• শনিবার, ২৫ জুন ২০২২, ১১ আষাঢ় ১৪২৯

নির্বাচন

আগামী সপ্তাহেই নতুন ইসি!

  • এম এ বাবর
  • প্রকাশিত ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২

নানা বিতর্কের মধ্যে স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে দেশে নির্বাচন কমিশন (ইসি) আইন হয়েছে। কিন্তু সার্চ কমিটি মাধ্যমে ইসি গঠন নিয়ে সব মহলে চলছে আলোচনা। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর অভিযোগ, ইসি গঠন নিয়ে ২০১৭ সালের মতো এবারো একই কৌশল নিয়েছে আওয়ামী লীগ। সরকারি দলের অনুগ্রহপ্রাপ্তদের দিয়ে ইসি গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। আগামী নির্বাচন কমিশন আরো একটি হুদা কমিশন হওয়ার পথে চলে গেছে। তাই গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠন না হলে তীব্র আন্দোলন করা হুমকি দিয়েছে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আমরা এ বছর স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপন করছি। কিন্তু নির্বাচনি বিতর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে পারিনি। এবার সার্চ কমিটির কাছে আমলাদের নামের আধিক্য বেশি। তাছাড়া, আমাকে একটা চাকরি দিন, মনোভাব নিয়ে অনেকে নিজের নাম প্রস্তাব করিয়েছেন। যদিও ইসিতে সৎ, দক্ষ ও নিরপেক্ষ উচ্চ পর্যায়ের আমলা বাঞ্ছনীয়। তবে নুরুল হুদার মতো অনুগ্রহ পেয়ে বড় হওয়া আমলা নয়। আর যেসব আমলা নিজ আগ্রহে নিজের নাম জমা দিয়েছেন, সার্চ কমিটি ইসিতে তাদের নাম প্রস্তাব দিলে এটি দিয়ে শক্তিশালী ও যোগ্য ইসি গঠন করা সম্ভব হবে না।

২০২৩ সালে অনুষ্ঠেয় দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতিপর্ব শুরু হয়ে গেছে। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি হুদা কমিশনের মেয়াদ শেষ হওয়ায় ইসি এখন কমিশনশূন্য। ব্যাপক আলোচনার মধ্যে ইসিতে নিয়োগের আইন হওয়ার পর গত ৫ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ সার্চ কমিটি গঠন করে দেন। আইন অনুযায়ী, সার্চ কমিটিকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তাদের নামের সুপারিশ রাষ্ট্রপতিকে জমা দেওয়ার কথা। সেই হিসাবে আগামী ২৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় হাতে রয়েছে এই কমিটির কাছে। এ সময়ের মধ্যে সিইসিসহ প্রত্যেক পদের জন্য দুইজন করে মোট ১০ জনের নাম প্রস্তাব করবে সার্চ কমিটি। এদের মধ্য থেকে ৫ জনকে দিয়ে আগামী বৃহস্পতিবারের মধ্যেই গঠন হতে যাচ্ছে নতুন নির্বাচন কমিশন। আর এ কমিশনের অধীনেই সম্পন্ন হবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।

বাংলাদেশে এ পর্যন্ত যতগুলো নির্বাচন কমিশন হয়েছে, কোনোটি বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। পরাজিত দল সব সময়ই তাদের হেরে যাওয়ার জন্য কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ২০১২ ও ২০১৭ সালেও সার্চ কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছিল। এটি প্রক্রিয়া হিসেবে মন্দের ভালো হলেও ফলাফল হয়েছে বিস্ময়। যদিও ভোটার তালিকা নিয়ে নয়ছয় হওয়ায় এম এ আজিজ কমিশন নির্বাচনই করতে পারেনি। এখন নির্ভুল ভোটার তালিকা আছে। কিন্তু ‘ভোট নেই’। ভোটার ভোটকেন্দ্রে না  গেলেও অদৃশ্য ছায়া ভোট দিয়ে যায়। এ অবস্থায় আগামী নির্বাচন কমিশনের কাছে দেশের মানুষের বড় ধরনের প্রত্যাশা রয়েছে। একটানা ১৩ বছর ক্ষমতায় থেকে আওয়ামী লীগ কাদের দিন বদল করেছে? জনগণের মাধ্যমে তা বিচার করতে অবশ্যই একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন জরুরি বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

২০১৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন বর্তমান নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব গ্রহণ করে। সোমবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) তাদের পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হয়। নবগঠিত সার্চ কমিটি প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও চারজন নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের মাধ্যমে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনে রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করবে। কমিটিকে সাচিবিক সহায়তা দিচ্ছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। নতুন ইসি গঠনে মোট ২৪টি রাজনৈতিক দল, ৬টি পেশাজীবী সংগঠন ও ব্যক্তিগতভাবে অনেকে সার্চ কমিটিতে নাম প্রস্তাব করেছে। সার্চ কমিটির কাছে আসা ৩২২ জনের নাম প্রকাশ করা হয়েছে। তালিকা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।

এদিকে ১০ জনের নাম চূড়ান্ত করতে গতকাল বুধবার প্রথম বৈঠক করে সার্চ কমিটি। আগের দিন মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেছেন, যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনে ১০ জনের নাম সুপারিশ করবে সার্চ কমিটি। সেই তালিকা থেকেই নতুন কমিশনের নাম প্রকাশ করা হবে। আগামী সার্চ কমিটির মেয়াদ শেষ হবে ২৭ ফেব্রুয়ারি। তবে ২৪ ফেব্রুয়ারির আগে চূড়ান্ত ১০ জনের নাম পাঠানোর সম্ভাবনা কম বলে জানা গেছে বৈঠক সূত্রে।

১৪ দলের সূত্র জানায়, ২০১৭ সালের মতো এবারো একই কৌশল নিয়েছে আওয়ামী লীগ। জোটের শরিক এবং সমমনা দলগুলোকে দিয়ে পছন্দের কয়েকটি নাম অনুসন্ধান (সার্চ) কমিটিতে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে। তবে এবার শরিক দু-একটি দল এ কৌশলে সাড়া দেয়নি।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচন কমিশনসংক্রান্ত কোনো বিষয় ব্যক্তিগত তথ্য নয়। এগুলো প্রকাশ করার বিষয়ে হাইকোর্টের নির্দেশনা আছে। স্বচ্ছতার স্বার্থে অনুসন্ধান কমিটিতে আসা নাম তিন স্তরে প্রকাশ করতে হবে। নইলে সার্চ কমিটি মাধ্যমে গঠিত এই ইসির প্রতি মানুষের আস্থা থাকবে না। তাছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোর অভিযোগ অনুযায়ী ইসি গঠনে আওয়ামী লীগের আনুগত্যদের রাখা হলে তারা কখনো নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্পন্ন করতে পারবে না।  

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, এবার সার্চ কমিটির কাছে আমলাদের নামের আধিক্য বেশি। এর কারণ হতে পারে নির্বাচন কমিশনে আমলাদের প্রয়োজনীয়তা আছে। যাকে নিয়োগ দেওয়া হবে তার প্রশাসনিক দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এ প্রতিষ্ঠানে যেকোনো ধরনের লোক নিয়োগ দেওয়া উচিত হবে না।

তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের প্রায় ১৭ লাখ লোককে ম্যানেজ করতে হয়। ১০ হাজার বিষয় ম্যানেজ করতে হয়। নির্বাচন কমিশনের আড়াই হাজার নিজস্ব কর্মকর্তা আছেন, তাদের সঠিকভাবে পরিচালনা করতে হয়। এ ছাড়া আইন-কানুন বোঝার বিষয় আছে, উদ্ভাবনের ও দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্তের বিষয় আছে। এ বাস্তবতায় যেকোনো লোককে বসিয়ে দিলে তো হবে না। কিন্তু যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে তাতে হাস্যোস্পদ অনেক নাম আছে। আমি নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে যত লেখাপড়া করেছি, তাতে এবার যে হ-য-ব-র-ল অবস্থা দেখছি, তাতে বিস্মিত না হয়ে পারিনি। মনে হচ্ছে, এটা নিছক চাকরি।

আমাকে একটা চাকরি দিন, এ ধরনের মনোভাব নিয়ে ব্যক্তি পর্যায়ে অনেকে নিজের নাম প্রস্তাব করেছেন। আর এদের দিয়ে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে স্বচ্ছতার আশা করা যায় না।

বিএনপি বলেছে, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠন না হলে তীব্র আন্দোলন করা হবে। এ দাবি নিয়ে তারা সরকারবিরোধী দলগুলোকে এক প্ল্যাটফরমে আনার প্রয়াস চালাবে বলেও ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে দেশের ৫৩ বিশিষ্ট নাগরিক গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য এখনই আইন প্রণয়নের তাগিদ দিয়েছেন।

সরকারি দল আওয়ামী লীগ বলেছে, সার্চ কমিটি গঠন করে ইতিমধ্যে দুই দফায় নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছে। দুই দফায় যেভাবে সার্চ কমিটি করা হয়েছে এবারো সেভাবেই নতুন কমিশন গঠন করা হবে। আওয়ামী লীগের কথা-সার্চ কমিটিও একটি আইনি প্রক্রিয়া। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের বাস্তবতায় শতভাগ নিরপেক্ষ ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া কঠিন কাজ। তবে তালিকায় থাকা দক্ষ আর বিবেকবান ব্যক্তি বাছাই করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।

১৪ দলের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, ইসি নিয়োগে অবশ্যই সার্চ কমিটিকে স্বচ্ছ প্রক্রিয়াতে এগোতে হবে। কৌশলে অনুসন্ধান কমিটির ওপর সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তিদের বাছাই করার বিষয়ে চাপ তৈরি হচ্ছে। এতে আরো স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যাবে। তবে তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলো কে কার নাম প্রস্তাব করল, তা প্রকাশ করলে ভালো হতো। তবে বাংলাদেশের বাস্তব প্রেক্ষাপটে এ নামগুলো প্রকাশ করা ঠিক হবে না।

১৪ দলের অন্যতম শরিক দল জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, স্বচ্ছ প্রক্রিয়া ইসি তৈরি করতে অন্তত ১০ জনের তালিকা প্রকাশ করা দরকার। এতে জনসাধারণ তাদের বিষয়ে মতামত দিতে পারে। পাঁচ-ছয় দিন সময় দিলে রাষ্ট্রপতির পক্ষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হবে।

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলেছেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ যদি নির্বাচন কমিশনে দলীয় লোক নিয়োগ দেয় তবে তা হতাশাব্যঞ্জক হবে। একটি শক্তিশালী ইসি গঠনে শুরু থেকেই আমরা কমিশন গঠনে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছি। শেষ পর্যন্ত যদি একটি দলের চামচা দিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন হলে তা দিয়ে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্পন্ন হবে না।

তিনি বলেন, আমরা নির্বাচন কমিশনকে পূর্ণ ক্ষমতা দিয়ে নির্বাচন কমিশন আইন চেয়েছিলাম। কিন্তু, নির্বাচন কমিশন গঠনে যে আইনটি হয়েছে তা হচ্ছে নতুন মোড়কে পুরনো জিনিস। নির্বাচন নিয়ে নয়-ছয় নয়, দেশের মানুষ অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেখতে চায়। 

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য আওয়ামী লীগ অনুসন্ধান কমিটির কাছে কৌশলে তাদের পছন্দের নাম পাঠিয়েছে। এ ইসি হবে তাদের আনুগত্যের আরো একটি হুদা কমিশন। বিএনপি মনে করে বর্তমান জনগণের ম্যান্ডেটবিহীন সরকারের অধীনে কোনো অবস্থাতেই নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়। 

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ বলেছেন, ইসি গঠনে আওয়ামী লীগ সার্চ কমিটিকে কোনোভাবে প্রভাবিত করছে না। তাই সার্চ কমিটি যোগ্য ব্যক্তিকেই কমিশনের জন্য প্রস্তাব করবে। 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads