• বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৮ আশ্বিন ১৪২৭
জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেছে

সংগৃহীত ছবি

মুক্তমত

মুক্তিযুদ্ধে সংগীত

জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেছে

  • এস এম জাহাঙ্গীর আলম সরকার পিপিএম
  • প্রকাশিত ২২ মে ২০২১

একটি জাতি হিসেবে বিকশিত হওয়র সুদীর্ঘ পথ পরিক্রমায় বাংলার আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট সাংস্কৃতিক ধারা তেমনিভাবে একটি ‘বাঙালি আত্মা/মন’ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল। আর এই ঋদ্ধ ও পূর্ণ বিকশিত ‘আত্মা’ যখন অস্তিত্বের সংকটের নিপতিত হয় তখনই তা হয়ে ওঠে বিপ্লবী এবং প্রতিবাদী। এ কারণেই আমরা দেখি যে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়কালীন গানগুলো ধর্ম বা অন্য কিছু নয় বরং ‘বাঙালি’ শব্দটিকেই তার চেতনা ও প্রেরণার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। মুক্তিযুদ্ধের গানগুলো বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখি যে, ‘বাংলা’ বা ‘বাঙালি’ শব্দটিই প্রেরণার কেন্দ্র।

প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সুধীজনেরা লোকসংগীতকে সামগ্রিক সৃষ্টি বলে মনে করে থাকেন। তবে বাংলার লোকসংগীত শুধু সমষ্টির সৃষ্টি নয় অনেকাংশে ব্যষ্টিক রচনা হিসেবেও পরিগণিত হওয়ার দাবি রাখে। এর দৃষ্টান্ত প্রাচীন চর্যাপদের গীতিকা থেকে শুরু করে সাম্প্রতিককালের অসংখ্য রীতি দিয়ে বোঝানো সম্ভব। যেমন, বাউল-মরমিয়া-দেহতত্ত্ব গানের রচয়িতার নাম-ভনিতায় এর সাক্ষ্য মেলে। উৎসভূমি সমাজ-সংস্কৃতি আর প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও ব্যক্তি থেকে সমষ্টিতে পরিণত হয়েছে এই ধারা। বলতে গেলে এই দৃষ্টান্তই ঢেউ তুলেছে বাংলা লোকসংগীতে। বাউল গান যেমন একক সৃষ্টি হলেও তৎকালীন সমাজের শুধু নয়, সর্বকালীন মানবহূদয়ের চিরন্তন আকুতি প্রকাশ পায় জগৎ ও জীবন সম্পর্কে; তার প্রকাশ সমগ্র মানবসমাজের সৃষ্টিরূপে গণ্য হতে পারে। প্রথমে ব্যক্তি এবং পরে তা মুখে মুখে সুরে সুরে প্রচারিত হয়ে সমষ্টিচেতনায় উত্তীর্ণ হয়। ব্যক্তির চাওয়া-পাওয়ার পথেই সমাজ এসেছে এবং সমাজ ব্যক্তিকেই অনুবর্তন করেছে। যেমন- ভাটিয়ালি গান। ব্যক্তি চেতনার গান- পুরোপুরি একক কণ্ঠের গান। ক্রমে তা লোকমুখে প্রচারিত হয়ে সমাজ মানসে উত্তীর্ণ হয়। সুতরাং বাংলাদেশে সেই সংস্কৃতির সূচনালগ্ন থেকেই মাটি ও মানুষের সাথে সম্পর্কিত লোকসংগীত বেশ জনপ্রিয় একটি মাধ্যম। বিশেষ করে ভাটিয়ালি, জারি-সারি, ভাওয়াইয়া এবং অন্যান্য বাউল গানের কথা বলা যেতে পারে। যেমন, পল্লীগীতি বা গ্রামীণ সংগীত সবসময়ই গ্রামবাংলার অত্যন্ত জনপ্রিয়। ভাওয়াইয়া ও পল্লীগীতির অন্যতম পুরোধা ছিলেন আব্বাস উদ্দীন আহমেদ। বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এদেশের সংগীতের বিকাশে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। তার গানের মধ্যে রয়েছে : ক্লাসিক্যাল বা ধ্রুপদী সংগীত, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, বাউল, জারি-সারি, গজল, কাওয়ালি, ভৈরবী, কীর্তন ও শ্যামাসংগীত। নজরুল বহু ইসলামী গানও রচনা করেন। আব্বাস উদ্দীন ও কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের মুসলমানদের নিকট সংগীতের গুরু হিসেবে বিশেষ সম্মানের অধিকারী। বিশেষত এসব সংগীতের মধ্য দিয়ে তাঁরা মানুষের মধ্যে জাগরণ সৃষ্টি করেন যার ধারাবাহিকতা মুক্তিযুদ্ধের সময় ব্যবহূত সংগীতগুলোতেও ছিল। তাঁদের সংগীত এদেশের মানুষকে জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে। ফলে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছিল। সংগীত বিনোদনমূলক সমাবেশের অন্যতম উপাদান হিসেবে উপভোগ্য হওয়ায় মুক্তিযুদ্ধের সময় তা উজ্জীবনী শক্তি হিসেবে কাজ করেছিল। ভাটিয়ালি, সারি ভাওয়াইয়া খুবই সুশ্রাব্য এবং জনপ্রিয় সংগীত। এর সাথে পাকিস্তানবিরোধী চেতনা যুক্ত হওয়ায় খুব সহজে তা মানুষের দৃষ্টি ও মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। এ শ্রেণির গানের আবেদন জোরালো ও উদ্দীপক হওয়ায় তা যুদ্ধক্ষেত্রে সংগীতের শক্তিমত্তার অসীমতাকেই প্রকাশ করেছে। যেখানে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক শক্তি বিপরীতধর্মী, কিংবা শত্রু শক্তি হিসেবে ক্রিয়াশীল থাকে সেখানেও সংগীতের শক্তি চূড়ান্ত সত্যের পক্ষে, মানবতার পক্ষে সমবেদনা ও সহমর্মিতা দেখাতে সক্ষয় হয়। জর্জ হ্যারিসন বা পন্ডিত রবিশংকর কর্তৃক বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে খোদ আমেরিকায় কনসার্ট করে শরণার্থীদের জন্য অর্থ ও মানবিক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে বিশ্ববাসীর দরবারে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অবস্থান তুলে ধরার প্রচেষ্টা সংগীতের বিশ্ব-শক্তিমত্তার এক অনন্য স্বাক্ষর। যুদ্ধ যখন অনিবার্যভাবে কোন জাতির মুক্তির একমাত্র বিকল্প হয়ে দাঁড়ায় তার অস্তিত্বের সংগ্রাম ও আত্মপরিচয় বিনির্মাণের অবিকল্প পটভূমি হিসেবে; আর সেই জাতি যদি হয় মেধা মননে হূষ্ট, ভাষা-সংস্কৃতির ঐতিহ্যের দীর্ঘ ইতিহাসের গৌরবান্বিত হয় তাহলে তার বাসনা পূরণের মাধ্যম কেবল সংগীত। এটি প্রেরণার উৎস হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকে না বরং তা হয়ে উঠে অস্ত্রের সমকক্ষ কখনো-বা তার চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী। কেননা একটি বুলেট মাত্র একজন শত্রুকে পরাভূত করতে পারে, সেখানে একটি গান সমগ্র জাতিকে উজ্জীবিত করতে পারে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে।

যাহোক বাঙালি জাতীয়তাবাদই ছিল মুক্তিযুদ্ধের মূল রাজনৈতিক দর্শন আর বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূল উপজীব্য হাজার বছরের বাঙালির ‘সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’। এ কারণেই সাময়িক রাজনৈতিক ভ্রান্তির দেয়াল খান খান হয়ে যায় বাঙালির সুদীর্ঘ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের দৃঢ়তায়। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতির বাস্তবতায় প্রথমবারের মত বাঙালি তার আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে শামিল হয় নিজ ‘জাতিরাষ্ট্র গঠনের’ যোদ্ধা হিসেবে বাঙালি উজ্জীবিত হয় পরাধীনতার শিকল ভাঙার জীবন মরণ পণে। বাঙালি জাতির ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা গৌরবময় এই কালপর্ব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এখানে সৃষ্টির বীজ আগেই গ্রোথিত ছিল। ভেতরে ভেতরে তা শুধু বিকশিত হওয়ার বাসনায় সুপ্ত ছিল। প্রস্তুত হয়েই ছিল স্বপ্নদ্রষ্টার ডাকে সারা দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশের অপেক্ষায়। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের সেই অনবদ্য কাব্যিক আহ্বান ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ যেন হাজার বছরের বাঙালির প্রাণের গণসাংগীতিক উচ্চারণ। আনুষ্ঠানিক এই ‘ডাক’ সাংষ্কৃতিকভাবে প্রস্তুত বাঙালি জাতিকে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করল তার আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার যুদ্ধে। বাংলা ও বাঙালির জয়গানই ছিল সে যুদ্ধের মূলমন্ত্র। তাই তো গীতিকার মাজহারুল আনোয়ার রচনা করলেন কালজয়ী গান ‘জয় বাংলা বাংলার জয়/হবে হবে নিশ্চয়ই/কোটি প্রাণ একসাথে জেগেছে অন্ধ রাতে/নতুন সূর্য উঠার এই তো সময়।’

তবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন গানগুলোকে চেতনাগতভাবে প্রধানত দুটি ধারায় ভাগ করা যায়- এক. মুক্তিযুদ্ধ পূর্বকালে বাঙালি সংস্কৃতির অসাম্প্রদায়িক জাতিসত্তা, জাতি প্রেম এবং দেশ প্রেম ও রাজনৈতিক সংগ্রাম ভিত্তিক গান। দুই. যুদ্ধকালীন সংগ্রামী ও প্রেরণাদায়ক সংগীত যেখানে রয়েছে দেশ জাতিকে রক্ষায় আত্মবলিদানে নিজেকে উৎসর্গের আহ্বান।

রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুকান্ত, ডিএল রায় প্রমুখের রচিত কবিতা ও গানগুলোও মুক্তিযুদ্ধের গান হিসেবে গীত হয়েছে। ‘চল্ চল্ চল্’, ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’ কিংবা ‘বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাটি’ আবার ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ অথবা ‘ধন্য ধান্য পুষ্পভরা’— প্রভৃতি গানগুলো মুক্তিযুদ্ধের গান হিসেবে বিবেচিত হয়। এই গানগুলো কেবল মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে রচিত তা নয় বরং আবহমান বাঙালি জাতিসত্তার মূল চেতনাকে ধারণ করে সংগীতের যে ধারাটি বহমান ছিল তা এক নতুন ব্যঞ্জনায় সময়ের প্রেক্ষাপটে নতুন উপযোগিতা নিয়ে প্রতিভাত হয়। একই সাথে ‘যুদ্ধকালীন সময়ের প্রেক্ষাপট’ সৃষ্টির নতুন প্রণোদনা হিসেবে কাজ করে। নানা সময়ে বাঙালির গানে, কাব্যে বিভিন্ন ধর্মের ছোঁয়া লাগলেও ধর্মীয় গোঁড়ামি, বিভেদ, বৈষম্য কখনোই তার সংস্কৃতিতে প্রকটরূপ ধারণ করে নাই বরং সহাবস্থান, সহমর্মিতার এক অনুপম সম্মিলন দেখা যায় বাঙালির সাহিত্যে। ব্রিটিশ শাসনের শেষ দিকে নানা রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে ‘দ্বি-জাতি তত্ত্বের’ মতো সাম্প্রদায়িক মতবাদের ভিত্তিতে পাকিস্তানি রাষ্ট্রের জন্ম হলেও তা যে বাঙালি জাতির মনন ও মানসপটের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না তা উভয় খণ্ডের সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব ও রূপ ভিন্নতার মধ্যেই প্রতিভাত হয়। সঙ্গত কারণেই অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে মাত্র ২৪ বছরের মাথায় ‘বাংলাদেশ’ রাষ্ট্রের জন্ম হয়। আর স্বভাবতই সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বিভিন্ন ধরনের সংগীতের ধারা। যা যুদ্ধজয়ে বিজয়ী করেছে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও অন্যান্য বঞ্চনার বিপরীতে বাঙালির মননে যে স্বাধীনতার মানসপট তৈরি হয়েছিল তা সংগীতের ব্যঞ্জনায় যোদ্ধাদের গতিশীল করেছে। যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেশ বিদেশে তার আলো ছড়িয়ে মাত্র নয় মাসে এনে দিয়েছে স্বাধীনতা। এখন বলতে হয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ যতটা রাজনৈতিক, যতটা অর্থনৈতিক ঠিক ততটাই সাংস্কৃতিক ভিত্তিভূমির ওপর প্রতিষ্ঠিত।

 

লেখক : পুলিশ সুপার, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads