• বৃহস্পতিবার, ২৯ জুলাই ২০২১, ১৪ শ্রাবণ ১৪২৮

মুক্তমত

চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে

  • প্রকাশিত ১৯ জুলাই ২০২১

সাদিয়া ইসলাম সম্পা

 

আগামী ২১ জুলাই পবিত্র ঈদুল আজহা। মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান উৎসব। করোনা মহামারির কারণে বিপর্যস্ত পুরো দেশ। মানুষের জীবনযাত্রার অবস্থা খুবই ভয়াবহ এবং শোচনীয়। প্রতিদিন মারা যাচ্ছে শত শত মানুষ। আক্রান্ত হচ্ছে হাজার হাজার। তবুও এ মহামারির মধ্যে উদ্যাপিত করতে হবে ঈদুল আজহা। মহামারি করোনার এই সময়ে পুরোপুরি স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঈদুল আজহা পালনে সরকার সকলকে আহ্বান জানিয়েছে। ঈদকে কেন্দ্র করে ১৫ জুলাই থেকে লকডাউন শিথিল করা হয়েছে। অনুমতি দেওয়া হয়েছে স্বাস্থ্যবিধি মেনে পশুর হাট বসার। ঈদুল আজহার সময় প্রতিবারই পশুর চামড়ার ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হন চামড়া ব্যবসায়ীরা। মহামারি করোনার এই সময়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে এবং ন্যায্য দামে চামড়া বেচাকেনার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। প্রতিবারের মতো এবারো চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে। কিন্তু প্রতি বছরই দেখা যায়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেওয়া সত্ত্বেও ন্যায্য দাম নিশ্চিত হয় না।

চামড়া বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি পণ্য হওয়া সত্ত্বেও সিন্ডিকেটের কারসাজিতে শিল্পটি বিপন্ন হতে চলেছে। তৃণমূল পর্যায়ে বিক্রেতা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের চামড়ার ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার পেছনে রয়েছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম। আর এ দুইয়ে চামড়া বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি পণ্য হওয়া সত্ত্বেও সিন্ডিকেটের কারসাজিতে শিল্পটি আজ ধ্বংসের মুখে। শুধু যে ন্যায্য দামের কারণে চামড়ার বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা না, ন্যায্য দাম না পাওয়ার পাশাপাশি রয়েছে সঠিক পরিকল্পনার অভাব। যেমন—সাভারে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণ না করে কারখানা স্থাপন করা, চামড়া কাটার পর বর্জ্য কোথায় ফেলা হবে সেটা নির্ধারণ না করা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, চাহিদামাফিক দক্ষ শ্রমিকের অভাব, লোডশেডিং, সড়ক যোগাযোগব্যবস্থায় অব্যবস্থাপনা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানির অভাব, সময়মতো গ্যাস সংযোগ না দেওয়া ইত্যাদির কারণে চামড়ার বাজারে এ শিল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

চামড়াজাত পণ্য দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি পণ্য হওয়ায় চামড়া শিল্পের সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ রয়েছে। প্রতি বছর চামড়াজাত পণ্য থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যায়। ফলে দেশের জিডিপির মাত্রা বেড়ে অর্থনৈতিক ভাবে সমৃদ্ধি অর্জন করাও সম্ভব। চামড়া শিল্পও অন্যান্য শিল্পের মতো অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারবে। কিন্তু বিগত কয়েক বছর ধরে ক্রমাগতভাবে বিপর্যয়ের ফলে এ শিল্পের ভবিষ্যৎ নষ্ট হতে চলেছে। সম্ভাবনাময় এ শিল্পের বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হলো প্রক্রিয়াকরণের অভাব। ন্যায্য দামে চামড়া ক্রয়-বিক্রয় না হওয়ার পর সেই চামড়া প্রক্রিয়াকরণেও বিভিন্ন ঘাটতি থেকে যায়। সঠিক প্রক্রিয়ার অভাবে নষ্ট হয়ে যায় অনেক চামড়া। সাধারণত কাঁচা চামড়া কিছুদিন মজুদের জন্য লবণের প্রয়োজন। কিন্তু কোরবানির এই সময়টা আসলে লবণের দাম বেড়ে যায়। ফলে পর্যাপ্ত পরিমাণ লবণ ব্যবসায়ীরা চামড়া প্রক্রিয়ার জন্য সংগ্রহ করতে পারে না। ফলে চামড়ার বাজারও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এরূপ পরিস্থিতি যদি চলতে থাকে তাহলে আর বেশিদিন বাকি নেই বিদেশে চামড়ার বাজার পুরোপুরি ধ্বংস হতে।

কাঁচামালের সহজলভ্যতার পাশাপাশি মূল্য সংযোজনের হিসেবে কোনো একটি নির্দিষ্ট খাত থেকে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি আয়ের অন্যতম উৎস চামড়া শিল্প। কিন্তু এ সত্য শুধু কাগজে কলমেই। বাস্তবতা হলো নানা ধরনের পণ্য উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন প্রতি মাসে আমদানি করছে প্রায় ৫০ লাখ বর্গফুট চামড়া। অথচ প্রতি বছর দেশে উৎপাদিত ২২ কোটি ঘনফুট চামড়ার প্রায় অর্ধেকই ব্যবহূত হচ্ছে না রপ্তানিযোগ্য পণ্য উৎপাদনে। চামড়ার আন্তর্জাতিক ক্রেতাজোট লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ এল ডব্লিউ জি’র ছাড়পত্র না থাকাই এর মূল কারণ। ট্যানারি মালিকরা বলছেন, সাভারে নতুন শিল্প নগরীই পারতো সব সংকট সমাধান করতে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন শিল্পের অনগ্রসরতার পেছনে সরকারের অর্থনৈতিক কূটনৈতিক ব্যর্থতা রয়েছে। আমরা যদি গত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যান দেখি, তাহলে দেখা যায় চামড়ার দাম কমেছে অর্ধেক। বিপরীতে চামড়া এবং চামড়াজাত পণ্যের দাম বেড়েছে কয়েকগুণ। তাহলে কাঁঁচা চামড়ার দাম কমেছে কেন সেই উত্তর মিলছে না কোথাও। নানা ধরনের রাসায়নিক পদার্থ মিশিয়ে প্রক্রিয়াজাত করা হয় চামড়া, যার বেশিরভাগই প্রস্তুত করা হয় বিদেশে রপ্তানির জন্য। তবে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর হিসেব অনুযায়ী গত কয়েক বছরে দুর্বল হয়েছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত হিসেবে বিবেচিত চামড়া শিল্প। মূল্যস্ফীতি হিসাব করলে দেখা যাবে আসলে চামড়ার দাম অনেক কমে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দাম ও চাহিদা দুটোই পড়ে যাচ্ছে। আর তার প্রভাব বাংলাদেশের বাজারে পড়ছে। এর মধ্যে দেশের চামড়া বাজারে কেনাবেচায় যে দশ হাত বদল হয় সেটা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। তাহলে আরেকটু সুবিধা পাওয়া যাবে। সরকারকে এ বিষয়ে নজরদারি বাড়াতে হবে। সাভারের মতো উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলে শিল্প নগরী গড়ে তুলতে হবে।

অন্যদিকে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার সিইটিপি নিয়ে যেসব অভিযোগ আছে, ট্যানারিগুলোর সেগুলো সমাধান করতে হবে। লোডশেডিং সমস্যা দূর করতে হবে। জেনারেটর সিস্টেম ভালো করতে হবে। তাছাড়া সাভারে ট্যানারি স্থাপন করতে বড় ধরনের ধাক্কায় পড়েছে অনেক ট্যানারি মালিকদের। এ ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে দীর্ঘ সময় লাগবে। ব্যবসা ভালো না যাওয়ায় অনেক ট্যানারি মালিকরা গতবার চামড়া কিনতে নেওয়া ঋণের অর্ধেকও শোধ করতে পারেনি। তার ভেতর রয়েছে কোভিড মহামারি। আর তাই ট্যানারি মালিকদের সক্ষমতা বাড়াতে অর্থ সহায়তার বিকল্প নেই। দেশের বাণিজ্যের স্বার্থ জিডিপির মাত্রা বাড়াতে অর্থনৈতিক ভাবে সমৃদ্ধিশালী হওয়ার জন্য অন্যান্য শিল্পের পাশাপাশি দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিযোগ্য পণ্য চামড়া শিল্পকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে। এ শিল্পের সাথে জড়িত সব প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে। চামড়ার বাজারের সাথে সংশ্লিষ্ট সব সমস্যা দূর করার জন্য নিতে হবে জরুরি পদক্ষেপ। তাহলে সুনিশ্চিত হবে চামড়ার বাজার এবং বেঁচে যাবে দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি পণ্য।

 

লেখক :  শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads