• সোমবার, ১৭ মে ২০২১, ৪ জৈষ্ঠ ১৪২৮
আত্মকেন্দ্রিকতায় ঝুঁকছে তরুণসমাজ প্রতিরোধ জরুরি

প্রতীকী ছবি

মুক্তমত

আত্মকেন্দ্রিকতায় ঝুঁকছে তরুণসমাজ প্রতিরোধ জরুরি

  • প্রকাশিত ১৬ এপ্রিল ২০২১

আদি সমাজ ব্যবস্থা থেকেই এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে একে অপরের প্রতি ভ্রাতৃত্ববোধ ভালোবাসা ছিল অকৃত্রিম। কারো কোনো বিপদ হলে নিজের জীবন বাজি রেখে সহযোগিতায় ঝাঁপিয়ে পড়ত। একে অপরের প্রতি সহযোগিতার মনোভাব ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয়। সময়ের সাথে সাথে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হয়েছে। এত উন্নয়নের পরেও সেই আগের মতো মানুষের মানসিকতার উন্নয়ন ও প্রসার আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী হয়নি। মানুষ নিজেদের উন্নয়নে অভিরাম ছুটে চলছে। নিজের স্বার্থ ছাড়া আর কারো কোনো কিছু দেখার সময় নেই। কামিনী রায়ের সেই বিখ্যাত কবিতার বাণী—‘সকলের তরে সকলে মোরা, প্রত্যেকে মোরা পরের তরে’ যেন আজ আমাদের নতুন প্রজন্মের বোধগম্য নয়। এই বেদবাক্য যেন শুধু পুস্তকেই সীমাবদ্ধ। বাস্তবে বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের মধ্য তার কোনো প্রভাব নেই। আধুনিক সমাজের অজুহাতে তরুণ প্রজন্মকে আত্মকেন্দ্রিক করে গড়ে তোলা হচ্ছে।

একজন মানুষ আত্মকেন্দ্রিক হয়ে বেড়ে ওঠার সবচেয়ে বড় কারণ পরিবার, সমাজ ও আমাদের পুঁজিবাদী রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। গ্রাম অঞ্চলে একটি প্রচলিত কথা আছে-‘নিজে বাঁচলে বাপের নাম’ শিশুকাল থেকে আত্মকেন্দ্রিক হয়ে বেড়ে ওঠার জন্য এই বাক্যটি যথেষ্ট। ছোটবেলায় আমাদের সন্তানকে যা শেখাব সেই প্রভাব তার মৃত্যু পর্যন্ত বিদ্যামান থাকবে। পৃথিবীতে অনেক কম মানুষ আছে যারা তাদের শৈশবে মন ও মস্তিষ্কে অঙ্কিত স্বভাব থেকে বের হয়ে আসতে পারে। পরিবারের সাথে পরিবেশ মানুষকে আত্মকেন্দ্রিক করে গড়ে তুলছে। সমাজে বর্তমান অধিকাংশ মানুষ ‘একলা চলো’ নীতিতে বিশ্বাস করে। একটি বিষয়, আমাদের সমাজে ভালো মানুষগুলো একলা চলতে পছন্দ করে। অথচ সমাজের খারাপ চরিত্রের মানুষগুলো একজোট হয়ে বসবাস করে। কিন্তু ভালো মানুষগুলো মনে করে আমি ভালো তো জগৎ ভালো, এই নীতিতে চলে। খারাপ মানুষগুলোর যেমন একতা আছে ঠিক তেমনি সমাজের ভালো মানুষগুলো যদি একত্রে চলত তাহলে সমাজের চিত্র অনেকটাই ভিন্ন হতো।

গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় পুঁজিবাদী অর্থনীতির প্রভাবে মানুষ আত্মকেন্দ্রিকতায় ঝুঁকছে। এই অর্থনীতির প্রভাবে দেশের জণগণকে এমনভাবে জীবিকা নির্বাহের কাজে ব্যস্ত রাখা হচ্ছে, অন্য কারো দিকে তাকানোর মানুষের সময় নেই। শহর অঞ্চলে এমন ঘটনা লক্ষ করা যায় একই ফ্ল্যাটে থাকে অথচ কোনোদিন কথা হয়নি। এমন ঘটনা সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হয়; একই ফ্ল্যাটে কেউ হত্যা বা নির্যাতনের শিকার হলে ওপরে বা নিচতলার বাসিন্দারা জানতেই পারে না। সবাই যেন নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত সর্বদা। অপরদিকে প্রযুক্তির সুবাদে সবার হাতেই এখন স্মার্ট ফোন, কোথাও কেউ নির্যাতনের শিকার হলে বা বিপদে পড়লে বর্তমান অধিকাংশ নতুন প্রজন্ম সেই বিপদ থেকে তাকে রক্ষা করার চেয়ে ভিডিও বা ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এমন ‘মানসিক প্রতিবন্ধী’ কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই সমাজের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না। চলার পথে রাস্তাঘাটে কেউ যদি বিপদে পড়ে তা দেখে অনেকেই মনে করে, কি দরকার অন্যের ঝামেলায় নিজেকে জড়ানোর! এই চিন্তা করে ফোনে একটি ছবি অথবা ভিডিও করে নিয়ে সেই স্থান ত্যাগ করে। অথচ একটু সদিচ্ছা ও সৎ সাহসিকতা হয়তো সেই বিপদে পড়া মানুষটিকে রক্ষা করতে পারত।

নব্বই দশকের পর থেকে তরুণ প্রজন্মের অধিকার আদায়ের আন্দোলনেও তেমন অংশগ্রহণ চোখে পড়ে না। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ছাত্রছাত্রীদের এমন ব্যস্ততার মধ্য রাখে যে একাডেমিক পাঠ্য ব্যতঅত অন্য কোনো কিছু করবে তার সুযোগ থাকে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও সেমিস্টার সিস্টেম করার কারণে পড়াশোনার পাশাপাশি একজন ছাত্রছাত্রী সহশিক্ষামূলক কার্যক্রমে যুক্ত হয়ে নিজেকে আরো দক্ষ করে গড়ে তুলবে এমন সুযোগ আর হয় না। অথবা তার নিজস্ব শিক্ষাঙ্গনের কোনো যৌক্তিক দাবি বা অধিকার নিয়ে আন্দোলন সংগ্রাম করবে এমন সময় তাদের নেই। ক্লাস, পরীক্ষা, টিউটরিয়াল, ইনকোর্স, অ্যাসাইন্টমেন্ট, প্রেজেন্টেশন ইত্যাদির কারণে সব সময় তাকে ব্যস্ত রাখা হচ্ছে। ফলে সেই শিশুকাল থেকে শিক্ষা জীবন শেষ করা পর্যন্ত আত্মকেন্দ্রিকতা থেকে বের হওয়ার সুযোগ থাকে না। কর্মজীবনে গিয়েও ভাবেন ‘কীভাবে নিজেকে ভালো রাখা যায়’। শুধু নিজের স্বার্থে অন্যের অধিকারকে হনন করে হলেও সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দৌড়ে অংশগ্রহণ করে। বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা যে অচল অবস্থার চিত্র ফুটে উঠেছে তা নিশ্চয় সুখকর নয়। কিছুদিন আগে বিবিসি বাংলা দুর্বল গণতন্ত্রের লক্ষণসমূহ কী কী হতে পারে এমন একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। সেখানে দুর্বল গণতন্ত্রের বেশ কিছু লক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে। প্রথমত, প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন। গণতন্ত্রের মূল বিষয় হচ্ছে নির্বাচন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মধ্যে নির্বাচন হলো ‘গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা’। দ্বিতীয়ত, দুর্বল গণতন্ত্রে একনায়করাও নির্বাচন করবে। যেসব দেশে বেসামরিক একনায়কতন্ত্র আছে সেখানেও নিয়মিত নির্বাচন হয়। কারণ তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে শাসকগোষ্ঠী তাদের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার চেষ্টা অব্যাহত রাখে। জনগণের অধিকার নিশ্চিত হবে না। তৃতীয়ত, জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করা। গণতন্ত্রে জনগণের মতামতের প্রাধান্য একটি বড় বিষয়। একটি সরকার নির্বাচিত হলেই গণতান্ত্রিক হয় না। এর ফলে জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলে। চতুর্থত, সেইসাথে ভোটার অংশগ্রহণ কমে যাবে। পঞ্চমত, সংসদ একদলীয় হবে এবং শাসন ব্যবস্থায় নিরাপত্তা বাহিনীর প্রভাব বেড়ে যাবে। সেইসাথে  ঐ দেশের সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে যাবে। যেমন— নির্বাচন কমিশন, সংসদ, বিচার বিভাগ ইত্যাদি। দুর্বল গণতন্ত্রের অন্যতম লক্ষণ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা না দেওয়া। গণতান্ত্রিক পরিবেশ না থাকলে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে মানুষের মধ্যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়। আরো একটি বড় লক্ষণ দেশে দুর্নীতি বেড়ে যাবে। সর্বশেষ সেই দুর্বল গণতন্ত্রের দেশের শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতা হারানোর ভয় থাকবে। বিশ্বব্যাপী অনেক গণতন্ত্রিক দেশে এমন অবস্থা বিরাজমান থাকলেও তা পরিবর্তনের জন্য তেমন কোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলন চোখে পড়ে না। সবাই নিজের কাজে ব্যস্ত। দুর্বল শাসন ব্যবস্থার কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় সকল পণ্যের মূল্য ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেলেও মানুষ কোনো প্রতিবাদ করে না। পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে এমনভাবে জনগণকে জীবিকা নির্বাহের কাজে ব্যস্ত রাখা হচ্ছে যেন নিজের পেট চালোনই কষ্টকর হয়ে যায়। একজন ব্যক্তি যদি চালের দাম বৃদ্ধির কারণে কোনো দেশে আন্দোলন করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হয় তাহলে তার পরিবার কী খাবে সেই নিশ্চয়তা নেই। তাই সেই অভিভাবক কষ্ট করে হলেও পরিবারের খাবার সংগ্রহে কাজ করে। ওই আন্দোলনে আর অংশগ্রহণ করা হয় না।

আমাদের জন্য সুখবর হলো দেশের বড় একটি অংশ তরুণ। এই প্রজন্মেকে সঠিক দিকনির্দেশনার মাধ্যমে সম্পদে পরিণত করা সম্ভব। এই বিশাল তারুণ্য একটি দেশের জন্য তখনই আশীর্বাদ হয় যখন রাষ্ট্র তাদের সঠিক ব্যবহার করতে পারে। এই তারুণ্যকে যদি শুধু নিজের উন্নয়ন নয় বরং দেশ ও মানুষের জন্য কিছু করার আছে এমন বার্তা তাদের দিতে পারি তাহলে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব।

আত্মকেন্দ্রিকতা নিয়ে চলতে থাকলে কখনোই পরিবর্তন সম্ভব নয়। আমাদের তরুণ প্রজন্মকে বুঝতে হবে, যদি একটি দেশের শাসন ব্যবস্থা সুন্দর হয়, যেখানে প্রতিটি নাগরিক তার মৌলিক অধিকারসহ সব ধরনের রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ঠিকমত বুঝে পাবে তাহলে সেই অবস্থার পরিবর্তনের জন্য চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। তরুণ প্রজন্মের এমন স্বার্থপরতা মনোভাব রুখতে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রকে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম উদার ও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মনোভাব নিয়ে গড়ে উঠুক সেই প্রত্যাশা রইল।

লেখক :আব্দুর রউফ

শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads