• শনিবার, ২৫ জুন ২০২২, ১১ আষাঢ় ১৪২৯

মুক্তমত

ইউক্রেন সংকট এবং একটি পর্যালোচনা

  • প্রকাশিত ৩১ জানুয়ারি ২০২২

এম আতহার নূর

 

পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি প্রান্তে ও অঞ্চলে বিভিন্ন রূপে এবং বিভিন্নভাবে আধিপত্যের করাল থাবা বিস্তৃত হচ্ছে। সূক্ষ্মভাবে দেখলে এসব প্রান্তিক ও আঞ্চলিক আধিপত্য স্বার্থের নেপথ্যে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সমস্যাগুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর সমস্যাগুলো ঘিরে পৃথিবীতে তৈরি হয়ে আসছে যুগে যুগে নানা সংকট। বিশ্বে সংকট থাকবে তা নিয়ে আলাপ-আলোচনা হবে এবং তার সমাধান হবে এটাই বিশ্বরাজনীতির ধর্ম। তাই বৈশ্বিক রাজনৈতিক কাঠামো সবসময়ই পরিবর্তনশীল। ইউক্রেন সংকট নিয়ে বিশ্ব আলোচনার টেবিলে ফের ঝড় উঠেছে। ইতোমধ্যে ইউক্রেন সীমান্তে রাশিয়া প্রায় ১ লাখ সৈন্যের জমায়েত করেছে। ২০১৪ সালের ক্রিমিয়ার মতোই রাশিয়া আবারো যেন হানা দিতে যাচ্ছে। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া ইউক্রেন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রাশিয়ার সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতমুখী অবস্থান। ইউক্রেন সীমান্তে সাড়ে আট হাজার মার্কিন সৈন্য লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। শুরু থেকেই ইউক্রেনে চলমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যে কোটি কোটি ডলারের অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহ দিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। অপরদিকে নিজের সীমান্তের সামনেই ন্যাটোর সম্ভাব্য ঘাঁটি নিয়ে শঙ্কিত ভ্লাদিমির পুতিন। তিনি বলে আসছেন, যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন এই সামরিক জোটে ইউক্রেনের যোগ দেওয়াটা হবে চূড়ান্ত সীমা অতিক্রম করা। শুরু থেকেই ইউক্রেনের প্রশ্নে যুদ্ধ এড়ানোর একমাত্র খোলা পথ ছিল কূটনৈতিক আলোচনার টেবিল। যদিও ইতোমধ্যে এ বিষয়ে ভ্লাদিমির পুতিন ও জো বাইডেনের মধ্যে দীর্ঘ বৈঠক হলেও তা ফলপ্রসূ হয়ে ওঠেনি। কিন্তু দেখা যাচ্ছে পূর্ব ইউক্রেনের সীমান্তে রাশিয়া সৈন্য সমাবেশ অব্যাহত রেখেছে। এবং সমুদ্রপথে ইউক্রেনকে বাকি বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, ইউক্রেনকে নিজেদের বলয়ে রাখতে এবং ন্যাটোতে যুক্ত হওয়া ঠেকাতে বড় প্রস্তুতিই নিয়েছে রাশিয়া। আর তাতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে পশ্চিমা বিশ্ব। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র চায় ইউক্রেনের অবাধ নির্বাচনে সরকার প্রতিষ্ঠিত হোক, যেখানে কারো হস্তক্ষেপ থাকবে না। কিন্তু এ বিষয়ে রাশিয়ার ভূমিকা সম্পূর্ণ বিপরীত। ইউক্রেনে এক লাখ সৈন্য মোতায়েন করেছে তারা, আবার ইউক্রেনকে নিজের বলে দাবি করছে; যার ফলে সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে।

সংকটের পূর্বইতিহাস ও সূত্রপাত, নবম শতক থেকে ইউক্রেনের উত্তর অংশ কিয়েভান রুশের অংশ ছিল। কিয়েভান রুশ ছিল প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব স্লাভীয় রাষ্ট্র। ১৩শ শতকে মোঙ্গল আক্রমণে এটির পতন ঘটে। এরপর বহু শতাব্দী ধরে ইউক্রেন বিভিন্ন বিদেশি শক্তির পদানত ছিল। এদের মধ্যে আছে পোল্যান্ড ও রুশ সাম্রাজ্য। ১৯১৮ সালে ইউক্রেনে একটি বলশেভিক সাম্যবাদী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯২২ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের চারটি প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের অন্যতম প্রজাতন্ত্র হিসেবে ইউক্রেন আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৯১ সালে ইউক্রেন স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং ১ ডিসেম্বর এক গণভোটে এটির প্রতি ইউক্রেনের জনগণ সমর্থন দেয়। ইউক্রেনের এই ঘোষণা সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনে একটি বড় ভূমিকা রাখে। রাজনৈতিকভাবে সমগ্র ইউক্রেনকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়। পূর্ব এবং পশ্চিম ইউক্রেন। পূর্ব ইউক্রেন সমর্থন করে রাশিয়াকে, অন্যদিকে পশ্চিম ইউক্রেন সমর্থন করে যুক্তরাষ্ট্রকে। ১৬৬৪ সালে ইউক্রেন রাশিয়ার সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। অর্থাৎ সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করে নেয় ইউক্রেন। কিন্তু ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটে এবং রাশিয়া যখন পরাশক্তি হিসেবে টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে এমন সময় ইউক্রেন রাশিয়ার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। পশ্চিমা দেশগুলোর দিকে অনুগত হয়ে ওঠে, ফলে সংকটের শুরু হয়। চলতি শতকেই ইউক্রেনে দুই দফা গণঅভ্যুত্থান ঘটেছে। ২০০৫ ও ২০১৪ সালে উভয় ক্ষেত্রেই বিক্ষোভকারীরা রাশিয়ার শ্রেষ্ঠত্ব অস্বীকার করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটো জোটে দেশের অন্তর্ভুক্তির দাবি তুলেছেন।

রাশিয়া ইউক্রেনে আগ্রাসন চালালে সেটা হবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাত। গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, এই সংকট বিজয়ে কিয়েভ ও মস্কোর কাছে হয়তো জাতীয় অস্তিত্ব ও সম্মান রক্ষার বিষয়। তাহলে চলমান এই যুদ্ধঝুঁকিতে ন্যাটো কেন নিজেদের জড়াবে? হ্যাঁ, ন্যাটো যুদ্ধে একটা কারণে জড়াতে পারে তা হলো, ইউক্রেনের এ চরম সংকটে ওয়াশিংটন ও ব্রাসেলস (ন্যাটোর সদর দপ্তর) যদি তাদের পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়, তাহলে বাকি বিশ্বের কাছে এ বার্তা পৌঁছে যাবে যে, আমেরিকার নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি ভিত্তিহীন। এছাড়া ওয়াশিংটন ইউরোপের ভূ-রাজনৈতিক ক্ষমতায় টিকে থাকতে যুদ্ধে জড়াতে পারে। নয়তো পূর্ব ইউরোপে তার পদচারণ সম্ভাবনা ধ্বংস হয়ে যাবে। অন্যদিকে পশ্চিমাদের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্কের ফাটল যত বড় হচ্ছে, ততই দেশটি চীনের ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ছে। সমীকরণ যদি এভাবেই আগায়, তাহলে এখানেই কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত? এমন অনেক প্রশ্নের উত্তরের অপেক্ষায় থাকতে হবে। হরেক সম্ভাবনাময় প্রশ্ন ঘিরে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে আজ বিশ্বপরিমণ্ডলে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে ইউরোপীয় শক্তির তুলনায় পিছিয়ে ছিল আমেরিকার সামরিক শক্তি। পরবর্তী সময়ে বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে শিল্পায়নের উদ্যোগ ও বিকাশ ঘটায় আমেরিকা। অতঃপর বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় শিল্প শক্তিধরে পরিণত হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বরাজনীতিতে একক পরাশক্তি হিসেবে অত্মপ্রকাশের মধ্য দিয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে বিশ্বরাজনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আবারো বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। বিশ্বরাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে আরেক পরাশক্তির আবির্ভাব ঘটে সোভিয়েত ইউনিয়নের। আদর্শিক-দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে পরস্পর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল কার আদর্শ উত্তম ও শক্তিশালী, সেটি প্রমাণ করতে। সমগ্র পৃথিবী তখন দুই ভাগে বিভক্ত ছিল— পুঁজিবাদ এবং সমাজতন্ত্র। স্নায়ুযুদ্ধে দুই পরাশক্তি পরোক্ষভাবে অস্ত্র প্রতিযোগিতা, স্পেস রেস, প্রক্সিযুদ্ধ এবং প্রচার-প্রচারে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছিল। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র একক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। একবিংশ শতাব্দীতে এসেও একে অপরের মুখোমুখি স্থানে অবস্থান করছে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর রাশিয়ার মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছিল। তাদের মধ্যে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ লক্ষ করা গেল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের দ্বন্দ্বে রাশিয়ার চীনকে সমর্থনের মাধ্যমে। আবার ইরানকে যখন অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করল যুক্তরাষ্ট্র, সেই তখনও রাশিয়া-ইরানের সঙ্গে আঁতাত সৃষ্টি করল।

১৯৯১ সালের ২৪ আগস্ট সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে স্বাধীনতা ঘোষণা করে ইউক্রেন। ইউক্রেনের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) দেশগুলির সীমান্ত আছে। খোদ রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনের ২ হাজার ৪১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমানা রয়েছে। রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনের গভীর সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রয়েছে। বর্তমানে ইউক্রেনের জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশকে রুশ ভাষা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০১৪ সাল থেকেই মস্কো পূর্ব ইউক্রেনকে অবৈধভাবে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করে আসছে। ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে ইউক্রেনের ক্রমবর্ধমান পদক্ষেপে রাশিয়ার তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। রাশিয়া চায় ইউক্রেন যাতে ন্যাটোতে যোগদান না করে। ইউক্রেন যদি ন্যাটোর সদস্য হয়ে যায়। স্বাভাবিকভাবেই একটি পরাশক্তি কখনোই সহ্য করবে না অন্য পরাশক্তি তাদের ঘরের কাছে দম্ভ করুক। যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীও ইউনিয়নের দেশগুলে এবং ন্যাটো মিত্রদের সমন্বয়ে গঠিত পশ্চিমা জোট এই দাবি বার বার প্রত্যাখ্যান করে আসছে। এমনিতেই ওয়াশিংটন চায় না রাশিয়া পুরো ইউক্রেনকে নিজেদের কবজায় নিক। আদর্শিক ও রাজনৈতিক কারণের সঙ্গে এ সংকটের পেছনে অর্থনৈতিক দিকও রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন চান, ২০০০ সালে চালু হওয়া মস্কো নিয়ন্ত্রিত মুক্তবাণিজ্য জোটে যোগ দিক ইউক্রেন। ইউরেশিয়ান ইকোনমিক কমিউনিটির (ইএইসি) পতাকাতলে সাবেক সোভিয়েতভুক্ত বেশ কয়েকটি দেশ মিলেছে এবং একে দেখা হচ্ছে সোভিয়েত ইউনিয়নকে আবার সক্রিয় করার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে। ৪ কোটি ৩০ লাখ জনসংখ্যার দেশ ইউক্রেন কৃষি ও শিল্প উৎপাদনে বেশ এগিয়ে। ইএইসিতে রাশিয়ার পরই শক্তিশালী সদস্য হওয়ার সক্ষমতা রয়েছে তাদের। তবে এ জোটে যোগ দিতে এখন পর্যন্ত অস্বীকার করে আসছে কিয়েভ।

অত‌এব, রাশিয়া যদি প্রতিবেশী দেশ ইউক্রেনে আক্রমণ চালায়, তবে তাদের চড়া মূল্য দিতে হবে। ইউক্রেনের সামরিক সামর্থ্য আগের তুলনায় বেশ শক্তিশালী। সে সময়ে রাশিয়া ক্রিমিয়াকে অধিভুক্ত করে নিয়েছিল মূলত রাশিয়া সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সহায়তায়। রাশিয়া যদি এখন ফের আগ্রাসন চালায়, তবে ইউক্রেনের অধিবাসীদের সঙ্গে তাদের দূরত্ব তৈরি হবে এবং বড় ধরনের জন-প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে হবে। অন্যদিকে রাশিয়ার গ্যাস ও জ্বালানি তেলে ইউরোপে সয়লাব হয়ে আছে। জার্মানিসহ ইউরোপের অধিকাংশ দেশ রাশিয়ার জ্বালানির ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। ঠিক এ কারণে ইউরোপের অনেক দেশ ‘ওয়াশিংটন প্রথম’ নীতি থেকে সরে এসেছে। ইউক্রেনের জন্য তারা সাধ্যের মধ্যে থাকা ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানির এ ভরসাকে ঝুঁকিতে ফেলবে না বলা যায়। তাই সংঘাত এড়ানোর এখনো যৌক্তিক পথ হচ্ছে কূটনীতিক আলোচনা। পরস্পর মহড়া পন্থায় সামরিক শক্তিপ্রদর্শন নয়। যদি আন্তর্জাতিক কর্মকর্তারা ইউক্রেন আঞ্চলিক সংকটে সক্রিয় সব পক্ষ ও খেলোয়াড়কে নিবিড় ও নির্মোহ সংলাপে বসিয়ে সব পক্ষের স্বার্থকে অগ্রাধিকার বিবেচনায় রেখে কার্যকর নীতি প্রণয়নে ব্যর্থ হয়, তবে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার এই সংকট মোকাবিলা অচিরে অসম্ভব হয়ে উঠবে।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

mdatharnur@gmail.com

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads