• শনিবার, ১৩ আগস্ট ২০২২, ২৯ শ্রাবণ ১৪২৯
মেধা পাচার ও মেধাবী জাতি গঠনের ভবিষ্যৎ

সংগৃহীত ছবি

মুক্তমত

মেধা পাচার ও মেধাবী জাতি গঠনের ভবিষ্যৎ

  • অলোক আচার্য
  • প্রকাশিত ১৮ জুন ২০২২

ব্রেইন ড্রেইন বা মেধা পাচার একটি দেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষতি। কারণ একটি দেশকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে মেধাবীদের ভূমিকাই প্রধান। অনেক মানুষ যে কাজটি করতে না পারে, একজন মেধাবী সেই কাজ করে সবাইকে মুক্তি দিতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বলতে পারি যে, দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে; ফলে প্রয়োজন হচ্ছে অতিরিক্ত খাদ্যের জোগান দেওয়া। এখন উৎপাদন বৃদ্ধিতে প্রয়োজন নতুন নতুন জাতের খাদ্যশস্যের উদ্ভাবন, যা একজন মেধাবী বৈজ্ঞানিক করতে পারেন। এভাবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই মেধাবী প্রয়োজন, উদ্ভাবনী শক্তির মানুষ প্রয়োজন।
আমাদের দেশেও প্রচুর মেধাবী মানুষ রয়েছে কিন্তু অনেকের মধ্যেই রয়েছে দেশত্যাগের প্রবণতা। উচ্চ শিক্ষা লাভ করতে গিয়ে সেখানেই গবেষণা এবং ভবিষ্যত আবাস গড়ে তুলছে। প্রতিটি ছাত্রছাত্রীর উচ্চ শিক্ষা লাভের স্বপ্ন থাকে। পিইসি,জেএসসি,এসএসসি শেষ করে উচ্চ মাধ্যমিক পড়তে যাওয়ার সময়ই তার চোখে থাকে আরও বড় কোন স্বপ্ন। ভবিষ্যতের সুন্দর কোন স্বপ্ন তাদের চোখের সামনে দোল খায়। সেই সাথে কোন পথে গেলে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে তার পরিকল্পনা করে। উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে ভালো কোনো চাকরি করার চেষ্টা তার ভেতর লালিত হয়। সেই উচ্চ শিক্ষা নেয়ার কাজটি যদি দেশের অভ্যন্তরেই অধিকাংশ শিক্ষার্থী করতে পারতো তাহলে তা দেশের জন্য যেমন ভালো হতো। একইরকমভাবে সেই সংশ্লিষ্ট ছাত্রছাত্রীর জন্যও ভালো হতো। দেশে উচ্চ শিক্ষা নেয়ার জন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি বহুসংখ্যক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। সরকার সেখানে বিপুল সংখ্যক বিনিয়োগ করছে। কিন্তু বিদেশে পড়ালেখা এবং গবেষণা কার্যক্রম শেষে অনেকেই আর ফিরছেন না। ফলে দেশ তাদের মেধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তারা হয়তো বিদেশে গিয়েই গবেষণার মাধ্যমে নতুন কিছু তৈরি করছেন। তারা বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হচ্ছেন। আমরাও বাঙালি হিসেবে তাদের প্রশংসা করছি। কিন্তু যদি তিনি এই কাজটিই দেশে করতে পারতেন বা করতেন তাহলে তা আরও বেশি সম্মানের হতো এবং আমাদের জন্য ভালো হতো। আর এই বিষয়টিই ব্রেইন ড্রেইন নামে পরিচিত। নিজ দেশের মেধা যখন দেশ ছেড়ে যায় সেই অবস্থাকেই বোঝানো হয়। ইউনেস্কোর তথ্যমতে, ২০১৫ সালে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৪ হাজার ১১২ জন শিক্ষার্থী বিদেশে অভিবাসন করেছে। ২০২০ সাল নাগাদ এই সংখ্যা চারগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

দেশে শীর্ষস্থানীয় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বলছে, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি ব্যাচের ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থীই বিদেশে চলে যায়। তাদের খুব কম সংখ্যকই দেশে ফিরে আসে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে গেছে, যা ২০০৯ সালের তুলনায় তিনগুণ বেশি। ২০২০ ওপেন ডোরস রিপোর্ট অন ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশনাল এক্সচেঞ্জ নামে মার্কিন পররাষ্ট্র বিভাগের শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক ব্যুরো এবং অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন আইআইএ’র যৌথভাবে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। এতে বলা হয় উচ্চ শিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষার্থী পাঠানোর ক্ষেত্রে বিশ্বের শীর্ষ ২০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭তম। তবে শিক্ষার্থী পাঠানোর বৃদ্ধির হারের দিক থেকে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে সবার থেকে এগিয়ে রয়েছে। এ থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট যে বিদেশে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণকারী শিক্ষার্থীও সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের গন্তব্যের মধ্যে রয়েছে কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, জাপানসহ আরও কয়েকটি দেশ। উচ্চশিক্ষায় বৃত্তির অফার থাকে। ২০২১ ওপেন ডোর রিপোর্ট অন ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন এক্সচেঞ্জের তথ্য বলছে, ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে আট হাজার ৫৯৮ জন বাংলাদেশিকে স্টাডি পারমিট দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মেধাবী শিক্ষিতরা উচ্চ শিক্ষা এবং গবেষণা করতে বিদেশে যাবেন এতে কোনো আপত্তি নেই বা কোনো প্রশ্নও নেই। তাদের কেউ কেউ সেখানে থেকেও যেতে পারেন এবং তার পেছনেও কিছু কারণ আছে। কিন্তু সেই সংখ্যা যদি বাড়তে থাকে তাহলে প্রশ্ন থাকে এবং প্রশ্নের সাথে আশঙ্কাও থাকে। আর তা হলো এসব মেধাবীদের এই দেশ বিনির্মাণে হাত দেওয়ার কথা ছিল এবং স্ব স্ব ক্ষেত্রে অবদান রাখার কথা ছিল যা তারা বিদেশের মাটিতে করছে।

সেখানে তারা সম্মান, অর্থ এবং নিরাপত্তা পাচ্ছে। তাহলে আমরা কি তাদের সেসব পরিবেশ দিতে ব্যর্থ যা তারা সেখানে পাচ্ছে? আবারো জোর দিয়ে বলছি যে দেশ সঠিক লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে আমাদের মেধাবী মানুষ প্রয়োজন। কেউ হাড়ভাঙা শ্রম দিয়ে দেশটাকে গড়বে আবার কেউ গবেষণা করবে আবার কেউ নতুন কিছু আবিষ্কার করবে যা আমাদের অর্থনীতির অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে। তথ্যটি যদি আমরা বিশ্লেষণ করি তাহলে আাামদের দুশ্চিন্তার কারণ আছে। কেন বিদেশে উচ্চ শিক্ষা নিতে যাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে তা নিয়ে গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। সেই সাথে সমাধান। কেউ কেউ মনে করেন, দেশে ধনী মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি এর একটি কারণ। আয় বৃদ্ধির সাথে সাথে বিদেশে সন্তানকে উচ্চ শিক্ষা দেয়ার ব্যপারে আগ্রহ সৃষ্টি হচ্ছে। সেই সাথে দেশের উচ্চ শিক্ষা দেয়া অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ফলে ধারণা জন্মাচ্ছে যে, বিদেশে গেলেই মান সম্মত উচ্চ শিক্ষা নিশ্চিত হবে। তবে ধারণাটি সর্বতোভাবে সঠিক নয়। কারণ বিদেশে ডিগ্রি নিতে যাওয়া কোনো সমস্যা নয়। সমস্যা হলো এই বিদেশে বিপুল পরিমাণ শিক্ষার্থী উচ্চ শিক্ষা শেষে দেশে এসে তার মেধা কাজে লাগাতে আগ্রহী কি না সেটা নিয়ে। তাদের জ্ঞান ও দক্ষতা দেশের জন্য খুব প্রয়োজন। এমনিতেই মেধা পাচার বলে একটি বিষয় রয়েছে যা আমাদের চিন্তার কারণ। এমন নয় যে সব মেধাই দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে তবে বিদেশে উচ্চ শিক্ষা নিতে যাওয়ার হার বৃদ্ধির সাথে সাথে মেধা পাচার হওয়ার পরিমাণটাও বেড়ে যায়। এটাই সত্যি। কোন দেশ উন্নয়নে মূল সম্পদ হলো সেই দেশের মেধাবী সন্তানরা। বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করে নতুন নতুন ধারণার উদ্ভাবন করে দেশকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করে এইসব মেধাবী সন্তানরা। তাদের ধরে রাখা তাই দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোন ধারণা প্রণয়ন ও বাস্তাবায়নের জন্য মেধার গুরুত্ব অপরিসীম। বাইরের দেশে উচ্চ শিক্ষা নেয়ার হার বাড়ার সাথে সাথে একদিকে যেমন মেধাবীরা দেশ থেকে বিদেশে গিয়ে অনেকেই নিজেকে সেখানেই গড়ে নিচ্ছে অন্যদিকে দেশের টাকাও বিদেশে চলে যাচ্ছে। এই দুই দেশের জন্য অমঙ্গলজনক। এর ফলে কোটি কোটি টাকা সেসব শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার জন্য বিদেশে যাচ্ছে। আমাদের কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে দৃষ্টি দিলে এই প্রবণতা রোধ বা কমিয়ে আনতে পারে। কারণ বাংলাদেশে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা পরিচালনার আইন থাকলেই হবে না তার বাস্তবায়ন দরকার।

বিদেশে পড়তে যাওয়ার আরও একটা কারণ হলো, যে পরিমাণ টাকা এখানে একটি ভালো মানের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খরচ করতে হয়; তার থেকে তুলনামূলকভাবে বিদেশে প্রায় একই খরচ হয়। সেক্ষেত্রে বাড়তি বলতে সেখানকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মান ও পড়ালেখা সময়কালীন চাকরি করার সুযোগও থাকে। আগেই বলেছি উচ্চ শিক্ষা নেয়া প্রতিটি শিক্ষার্থীর স্বপ্ন থাকে। একটি সুন্দর জীবন গড়ার স্বপ্ন থাকে। সেই স্বপ্ন পূরণের নিশ্চয়তায় একজন শিক্ষার্থী দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশে পাড়ি জমায়।

এখন একটি পরিকল্পনার মাধ্যমে আমাদের দেশের সম্পদ দেশে রাখার উদ্যোগ নিতে হবে। একদিনে আমরা এটা করতে পারবো না। কিন্তু দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার মান বাড়াতে হবে। তা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করতে হবে। টিউশিন ফির সাথে সাথে শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা দিতে হবে। বিদেশগামী শিক্ষার্থীদের হার পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনতে হবে। দেশের সম্পদ দেশেই রাখতে হবে। আর মেধাবীদের থেকে কোনো সম্পদই বড় সম্পদ নয়। বিদেশ থেকে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে তারা যদি তাদের জ্ঞান ও দক্ষতা দেশের কাজে লাগায় তাহলে তা দেশকে এগিয়ে নিতে জোরালো ভূমিকার রাখবে। দেশের উচ্চ শিক্ষার মান, খরচ, সুবিধা ইত্যাদি বৃদ্ধি করে উন্নত দেশের মানের সমপর্যায় করতে হবে যাতে দেশেই সবাই লেখাপড়া শেষ করে ক্যারিয়ার গঠনে আগ্রহী হয়। তাহলে দেশের মেধা বিদেশে যাবে না।

লেখক : শিক্ষক ও মুক্তগদ্য লেখক
sopnil.roy@gmail.com

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads