• শুক্রবার, ২০ মে ২০২২, ৬ জৈষ্ঠ ১৪২৯
আমাদের প্যাডম্যান

সংগৃহীত ছবি

স্বাস্থ্য

আমাদের প্যাডম্যান

  • প্রকাশিত ০৬ মে ২০২১

নাসিমুল আহসান

রুখসানা আক্তার। নারায়ণগঞ্জের জাহীন নিটওয়্যারস লিমিটেডের একজন নারীকর্মী। পিরিয়ডের সময় স্যানিটারি ন্যাপকিনের জন্য আর ভাবতে হয় না তাকে। ফার্মেসিতে গিয়ে ন্যাপকিন কেনার মতো ‘বিব্রতকর’ অবস্থাতেও পড়তে হয় না। ‘এখন মেশিনে কার্ড ছোঁয়ালেই ন্যাপকিন বেরিয়ে আসে। একসাথে এক প্যাকেটও কিনতে হয় না। মেশিনে ৫ টাকা দিলেই মিলে যায় প্যাড,’ হাসিমুখে বলতে থাকে রুখসানা।

নারায়ণগঞ্জের মদনপুরে অবস্থিত জাহীন নিটওয়্যারস লিমিটেডের কারখানায় রুখসানার মতো এমন প্রায় এক হাজার নারী পোশাকশ্রমিক সহজেই স্যানিটারি ন্যাপকিন সংগ্রহ করতে পারছেন এই মেশিন থেকে। কর্মক্ষেত্রে নারীদের স্বাচ্ছন্দ্য বাড়াতে নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ‘জ্যোতি’ নামের এই স্যানিটারি ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিনটি বসিয়েছে তরুণ প্রকৌশলী রেজওয়ান নূর আহমেদ শাব্বিনের আইওটি প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠান ভার্টিক্যাল ইনোভেশনস লিমিটেড।

পিরিয়ড বা মাসিকের মতো একটা স্বাভাবিক এবং প্রাকৃতিক বিষয় নিয়ে লজ্জা আর সংকোচের নানা গল্প চোখে পড়ে আমাদের সমাজে। অনেকেই স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনতে বিব্রত বোধ করেন। বাবা-মায়েরা সন্তানের সাথে পিরিয়ড নিয়ে অনেক সময় খোলাখুলি আলাপও করেন না। যুগের পর যুগ ধরে পিরিয়ড নিয়ে নানা কুসসংস্কার আর প্রতিবন্ধকতা বেড়ে উঠেছে সমাজের সবখানে। আর পিরিয়ড নিয়ে সামাজিক কুসংস্কার, অসচেতনতা আর কথা না বলার অচলায়তন ভাঙতে কাজ করে চলছেন এই প্রকৌশলী। দীর্ঘ ১৫ বছর দেশের শীর্ষস্থানীয় মোবাইল কোম্পানিতে চাকরি করেছেন শাব্বিন। এরপর তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্যসেবা উদ্যোগ মায়াতে কাজ করেছেন। পরে দুই কন্যাসন্তানের পিতা শাব্বিন মেয়েদের মাসিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ হন। চাকরি ছেড়ে তৈরি করেন নিজের প্রতিষ্ঠান ভার্টিক্যাল ইনোভেশন লিমিটেড। নিজের গড়া প্রতিষ্ঠানে আইওটি প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কিশোরী ও নারীরা তাদের স্কুল ও কর্মস্থলে যাতে স্যানিটারি ন্যাপকিন পেতে পারেন, সেজন্য দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে তৈরি করেছেন স্যানিটারি ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিন।

সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রামে বম, খুমি এবং মুরং আদিবাসী কিশোরীদের মাঝে ৪০০ প্যাকেট স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া ঢাকার আদাবরের রিয়াদুল মুসলিমাত শিশু শিক্ষালয়ের ১০০ কিশোরীর জন্য স্কুল ক্যাম্পাসে স্থাপন করেছেন জ্যোতি স্যানিটারি ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিন। টানা ১ বছর দিনে রাতে যখন খুশি বিনামূল্যে ন্যাপকিন সংগ্রহ করতে পারবেন শিক্ষার্থীরা। এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের এখন আর ফার্মেসিতে যেতে হয় না স্যানিটারি ন্যাপকিনের জন্য। কাউকে অনুরোধও করতে হয় না ন্যাপকিন কিনে দেওয়ার জন্য। নিজেরাই নিজেদের ন্যাপকিন সংগ্রহ করে নিতে পারেন আবাসিক এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আঙিনা থেকে।

পোশাক কারখানায় ভেন্ডিং মেশিন স্থাপন সম্পর্কে রেজওয়ান নূর বলেন, দেশের পোশাকশিল্পে প্রায় ৩.২ মিলিয়ন নারী কাজ করেন, গড়ে বছরে প্রত্যেক নারী প্রায় ৭২ দিন  মাসিকের জন্য কারখানায় আসেন না। ফলে ব্যাহত হয় কারখানার কার্যক্রম, ক্ষতি হয় দেশের অর্থনীতিতে। কিন্তু সব কারখানায় ভেন্ডিং মেশিন বসানোর পাশাপাশি প্রজনন স্বাস্থ্য সচেতনতা ও সুরক্ষার আয়োজন বাড়াতে পারলে এ দৃশ্য বদলাতে পারে বলে জানান রেজওয়ান।

ভেন্ডিং মেশিন তৈরি ও সহজে, স্বল্পমূল্যে ন্যাপকিন প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করার এই প্রচেষ্টার বিষয়ে তিনি বলেন, পিরিয়ড চলাকালীন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ পিরিয়ড প্যাড বা স্যানিটারি ন্যাপকিন এখনো সহজলভ্য নয়। দোকান বা ফার্মেসি থেকে কেনার সময় প্রায়ই বিভিন্ন অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয় আমাদের কিশোরী ও নারীদের। তিনি বলেন, সামাজিকভাবে পিরিয়ড বিষয়টি এখনো ট্যাবু হিসেবেই বিরাজ করছে, যা আমাদের কিশোরী ও নারীদের সামাজিক, শারীরিক ও মানসিক বিকাশে নানান বাধার তৈরি করে। এ কারণেই নারীদের স্কুলে কিংবা কর্মক্ষেত্রে ন্যাপকিন পৌঁছে দেওয়ার প্রচেষ্টা আমাদের। পাশাপাশি নারীকে তার প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন করা ও পিরিয়ড নিয়ে প্রচলিত কুসংস্কারগুলো ভেঙে দেওয়ার জন্য নানাভাবে কাজ করছে আমাদের প্রতিষ্ঠান।

অনলাইনে পিরিয়ড সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে নানা ধরনের কার্যক্রম হাতে নিয়েছে শাব্বিনের পিরিয়ড বিষয়ক প্ল্যাটফরম জ্যোতি (www.jyoti.com.bd)। নারীরা যাতে পিরিয়ড সম্পর্কে কথা বলতে আগ্রহী হয়, সেজন্য নিয়মিত পিরিয়ড ব্লগ লেখার প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হচ্ছে। পাশাপাশি কেবলমাত্র নারী ও কিশোরীদের নিয়ে ফেসবুক গ্রুপ ও পেজ (www.facebook.com/jyoticommunity) তৈরি করা হয়েছে। এখানে যে কেউ তার পিরিয়ড সম্পর্কিত যে-কোনো প্রশ্ন করতে পারে, পরামর্শ চাইতে পারে। জ্যোতির বিশেষজ্ঞ টিম হাজির হয় দরকারি সমাধান নিয়ে। এ ছাড়া জ্যোতি নিজেদের বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পিরিয়ড সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য ও পরামর্শ শেয়ার করছে নিয়মিত বিরতিতে, যেগুলো পিরিয়ড সম্পর্কিত সামাজিক সচেতনতা তৈরিতে ভূমিকা রাখছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ১৮ হাজার মানুষের কাছে পৌঁছুচ্ছে জ্যোতির এ প্রচেষ্টা। 

জ্যোতির মাধ্যমে পিরিয়ড নিয়ে সামাজিক সচেতনতা কার্যক্রম ও সহজে কিশোরী ও নারীদের স্যানিটারি ন্যাপকিন প্রাপ্তির বিষয়ে কাজ করে চলছেন রেজওয়ান আহমেদ নূর। জ্যোতির কার্যক্রম ও বাংলাদেশে পিরিয়ড নিয়ে নানান সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে তিনি জানান, নারীর পিরিয়ড কোনো ট্যাবু নয়, এটি একটি স্বাভাবিক স্বাস্থ্য প্রক্রিয়া। মানুষের অন্যান্য মৌলিক মানবাধিকারের মতো পিরিয়ডের সময় সঠিক স্বাস্থ্য পরামর্শ ও উপকরণ পাওয়া একজন নারীর মৌলিক অধিকার। আমরা নারীর এই অধিকার রক্ষায় কাজ করছি। জ্যোতি দেশের কিশোরী ও নারীদের মাঝে পিরিয়ড সচেতনতা ও জ্ঞান বৃদ্ধিতে কাজ করে চলছে। পাশাপাশি পিরিয়ড নিয়ে আমাদের যে সমাজে যে কুসংস্কার আছে, সেগুলো ভাঙতে কাজ করে চলছে জ্যোতি।

নারীর প্রজণন স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও পিরিয়ড নিয়ে সচেতনতা তৈরির এ কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যাবেন বলে জানান রেজওয়ান নূর। তিনি বলেন, এটা একটা বড় লড়াই। সামাজিক ট্যাবু আর কুসংস্কারকে ভাঙতে হবে আমাদের। বাবা-মা, স্কুলের শিক্ষক, প্রতিবেশী, বন্ধু থেকে শুরু করে সরকার ও গণমাধ্যম, সবারই এ কাজে এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের সন্তানদের এগিয়ে নিতে হলে এই কুসংস্কারের দেয়াল ভাঙতে হবে।

শাব্বিনের এই উদ্যোগের স্বীকৃতিও মিলেছে ইতোমধ্যে। গত বছর সরকারের তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগ থেকে জিতে নিয়েছেন কল ফর ন্যাশন শীর্ষক প্রতিযোগিতার রানারআপ পুরস্কার। সাব্বিন আরো দূর যেতে চান। পিরিয়ডবান্ধব ও মাসিক নিয়ে কুসংস্কারমুক্ত একটা সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চান। আমাদের মেয়ে শিশুরা যাতে অবাধ স্বাধীনতায় বেড়ে উঠতে পারে, পিরিয়ডের অস্বস্তি যাতে তাদের স্পর্শ করতে না পারে, সেটাই বাংলাদেশের এই ‘পিরিয়ডম্যানের’ স্বপ্ন।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads