• বুধবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৭ আশ্বিন ১৪২৮
ডিমেনশিয়া হলে কেন মানুষ স্মৃতি হারাতে শুরু করে

প্রতীকী ছবি

স্বাস্থ্য

ডিমেনশিয়া হলে কেন মানুষ স্মৃতি হারাতে শুরু করে

  • অনলাইন ডেস্ক
  • প্রকাশিত ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২১

কোভিড-১৯ মহামারি ছাড়া বর্তমান বিশ্বে যেসব বড় ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে তার একটি ডিমেনশিয়া। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বেশিরভাগ দেশ ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রস্ট হওয়ার ক্রমবর্ধমান সমস্যা মোকাবেলায় ব্যর্থ হচ্ছে।

সংস্থাটির নতুন এক রিপোর্টে বলা হয়েছে- সারা বিশ্বের মাত্র এক চতুর্থাংশ দেশের জাতীয় নীতিমালা রয়েছে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি ও তার পরিবারকে সাহায্য দেওয়ার ব্যাপারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে বর্তমানে সাড়ে পাঁচ কোটিরও বেশি মানুষ ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত এবং এই শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে মধ্যে এই সংখ্যা তিনগুন বৃদ্ধি পাবে। এই রোগটির কথা ১৯০৬ সালে প্রথম উল্লেখ করেন আলোইস আলঝেইমার নামের একজন জার্মান চিকিৎসক। স্মৃতি হারিয়ে ফেলা একজন নারীর ময়নাতদন্ত করতে গিয়ে তিনি দেখতে পান যে তার মস্তিষ্ক নাটকীয়ভাবে শুকিয়ে গেছে এবং স্নায়ুকোষগুলো ও তার আশেপাশে অস্বাভাবিক অবস্থা তৈরি হয়েছে।

সে সময় এটি খুব বিরল রোগ ছিল এবং তার পরেরও কয়েক দশকেও এনিয়ে তেমন কোনো গবেষণা হয়নি।

ডিমেনশিয়া কী

মস্তিস্কের অনেক অসুখের একটি উপসর্গ এই ডিমেনশিয়া। ‌এর স্বাভাবিক ও সাধারণ একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে স্মৃতিভ্রষ্ট হওয়া বা ভুলে যাওয়া। কেউ ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হলে তার পক্ষে অতীতের চেয়ে সাম্প্রতিক ঘটনা মনে রাখা অনেক বেশি কঠিন। বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজের নিউরো মেডিসিন বিভাগের প্রধান ও নিউরোলজিস্ট ড. সেহেলী জাহান বলেন, এটা মূলত বয়স্ক মানুষের রোগ।

"বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্মৃতির ব্যাপারে সমস্যা দেখা দেয়। সহজ করে বললে এটি হচ্ছে ভুলে যাওয়া রোগ। এর সাথে অন্যান্য সমস্যাও হয় যেমন নিজের কাজগুলো নিজে ঠিক মতো করতে না পারা। কারো হাঁটা চলারও সমস্যা হয়," বলেন তিনি।

ডিমেনশিয়ার আরো যেসব উপসর্গ আছে তার মধ্যে রয়েছে আচরণের পরিবর্তন, মেজাজ ও ব্যক্তিত্ব, পরিচিত জায়গাতেও হারিয়ে যাওয়া অথবা কারো সঙ্গে আলাপ করার সময় সঠিক শব্দটি খুঁজে না পাওয়া। এটা এমন এক পর্যায়ে গিয়েও পৌঁছাতে পারে যে তিনি খেয়েছেন কী না সেটাও তিনি মনে করতে পারেন না। চাবি কোথায় রেখেছেন, চেকে সই করেছেন কী না- এসব তারা সহজেই ভুলে যান।

এমনকি তারা কথাও গুছিয়ে বলতে পারেন না। কথা বলার সময় কোন শব্দের পর কোন শব্দ ব্যবহার করবেন কিংবা একটা বাক্যের পর পরের বাক্যে কী বলবেন সেসব তারা মেলাতে পারেন না।

ড. জাহান বলেন, ডিমেনশিয়ার নানা রকমের প্রকারভেদ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা দেয় আলঝেইমার্সজনিত ডিমেনশিয়া যা বংশগত।

আরো কিছু ডিমেনশিয়ার মধ্যে রয়েছে ভাসকুলার ডিমেনশিয়া, লিউই বডি ডিমেনশিয়া, ফ্রন্টো টেম্পোরাল ডিমেনশিয়া এবং পারকিনসন্সজনিত ডিমেনশিয়া।

কেন ভুলে যাই

মানুষ কেন ভুলে যায়- এই প্রশ্নের উত্তরে ড. সেহেলী জাহান বলেন, "মস্তিষ্কের একটি নির্দিষ্ট জায়গা, যা স্মৃতির প্রবেশপথ তাকে বলা হয় হিপ্পোক্যাম্পাস। এই এন্ট্রি পয়েন্টের উপরেই রোগটি আক্রমণ করে।"

"এর অর্থ হচ্ছে ডিমেনশিয়া হলে হিপ্পোক্যাম্পাস শুকিয়ে ছোট হয়ে যায়। যখন এটি ভাল থাকে, এটি বিভিন্ন স্মৃতি সংগ্রহ করে জায়গা মতো গুছিয়ে রাখতে পারে। কিন্তু হিপ্পোক্যাম্পাস যখন নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়ে তখন সে আর স্মৃতি গুছিয়ে রাখতে পারে না।"

তিনি বলেন, একারণে মানুষ তার নিকট অতীতের স্মৃতি হারাতে শুরু করে।

"কুড়ি বছর আগের জিনিস তার ঠিকই মনে আছে। কারণ সেগুলো গুছিয়ে রাখার মতো লোক ছিল। সেগুলো গোছানো আছে। কিন্তু এখনকার স্মৃতি গুছিয়ে রাখার লোক নেই! একারণেই তারা সাম্প্রতিক কালের স্মৃতি ভুলে যেতে শুরু করে," বলেন ড. সেহেলী জাহান।

বাংলাদেশে ডিমেনশিয়া

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে, ২০০০ সালের পর থেকে ডিমেনশিয়ার কারণে মৃত্যুর সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে গেছে। সারা বিশ্বে বর্তমানে যেসব অসুখের কারণে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে তার তালিকায় ডিমেনশিয়ার অবস্থার পাঁচ নম্বরে। এই রোগে ধনী দেশগুলোতেই সবচেয়ে বেশি মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে।

ব্রিটেনের দাতব্য প্রতিষ্ঠান আলঝেইমার্স রিসার্চ ইউকে বলছে, "আমাদের সময়ে স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ডিমেনশিয়া। এর চিকিৎসায় কিছু করতে না পারলে ডিমেনশিয়াতে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়তেই থাকবে।"

কিন্তু বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজের নিউরোলজিস্ট ড. সেহেলী জাহান বলেন, বাংলাদেশে এই অসুখটি এখনও পশ্চিমা দেশগুলোর মতো প্রকট নয়।

তিনি বলেন, "আমার হাসপাতালে আমি যত রোগী দেখি তাদের মধ্যে অন্য রোগের তুলনায় ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা খুব কম। তবে এই রোগের ব্যাপারে মানুষের মধ্যে সচেতনতাও অনেক কম। একারণে তারা রোগীদের ডাক্তারের কাছে আনে না কীনা সেটা আমি বলতে পারবো না। তবে যারা ডিমেনশিয়ার রোগী তাদের বেশিরভাগই কয়েকবার স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন," বলেন ড. সেহেলী জাহান।

"মৃগী রোগীদের মস্তিষ্ক তো একটা পর্যায়ে গিয়ে ঠিক মতো কাজ করে না। অনেক সময় দেখা যায় এই রোগীদেরকে পীর-ফকির দেখিয়ে বহু বছর পর ডাক্তারদের কাছে নিয়ে আসা হয়। তখন তেমন কিছু করারও থাকে না।"
পশ্চিমা দেশের তুলনায় বাংলাদেশে মানুষের আয়ু কম সেটাও ডিমেনশিয়া রোগী কম হওয়ার পেছনে একটা কারণ হতে পারে।

"ওদের চিকিৎসা ব্যবস্থা অনেক উন্নত। ফলে তারা সহজেই রোগ শনাক্ত করতে পারে। ওরা বেশি বছর বাঁচে তাও ঠিক। আবার এটাও তো ঠিক যে এসব সমস্যা ৫০/৬০ বছর বয়স থেকেই দেখা দিতে শুরু করে। বাংলাদেশেও তো মানুষ এখন ৬০/৭০ বছর বেঁচে থাকে।"

কেন হয় ডিমেনশিয়া

একটি কারণ- মানুষ এখন আগের তুলনায় বেশি বছর বেঁচে থাকছে। আর বয়স হলে ডিমেনশিয়াতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

বিবিসির স্বাস্থ্য ও বিজ্ঞান বিষয়ক সংবাদদাতা জেমস গ্যালাহার বলছেন, প্রাণঘাতী রোগের চিকিৎসার কারণে ডিমেনশিয়ার মতো মূল্য দিতে হচ্ছে- এটিকে এভাবেও দেখা যেতে পারে।

ড. সেহেলী জাহান বলেন, বংশগত কারণ ছাড়াও বার বার স্ট্রোকে আক্রান্ত হলে, মস্তিষ্কে সংক্রমণ ঘটলে, কিম্বা থাইরয়েডের মতো হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেলে এবং ভিটামিনের অভাবেও ডিমেনশিয়া দেখা দিতে পারে।

গবেষণায় দেখা গেছে আলঝেইমার্সের সঙ্গে এমিলয়েড বিটা প্রোটিনের ঘনিষ্ট সম্পর্ক রয়েছে। ধারণা করা হয় যে এসব প্রোটিন জমা হওয়ার কারণেই মস্তিষ্কের কোষের মৃত্যু হয়।

এ কারণে এমিলয়েড বিটা প্রোটিনকে সরিয়ে দিতে পারলে মস্তিষ্কের কোষগুলোকে রক্ষা করা সম্ভব হবে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন।

বিজ্ঞানীরা বলছেন মানুষের মস্তিষ্ক সত্যিকার অর্থেই এক বিস্ময়কর ও জটিল এক কাঠামো। ১০০ বিলিয়নেরও বেশি নিউরন দিয়ে এই মস্তিষ্ক গঠিত।

বলা হয়, এই পৃথিবীতে সবার যদি একটি করে কম্পিউটার থাকে এবং সবাই এক সঙ্গে লগ-ইন করে একই সময়ে কাজ করেন, তার পরেও সেই কাজ মস্তিষ্কের দশভাগের একভাগ কাজের সমান হবে না।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads