• রবিবার, ১৪ আগস্ট ২০২২, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৯
বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের বিকাশ ও সম্ভাবনা

সংগৃহীত ছবি

সম্পাদকীয়

বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের বিকাশ ও সম্ভাবনা

  • অলোক আচার্য
  • প্রকাশিত ১৫ জানুয়ারি ২০২২

পৃথিবীব্যাপী সম্ভাবনাময় হিসেবে বিবেচনা করা হয় পর্যটন শিল্পকে। পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন ও নতুন নতুন স্থান পর্যটনের আওতায় আনা এবং পর্যটকদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করছে সরকার। পর্যটনকেন্দ্র ঘিরে গড়ে ওঠে ব্যবসা-বাণিজ্য। এর ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। পর্যটন শিল্প ঘিরে বহুমুখী সম্ভাবনা রয়েছে। ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও আমরা এখনো সেভাবে এই খাতে অগ্রসর হতে পারিনি। আমরা হয়তো অনেক দেরিতে শুরু করেছি। পর্যটনকেন্দ্র ও এর আশপাশের পরিবেশ, সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি এবং নিরাপত্তা এ সবকিছুই একটি দর্শনীয় স্থান পর্যটনকেন্দ্র হতে সাহায্য করে। কোনো স্থাপনা, পাহাড়, বন, সমুদ্রসৈকত, দ্বীপ, ঝরনা ইত্যাদি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে আমাদের দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এসব সম্ভাবনাময় স্থান রয়েছে। যেখানে পরিকল্পিত উপায়ে গড়ে তুলতে সক্ষম হলে দক্ষিণ এশিয়ায় পর্যটনে আমরাও এগিয়ে থাকবো। কারণ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ পর্যটনশিল্পে সবচেয়ে পিছিয়ে। জিডিপিতে পর্যটনশিল্পের প্রত্যক্ষ অবদান রাখা ১৭৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪২তম। পর্যটন খাত থেকে বর্তমানে বাংলাদেশের বার্ষিক আয় মাত্র ৭৬.১৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। যেখানে সার্কভুক্ত অন্যান্য দেশ ভারত, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও পাকিস্তানের পর্যটন খাত থেকে আয় আমাদের দেশের চেয়ে বেশি। দক্ষিণ এশিয়ার একটি চমৎকার দেশ হলো বাংলাদেশ। যেখানে পর্যটন শিল্পের রয়েছে প্রচুর সম্ভাবনা।

এই শতাব্দির একটি দুঃসময়ের নাম কোভিড-১৯ ভাইরাস। যা জীবন ও জীবিকাকে থামিয়ে দিয়েছিল। করোনা অতিমার্তার কারণে অন্যসব খাতের সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পর্যটন খাত। সারা বিশ্বেই এই খাত করোনার কারণে বিপর্যস্ত হয়। করোনার প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ার পরপর প্রায় সব দেশই লকডাউনের পথে হাঁটে। সেই সময় পর্যটন কেন্দ্রগুলোও বন্ধ হয়ে যায়। কারণ যে পর্যটকদের জন্য পর্যটনকেন্দ্র, সেই কেন্দ্রগুলো পর্যটক শূন্য থাকে। এর সঙ্গে জড়িত সব ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোও বন্ধ থাকে। সেই সঙ্গে বন্ধ হয়ে যায় পর্যটনকেন্দ্র ঘিরে গড়ে ওঠা ব্যবসা-বাণিজ্য। এসব ব্যবসার সঙ্গে জড়িত অসংখ্য মানুষ। রয়েছে গাইড যারা পর্যটকদের পর্যটনকেন্দ্রগুলো ঘুরে দেখতে সাহায্য করে। পর্যটক শূন্য দীর্ঘদিন পরে থাকে পর্যটনকেন্দ্রগুলো। করোনা মহামারিতে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পর্যটন খাত। বিশ্বব্যাপী লাখ লাখ মানুষ যারা এ খাতের সঙ্গে জড়িত ছিল তারা চাকরি হারিয়ে ছিলেন। সবার জীবিকাতেই করোনার খড়গ নেমে আসে। পর্যটন খাতে ধস নেমে গত বছর (২০২০ সালে) এশিয়ার পাঁচটি দেশে ১৬ লাখ মানুষ কর্ম হারিয়েছেন। এছাড়া ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ব্রুনাই ও মঙ্গোলিয়া এই পাঁচটি দেশের অন্তত এক তৃতীয়াংশ মানুষ কাজ হারিয়েছে। তথ্যে জানা যায়, এ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৪০ লাখ জনবল বেকার হয়ে পড়েছিল। নিবন্ধিত ৭৩২টি ট্যুর অপারেটর আর ৪৪টি তারকা হোটেলসহ সারা দেশের পাঁচ শতাধিক হোটেল-মোটেল ছিল অতিথি-শূন্য। এই খাতে প্রায় ১৫৫ হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। তারপর একসময় ধীরে ধীরে করোনার প্রকোপ কমতে থাকে সারা বিশ্বেই। তখন পর্যায়ক্রমে খুলে দেওয়া হয় পর্যটনকেন্দ্র। 

বাংলাদেশও ক্রমেই পর্যটন শিল্প বিকশিত হচ্ছে। কাজের ফাঁকে মানুষ এখন ভ্রমণমুখী হয়েছে। পরিবারসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করে। পৃথিবীর উল্লেখযোগ্য কিছু পর্যটনকেন্দ্র রয়েছে বাংলাদেশে। এছাড়াও দেশব্যাপী অসংখ্য দর্শনীয় স্থান রয়েছে যেসব স্থান ক্রমশই ভ্রমণের জন্য জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এর একটি বড় সুবিধা হলো একটি স্থান ভ্রমণের জন্য জনপ্রিয় হয়ে উঠলে সেই স্থান ঘিরে সৃষ্টি হয় কর্মসংস্থান। তবে এর সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজন ভ্রমণকারীদের নিরাপত্তা, প্রয়োজনীয় আবাস, খাবার ইত্যাদি সুবিধা। অনেক আনন্দ নিয়ে পর্যটকরা সেখানে যায়। যাদের সামর্থ্য কম তারাও যান। কিন্তু খাওয়া-দাওয়ার অতি উচ্চ মূল্য এবং থাকার জায়গা পর্যাপ্ত না হলে অনাগ্রহের সৃষ্টি হয়। সম্প্রতি কক্সবাজারে একটি ধর্ষণের ঘটনায় দেশব্যাপী তোলপাড় হয়েছে। একটি ঘটনা মানুষের মনে শঙ্কা তৈরি করে। একটি ভুল বার্তা পর্যটকদের কাছে পৌঁছায়। এছাড়াও সেখানে খাদ্যদ্রব্যের লাগামহীন মূল্য এবং পর্যটকদের চাপ বাড়ায় হোটেল না পাওয়ার ছবিও দেখেছি। পথেঘাটে, গাড়িতে উদ্বাস্তুর মতো নিরাপত্তাহীন অবস্থায় পর্যটরগণ রাত কাটিয়েছেন। যা খুবই দুসংবাদ আমাদের পর্যটনকেন্দ্রের জন্য। এ বিষয়গুলোর বিশেষত পর্যটকদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে।

বিশেষ করে আমাদের কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত এবং বাংলাদেশের দার্জিলিং খ্যাত সাজেক ভ্যালি বা কুয়াকাটার মতো পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পর্যটকদের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। কারণ এসব স্থানে দেশি পর্যটক ছাড়াও আসে প্রচুর সংখ্যক বিদেশি পর্যটক। করোনার প্রভাব ক্রমেই পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে মানুষের ভ্রমণ শুরু হয়েছে। মানুষ প্রাণখুলে হাসতে শুরু করেছে। পৃথিবীজুড়েই পর্যটন একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প এবং অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে ভূমিকা পালন করে থাকে। তাই বিভিন্ন দেশ তাদের পর্যটকদের কথা মাথায় রেখে পর্যটনকেন্দ্রগুলোর সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করছে। পর্যটন শিল্পকে অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক করে গড়ে তুলছে। পর্যটকদের আবাসন ব্যবস্থা, নিরপত্তা, খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা, শপিং, ইতিহাস ও ঐতিহ্য জানানোর ব্যবস্থাসহ নানাবিধ সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা সব দেশেই করে থাকে। পৃথিবীতে অনকে দেশই আছে, যাদের অর্থনীতি নির্ভর করে এই পর্যটন শিল্পের ওপর। করোনায় তাদের ক্ষতি হয়েছে সবচেয়ে বেশি। আর তাই অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে পর্যটন শিল্প প্রসার করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে।

বিশ্ব ভ্রমণ ও পর্যটন কাউন্সিলের (ডব্লিউটিটিসি) তথ্যানুযায়ী, বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই শিল্পের অবদান ৮ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলার। ২০১৯ সালে পর্যটন শিল্প বিশ্বের জিডিপিতে অবদান রাখে ১১ দশমিক ৪ শতাংশ। তাই এই শিল্পের বিকাশ লাভ আবশ্যক। করোনা পরবর্তী সময়ে এখনো দেশের পর্যটনশিল্প জমে ওঠেনি। প্রকৃতিতে এখন শীতের মৌসুম চলছে। শীতের এই সময় থেকে শেষ পর্যন্ত দেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পর্যটকদের ভিড় থাকে। মানুষ সতর্কতা নিয়েও পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে যেতে আরম্ভ করেছে। ধীরে ধীরে এই সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাবে। আমাদের দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৃথিবী বিখ্যাত পর্যটনকেন্দ্র রয়েছে। যেসব স্থান ভ্রমণ করতে দেশ বিদেশের পর্যটকরা প্রতি বছর ভিড় করে। এসব পর্যটনকেন্দ্রের মধ্যে অন্যতম হলো কক্সবাজার। পৃথিবী বিখ্যাত সমুদ্রসৈকত ছাড়াও আরও ভ্রমণ স্থান রয়েছে এখানে। রয়েছে সাগরকন্যা কুয়াকাটা। আমাদের পাহাড় সমৃদ্ধ পাবর্ত্য তিন অঞ্চল রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে অসংখ্য পর্যটনকেন্দ্র রয়েছে। সাজেক ভ্যালি, নীলাচল, নীলগিরি, বিছানাকান্দি, চা-বাগান, বরিশালের লাল শাপলার বিল, পাহাড়পুর, ময়নামতি, গজনী, রাতারগুলের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে পর্যটকরা ছোটেন সেখানে। এসব ছাড়াও প্রতিটি জেলাতেই রয়েছে পর্যটনকেন্দ্র। সেসব কেন্দ্রে পরিবার-পরিজন নিয়ে ছুটিতে বেড়াতে যান ভ্রমণ পিপাসুরা।

আমাদের দেশের প্রতিটি অঞ্চলের রয়েছে আলাদা সৌন্দর্য। রয়েছে আলাদা বিখ্যাত পর্যটনসমৃদ্ধ স্থান। যেসব স্থান ঘিরে গড়ে উঠেছে ব্যবসা-বাণিজ্য। এসব পর্যটনকেন্দ্র ঘিরে প্রচুর কর্মসংস্থান গড়ে উঠেছে। নারী-পুরুষ তাদের কর্মসংস্থান খুঁজে নিয়েছে। করোনার কারণে দীর্ঘ কয়েক মাস এসব মানুষ দুর্ভোগে ছিল। এখন তারা আবার আগের জীবনে ফিরছেন। তবে ফের বাড়ছে করোনার সংক্রমণ। এখন কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হলো স্বাস্থ্যবিধি মেনে সেসব স্থান চলাচলের উপযোগী করে তুলতে হবে। পর্যটকদেরও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি মেনেই জমায়েত হওয়া উচিত। কারণ করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধি পেলে কঠোর সিদ্ধান্ত আসতে পারে। আবার থমকে যেতে পারে পর্যটন কেন্দ্রগুলো। অথচ দেশের পর্যটন শিল্পকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য এই খাতের পূর্ণ গতিতে চলা প্রয়োজন। কিন্তু এখনো করোনা মহামারির প্রকোপ চলছে। এর মধ্যেই পর্যটন শিল্পকে বিশ্বমানের করে তুলতে হবে, যাতে আরও বেশি পর্যটক আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়।

এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯৫০ সালে বিশ্বে পর্যটকের সংখ্যা ছিল ২৫ মিলিয়ন যা বর্তমানে বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ১৩৩৫ মিলিয়েনে দাঁড়িয়েছে। পর্যটন শিল্প বিকাশ লাভ করলে আমাদের দেশের কর্মসংস্থানের বড় অংশ সমাধান করা সম্ভব। মানুষের জীবনমান উন্নয়নে এবং দেশের অর্থনীতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হবে এই পর্যটনশিল্প। তাই করোনা মহামারির পর যাতে তা দ্রুত গতিতে বিকাশমান হতে পারে সে ব্যবস্থা করতে হবে। পরিকল্পিত উপায়ে পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নিতে হবে।

লেখক : শিক্ষক ও মুক্তগদ্য লেখক

sopnil.roy@gmail.com

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads