণিমাগাতী ইউনিয়নের ব্রহ্মখোলা কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি সাইফুল ইসলাম, মাল্টিপারপাস হেলথ ভলেন্টিয়ার (এমএইচভি) রুহুল আমিন, স্বাস্থ্য সহকারী হোসনে আরা বেগমসহ অনেকের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার কারণে উপজেলার স্বাস্থ্যসেবায় মহাবিপর্যয় ঘটে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতিটা খাত থেকেই তিনি অর্থ আত্মসাৎ করেন। পরিবহন বিলের টাকা থেকে ২৫ থেকে ৩০% কর্তন করেন। যেখানের পূর্বের কর্মকর্তারা সর্বোচ্চ ৫% কর্তন করতেন।

শহীদুল ইসলাম নাদু নামে এক কর্মচারী বলেন, কেউ প্রমোশনের ফরোয়ার্ডিং নেওয়ার জন্য স্যারের কাছে গেলে তার কতকগুলো সিএইচসিপি পদের মেয়ে কর্মচারী রয়েছে, তাদের মাধ্যমেই ১০/২০ হাজার টাকা করে ঘুষ নেন। স্যার যখন কোনো স্থানে পরিদর্শনে যান সেখানে ইনচার্জ বা সহকারী ইন্সপেক্টরকে না নিয়ে সিএইচসিপি নাজমা এবং আলিফা নামের দুজনকে গাড়িতে তুলে সঙ্গী হিসেবে নিয়ে যান। এছাড়াও গত ছয় মাস যাবত নামজা ও আলিফাকে কেন্দ্রে না পাঠিয়ে সার্বক্ষণিকভাবে তার অফিস কক্ষে বসিয়ে রেখে তাদের দ্বারা বিভিন্ন অনিয়ম করাচ্ছেন তিনি।

উল্লাপাড়া স্বাস্থ্য সহকারী অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কে এম রাশিদুল হাসান জানান, আমার স্বাস্থ্য সহকারীদের বিনা কারণেই শোকজ করা হয়। সিএইচসিপি নাজমার সঙ্গে পরামর্শ করে টার্গেট করে শোকজ করেন তিনি। শোকজের জবাব সন্তোষজনক হলেও বিনা কারণে তাদের বেতন কর্তনসহ সার্ভিস বুকে লালকালি দিয়ে বিভিন্ন ধরনের খারাপ রের্কড লেখেন তিনি।

সিএইচসিপি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, এই অফিসে অনেক ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতি হচ্ছে। কর্মচারীদের কথায় কথায় বেতন বন্ধ করা, খারাপ ও আচরণ খারাপ ভাষা প্রয়োগ করেন এই স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন। বিনা কারণে হাসপাতালের ৬/৭ জন কর্মচারীর বেতন-ভাতা বন্ধ করে রেখেছেন তিনি। বেতন বন্ধ করা কর্মচারী ও তাদের পরিবার অতি মানবেতর জীবনযাপন করে দিনাতিপাত করছেন। ডা. আনোয়ার হোসেন টাকা ছাড়া কারো বেতন ছাড় দেন না। সিএইচসিপি আলিফা ও নাজমার সঙ্গে তিনি গোপন আঁতাত করে এ সমস্ত টাকা হাতিয়ে নেন।  

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. আনোয়ার হোসেনের মোবাইলে ফোন দেওয়া হলে তিনি বলেন, কর্মচারীদের সঙ্গে একটু ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। এ কারণে তারা অভিযোগ দিয়েছেন। সেগুলো মীমাংসার চেষ্টা চলছে।

সিরাজগঞ্জ উপজেলা সদর স্বাস্থ্য কর্মকর্তা কর্মচারি ফোরামের সাধারণ সম্পাদক ডা. জাহিদুল ইসলাম হীরা বলেন, উল্লাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে কর্মচারীদের মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি জেনে আমরা গত বৃহস্পতিবার বিষয়টি মিমাংসার জন্য ইউএইচএফপিও ফোরামের পক্ষ থেকে ৪/৫ জন গিয়েছিলাম। ওইদিন বিষয়টি প্রাথমিকভাবে মীমাংসা হয়েছে।

সিভিল সার্জন ডা. রামপদ রায় বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহা-পরিচালক বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে। যার অনুলিপি আমার দপ্তরে দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads