• শনিবার, ২৫ জুন ২০২২, ১১ আষাঢ় ১৪২৯

নির্বাচন

নির্বাচনে আস্থা ফেরানোর চেষ্টা

  • এম এ বাবর
  • প্রকাশিত ১০ মার্চ ২০২২

নির্বাচন নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা কাটিয়ে উঠতে, বিভিন্ন মহলের সঙ্গে সংলাপে বসবে নবগঠিত নির্বাচন কমিশন-ইসি। বিশেষ করে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে, ভোটের প্রতি রাজনৈতিক দল, জনগণ এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের আস্থা ফেরাতে কাজ করছে ইসি।

আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে চায় ইসি। তাই সামনের সপ্তাহ থেকে রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের সঙ্গে সংলাপের আয়োজন করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে প্রথম পর্যায়ে শিক্ষাবিদদের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে ১৩ মার্চ থেকে দিয়ে এ কার্যক্রম শুরু হবে।

এদিকে রাজনীতি ভোটের প্রতি দেশের মানুষের আস্থা ফেরানোই নবগঠিত নির্বাচন কমিশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা। তাদের মতে, বিদায়ী কমিশনের নেতৃত্বে গত ৫ বছরে জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ে যে ভোট হয়েছে-তাতে মানুষের মতামত প্রতিফলিত হয়নি; বরং অনেক জায়গায় ভোটের নামে প্রহসন হয়েছে। এ কারণে সাধারণ মানুষের ভোটের প্রতি এক ধরনের অনাস্থা তৈরি হয়েছে। তাই এ সংলাপের মাধ্যমে পরামর্শ নিয়ে তা বাস্তবায়ন না করলে এ ইসির প্রতি মানুষের আস্থা আসবে না; বরং রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হবে।     

অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নবগঠিত ইসির প্রথম কাজ হবে মানুষের আস্থা ফেরানো। তাই এ মুহূর্তে বিভিন্ন মহলের সঙ্গে পারামর্শের জন্য সংলাপের উদ্যোগটি ইতিবাচক। এর মাধ্যমে অংশীজনদের মতামত শুনে আস্থা অর্জনে কাজে লাগাতে পারবে নতুন ইসির দায়িত্বপ্রাপ্তরা। 

২৬ ফেব্রুয়ারি প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) হিসেবে কাজী হাবিবুল আউয়াল এবং নির্বাচন কমিশনার হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আহসান হাবিব খান, অবসরপ্রাপ্ত জেলা দায়রা জজ বেগম রাশেদা সুলতানা, সাবেক সিনিয়র সচিব মো. আলমগীর ও মো. আনিছুর রহমানকে নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি। ২৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নিয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে নির্বাচন ভবনে অফিস শুরু করে হাবিবুল আউয়াল কমিশন। ওইদিন বিকেলে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করে নতুন কমিশন। 

১ মার্চ জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে। ২ মার্চ জাতীয় ভোটার দিবসে অংশগ্রহণ এবং ৬ মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়ায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধি সৌধে শ্রদ্ধা জানায় কমিশন। এখন নতুন কমিশন আস্তে আস্তে নিজেদের কাজে মন দিচ্ছে বলে জানা গেছে।

ইসি সূত্র জানায়, আগামী ১৩ মার্চ সুশীল সমাজ বা শিক্ষাবিদদের প্রতিনিধি নিয়ে এই সংলাপ শুরু হতে পারে। পর্যায়ক্রমে ধাপে ধাপে রাজনৈতিক দল, নির্বাচন পর্যবেক্ষক, নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের নিয়ে অনুষ্ঠিত হবে এই সংলাপ পর্ব। সংলাপের বিষয়ে জানতে চাইলে ইসির যুগ্ম-সচিব ও পরিচালক (জনসংযোগ) এসএম আসাদুজ্জামান বলেন, এই বিষয়ে প্রস্তুতি গ্রহণ করা হচ্ছে।

নতুন নির্বাচন কমিশনের সদস্যরা সরকারের পছন্দের লোক মন্তব্য করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, তারা সবাই সরকারের অনুগত, সুবিধাভোগী ও তোষামোদকারী। তাই সংলাপের নামে নাটক করে আবারো মানুষের ভোটাধিকার বঞ্চিত করবে। এ ইসির অধীনে নির্বাচনে যাবেন না তারা। আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে কোনো কমিশন কাজ করতে পারবে না। এটা জাতীয় ও স্থানীয় সরকারের সব নির্বাচনে প্রমাণ হয়েছে। আমাদের বক্তব্য স্পষ্ট, সরকারকে পদত্যাগ করে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠন করতে হবে। ওই সরকার (নিরপেক্ষ সরকার) নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করবেন। তার অধীনে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হলে তাতে আমরাসহ সব দল অংশগ্রহণ করবে।

এদিকে বিএনপিকে আস্থায় আনার বিষয়ে সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, তাদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করব। বিএনপি যদি ঘোষণা দিয়েও থাকে, তাদের কি আহ্বান জানাতে পারবো না? কোনো কিছুই শেষ নয়। আমরা তো তাদের চা খেতে আমন্ত্রণ জানাতেই পারি।

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচনি ব্যবস্থা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটি নানা কারণে ভেঙে পড়েছে। এই ভেঙে পড়া ইসিকে পুনর্গঠন, পুনর্বিন্যাস করে এবং নির্বাচনের প্রতি জনআস্থা ফিরিয়ে আনাই হবে নতুন ইসির জন্য আগামী দিনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। আর যদি তারা তা করতে ব্যর্থ হন- তাহলে ফলাফল কারো জন্যই সুখকর হবে না। তবে আগামী নির্বাচন নিয়ে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে ইসির এ সংলাপ অনেকটা ইতিবাচক বলে তিনি মনে করনে।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, এই কমিশন দেশের মানুষের ভোটে আস্থা ফেরাতে কাজ করবেন বলে তিনি আশাবাদী। তাছাড়া আগামীতে তাদের মেয়াদকালে অনুষ্ঠিতব্য আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠানে সাফল্য অর্জন করবেন। এ জন্য সবার সঙ্গে পরামর্শ করে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা একটি ভালো উদ্যোগ।

জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, কাজী হাবিবুল আউয়াল (প্রধান নির্বাচন কমিশনার) সহ ইসির সব সদস্যদের চিনি, জানি। তাই তারা আগামীতে সর্বজন গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দিতে পারবে বলে তিনি আশাপ্রকাশ করেন। 

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, সরকারের আস্থাভাজন ও ঘনিষ্ঠজন বলে বিবেচিত লোকদের দিয়েই নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছে- এটাই বাস্তব সত্য। সরকার অতীতের ধারাবাহিকতা অনুসরণ করে নিজেদের পছন্দের এবং আস্থাভাজন লোক দিয়েই নির্বাচন কমিশন গঠন করেছে। তারপরও সৎ ইচ্ছে থাকলে এ ইসির মাধ্যমেও ভালো নির্বাচন করা সম্ভব। আর আগামী তাদের কর্মপরিকল্পনা তৈরিতে ইসির এ সংলাপ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি ভালো দিক নির্দেশনা পাবে বলে আমি আশা করি। তবে এ ইসি যদি কারো মাধ্যমে প্রভাবিত হয়ে নির্বাচন পরিচালনা করে এতে করে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সংকট আরো ঘনীভূত হবে।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, বিভিন্ন মহলের সঙ্গে পরামর্শের জন্য ইসির সংলাপের উদ্যোগটি ইতিবাচক। এর মাধ্যমে অংশীজনদের মতামত শুনে আস্থা অর্জনে কাজে লাগাতে পারবে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হলো যেসব সুপারিশ আসবে, সেগুলো বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেওয়া। এই সংলাপ যেন লোকদেখানো বা প্রতারণামূলক না হয়।

দায়িত্ব গ্রহণ করার পর ট্রেডিশনালি বিভিন্ন মহলের সঙ্গে সংলাপে বসেন। ২০০৮ সালে ইসির নিবন্ধন প্রক্রিয়া শুরু করা এটিএম শামছুল হুদা কমিশন মেয়াদকালে দুইবার সংলাপে বসেছিলেন বলে জানা গেছে। এছাড়া কাজী রকিবুদ্দীন আহমেদ কমিশনের সময়ও সংলাপ হয়েছিল। তবে হাবিবুল আউয়াল কমিশনের মতো দায়িত্ব নিয়েই সংলাপে বসেনি কোনো কমিশন।

সদ্য বিদায়ী কেএম নূরুল হুদা কমিশন দায়িত্ব নিয়েছিল ২০১৭ সালের ১৫ জানুয়ারি। এরপর কর্মপরিকল্পা ঠিক করে ওই কমিশন ২০১৭ সালের ৩১ জুলাই সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সংলাপ শুরু করে। নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে ২৪ অক্টোবর সংলাপের মাধ্যমে এই পর্ব শেষ করে বিদায়ী কমিশন। ওই সংলাপে  ৪০টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যমের প্রতিনিধি, পর্যবেক্ষণ সংস্থা, নারী নেত্রী ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের সাথে সংলাপ করা হয়। সংলাপ থেকে বিভিন্ন বিষয়ে পাঁচ শতাধিক সুপারিশ আসে। সেখানে পাওয়া সুপারিশগুলোকে তিনটি শ্রেণিতে (সংবিধান সংশ্লিষ্ট, আইন প্রণয়ন বিষয়ক ও নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ার) সাজায় কমিশন।

সংলাপে আলোচনার সুবিধার্থে কার্যপত্রে যে ৯টি আলোচ্যসূচি অন্তর্ভুক্ত করেছিল কেএম নূরুল হুদা কমিশন। সেই সংলাপে কিছুটা আশ্বস্ত হলেও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরপর বিএনপিসহ সমমনা বেশকিছু নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল কেএম নূরুল হুদা কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন নির্বাচন বর্জন করে।

দায়িত্ব নেওয়ার পর ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রথম সংবাদ সম্মেলনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এজেন্ডা হলো, আমরা তাদের সহায়তা করবো। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সহায়তা না করে, পলিটিক্যাল লিডারশিপে যদি ন্যূনতম সমঝোতা না থাকে, আমি তো তাদের মুরব্বী হতে পারবো না। উনারা আমাদের থেকে অনেক বেশি জ্ঞানী, অভিজ্ঞ। আমরা তাদের কাছে অনুনয়-বিনয় করবো আপনারা নিজেদের মধ্যে সমঝোতা সৃষ্টি করেন, একটা চুক্তিবদ্ধ হন যে-আপনারা সুন্দরভাবে নির্বাচনটা করবেন। ওখানে সহিংসতা হবে না, কেউ কাউকে বাধা দেবে না।

ভোটে আস্থা ফেরানোর বিষয়ে সিইসি বলেন, আমরা সততা নিষ্ঠার সাথে নির্বাচন বিষয়ে দায়িত্ব পালন করবো। আমরা কতোটা সৎ ছিলাম, দায়িত্ব পালন করেছি সেটি পরে মূল্যায়ন করতে পারবেন। আমরা প্রত্যাশা করি সকলে নির্বাচনে অংশ নিয়ে গণতন্ত্রকে সুসংহত করবেন। যারা নির্বাচন করবেন তাদের জন্য অনূকুল পরিবেশ তৈরি করার দায়িত্ব কমিশনের রয়েছে। কর্মপদ্ধতি কি হবে সেটি ঠিক করিনি। তবে বিভিন্ন মহলের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে পরামর্শ নিয়ে আগামী ভোটে মানুষের আস্থা ফেরাতে পারব।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads