• বৃহস্পতিবার, ৩০ জুন ২০২২, ১৬ আষাঢ় ১৪২৯
ফকিরহাট সরকারি হাসপাতালে তীব্র পানি সংকটে রোগীদের ভোগান্তি

প্রতিনিধির ছবি

সারা দেশ

ফকিরহাট সরকারি হাসপাতালে তীব্র পানি সংকটে রোগীদের ভোগান্তি

  • ফকিরহাট (বাগেরহাট) প্রতিনিধি
  • প্রকাশিত ১৪ মে ২০২২

বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তীব্র্র পানি সংকটে দুর্বিসহ হয়ে উঠেছে চিকিৎসা কার্যক্রম। এতে হাসপাতালে আসা রোগী, ডাক্তার, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভোগান্তীর সৃষ্টি হচ্ছে। স্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের অবহেলায় ও উদাসিনতায় এই সংকটের সৃষ্টি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান কাজের সরকারি টাকা তুলে নিয়ে গেলেও ওই প্রকল্প থেকে এক ফোঁটা পানি পাচ্ছে না হাসপাতালে আসা রোগী ও কোয়ার্টারে থাকা কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।

পরিসংখ্যানবিদ সুকুমার ভট্টাচার্যের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী গত এক মাসে ফকিরহাটের ৫০ শয্যা বিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৯ হাজার ৭৫৫ জন রোগী আবাসিক ও অনাবাসিক চিকিৎসা নিয়েছেন। তীব্র গরমে ডায়রিয়ার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্ত রোগী সংখ্যা। এছাড়া প্রসূতি বিভাগ, শিশু, জেনারেল ও অন্যান্য ওয়ার্ডগুলোয় চিকিৎসা নেওয়া রোগীরা পানির অভাবে শৌচাগার ব্যবহারে সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। পানির অভাবে পরিচ্ছন্নতা কর্মীরাও নিয়মিত পরিচ্ছন্ন রাখতে পারছে না হাসপাতালের মেঝে, শৌচাগারসহ অন্যান্য স্থান। ফলে পরিচ্ছন্নতার অভাবে দুর্গন্ধ ছড়ানোর পাশাপাশি জীবানু ও সংক্রমণ ব্যধি অন্যান্য রোগীদের মাঝে ছড়িয়ে পরার আতঙ্ক রয়েছে। এছাড়া দৈনন্দিন কাজে ব্যবহারের পাশাপাশি নিরাপদ খাবার পানিরও সংকট রয়েছে হাসপাতালটিতে।

হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মকর্তা কর্মচারীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রায় ২ বছর ধরে পানি সংকটে রয়েছে ফকিরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। দীর্ঘদিন থেকে একটি অগভীর নলকূপ থেকে মটরের মাধ্যমে হাসপাতালের জন্য পানি সরবরাহ করা হয়। এ নলকূপের পানি অত্যান্ত আয়রণযুক্ত ও পানে অনুপযোগী হওয়ায় সরবরাহকৃত পানির পাইপে মরিচা এবং ময়লা জমে প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

গত ২০২১ সালের এপ্রিল মাসে গভীর নলকূপের মাধ্যমে নতুন পানি সরবরাহ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। কাজ শেষে হাসপাতালে হস্তান্তরের মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে তা অকেজো হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে পানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে।

শনিবার (১৪ মে) সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, অকেজো হয়ে পড়ে আছে হাসপাতালের নতুন পানি সরবরাহ প্রকল্পের যন্ত্রপাতি। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান মেসার্স হাবিব এন্টারপ্রাইজের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রকল্প শেষে তারা কাজের টাকা তুলে নিয়েছেন। প্রকল্পের টাকা তুলে নিয়ে গেলেও এক ফোঁটা পানি পাচ্ছে না ফকিরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। এ নিয়ে হাসপাতালে আসা রোগীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।

হাসপাতালের মহিলা ওয়ার্ডের ২৪ নং বেডের এপিন্ডিক্স রোগী আদুরী বেগম জানান, তিনি চার দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি আছেন। রোগীদের গণশৌচাগারে মাত্র কিছু সময়ের জন্য পানি পাওয়া যায়। সরবরাহকৃত সেই লালচে মরিচাযুক্ত ময়লা পানি ব্যবহারের অনুপযুক্ত। শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসারত ফারিহা আক্তারের অভিভাবক সালমা বেগম বলেন, বাথরুমের ট্যাপ খুললেই বালতি ও মেঝেতে ময়লা পানির ঘন আস্তরন পড়ে যায়। ডায়েরিয়া ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন সালেহা বেগম বলেন, নিয়মিত পরিস্কারের জন্য তিনি হাসপাতালের শৌচাগারে যথেষ্ট পানি পাচ্ছেন না। ফলে ওয়ার্ডের বেডরুমের সাথে সংযুক্ত টয়লেট থেকে দুর্গন্ধ আসায় দুর্বিসহ সময় পার করছেন। ওয়ার্ডগুলোতে খাবার পানি সরবরাহের জন্য একাধিক রিভার্স ওসমোসিস (আরও) মেশিন থাকলেও আয়রনযুক্ত পানিতে তা নষ্ট রয়েছে। ফলে রোগীর স্বজনদের বাইরে থেকে পানি কিনে আনতে হয়। কেউ কেউ গভীর নলকূপে গিয়ে পানি সংগ্রহ করেন। হাসপাতালে আসা অনেক রোগী অভিযোগ করে বলেন, পানির অভাবে পুরো পরিবেশটা নোংরা হয়ে থাকে। হাসপাতালে সুস্থ হতে এসে উল্টো আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছে তাঁরা।

পানির অভাবে অনেক সময় হাসপাতালের মেঝে মুছতে না পেরে শুধু ঝাড়ু দিচ্ছেন বলে জানান পরিচ্ছন্নতাকর্মী ঋতু বেগম। হাসপাতালে কর্মরত নার্স সালমা আক্তার বলেন, রোগীদের সেবা দিয়ে এসে নিজেকে জীবানুমুক্ত করার জন্য প্রায় সময় হাত ধোয়ার পানি পাওয়া যায় না। ফলে ডায়েরিয়া রোগীর কাছ থেকে এসে শিশু ওয়ার্ডে ও বৃদ্ধ রোগীদের কাছে সেবা দিতে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়।

এই পানি সরবরাহ প্রকল্পের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান মেসার্স হাবিব এন্টারপ্রাইজের স্বত্তাধীকারী মো. আল আমীন জানান, ওয়ার্ক অর্ডার অনুযায়ী তিনি কাজ করেছেন। কিন্তু বার বার বৈদ্যুতিক লাইনে সমস্যা থাকার জন্য এ সংকটের সৃষ্টি হয়েছে।

বাগেরহাট জেলা স্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী মো. এনামূল কবির বলেন, বিদ্যুত সরবরাহে বিভ্রাটের কারণে ট্রান্সমিটার পুড়ে যাওয়ায় এ সমস্যা হয়েছে। স্বল্প সময়ের মধ্যে নতুন টেন্ডার মাধ্যমে আবার ট্রান্সমিটার স্থাপন করা হবে। ফলে পানির সমস্যা দুর হবে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শাহ্ মো. মহিবুল্লাহ্ বলেন, ফকিরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সদ্য যোগদান করেছি। হাসপাতালে তীব্র পানি সংকট রয়েছে। রোগীদের দুর্দশা লাঘবে নিজ খরচে মিস্ত্রী ডেকে পাইপ লাইন ও পানির ট্যাঙ্ক পরিস্কার করিয়েছি। কিন্তু পানির অধিক আয়রনে পাইপগুলো মরিচা ধরে আটকে গিয়েছে। পুরো সিস্টেম পরিবর্তন না করলে স্থায়ী সমাধান হবে না বলে স্যানিটেশন মিস্ত্রী জানিয়েছে। অকেজো হয়ে যাওয়া নতুন প্রকল্পের বিষয়টি তিনি উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন বলে তিনি জানান।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads