• রবিবার, ১৪ আগস্ট ২০২২, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৯

সম্পাদকীয়

ভাষার জনপদ, জনপদের ভাষা

  • মামুন রশীদ
  • প্রকাশিত ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২

ফেব্রুয়ারি, মাতৃভাষার সম্মান ও মর্যাদা রক্ষায় এ মাসে আমরা রাজপথে রক্ত দিয়েছি। ফেব্রুয়ারি তাই আমাদের কাছে শুধু একটি মাস নয়, একুশ আমাদের কাছে শুধু একটি তারিখ নয়। এ মাস আমাদের চেতনার বাতিঘর। আমাদের এগিয়ে যাবার প্রেরণা। মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষায় আমরা রক্ত দিয়েছি বলেই, যে কোনো জাতির মাতৃভাষার প্রতি আমাদের দরদ। যে কোনো জাতির ভাষা প্রসঙ্গে আমাদের শ্রদ্ধাবোধ। অথচ ভাষার এই মাস, ভাষা শহীদদের স্মরণের দিন একুশে ফেব্রুয়ারি, অথচ এ মাসেই ভাষার জন্য বেদনাদায়ক খবর জানতে হয়। আজকের দিনে সবার হাতেই মুঠোফোন। সবার হাতেই আন্তর্জাল ব্যবহারের সুবিধা। সেই সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে সকল তথ্যপ্রবাহকে এক সূত্রে গেঁথে রেখেছে গুগল নামের একটি সার্চ ইঞ্জিন। যা ব্যবহার করে আমরা মুহূর্তেই জেনে নিতে পারছি আমাদের প্রয়োজনীয় তথ্য। যেমন বর্তমান পৃথিবীতে ভাষার সংখ্যার প্রায় সাড়ে ছয় হাজার। এর মাঝে এমন অনেক ভাষা রয়েছে, যে ভাষায় কথা বলার মানুষের সংখ্যা এক হাজারের বেশি হবে না। আর এই এক হাজার লোকে বলতে পারা ভাষার সংখ্যাও কিন্তু কম নয়, তাও প্রায় দুই হাজার। তার মানে এই ভাষাগুলো সময়ের বিবর্তনে হারিয়ে যাবে। এবং যাচ্ছেও। একুশে ফেব্রুয়ারি পৃথিবীতে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়। বিশ্বব্যাপী দিনটি পালনের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করে জাতিসংঘের সংস্থা ইউনেস্কো। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে ২০১৮ সালে ইউনেস্কোর মহাপরিচালক অড্রে অ্যাজুলাই এক বার্তায় বলেছিলেন, প্রতি দুই সপ্তাহে, মানে ১৪ দিনে বিশ্বের বুক থেকে হারিয়ে যায় একটি করে ভাষা। শুধু যে ভাষা হারিয়ে যায়, তা নয়, একটি ভাষার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যায় সেই ভাষায় কথা বলা মানুষের ইতিহাস ও সংস্কৃতিও। এবারে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রাক্কালে এমনি একটি বেদনাদায়ক খবর আমাদেরকে পড়তে হলো। ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২২ তারিখে বিভিন্ন দৈনিকে একটি মনখারাপ করা প্রতিবেদন প্রকাশ পেয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, মারা গেলেন ইয়ামানা ভাষাভাষী শেষ মানুষটিও। ‘ইয়ামানা’ ভাষাটিতে কথা বলতেন দক্ষিণ আমেরিকার একেবারে দক্ষিণ প্রান্তের ইয়াগন সম্প্রদায়ের কিছু মানুষ। তাদের শেষ প্রতিনিধি ছিলেন ক্রিস্টিনা ক্যালডেরন। ৯৩ বছর বয়সে তিনি মারা যাওয়ায় এই মুখের ভাষা হিসেবে ইয়ামানা মৃত ভাষায় পরিণত হলো। কারণ দক্ষিণ আমেরিকার দেশ চিলিতে এই ভাষাটিতে কথা বলার আর কেউ রইলেন না। প্রাচীন এই ভাষাটির মৃত্যু হলো, শুধু বাহকের অভাবে। ২০০৩ সাল পর্যন্ত এ ভাষাটিতে কথা বলার জন্য জীবিত ছিলেন দুজন মানুষ। ক্রিস্টিনা ক্যালডেরন এবং তার বোন। ২০০৩ সালে বোনের মৃত্যুর পর ক্রিস্টিনাই ছিলেন ভাষাটির শেষ প্রতিনিধি। মুখের ভাষা হিসেবে হারিয়ে গেলেও ভাষাটি যেন বিলুপ্ত না হয়ে যায়, সেজন্য ক্রিস্টিনা ক্যালডেরন উদ্যোগী হয়ে স্প্যানিশ ভাষায় অনুবাদসহ ইয়ামানা ভাষার একটি অভিধান তৈরি করেন। ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি বিজড়িত মাসে ভাষার মৃত্যু, হারিয়ে যাওয়ার খবর সত্যিকার অর্থেই বেদনার। শুধু বিশ্বের প্রেক্ষাপটেই নয়, আমাদের দেশেও অসংখ্য ভাষা হারিয়ে যাওয়ার হুমকির মুখে। মাত্র কয়েক বছর আগে আমরা সিলেট অঞ্চলে বসবাসকারী ‘পাত্র’ সম্প্রদায়ের ‘লালং’ ভাষার হুমকির কথা জেনেছিলাম। আলাদা সংস্কৃতি ও ভাষা থাকলেও বর্ণমালা না থাকায় ভাষাটির কোনো লিখিত রূপ নেই। এছাড়া পাত্রদের জনসংখ্যা কমতে থাকা এবং সমতলের মানুষের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ গড়ে তোলায় ভাষাটিতে প্রবেশ করছে বাংলাসহ বিভিন্ন ভাষার শব্দ। আবার জনগোষ্ঠীটির অনেক সদস্যই নিজেদের ভাষায় কথা বলার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। ফলে হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে লালং ভাষা। এরকম ভাবে প্রতিদিনই হুমকির মুখে কোনো না কোনো ভাষা, এবং প্রতিনিয়তই হারিয়ে যাচ্ছে কোনো না কোনো ভাষা।

ভাষার বিবর্তন হয়। সেই বিবর্তনে কোনো কোনো ভাষা হয়তো টিকে থাকতে পারে না। আমাদের রাজধানীর পুরনো ঢাকার বাসিন্দাদের কুট্টি বা সুখবাসী ভাষাও আজ টিকে থাকার লড়াই করছে। রাজধানী হিসেবে চারশ বছরেরও বেশি পুরনো নগরী ঢাকা। তবে নগর পত্তনের আগেই ঢাকার অস্তিত্ব ছিল। ধারণা করা হয়, তখন এই জনপদের নাম ছিল পাকুড়তলি, আর জনপদটির অবস্থান ছিল বর্তমানে ঢাকার বাবুবাজার এলাকায়। পরবর্তীকালে ১৬০৮/১৬১০ সালে ঢাকা মুঘল সুবা বাংলার রাজধানী হওয়ার গৌরব অর্জন করে। এ সময় সুবেদার ইসলাম খান সুবে বাংলার রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন জাহাঙ্গীরনগর। বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ঘেঁষে যার বিস্তৃতি। তবে ইসলাম খানের আগেই মুঘল সেনাপতি মানসিংহ ঢাকায় এসেছিলেন। গবেষকদের অভিমত, তিনি রাজমহল থেকে ঢাকা হয়ে যশোর যান। তার এই যাত্রার উদ্দেশ্য ছিল বাংলার বারোভূঁইয়ার অন্যতম প্রতাপাদিত্যকে দমন  করা। মুঘল বাহিনীতে সৈনিক হিসেবে ছিলেন পাঠান, মুঘল, রাজপুতসহ নানা জনগোষ্ঠীর মানুষ। সেনাবাহিনীতে বিভিন্ন ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর সৈনিক, স্বাভাবিকভাবেই তাদের নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ গড়ে তুলতেই লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কার উদ্ভব। মুঘল সেনাবাহিনীতে লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা হিসেবে জায়গা দখল করে নেয় উর্দু। এই সৈনিকদের ভাষা ছিল উর্দু। তুর্কিভাষা থেকে আগত শব্দ উর্দু। শব্দটির অর্থ সৈন্য। মুঘল সম্রাট শাহজাহানের সেনানিবাসের নাম ছিল উর্দু-এ-মুআল্লা। সম্রাট শাহজাহান তার সেনানিবাসের নামে সৈনিকদের ভাষার নামকরণ করেন উর্দু। শাহজাহান যখন যুবরাজ, সম্রাট হননি, তখন (১৬২৪-২৫, এই দুই বছর) তিনি বাংলার শাসনকর্তা ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের অধ্যাপক ড. কানিজ-ই-বাতুল ধারণা করেন, সম্ভবত এ সময়েই আমাদের অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে উর্দু ভাষার পরিচয়।

তবে এ অঞ্চলে উর্দু ঠিক কাদের হাত ধরে এসেছেল সে বিষয়ে গবেষকরা পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। এর আগে বাংলা ভাষায় আরবি-ফারসি শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটে তুর্কি বংশোদ্ভূত মুসলিম বীর মালিক গাজি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মাদ বখতিয়ার খলজি, যিনি বখতিয়ার খলজি নামেও পরিচিত, ১২০৩ সালে তার বাংলা বিজয়ের মাধ্যমে। অধিকাংশ গবেষক স্বীকার করে নিয়েছেন যে, ১৬০৮/১৬১০ সালে ঢাকা সুবে বাংলার রাজধানী হওয়ায় মুঘলদের মাধ্যমে স্থানীয় ভাষায় উর্দুর অনুপ্রবেশ ঘটে। ঢাকা রাজধানীর মর্যাদা পাওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই নানা স্থান থেকে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ কাজের সন্ধানে এবং ব্যবসা বাণিজ্যের প্রয়োজনে ঢাকায় আসতে থাকেন। একদিকে বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের আঞ্চলিক ভাষা, অন্যদিকে রাজভাষা হিসেবে ফারসি এবং মুঘল সেনা ও প্রশাসনিক সূত্রে আসা মানুষের উর্দু ভাষার সঙ্গে মিশ্রণ ঘটতে থাকে ঢাকার স্থানীয় ভাষার। মুঘল সেনাদলের সঙ্গে স্থানীয়দের ব্যবসায়িক প্রয়োজনেই সখ্য গড়ে ওঠে। বাইরে থেকে আসা এই সেনাদলের হাতেই তখন নগদ টাকা। ফলে টাকার হাতবদলের সঙ্গে সঙ্গে ভাষাও হাতবদল হতে থাকে। উর্দুভাষী সেনাদলের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ করতে স্থানীয়রা উর্দু শব্দভান্ডার থেকে অকাতরে শব্দ গ্রহণ করতে থাকে। এতে করে স্থানীয় ভাষার বড় অংশের দখল নেয় উর্দু। তাই কুট্টি ও সুখবাস দুটি উপভাষাতেই উর্দুর প্রভাব বেশি। যদিও ভাষাবিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, দুটি ভাষাই বিশুদ্ধ উর্দু থেকে আলাদা।

ভাষাবিজ্ঞানী ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তার বাঙ্গালা ভাষাতত্ত্বের ভূমিকায় বাংলাদেশে আর্য আগমনের আগে, কোল, দ্রাবিড় ও ভোটচীনা-এই তিনটি ভাষার অস্তিত্বের কথা বলেছেন। পরবর্তীকালে, আর্য আগমনের পরে খ্রিস্টীয় নবম-দশম শতকে প্রাকৃত, অপভ্রংশ এবং অবহট্টের স্তর পেরিয়ে বাংলা ভাষাও একটি রূপ পায়।  শুরু থেকেই এ অঞ্চলের মানুষের একটি নিজস্ব ভাষা ছিল, যদিও সে ভাষার রূপ স্পষ্ট না। কিন্তু সেই রূপটির সঙ্গে মিশ্রণেই নতুন উপভাষা দুটির জন্ম। ভাষাবিজ্ঞানী জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ারসনের অমর কীর্তি ‘লিঙ্গুইস্টিক সার্ভে অব ইন্ডিয়া’ গ্রন্থটি। ৮ হাজার পৃষ্ঠার কুড়ি খণ্ডের এই বইটি প্রকাশিত ১৯০৩-২৭ সালে। শতাধিক বছর আগে প্রকাশিত ভাষাবিজ্ঞানী গ্রিয়ারসনের এই লিঙ্গুইস্টিক সার্ভে অব ইন্ডিয়ায় বাংলার ৭৩টি উপভাষার নমুনা দেওয়া হয়। এসব নমুনায় ঢাকা অঞ্চলের একটি উপভাষা থাকলেও, তা ঢাকার ছিল না। এমনকি আজকের কুট্টিভাষাও সে নমুনা জরিপে ছিল না। জরিপে অনুপস্থিত থাকলেও, কুট্টি এবং সুখবাস নামের নতুন উপভাষা দুটি গঠনের কাজ যখন সম্পন্ন হচ্ছে, তখন ষোড়শ শতাব্দী, বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ, বাংলা ভাষারও বিকাশ কাল। গত কয়েকশ বছরে ঢাকার মানুষ মুখের ভাষার কয়েকটি রূপ দেখেছে। সেগুলোর মাঝে প্রধান করা হয় তিনটি রূপকে। ভাষাবিজ্ঞানীরা বলছেন, ভাষার এই রূপ তিনটি হলো—ঢাকাই বাংলা (কুট্টি ভাষা), ঢাকাই উর্দু (সুখবাস) এবং প্রমিত বাংলা।

আজকে যাদের কুট্টি বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে, তারা ছিলেন পেশাজীবী। অন্যদিকে সুখবাসী বা সুব্বাসীরা ছিলেন নবাবদের সহবাসী। কুট্টি এবং সুখবাসীদের সম্পর্কে অধ্যাপক ড. রাজীব হুমায়ুন তার ‘পুরোনো ঢাকার বাংলা উপভাষা’ প্রবন্ধে বলেছেন, ‘কুট্টি/সুখবাসী শ্রেণিভেদ বর্তমান পুরোনো ঢাকায় নেই বললেই চলে। ...আসলে কুট্টি/সুব্বাসীদের প্রায় সকলেই ঢাকার পার্শ্ববর্তী এলাকা এবং বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত। মুগল এবং অন্য কোনো বিদেশি রক্তের মিশ্রণ ঘটেছে সামান্য। মুগল-পূর্ব বসতি স্থাপনকারীদের হয়তোবা কুট্টি বলা হতো। মুগল-উত্তর বসতি স্থাপনকারীদের মধ্যে গরীব ও শ্রমিক শ্রেণির সদস্যদেরও হয়তোবা কুট্টিভুক্ত করা হয়েছিল।

মুগল-উত্তর বাজারকেন্দ্রিক ও আভিজাত্য প্রয়াসী বসতি স্থাপনকারীগণ হয়তো নিজেদের সুখবাসী বলে দাবি করতেন। এমনও হতে পারে, কুট্টি এবং বাজাইরা দুটি শব্দই তুচ্ছার্থে ব্যবহূত পরিভাষা হিসেবে পুরোনো ঢাকায় প্রচলিত হয়। মুগল-উত্তর যুগের ধনী বাসিন্দারা তুচ্ছার্থে গরীব বাসিন্দাদের বিশেষ করে প্রাক-মুগল যুগের বাসিন্দাদের কুট্টি বলতেন। কুট্টি/সুখবাসী নির্ণয়ের মূল মাপকাঠি দারিদ্র্য। ২০০৯ সালের গোড়াতেও দেখা গেছে, গরীব ঢাকাইয়াদের চিহ্নিত করা হচ্ছে কুট্টি হিসেবে।’

কুট্টিদের কথাবার্তা বেশ রসালো। তারা কথা বলে অপভ্রংশ বাংলায়, হিন্দি-উর্দু মেশানো বাংলায়। অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান তার ‘পরিবর্তনশীল ঢাকার উপভাষা’ প্রবন্ধে বলছেন, ‘বিরাজমান সমাকৃতির সংস্কৃতিতে ধোলাই খালের ধারা যুক্ত হলো মোগল আমলে। এই খালের পূর্বদিকে ছিল শ্রমজীবী (ধানকাটা, কোঠাবাড়ি বানানো সবই) কুট্টিদের বাস, পশ্চিম দিকে গড়ে উঠল খুশনাশিনদের নব বাণিজ্যায়ন ও উত্তরভারতীয় সংস্কৃতি চর্চার আয়োজন। কুট্টিরা তাদের নাম দিলেন সুখবাসী।’

কুট্টি এবং সুখবাস এ দুটি উপভাষাভাষী গোষ্ঠীর বাস ছিল ধোলাই খালের দুপাড়ে। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম তার ‘ঢাকাই উপভাষার ঐতিহাসিক বিবর্তন’ প্রবন্ধে বলেছেন, ‘মুগল আমলে শতাধিক বছর যাবত পুরাতন ঢাকার পরিধি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ঢাকাই উপভাষার বাংলা এবং উর্দু মিশ্রিত দুইটি রূপই বিস্তার লাভ করেছিল। যে ধারা ব্রিটিশ শাসন কাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। পুরাতন ঢাকার তাঁতি বাজার, শাঁখারিবাজার, পাটুয়াটুলি, বাংলাবাজার, ফরাশগঞ্জ, গেন্ডারিয়া, লক্ষ্মীবাজার, নারিন্দা, মৈশুন্দি, মদনমোহন বসাক রোড, নবাবপুর, ওয়ারী, বনগ্রাম, হাটখোলা, টিকাটুলি, পুরানা পল্টন, সেগুনবাগিচা, কায়েতটুলি, নবাবগঞ্জ প্রভৃতি অমুসলমান অধ্যুষিত এলাকায় ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ‘ঢাকাই বাংলা’ ছিল স্থানীয় অধিবাসীদের যোগাযোগের ভাষা। অপরদিকে উর্দু মিশ্রিত ঢাকাই ভাষা ছিল ফুলবাড়িয়া, নাজিরাবাজার, বংশাল, নয়াবাজার, মাহুতটুলি, দেওয়ানবাজার, চকবাজার, বেগমবাজার, সাতরওজা, মৌলভীবাজার, মুগলটুলি, ইসলামপুর, কলতাবাজার, কসাইটুলি, উর্দু রোড, খাজে দেওয়ান, লালবাগ, নবাবগঞ্জ প্রভৃতি মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলের স্থানীয় অধিবাসীদের প্রধান ভাষা।’

ঢাকার আদিবাসী, যারা কুট্টি হিসেবে চিহ্নিত তাদের বেশিরভাগই নিম্নবিত্তের মানুষ। তাদের মূল পেশা ছিল ‘রাজ ওস্তাগারের কাজ’। এছাড়া তাদের বড় অংশই ছিলেন গাড়োয়ান, কোচোয়ান, কসাই, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। তবে তাদের ভাষায় রয়েছে তীক্ষ্নতা, রয়েছে সরলতা। ‘ঢাকাই কুট্টির চুটকি’ নামে এই বইয়ে সংগৃহীত কৌতুকগুলি পাঠের মধ্য দিয়ে আমরা সচেতনভাবেই লক্ষ করবো, এখানে যে ধারার কথাবার্তা, ভাষার তির্যকতা, রসবোধ, তার অধিকাংশই ব্যবহার করেছেন নিম্নআয়ের মানুষ। তাদের স্পষ্ট ও কৌতুকময় কথাবার্তার মধ্য দিয়ে একইসঙ্গে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এই মানুষগুলোর জীবনের সততা ও সরলতাময় দিকও।

পরবর্তীকালে ১৯০৫ সালে দ্বিতীয় দফায় ঢাকা রাজধানীর মর্যাদা পায়, সেটি লর্ড কার্জনের উদ্যোগে বঙ্গভঙ্গের সময়ে। স্থানীয় ভাষায় রাজকার্যাদেশ উপলক্ষে এ সময়ে নতুন কোনো উপাদান যুক্ত হয়নি বলেই ভাষাবিজ্ঞানীরা ধারণা করেন। তৃতীয় দফায়, ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর, তৃতীয়বারের মতো ঢাকা রাজধানী হওয়ার গৌরব অর্জন করে। এ দফায় অবিভক্ত বাংলার রাজধানী কলকাতা থেকে যারা ঢাকায় চলে আসেন, তারা বসতি স্থাপন করেন সেগুনবাগিচা, পুরানা পল্টন, ওয়ারী, গেন্ডারিয়া, আজিমপুর এলাকায়। কলকাতা থেকে ঢাকা আসার সময় তারা নিয়ে আসেন প্রমিত বাংলা। স্বাভাবিকভাবেই এ সময়ে প্রমিত বাংলার চর্চা বাড়ে। তবে খুব বেশি সময় পাওয়া যায়নি। কারণ ১৯৪৮ সাল থেকেই জটিল হয়ে উঠতে থাকে পূর্ব বাংলার ভাষা পরিস্থিতি। পাকিস্তান সরকার উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্ত জানায়, প্রতিবাদে ফেটে পড়ে ঢাকাসহ সারা বাংলার মানুষ। ভাষা আন্দোলন সংগঠিত হয় ১৯৪৮ সালে। বাংলা ভাষার দাবিতে আন্দোলনরতদের এ সময় ঢাকায় অভিবাসিত অবাঙালি মোহাজের ও উর্দুভাষী জনগোষ্ঠী হামলা চালায়। ১৯৫২ সালে শহীদদের রক্তের বিনিময়ে একুশে ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলা ভাষার মর্যাদা। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চা পায় নতুন মাত্রা। শুরু হয় অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন। যার চূড়ান্ত রূপ ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে। ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা অর্জন করি স্বাধীন মানচিত্র। ঢাকা চতুর্থবারের মতো রাজধানীর মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর, অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো ভাষাতেও স্থিতিশীলতা আসে।

সময়ের নিয়মে, আধুনিকতার সূত্র ধরে, জ্ঞান-বিজ্ঞান-উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে পৃথিবীজুড়েই পুরনো অনেক কিছু হারিয়ে যাচ্ছে। তার স্থান দখল করছে আধুনিকতা। যে ঘোড়াগাড়ি একসময় ছিল ঢাকার ঐতিহ্য, ঢাকার অলঙ্কার- কালের আবর্তে সেই ঘোড়ার গাড়ি আজ বিলীন, গাড়োয়ান আজ বিলুপ্ত পেশা। একইভাবে আজ হারিয়ে যাচ্ছে পুরোনো ঢাকার ঐতিহ্যবাহী অনেক খাবার, যান্ত্রিক জীবনের ছোঁয়ায় কমে আসছে রসিক ও কৌতুকপ্রিয় মানুষের সংখ্যাও। সংকুচিত হয়ে আসছে পুরোনো ঢাকার সরস ও উপভোগ্য কুট্টি ভাষাও। ভাষার এই সংকোচনের বিপক্ষে আমাদের দাঁড়ানো প্রয়োজন। ভাষার প্রতি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান হওয়া জরুরি। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও শহীদ দিবসের অঙ্গীকার হোক সকল ভাষা, উপভাষার প্রতি শ্রদ্ধা এবং তাদের টিকে থাকতে সহায়তার হাত বাড়ানো।

 

লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads