• শুক্রবার, ২১ জানুয়ারি ২০২২, ৭ মাঘ ১৪২৮
কৃষকের কষ্ট ঘুচাল হারভেস্টার মেশিন

ছবি: বাংলাদেশের খবর

সারা দেশ

কৃষকের কষ্ট ঘুচাল হারভেস্টার মেশিন

  • আখাউড়া (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি
  • প্রকাশিত ২৯ নভেম্বর ২০২১

প্রতিবছর কাটার সময় হাতে কাস্তে, কাঁধে বাঁশের তৈরি ভারজোত নিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন আসতো। তাদের সাথে থাকতো শার্ট, গেঞ্জি, গামছা আর লুঙ্গী । আবার অনেকের সাথে আছে কিছু শুকনো খাবারও। চলাফেরা করতে সামান্য টাকা পয়সা ও তারা রাখছেন সঙ্গে। দল বেধে তারা কাজের জন্য অপেক্ষা করতো।

বেশীরভাগ লোকজন আসতো ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জে এলাকা থেকে। পাশাপাশি স্থানীয় শ্রমিকরাও কাজা করত। তারাও অপেক্ষায় থাকতো কখন জমির ধান পাকবে তা কাটার জন্য। ধান কাটা ও আবাদের সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলায় আমন বোরো মৌসুমে কৃষি শ্রমিকদের সরগরমে মুখরিত হয়ে থাকতো এলাকা। কিন্তু আধুনিকতার ছোয়ার এখন আর সেই দৃশ্য চোখে পড়ে না। দিন দিন কমছে কৃষি শ্রমিক। শ্রমিকরা প্রবাসসহ নানা পেশায় চলে যাওয়ায় কৃষকদের দু:শ্চিন্তা যেন বাড়ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পৌর শহরসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য লোকজন কৃষি শ্রমিকের কাজ করতো। পাশাপাশি থাকতো বাইরের শ্রমিকও। আমন বোরো মৌসুমসহ সব সময় তাদের দিয়ে কাজ করা হতো। কাজের মজুরিও ছিল ভালো। তারাই ছিল কৃষকদের কৃষি কাজের একমাত্র ভরসা। কিন্তু বর্তমানে গত কয়েক বছর ধরে এসব কিছুর অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এলাকায় কৃষি শ্রমিক সংকট চলছে। পাওয়া যাচ্ছেনা স্থানীয় কিংবা বাইরের শ্রমিকও । কৃষি শ্রমিকদের মধ্যে অধিকাংশ লোকজন প্রবাসে চলে যাওয়া, ক্ষুদ্র ব্যবসা, চাকুরি, সিএনজি অটো রিকশাসহ বিভিন্ন পেশায় চলে যাওয়ায় ধান কাটার কৃষি শ্রমিকের সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে আমন বোরো মৌসুমে কৃষকরা তাদের পাকা ধান কেটে গোলায় তুলা নিয়ে অনেকটাই দু:শ্চিন্তার মধ্যে পড়তে হচ্ছে।

এদিকে উপজেলার সর্বত্র আমন ধান কাটা শুরু হওয়ায় কৃষি শ্রমিক সংকট দেখা দেয়। পাকা ধান নিয়ে স্থানীয় কৃষকরা বিপাকে পড়ায় ‘কম্বাইন্ড হারভেস্টার মশিনে তাদের মুখে হাসির ঝিলিক ফুটে উঠেছে। সেই সাথে কৃষকদের দূর হয়েছে দু:শ্চিন্তা ও বাড়তি খরচ।

বর্তমানে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ‘কম্বাইন্ড হারভেস্টার মেশিনের মাধ্যমে চলছে জমির ধান কাটার কাজ। সবাই মুগ্ধ হয়ে দেখছেন ধান কাটার দৃশ্য। অল্প সময়ে মাঠের ধান কর্তন ও ঝাড়াই-মাড়াই করতে দেখে উৎসুক জনতার মুখে হাসি। ধান কাটা শেষে কেউ কেউ স্বচ্ছ ধান হাতে নিয়েও দেখছেন। যেখানে একজন কৃষকের জমি থেকে ধানকাটা, মাড়াইসহ অন্যান্য কাজে অতিরিক্ত টাকা গুণতে হয় সেখানে স্বল্প টাকায় ও শারীরিক পরিশ্রম ছাড়া করতে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ধান কাটার সুযোগ পাওয়ায় স্থানীয় কৃষকরা খুবই খুশি।

উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, চলতি আমন মৌসূমে পৌর শহরসহ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার হেক্টর জমিতে ধানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে স্থানীয় কৃষকরা জমির জমির ধান কাটা নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ মৌসূমে ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে।

এদিকে এলাকায় ‘কম্বাইন্ড হারভেস্টার’ মেশিনের মাধ্যমে স্বল্প সময়ে কম খরচে শারীরিক পরিশ্রম ছাড়া ধান কাটা, মাড়াই সুবিধাসহ অতি সহজে ধান ঘরে তুলতে পারায় কৃষকরা বেজায় খুশি।

শ্রমিক মো. ইদ্রিস মিয়া বলেন, গত প্রায় ১০ বছরের উপরে তার আপন ও চাচাতো ৭ ভাই মিলে ধান কাটাও লাগানোর কাজ করেছেন। বর্তমানে তাদের ওই ৭ ভাইএর মধ্যে ৪ জন প্রবাসে, ১ জন ক্ষুদ্র ব্যবসা আর বাকী দুই জন সিএনজি অটো রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করায় গত কয়েক বছর ধরে কৃষি শ্রমিকের কাজ ছেড়ে দিয়েছেন।

মো. বাবুল মিয়া বলেন, তার ৩ ছেলে রয়েছে। সবাই মিলে অনেক বছর কৃষি কাজ ও শ্রমিকের কাজ করেছেন। বর্তমানে তার দুই ছেলে প্রবাসে চলে যাওয়া ও ১ ছেলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকুরি হওয়ায় কৃষি কাজ ছেড়ে দিয়েছেন। নিজের যেটুকু জমি রয়েছে সেটিও বর্গা দিয়েছেন বলে জানায়। তাই এখন আর তিনি কৃষি কাজ করছেন না।

জমির মালিক মো. মুরাদ মিয়া বলেন, চলতি মৌসুমে ১০ বিঘা জমিতে আমন আবাদ করেছেন। জমির ধান পেকে যাওয়ায় শ্রমিকের অভাবে ধান কাটতে না পাড়ায় খুবই দুশ্চিন্তার মধ্যে ছিলেন। স্থানীয় ভাবে ‘কম্বাইন্ড হারভেস্টার’ মেশিন পাওয়ায় ধান কাটার বড় একটি চিন্তা দূর হয়েছে। এ যন্ত্রটি দিয়ে ১ বিঘা বা (৩০ শতক) জমির ধান কাটতে ২০ মিনিটি সময় লাগে। এক সাথে জমির ধান কাটা-মাড়াই -ঝাড়া ও বস্তায় ভরা হয়ে যায়। বিঘা প্রতি টাকা দিতে হচ্ছে ১৬ শ থেকে ১৮ শ টাকা নিচ্ছে। এই যন্ত্রটির মাধ্যমে ধান কাটতে পেরে তিনি খুবই খুশি।
কৃষক মো. আলম খা, মিলন খা বলনে, ধান কাটা শুরু হওয়ায় স্থানীয় ও বাইরের শ্রমিক ৫০০ টাকা মজুরি দিয়ে ও পাওয়া যায় না। তাই গত দুই বছর ধরে মেশিনের সাহায্যে ধান কাটছেন বলে জানায়।

তিনি আর বলেন, শ্রমিক দিকে ধান কাটলে ১ বিঘায় কমপক্ষে ২হাজার টাকা দিতে হয়। সেইসাথে কাটা ধান বাড়িতে আনা, তারপর ধান মাড়াই করা সব মিলিয়ে প্রায় ৪ হাজার টাকার উপর খরচ হয়। কিন্তু কম্বাইন্ড হারভেস্টার মেশিন দিয়ে ধান কাটায় বিঘায় ১৬ শ থেকে ১৮ শ টাকা লাগছে। এই মেশিন থাকায় আমাদের খুবই ভালো হচ্ছে।

কৃষক মো. দিদার মিয়া বলেন, গত দুই বছর ধরে ধান কাটা নিয়ে কোন চিন্তা করতে হচ্ছে না। সময়মতো হারভেস্টার মেশিন পাওয়ায় অতি সহজে ধান কেটে বাড়িতে আনা যাচ্ছে। এতে করে সময় ও খরচ অনেক বেঁচে যাচ্ছে।

মেশিন মালিক মো. তামজিত খান বলেন এ মৌসুমে তিনি একটি হারভেস্টার মেশিন ক্রয় করেছেন। সকাল বিকাল পুরোদমে ধান কাটার কাজ করছেন। এই যন্ত্রটি দিয়ে দ্রুত ধান কাটা, শ্রমিকের অভাব দূরীকরণ, স্বল্প খরচ, ফসলের ক্ষতি কম, একই সঙ্গে ঝাড়াই-মাড়াই ও বস্তাবন্দি অতি সহজে করা যায়। তিনি আরো বলেন মেশিনে ধান কাটতে বিঘা প্রতি নেওয়া হচ্ছে ১৬শ থেকে ১৮শ টাকা নেওয়া হয়। কিন্তু মেশিন ছাড়া শ্রমিক দিয়ে জমির ধান কাটালে একজন কৃষকের বিঘা প্রতি ধান কাটা মাড়াই, ঝাড়াই বাড়ি পৌছা পযর্ন্ত ৪ হাজার টাকার উপর খরচ হতো। কিন্তু এখন মেশিন আসায় কৃষকরা লাভবান হচ্ছে ।

মেশিন চালক মো. সোহাগ মিয়া বলেন ‘কম্বাইন্ড হারভেস্টার মেশিনের মাধ্যমে দ্রুত ধান কাটা মাড়াই-ঝাড়া এক সাথে হয়ে যায়। এলাকায় এ যন্ত্রটির প্রচুর চাহিদা রয়েছে। মূলত শুকনো জমিতে ধান কাটা হয়। প্রতিদিন ৪০-৫০ বিঘা জমির ধান কাটা যায়।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহানা বেগম, বলেন উন্নত দেশে কৃষি কাজে লোকজন উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। বর্তমানে অনেক প্রযুক্তি আমাদের দেশে চলে এসেছে যা কৃষকদের অনেক সহায়তা হচ্ছে। ইতিমধ্যে স্থানীয় কৃষকরা ‘কম্বাইন্ড হারভেস্টার মেশিনের মাধ্যমে জমির পাকা ধান কাটছে। এরফলে কৃষকের সময় ও অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি শারীরিক পরিশ্রম লাঘব হচ্ছে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads