• সোমবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১১ আশ্বিন ১৪২৯
কোন ভ্যাকসিন কেমন?

সংগৃহীত ছবি

স্বাস্থ্য

অক্সফোর্ড, মডার্না এবং ফাইজার

কোন ভ্যাকসিন কেমন?

  • প্রকাশিত ১০ ডিসেম্বর ২০২০

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ১৭২টি দেশের ২০০-এর বেশি প্রতিষ্ঠান করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন তৈরিতে ব্যস্ত। তার মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ৫টি দেশের সরকার নয়টি প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি সাহায্য করেছে। দেশগুলো হলো- আমেরিকা, ব্রিটেন, জার্মানি, চীন এবং অস্ট্রেলিয়া। ৮০টি প্রতিষ্ঠান তাদের নিজেদের ফান্ড থেকে অর্থ জোগান দিয়ে গবেষণা করছে। এই ভ্যাকসিন প্রতিযোগিতায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আট বিলিয়নের মতো ফান্ড জোগান দিয়েছে, আমেরিকা একাই তার গবেষণার কাজে দিচ্ছে ৯ বিলিয়ন, জার্মানি ২ বিলিয়ন, ইংল্যান্ড ১ বিলিয়নের মতো। বাকি ১৬৮টি দেশের দুইশ’র বেশি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ পঞ্চাশ বিলিয়নের মতো।

২০১৯ সাল পর্যন্ত বিশ্ব ভ্যাকসিন মার্কেট ছিল ৬০ বিলিয়ন ডলারের। আগামী দুই থেকে তিন বছরে এর পরিমাণ গিয়ে দাঁড়াবে ৯ ট্রিলিয়ন ডলারের! কিন্তু এই মুহূর্তে মাত্র তিনটি ভ্যাকসিন সবার মুখে মুখে- অক্সফোর্ড, মডার্না এবং ফাইজার। আসলে ফাইজার না বলে বলা উচিত বায়োএনটেক (BionTech)।  কারণ হলো, গবেষণার মূল কাজটি করছে তিনটি মূল প্রতিষ্ঠান। ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির মেডিকেল সায়েন্স ডিপার্টমেন্টের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান- অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন গ্রুপ।

আমেরিকার ব্যক্তিমালিকানাধীন বায়োটেকনোলজি প্রতিষ্ঠান মডার্না। জার্মানির বায়োএনটেক হলো তুরস্কের বংশোদ্ভূত জার্মান মুসলিম চিকিৎসক দম্পতির ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় ২০০৮ সালে গড়ে ওঠা বায়োটেকনোলজির একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান।  এই তিনটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান মূল ভ্যাকসিনটি তৈরি করছে। কিন্তু তা উৎপাদনের মতো বিশাল কাজটি করবে বাকি তিনটি ওষুধ তৈরির কোম্পানি।  অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিনটি বাজারজাত করবে ওষুধ কোম্পানি Astra Zeneca, মডার্নার ভ্যাকসিনটি করবে আমেরিকান একটি ওষুধ কোম্পানি Lonza আর বায়োএনটেকেরটি করবে Pfizer| ওষুধ বিক্রির দিক থেকে বিশ্বে এক নাম্বার সুইজারল্যান্ডের Roche, দ্বিতীয় একই দেশের Novartis, তৃতীয় আমেরিকান Pfizer। বিভিন্ন প্রকার ওষুধ কিংবা ভ্যাকসিন তৈরির মূল কাজ ছোট এবং অচেনা প্রতিষ্ঠানগুলো করলেও আসল দাও মারে বড় বড় ওষুধ কোম্পানিগুলো।

যাহোক, আসল আলোচনায় আসি। অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিনটির নাম : ChAdOx1। এটিতে ব্যবহূত উপাদানটি adenoviral vector। শিম্পাঞ্জির দেহে সর্দি কাশি হতে Adenovirus নামের এক ধরনের ভাইরাস দায়ী। এটি দুর্বল ধরনের ভাইরাস। জেনেটিক্যালি ভাইরাসটির জেনেটিক কোড আংশিকভাবে নিয়ে একটি উপাদান তৈরি করা হয়, যাকে ভ্যাকসিন ভেক্টর বলে। তারপর তা শরীরে ঢোকালে শরীর ভাবে যে রক্তে করোনাভাইরাস ঢুকেছে। কারণ হলো করোনাভাইরাসের মধ্যে থাকা প্রোটিনগুলোর জেনেটিক কোড আর ল্যাবে বানানো এডেনো ভেক্টরের কোড একই! তখন শরীর ভুল করে করোনাভাইরাস ভেবে অ্যান্টিবডি তৈরি করে। অ্যান্টিবডির কাজ হলো করোনাভাইরাস শরীরে ঢুকলে তাকে মেরে ফেলা।

মডার্নার ভ্যাকসিনের নাম : mRNA-1273। ভ্যাকসিনটিতে কোনো ভাইরাস সরাসরি নেই। সচরাচর ভ্যাকসিন তৈরি করা হয় কোনো ভাইরাসকে দুর্বল করে অথবা তার আংশিক নিয়ে। যেমনটা অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিনে এডেনো ভাইরাস থেকে নেওয়া জেনেটিক কোড ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু মডার্নার ভ্যাকসিন প্রস্তুতির উপায়টি ভ্যাকসিন জগতে নতুন। সহজ করে বলছি ব্যাপারটি।

সজঘঅ মানে হলো মেসেঞ্জার জঘঅ। নতুন করোনাভাইরাসটি এক ধরনের RNA ভাইরাস। ভাইরাসটির দেহে RNA নামক একটি উপাদানের মধ্যে প্রোটিন তৈরির কিছু কোড লেখা থাকে। করোনাভাইরাস যখন শরীরের কোষকে আক্রমণ করে, তখন ভাইরাস থেকে RNAwU কোষের ভেতর ঢুকে যায়। এই RNA নিজে কিছু করতে পারে না। কোষের ভেতর থাকা mRNA ভাইরাসের জঘঅ-এর একটা ডুপ্লিকেট কপি নিজের ভেতর নেয়। কোষের ভেতর থাকা রাইবোজোম সেই সজঘঅ-এর ভেতর থাকা কপি কোডকে নিজের কোষের কোড ভেবে প্রোটিন তৈরি করে, সেই প্রোটিন ধীরে ধীরে নতুন ভাইরাস তৈরি করে। মডার্না নিউ টেকনোলজিতে এই কোডসহ mRNA-এর কিছু অংশ কৃত্রিমভাবে ল্যাবে তৈরি করে ভ্যাকসিনটি তৈরি করেছে। শরীরে ভ্যাকসিনটি ঢোকালে mRNA-এর ভেতর থাকা করোনাভাইরাসের স্পাইক প্রোটিন তৈরির একই কোডের মতো হওয়ার কারণে শরীর মনে করে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে এবং অ্যান্টিবডি তৈরি করে সেই ভাইরাসকে মারতে।

বায়োএনটেকের ভ্যাকসিনটির নাম : BNT162b2। এটিও মডার্নার মতো mRNA টেকনোলজি ব্যবহার করে ভ্যাকসিনটি প্রস্তুত করেছে। দুটোর কাজের পদ্ধতি একই।   তিনটি ভ্যাকসিনের মধ্যে একটি সংখ্যার লড়াই চলছে। Catch phrase-‰i gGZv Number phrase এখন চোখে পড়ানো হচ্ছে। ভ্যাকসিনের কার্যকারিতার দাবির আড়ালে সংখ্যা যুদ্ধ এখন বাজারের প্রধান গল্প।  সাধারণ মানুষ এমন সংখ্যাতে বিভ্রান্ত হয় সহজে; কিন্তু বিজ্ঞানীদের হিসাব অন্য। একটি ভ্যাকসিন ৬০% কার্যকরী হলে যে ফলাফল দেবে, ৯০% হলেও একই ফলাফল দেবে। যেমন ওষুধের ক্ষেত্রে একটা মিনিমাম ডোজ নির্ধারণ করা হয়। এটাকে বলে ঙঢ়ঃরসধষ ফড়ংব। যে ডোজে ওষুধটি তার টার্গেট ফলাফল দেবে কিন্তু মিনিমাম সাইড ইফেক্ট হবে। তাই চিকিৎসকরা যখন বলে ওষুধটি প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী খাবেন, বেশিও খাবেন না, কম খাবেন না! কম খেলে ইফেক্ট হবে না, বেশি খেলে ক্ষতি হবে। চজ প্রোপাগান্ডা অনুযায়ী মডার্নার ৯৪.৫% কার্যকরী দাবি, বায়োএনটেকের দাবি শুরুতে ৯০% থাকলেও মডার্নার পরে হিসাব সাইজ করে ৯৫% দাবি করল। অক্সফোর্ড এ ক্ষেত্রে সত্যটুকু বলার চেষ্টা করেছে। বয়সভেদে তাদের ভ্যাকসিন ৬২% থেকে ৯০% কার্যকর। এখানে ফাইজার বা বায়োএনটেক এগিয়ে। সংখ্যার যুদ্ধ বাদ দিয়ে অন্য দিকে যাই। অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন সর্বোচ্চ ৬ মাস পর্যন্ত মজুদ রাখা যায়। মডার্নার ভ্যাকসিন রাখা যায় ১ মাস পর্যন্ত। ফাইজার বা বায়োএনটেকেরটি রাখা যায় মাত্র ৫ দিন। এক্ষেত্রে অক্সফোর্ড এগিয়ে। সংরক্ষণ প্রক্রিয়ার ইনফ্রাস্ট্রাকচার অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিনের বেশি দেশগুলোর আছে। এক্ষেত্রে. বায়োএনটেক-এর কম টেকসই। অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিনটি সংরক্ষণ করতে ৩৬ থেকে ৪৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট যথেষ্ট। মডার্নারটি রাখতে দরকার হয় মাইনাস ৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট। বায়োএনটেক-এর ভ্যাকসিন রাখতে মাইনাস ৯৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট! এমন সংরক্ষণ ব্যবস্থা পৃথিবীর অনেক দেশেরই তেমন নেই। অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিনের প্রতি ডোজের দাম পড়বে ৩ থেকে ৪ ডলার মাত্র। বায়োএনটেক-এর প্রতি ডোজের মূল্য ১৯ থেকে ২১ ডলার। মডার্নার খরচ ৩২ থেকে ৩৭ ডলার। এ ক্ষেত্রে অক্সফোর্ড সাশ্রয়ী, বিশেষ করে দরিদ্র দেশগুলোর জন্য। এই মুমূর্তে অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিনটি মজুদ আছে ২০০ মিলিয়ন ডোজ, ২০২১ সালে তারা ১.৫ বিলিয়ন ডোজ সাপ্লাই দিতে সক্ষম। ফাইজারের আছে ৫০ মিলিয়ন মজুদ, আগামী বছর দিতে পারবে ৫০০ মিলিয়নের মতো। মডার্নার আছে ২০ মিলিয়নের মতো, আগামী বছর তারা ১ বিলিয়ন ডোজ তৈরিতে সক্ষম। উল্লিখিত হিসাবে ফাইজার বা বায়োএনটেক-এর ভ্যাকসিন সংখ্যার বিচারে সবচেয়ে ইফেক্টিভ হলেও সরবরাহ, সংরক্ষণ, মূল্য, সাপ্লাই মার্কেটের বিচারে সবচেয়ে পিছিয়ে। মডার্নার অবস্থান মাঝামাঝি সবকিছুতে। লড়াইটা তাই তার অক্সফোর্ডের সাথে। কার্যকরী সংখ্যায় অক্সফোর্ড বাকি দুটো থেকে পিছিয়ে থাকলেও দাম, সংরক্ষণ, সরবরাহ, ট্র্যাডিশনাল ভ্যাকসিন তৈরির পদ্ধতি, মার্কেট ডিমান্ড সবকিছুর বিচারে সবচেয়ে এগিয়ে।

সূত্র : 1. Oxford Vaccine Group, 2. Moderna. Inc, 3. BioNTech, 4. Pfizer, 5. Astrazeneca, 6. WHO

  লেখক : চিকিৎসক এবং লেখক

আরও পড়ুন

বিশ্ব

অর্থ সহায়তা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

  • আপডেট ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২২

বিশ্ব

ইরানে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৬

  • আপডেট ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২২

দুর্ঘটনা

রাজধানীতে সড়কে ঝরলো ২ প্রাণ

  • আপডেট ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২২


বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads