• শনিবার, ২৫ জুন ২০২২, ১১ আষাঢ় ১৪২৯

মুক্তমত

প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের স্বীকৃতি চাই

  • প্রকাশিত ৩১ ডিসেম্বর ২০২১

রাশেদুজ্জামান রাশেদ

 

মহান মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। বাঙালি ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীরা পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর কাছে দীর্ঘ ২৫ বছরের শোষণের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়েছিল। বাঙালি ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ছিল নিরস্ত্র। আর যুদ্ধটা করেছিল সশস্ত্র। একাত্তরের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) মহান নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ শোনার জন্য রেডিও’র সামনে বসে থাকতেন। খুব ভালোভাবে বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে শুনেছেন-‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এ ভাষণ শোনার পর থেকেই ভাবতে শুরু করলেন দেশ ও জাতির জন্য কিছু একটা করতে হবে। কয়েক দিন পর ২৫ মার্চ রাতে অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে পাকিস্তানিরা যুদ্ধের সূচনা করেন। পাক হানাদারবাহিনী আক্রমণ করলো ঢাকা রাজারবাগ পুলিশ লাইনসহ বিভিন্ন স্থানে। শুরু হলো হত্যা ও নির্যাতন। দেশকে স্বাধীন করতে জীবন বাজি রেখে যারা যুদ্ধ করেছিলেন তাদেরকে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান (মুক্তিযোদ্ধা) হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়। স্বাধীনতার ৫০ বছরেও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি ও সম্মান না পাওয়া একজন মুক্তিযোদ্ধার নাম মো. মহুবর রহমান। তিনি নীলফামারী জেলা ডিমলা উপজেলার ২ নং বালাপাড়া ইউনিয়নের (ভাসানী পাড়া) গ্রামের মৃত মফিজ উদ্দিন সরকারের ছেলে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে যুদ্ধে অংশ নিতে ৬ নম্বর সেক্টর কোম্পানির কমান্ডার আছির উদ্দিনের মাধ্যমে দেওয়ানগঞ্জ ক্যাম্পে প্রশিক্ষণে যান মো. মহুবর রহমান। পরে আব্দুল খালেকের মাধ্যমে ভারত ইয়ত ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ করেন তিনি। সেখান থেকে ফিরে এসে বুড়িমারী হেডকোয়ার্টার ধরলা নদীর বিশাল মাঠে সর্বশেষ প্রশিক্ষণ নিয়ে রাইফেল হাতে দেশকে হানাদারমুক্ত করার জন্য যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

বুড়িমারীতে যুদ্ধকালীন সময়ে মহুবর রহমানের তিনজন সহযোদ্ধা ছিলেন মো. আমিরুল ইসলাম, মো. আশরাফ আলী, মো. হাফিজুর রহমান। তারা তিনজনই গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু স্বাধীনতার অর্ধ শতাব্দী পর একাত্তরের টগবগে যুবক এখন বয়সের ভারে খুব একটা চলতে পারেন না। দীর্ঘদিন ধরে অনেক চেষ্টা তদবির করেও মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় তার নাম লিপিবদ্ধ হয়নি। তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তি না হওয়ায় তিনি বঞ্চিত রয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা থেকে। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দিতে পারছেন না তিনি। নিজ গ্রামের মানুষসহ উপজেলার অন্য বীর মুক্তিযোদ্ধারা মহুবর রহমানকে মুক্তিযোদ্ধা বলে ডাকলেও কাগজে-কলমে তার স্বীকৃতি মিলেনি স্বাধীনতার ৫০ বছরেও। ৬৫ বছর বয়সী মহুবর রহমান অলস সময়ে ঝাপসা চোখে এখন শুধু মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রোমন্থন করেন।

আমার ছোট বেলা থেকে বিজয় দিবস মানে উল্লাস, আনন্দের ঘনঘটা। রাতে জেগে থাকতাম রাত ১২ টায় ১ মিনিটে তোপধ্বনি শুনার জন্য। বাবা খুব ভোরে উঠে বাঁশের চাটা দিয়ে বাগান থেকে ফুল নিয়ে সুন্দর করে ফুলের মালা তৈরি করতেন। আমি বাবাকে সহযোগিতা করতাম। বিশেষ করে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে সকালের ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে বাবার সাইকেলে চড়ে হাতে ফুলের ডালা নিয়ে বাবার পার্টি অফিসে যেতাম। ফলে আমার বাল্যকাল থেকে বাবার হাত ধরে আমাদের গ্রামের বধ্যভূমিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি দিতে আবেগ-অনুভূতির জায়গায় তৈরি হয়েছে বালাপাড়া বধ্যভূমির প্রতি। বিশেষ করে এই বধ্যভূমিতে শুয়ে আছেন ১১ জন। শহীদ পরিবারের সদস্যরা আসেন তাদের প্রিয় মানুষদের স্মরণ করতে। যারা সরাসরি যুদ্ধ দেখেছেন অথবা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। তাদের কাছ থেকে সেই করুণ ইতিহাস শুনতাম। ফলে প্রতি বছর বিজয় আসলেই বাড়িতে গিয়ে বিজয় দিবস পালন করি।

আমি বধ্যভূমিতে ফুল দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ এক রাজনৈতিক নেতা রাজ্জাক ভাই অটোরিকশাতে করে মহুবর রহমানকে নিয়ে আসলেন। তিনি পরিচয় করিয়ে দিলেন তিনি একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। বালাপাড়া বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভে কয়েকটি সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে হয়। ফুল হাতে নিয়ে একা সিঁড়ি দিয়ে উঠতে পারছেন না বীর মুক্তিযোদ্ধা মহুবর রহমান। তার বাম হাত আমার কাঁধে নিয়ে শহীদের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তাকে বললাম দাদু আপনার একটা ছবি তুলতে পারি? তিনি তৎক্ষণাৎ উত্তর দিলেন না ছবি তুলতে হবে না। আমি থমকে গিয়ে ক্ষাণিকক্ষণ পরে তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, দাদু ছবি তুলতে নিষেধ করলেন কেন? তিনি বললেন আজ ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের বৈষম্য কেন? কেন একজন মুক্তিযোদ্ধাকে স্বীকৃতি পেতে ভবঘুরের মতো অফিসে অফিসে ঘুরে বেড়াতে হবে? তাঁর দুই প্রশ্ন আমার কাছে পাহাড় সমান ওজন মনে হলো। শীর্ণদেহ। মাথার চুলগুলো পেকে সাদা হয়ে গেছে। মানবমুক্তির স্বপ্ন বুকে লালন করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিজের জীবন বাজি রেখে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর কবল থেকে নিজের দেশকে রক্ষা করেছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতার ও বিজয় দিবসের ৫০তম বছরে এসে তিনি আক্ষেপ করে বললেন, এখনও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেলেন না। রাজনীতিটা অপ-রাজনীতি হয়েছে। সবকিছুই যেন আজ পণ্যে পরিণত হয়েছে।

১৭ ডিসেম্বর তাঁর বাড়িতে যাই, তিনি আমাকে বসতে বললেন আমি চেয়ারে বসে আছি। তিনি হঠাৎ তার শোবারঘর থেকে একটা কাগজ এনে হাতে দিয়ে বললেন— দেখ, আমি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হই কিনা? আমি দেখলাম তিনি গত ১৪ অক্টোবর ২০১৩ সালে ডিজি নাম্বার ১১০১০৯৫ -এর মাধ্যমে আবেদন করেন। তাঁর সবুজ মুক্তি বার্তা নাম্বার ০৩১৫০২০১৮০। তিনি যাবতীয় কাগজপত্রও জমা দিয়েছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসের সুবর্ণজয়ন্তীতেও তাঁর কোনো সুরাহা হলো না। কেন একজন মুক্তিযোদ্ধাকে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে প্রমাণ দিতে ভবঘুরের মতো ঘুরে বেড়াতে হবে? তার যে প্রমাণাদি রয়েছে, এতে তিনি একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা, এতে কোনো সন্দেহ নেই। স্বাধীনতার ৫০ বছরে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাওয়া এখন তার অধিকার।

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছে মহুবর রহমানের মতো শত শত প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। তাঁরা আজ টাকার অভাবে নিজেদের প্রমাণ করতে পারছেন না তাঁরা মুক্তিযোদ্ধা। বিভিন্ন সময় ভুয়া মুক্তিযোদ্ধারা নানা কৌশলে, রাজনৈতিক সুবিধা নিয়ে তালিকাভুক্ত হয়েছেন। কিন্তু অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত হননি। অনেকে বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান দিতে না পারা জাতির জন্য লজ্জাজনক বিষয়। ফলে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা পরাজিত হোক তা কেউ চায় না। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত হলেও তাঁরা যেন মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পান। তাদের কান্না আমরা আর দেখতে চাই না। তাই স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের স্বীকৃতি দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও কর্তব্য।

 

 লেখক : নিবন্ধকার

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads