• রবিবার, ১৪ আগস্ট ২০২২, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৯

সম্পাদকীয়

হারাধন দাস

দেশে এমন সাদা মনের শিক্ষক প্রয়োজন

  • প্রকাশিত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২

মোহাম্মদ হাসান

 

কুমিল্লা জেলার দেবিদ্বার উপজেলার এক নিভৃত পল্লি শুভপুর গ্রাম। সত্তর দশকে এই গ্রাম নিতান্তই পশ্চাৎপদ এক গ্রামবাংলার নাম। যেখানে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত অবহেলিত জনগোষ্ঠীর বাস। বিজলী বাতির দেখা নেই। দৈনিক গ্রামীণ হাট যার প্রাণ। গ্রামের ভেতর দিয়ে বয়ে চলা সংকীর্ণ খাল-বিল-জলাশয় এসে মেলে দূরের নদীর সঙ্গে। যানবাহন কদাচ, একটি-দুটি টেনে চলা রিকশা, ঠেলাগাড়ি ইত্যাদি। শুধু গাছ-গাছালি, অবারিত সবুজ ধান আর শস্যের প্রান্তর এবং নানা জাতের পাখ-পাখালির পাখসাটে মাতোয়ারা শুভপুর গ্রাম। এই আনন্দে আত্মহারা এই গ্রাম্য শিশুদের জীবনে শিক্ষা-দূত হয়ে এলেন হারাধন দাস, নিজের জীবনেই যে বঞ্চিত; অথচ সাদা মনের মানুষ।    

হারাধন স্যার শুভপুর গ্রামের এক অনন্য নাম। তিনি এমন একজন মানুষ, সত্তর দশকের অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষক ছিলেন। তাঁর হাত দিয়ে গ্রামের অনেক ছেলে-মেয়ে আলোয় আলোকিত হয়েছেন। অনেককেই তিনি নিজের স্বপ্নকে নিজের মতো করে দেখার মনোবল তৈরি করে দিতেন। যাদের জীবনে লেখাপড়া ছিল না, কেটে গেছে অন্ধকারের হাহাকার জীবন। তাদের সেই অন্ধকারকে দূরে ঠেলে নিজের ছেলেমেয়ের মতো তাদের স্বপ্ন বুনতে অনুপ্রেরণা দিতেন। বলা যেতে পারে তিনি গ্রামের সত্তর দশকের একজন আদর্শ অভিভাবক। কেউ কেউ তাকে আদর্শ নায়ক মনে করতেন।

হারাধন স্যার গ্রামের ছেলেমেয়েদের প্রাইভেট পড়াতেন। তিনি শুভপুর গ্রামের কৃতী সন্তান। এই গ্রামের একজন শ্রেষ্ঠ নায়ক মনে হচ্ছে। আসলে তিনি একটা সিনেমার ভালো ক্যারেকটার। জীবনের অনেকটা সময় ব্যয় করেছেন শুধু গ্রামের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শেখানোর জন্য। আজ থেকে ২০-২৫ বছর আগে গ্রামে শিক্ষার হার খুবই কম ছিল। হারাধন স্যার যদিও এই গ্রামের নয়। কিন্তু তিনি অন্য গ্রামের হলেও তার হাত দিয়ে ওই সময় আমাদের গ্রামের অধিকাংশ মানুষ উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছেন। যাদের হাতেখড়ি ছিলেন তিনি। তিনি একজন প্রাইভেট টিউটর নন, তিনি দুই গ্রামের স্কুল-পড়ুয়া ছেলেমেয়েদের আদর্শ অভিভাবক।

আপনি যদি তার লেখাপড়ার কথা শোনেন, তাহলে অবাক হবেন। কীভাবে সম্ভব এতো কম লেখাপড়া করে গ্রামের ছেলেমেয়েদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার আলো দেখানো। তিনি কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ থেকে কোনো স্নাতক বা ডিগ্রি অর্জন করেননি। তিনি অষ্টম শ্রেণির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি। সত্তর দশকের সময়ে তাদের পরিবারই তেমন ভালো অবস্থানে ছিলো না। তাই নিজের লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারেননি। নিজে উচ্চশিক্ষার সুযোগ না পেরেও গ্রামের মানুষের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করার জন্য উৎসাহ দিতেন।

স্যারের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কর্মস্থল ছিল না, করতেন কৃষিকাজ। পাশাপাশি নিজের বাড়ির উঠোনে প্রাইভেট পড়াতেন। খুব ভোরে বা বিকালে মাদুর বিছিয়ে ছোট ছোট বাচ্চাদের পড়াতেন। এখনকার মতো টেবিল-চেয়ার বা বেঞ্চ ছিল না। কিন্তু প্রাইভেট পড়ুয়া ছেলেমেয়ে বেশি হওয়ায় একসময় বাড়িতে ক্লাসরুমের মতো করে বেতের বেড়া এবং টিন দিয়ে স্কুলঘর করেছিলেন। একে স্কুলঘর নয়, বলতে হবে প্রাইভেট পড়ানোর ঘর। অনেকেই ব্যঙ্গাত্মকভাবে স্যারকে বলতেন, ‘স্যার স্কুলঘর বানাইয়া লাইছেন একবারে, স্কুল খুলে ফেলুন।’ এই ঘর পরে গ্রাম্য কিস্তির ঘর হয়ে যায়। টিনের ছাপড়ার মতো, ঘরের বেড়া ছিল না। স্যারের কাছে ছেলেমেয়ে উভয়ে প্রাইভেট পড়তেন। গ্রামের ছাত্ররা শহরের ছেলেমেয়েদের তুলনায় অনেক দুষ্ট হয়। এই ছেলেমেয়েগুলো স্যারের সাথে অনেক দুষ্টুমি করতো। যখন স্যার একটু শাসন করতেন, তখন বইখাতা নিয়ে ভোঁদৌড় দিত বাড়ির দিকে। স্যার খুব শাসন করতেন। স্যার খুব উচ্চৈঃস্বরে পড়াতেন। মাঝে মাঝে বেত দিয়ে মারতেন। ব্যাঙের চেঙ্গি দিতেন। প্রাইভেট পড়ার সময় পড়া না পারলে তিনি এই কাজটা করতেন।

স্যার যেহেতু কোনো প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন না, কৃষিকাজ আর টিউশনের টাকায় সংসার চালাতেন। ছেলেমেয়েদের যখন প্রাইভেট পড়াতেন তখন কোনো টাকার পরিমাণ ধার্য ছিল না। শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা যা সম্মানি দিতেন তা-ই নিতেন। মাঝে মাঝে অনেক ছেলেমেয়েকে বিনা পয়সা পড়াতেন। স্যার মাঝে মাঝে বলতেন, ‘কোনো অসুবিধা নাই। যখন যা প্রয়োজন হবে, আমাকে বলিস, আমি চেষ্টা করবো সবকিছু জোগাড় করে দেওয়ার জন্য।’

স্যারের ব্যবহার ছিল অত্যন্ত নমনীয়। একজন শিক্ষকের যেসব গুণাবলি থাকার কথা, তিনি সবকটি গুণাবলি অত্যন্ত সুনামের সাথে ব্যবহার করেছেন। যেমন— তিনি সবসময় অন্যান্য কাজের চেয়ে বেশি সময় দিতেন ছেলেমেয়েদের; ছেলেমেয়েদের আগ্রহ তৈরি করে দিতেন লেখাপড়া করার জন্য; শিক্ষার্থীদের অভিভাবকের কাছে কোনোদিন বলতেন না আপনার ছেলেমেয়ে পড়া পারে না। তাদের লেখাপড়ার প্রতি উৎসাহ নাই। বরং বলতেন, ভালো শিখছে আপনার ছেলেমেয়ে। অভিভাবকদের হতাশ করতেন না; প্রাইভেট পড়ানোর সম্মানি বা টাকার জন্য কখনো চাপ দিতেন না; ধৈর্য সহকারে গ্রামের দুষ্ট ছেলেমেয়েদের সামলানোর ক্ষমতা বেশি ছিল; ছেলেমেয়েদের শিক্ষার মান বুঝতেন এবং সে অনুযায়ী বিশেষ ব্যবস্থা নিতেন; কখনো শিক্ষার্থীদের দুই নজরে দেখতেন না; তিনি শুধু প্রাইভেট পড়ানোর শিক্ষক ছিলেন না, একজন অভিভাবক ছিলেন; ছেলেমেয়েদের সাথে বন্ধুসুলভ আচরণ করতেন; কখনো মিথ্যা কথা বলতেন না; এবং অল্প অল্প গুছিয়ে কথা বলতেন। বয়স হওয়ায় স্যারের উচ্চারণ অস্পষ্ট ছিল। কিন্তু তবু শিক্ষার্থীদের সঠিক উচ্চারণ করিয়ে দিতেন। স্যারের এই গুণাবলি সবার কাছে প্রশংসনীয় ছিল।

দুঃখজনক হলেও সত্য, স্যারের মতো হাতেখড়ি প্রাইভেট টিউটর আজকাল খুব কম পাওয়া যায়। বর্তমানে তো প্রাইভেট টিউটররা টাকার বিনিময়ে শিক্ষাকে ব্যবসায় পরিণত করেছেন। স্যারের কখনো টাকার প্রতি নেশা ছিল না। সরল ও সাদাসিধা জীবনযাপন করেছেন সবসময়। আবার গ্রামে প্রাইভেট পড়িয়ে যে বাড়ি-গাড়ি করেছেন তেমন কিছুও হয়নি। এখন এই কথিত আধুনিকতার শিক্ষার ভিড়ে হারাধন স্যারের মতো একজন শিক্ষক দরকার। নতুবা যে নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটেছে তা আরো বৃদ্ধি ছাড়া নীতিবান মানুষ গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে সবাই পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। সবাই অর্থ ও ক্ষমতার পেশাকে পছন্দের তালিকায় রাখছেন। শিক্ষকতার মতো সম্মানিত পেশার সাথে জড়িত থাকতে পছন্দ করছেন না। আর্থসামাজিক অবস্থার কারণে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামের প্রতিভাবান শিক্ষক, যাদের আলোয় আলোকিত হয়ে দেশের সুনাম অর্জনে ভূমিকা রাখার কথা। তাদের দেওয়া বিভিন্ন কৌশল বা পদক্ষেপ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে গ্রামের ছেলেমেয়েরা। তাই স্বশিক্ষিত এমন হারাধন স্যারদের আজ সমাজে খুব বেশি প্রয়োজন।

হারাধন স্যার আমাদের মাঝে চিরদিন বেঁচে থাকবেন। তিনি আমাদের শিক্ষকদের শিক্ষক, একজন আদর্শ অভিভাবক। তার অনুপ্রেরণায় সব মানুষের মাঝে শিক্ষার আলো জেগে উঠুক। দেশে জন্ম নিক হাজারো আলোকিত মানুষ। তবেই বাংলাদেশ দুর্নীতিমুক্ত সোনার বাংলায় পরিণত হবে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads