• শনিবার, ২৫ জুন ২০২২, ১১ আষাঢ় ১৪২৯
পরিমাণগত নয়, শিক্ষার গুণগত মানের পরিবর্তন দরকার

সংগৃহীত ছবি

মুক্তমত

পরিমাণগত নয়, শিক্ষার গুণগত মানের পরিবর্তন দরকার

  • প্রকাশিত ০৫ জানুয়ারি ২০২২

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকার, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে বিভিন্ন পরীক্ষায় পাসের হার বৃদ্ধি ও অধিক জিপিএ প্রাপ্তি নিয়ে বেশ গর্ব ও স্বস্তি প্রকাশ করতে দেখা যায়। এক্ষেত্রে সরকার যদি শতভাগ পাশ বা শিক্ষার পরিবর্তে মানসম্মত ও গুণগত শিক্ষার উপর গুরুত্বারোপ করতো, তবে তা দেশ, জাতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করতো। অথচ মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে উত্তীর্ণ এসব শিক্ষার্থীদের একটি বিশাল অংশ যখন পাবলিক বিশ্বিবদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ফেল করছে, তখন স্বভাবতই শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। আমরা কি শিক্ষার্থীদের মানসম্মত ও গুণগত শিক্ষা দিতে পারছি, না-কি একটি বিশাল গলদ রেখে সামনে অগ্রসর হচ্ছি! শুধু তাই নয়, গুণগত শিক্ষা ও গবেষণার কারণে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও বৈশ্বিক মানদণ্ডে পিছিয়ে পড়ছে, যা সত্যিকারভাবে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ ও ভাবিয়ে তুলছে। অথচ শিক্ষা একটি দেশের উন্নয়নের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুষঙ্গ। যে দেশে শিক্ষার হার ও গুণগত মান যত বেশি, সেই দেশ অর্থনৈতিকভাবে তত বেশি অগ্রসর। বৈশ্বিক উন্নয়ন রূপরেখা-২০৩০ বা টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের (এসডিজি) আওতায় সে কারণেই গুণগত শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যে সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত এবং জীবনব্যাপী শিক্ষালাভের সুযোগ সৃষ্টি করার লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে বিশ্বব্যাপী।

কিন্তু আমাদের দেশে বিগত কয়েক দশকে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষায় বালক ও বালিকা উভয়েরই অংশগ্রহণের হার অভূতপূর্বভাবে বেড়েছে, শিক্ষার হারও বেড়েছে এবং একইসঙ্গে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাও বেড়েছে। আনুষ্ঠানিক শিক্ষাধারার সঙ্গে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষাধারাও প্রাথমিক শিক্ষার অগ্রগতি সাধনে এগিয়ে এসেছে। এসবের পরিপ্রেক্ষিতে বলা চলে, দেশে শিক্ষার পরিমাণগত বিকাশ অনেকখানি হয়েছে বটে, তবে গুণগত উন্নয়ন তেমন ঘটেনি। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ শিক্ষার্থীর গুণগত যোগ্যতা অর্জনের মান অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক। মাধ্যমিক শিক্ষার অবস্থাও প্রাথমিক শিক্ষার মতো। শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও হার ক্রমশ বাড়লেও শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনে বাংলাদেশ ভীষণভাবে পিছিয়ে রয়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষা ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। দেশে উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি আশাব্যঞ্জক নয়। বস্তুতপক্ষে সব স্তরের শিক্ষাতেই তাত্ত্বিক ধারা প্রাধান্য বিস্তার করছে, যা আমাদের জন্য মোটেও স্বস্তির বিষয় নয়।

গুণগত ও মানসম্মত শিক্ষাই দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করে থাকে। তদুপরি উৎপাদনশীল, সামাজিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতা সম্পন্ন দক্ষ মানবগোষ্ঠী তৈরির মাধ্যমে ন্যায়বিচার, বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা গঠন, সহযোগিতা ও সহনশীল মনোভাব তৈরির পরিবেশ নিশ্চিত করে। সুশিক্ষাই শারীরিক সুস্থতা, সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী শক্তিকে ত্বরান্বিত করে সামাজিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সক্ষম। গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করার প্রধান উপায় হচ্ছে মানসম্মত বা মেধাবী শিক্ষক নিয়োগ। শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য ভালো শিক্ষাগত যোগ্যতার অধিকারী মানসম্পন্ন শিক্ষক স্বচ্ছতার ভিত্তিতে নিয়োগ করতে হবে। সব শিক্ষকের জন্য বুনিয়াদি ও বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, কর্মরত শিক্ষকদের জন্য কর্মকালীন প্রশিক্ষণ এবং একইসঙ্গে শিক্ষকদের যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করতে অবশ্যই যথোপযুক্ত বেতনভাতা দিয়ে তাদের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা ও পেশাগত স্বাধীনতা প্রদান করতে হবে। কিন্তু ইদানীং আমাদের দেশের শিক্ষার নিচু স্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সর্বত্র শিক্ষক নিয়োগে আর্থিক লেনদেন, স্বজনপ্রীতি ও অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিয়োগ হয় বলে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে, যা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য অশনিসংকেত। এ কারণে অনেক মেধাবী যথাযথ যোগ্যতা ও মেধা থাকা সত্ত্বেও নিয়োগ লাভে ব্যর্থ হয় এবং এটা গুণগত শিক্ষার জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জ ও হুমকি।

গুণগত শিক্ষা বিষয়টি কেবল শিক্ষক, বিদ্যালয়, পুস্তক, শিক্ষার্থী বা শ্রেণিকক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বা তা কোনো পদ্ধতিগত উপাদানও নয়। কারণ গুণগত শিক্ষাকে সামগ্রিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়; যার সাথে বিদ্যালয়ের কর্মতৎপরতা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। গুণগত শিক্ষা শিক্ষার্থীদেরকে নানাবিধ নৈতিক ও আধ্যাত্মিক অন্তর্নিহিত গুণ উন্মোচনে সহায়তা করে। এটি একদিকে শিশুদের কুসংস্কার থেকে বিজ্ঞানমনস্ক ও সংস্কৃতিমনা হিসেবে গড়ে উঠতে উৎসাহিত করে, অন্যদিকে এটি শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করে, আর শিক্ষার্থীদের সঠিক দক্ষতা ও প্রান্তিক যোগ্যতা অর্জনের মধ্য দিয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জনের দিকে ধাবিত করে। শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান, জীবনদক্ষতার উন্নয়ন, দৃষ্টিভঙ্গির গুণগত পরিবর্তন এবং সামাজিকভাবে সচেতন করে তোলাসহ পরবর্তী ধাপের শিক্ষা গ্রহণের উপযোগী করে তোলা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

কর্ম ও জীবনমুখী শিক্ষা অর্জনই প্রকৃত অর্থে গুণগত শিক্ষা। জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০-এ বলা হয়েছে, দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি সাধনের জন্য শিক্ষাকে সৃজনশীল ও প্রয়োগমুখী করে তুলতে হবে। শিক্ষার্থীদেরকে শ্রমের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও আগ্রহী এবং শিক্ষার বিভিন্নস্তরে কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে বৃত্তিমূলক শিক্ষায় দক্ষতা অর্জনে সামর্থ্যবান করে তুলতে হবে। কিন্তু আমাদের দেশে যথাযথ অবকাঠামো ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ না দিয়ে সৃজনশীল শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। ফলে এটি লেজেগোবরে অবস্থা তৈরি হয়েছে এবং শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি না করে পরিমাণগত একটি কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে অনেকেই বলছেন। তাছাড়া আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেসব বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি দিচ্ছে, পরবর্তীকালে বাস্তব জীবনে তা কতটুকু কাজে লাগাতে পারছে, তা ভাববার দরকার রয়েছে। আমাদের দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ব্যবহারিক ও কর্মমুখী শিক্ষার পরিবর্তে পুঁথিগত বা তাত্ত্বিক শিক্ষায় বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে।

উচ্চশিক্ষা নেবার পর তরুণদের মধ্যে যে উচ্চ আকাঙ্ক্ষা তৈরি হচ্ছে, তা যখন তারা পূরণ করতে পারছে না, তখন তাদের মধ্যে একটি হতাশার জন্ম দিচ্ছে। দিন দিন আমাদের প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থা হতাশাগ্রস্ত তরুণ-তরুণী বৃদ্ধি করে চলেছে। ফলে এসব হতাশাগ্রস্ত জনগণ অনেক সময় বিপথে যাচ্ছে, সমাজে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। কিন্ত আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা যদি শ্রমের প্রতি শ্রদ্ধাশীল দক্ষ জনবল তৈরি করতে সক্ষম হতো, তবে আমরা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আত্মনির্ভরশীল জাতি হিসেবে গড়ে উঠতে পারতাম। সমপ্রতি শিক্ষার্থীরা কারিগরি শিক্ষায় লেখাপড়া করতে আগ্রহী হয়ে উঠছে। কৃষিকাজ, পশুপালন, মৃৎশিল্প, তাঁতশিল্প, মৎস্যশিল্প ইত্যাদি যে ছোট কাজ নয় তা শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমেই আমাদের বাচ্চাদের শেখাতে হবে। জাপানি একটি প্রবাদ রয়েছে, ‘তুমি আমাকে একটি মাছ দিলে মানে তুমি আমাকে এক বেলা মাছ খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিলে। কিন্তু তুমি আমাকে মাছ ধরার কৌশল শেখালে মানে তুমি আমাকে সারাজীবন মাছ খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিলে।’

অধিক বিনিয়োগ গুণগত শিক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান ও বিষয়। বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ হওয়া সত্ত্বেও শিক্ষা খাতে অর্থ বরাদ্দ অপর্যাপ্ত। দেশে শিক্ষা খাতে প্রকৃত বিনিয়োগ চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে মাথাপিছু বার্ষিক বিনিয়োগের পরিমাণ বাংলাদেশে ৫ ডলার, শ্রীলংকায় ১০ ডলার, ভারতে ১৪ ডলার, মালয়েশিয়াতে ১৫০ ডলার ও দক্ষিণ কোরিয়ায় ১৬০ ডলার। সার্কভুক্ত দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটে সামগ্রিক শিক্ষা খাতে বরাদ্দ মাত্র ০.৯২ শতাংশ এবং উচ্চশিক্ষা উপ-খাতে বরাদ্দ মাত্র ০.১২ শতাংশ, যা সার্কভুক্ত দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম। উল্লেখ্য শ্রীলংকা, পাকিস্তান, ভারত ও নেপালে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ মোট জিডিপির তুলনায় যথাক্রমে ৪.৫ ও ৩.৫ শতাংশ। এ কারণে বিশেষজ্ঞরা উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে বর্তমান জাতীয় বরাদ্দ ০.৯২ থেকে ক্রমান্বয়ে ২০২৬ সালের মধ্যে ২ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ৬ শতাংশে উন্নীত করা আবশ্যক বলে মনে করছেন। পাশাপাশি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ২০৩০ সালের মধ্যে অর্জনের লক্ষ্যে শিক্ষা খাতে জাতীয় বাজেটের বর্তমান বরাদ্দ ৮ থেকে ১৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করাও জরুরি। ইউনেস্কোর সুপারিশ অনুযায়ী বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ৭ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন। শিক্ষা মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রধানতম উপায় হলেও দেশে শিক্ষায় অর্থায়ন এখনো হতাশাব্যঞ্জক। ইউনেস্কো গঠিত ‘একবিংশ শতাব্দীর জন্য আন্তর্জাতিক শিক্ষা কমিশন’ তথা ইউনেস্কো গঠিত দেলরস কমিশন প্রতিবেদনে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রাপ্ত বৈদেশিক সহায়তার ২৫ শতাংশ শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে।

গুণগত শিক্ষা অর্জনে ও টেকসইকরণে কিছু সাধারণ পূর্বশর্ত পূরণ প্রয়োজন। এগুলো হচ্ছে— বৈষম্যহীন সমন্বিত শিক্ষা, আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাক্রম, মানসম্মত ও পেশার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ শিক্ষক, প্রয়োজনীয় সুযোগ দিয়ে মেধাবীদের শিক্ষকতায় এনে ধরে রাখা, সন্ত্রাসমুক্ত শিক্ষাঙ্গন, দুর্নীতি নির্মূল ও অপচয়রোধ এবং শিক্ষায় অধিক বিনিয়োগ। এসব পূর্বশর্ত পূরণের ওপর নির্ভর করে গুণগত শিক্ষার মান ও মাত্রা। মানসম্মত ও গুণগত শিক্ষা বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। এটি উন্নত বিশ্ব এবং উন্নয়নশীল বিশ্বেও শিক্ষাবিদদের মনোযোগ আকর্ষণ করে চলেছে। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো টেকসই উন্নয়নের পরিপ্রেক্ষিতে গুণগত শিক্ষার ধারণা ও গুরুত্ব বিশেষভাবে তুলে ধরেছে। এজন্য পরিমাণগত নয়, সরকার, শিক্ষক ও অভিভাবক সবার মানসম্মত ও গুণগত শিক্ষার ওপর আমাদের জোর দেওয়া উচিত।

লেখক : মো. জিল্লুর রহমান

ব্যাংকার ও মুক্তগদ্য লেখক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads