• বৃহস্পতিবার, ২৯ জুলাই ২০২১, ১৪ শ্রাবণ ১৪২৮
জমেছে ডিজিটাল পশুর হাট

সংগৃহীত ছবি

তথ্যপ্রযুক্তি

জমেছে ডিজিটাল পশুর হাট

  • মোহসিন কবির
  • প্রকাশিত ১৪ জুলাই ২০২১

কোরবানির পশু কিনতে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি থাকায় অনেকেই এবার যেতে চাইছেন না হাটে। পাশাপাশি অনলাইনে পশু কেনার ঝক্কি-ঝামেলাও কম। তাই মহামারির প্রকোপ বৃদ্ধিতে বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবার কোরবানির পশু কেনার ক্ষেত্রে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ডিজিটাল হাট। ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) তথ্য বলছে, এ পর্যন্ত সারা দেশে অনলাইনে প্রায় ১ লাখ ৫৭ হাজার কোরবানির পশু বিক্রি হয়েছে। এর বাইরে ফেইসবুকভিত্তিক আরো অসংখ্য হাটের মাধ্যমেও প্রতিদিন বিক্রি হচ্ছে কোরবানির পশু। যার সংখ্যাও নেহায়েত কম না। 

ই-ক্যাব-র সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াহেদ তমাল বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘ই-ক্যাবের তালিকাভুক্ত ১-শোরও অধিক অনলাইন প্রতিষ্ঠান অনলাইনে পশু বিক্রি করছে। ২৪২টি কোরবানি পশুর হাট অনলাইন প্ল্যাটফরমের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। ক্রেতা বিক্রেতার যে কোনো সমস্যার জন্য রাখা হয়েছে অভিযোগ সেন্টারও।’

সংক্রমণ এড়াতে সরকারও অনলাইনে কোরবানির পশু কেনায় ক্রেতাদের উৎসাহ দিচ্ছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল দেশব্যাপী উদ্বোধন করা হয়েছে ‘ডিজিটাল হাট’। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম ভার্চুয়ালি এ হাটের উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের পরপরই অনলাইন প্ল্যাটফরমের মাধ্যমে কোরবানির পশু কেনেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। মঙ্গলবার দুপুর ১২টা ৪২ মিনিটে ৭০ হাজার টাকায় তিনি পশুটি কিনে তা একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানকে দান করে দেন।

এদিকে, অনলাইন হাট ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হলেও অনেকে আস্থার অভাবে এখনো ডিজিটাল হাটের দিকে ঝুঁকছেন না। ক্রেতাদের আস্থা বাড়াতে এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করেছে সরকার। গত ৩০ জুন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত ডিজিটাল হাট-এর নীতিমালায় ক্রেতা যাতে ত্রুটিহীন পছন্দের কোরবানির পশুটি সময় মতো হাতে পান সেটি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

তবে ক্রেতাদের আস্থা বাড়াতে নানামুখি উদ্যোগের অংশ হিসেবে নীতিমালার পাশাপাশি চালু করা হয়েছে ‘এসক্রো সার্ভিস’। সরকারের অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রকল্প এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে পরিচালিত হবে এই সার্ভিস। এর মাধ্যমে, ক্রেতার অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে জমা থাকবে। ক্রেতাকে পশু ডেলিভারি দেওয়ার পর পুরো অর্থ ছাড় করতে পারবে অনলাইন প্রতিষ্ঠান। এছাড়া, মানুষের অনলাইনে কোরবানি পশু বিক্রি জনপ্রিয় করার বিষয়ে ই-ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘এবার লাইভ হাট করা হয়েছে। সরাসরি অনলাইনে বিভিন্ন ফার্ম এবং হাট থেকে লাইভ ভিডিওর মাধ্যমে পশু দেখে কিনতে পারবেন ক্রেতারা। ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোকে এসওপি মেনে কার্যক্রম পরিচালনার করার জন্য ডিজিটাল কমার্স নির্দেশিকা মেনে চলার জন্য তাদেরকে সনদের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ক্যাম্পেইনের আয়োজন করা হয়েছে। যাতে করে ক্রেতারা অনলাইনে কেনাকাটার ক্ষেত্রে আস্থা পায়’।  

হাট থেকে পশু কিনতে মোটা অংকের হাসিল পরিশোধ করতে হয়। যা ডিজিটাল হাটে দেওয়া লাগবে না। পশু ক্রেতার কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব বিক্রেতার। পাশাপাশি স্লটারিং সেবারও ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল, যদিও স্লটারিং সেবার জন্য ক্রেতাকে বুকিং দিতে হবে ১০ জুলাইয়ের মধ্যে।

এসবের পাশাপাশি খামারগুলোর আলাদা তালিকা রয়েছে ওয়েবসাইটে। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত নির্দেশিকায় স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, ডিজিটাল হাটে পশু বিক্রয়ের জন্য আবেদনকারীকে অবশ্যই ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন বা বাংলাদেশ ডেইরি ফার্ম এসোসিয়েশন (বিডিএফএ) অথবা জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণাধীন হাট-এর সদস্য হতে হবে। এছাড়াও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে বিক্রেতার ট্রেড লাইসেন্স এবং নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্ট। তবে এই নিয়মের কারণে গৃহস্থে পালিত পশুর মালিকরা ডিজিটাল হাটগুলোর বাইরেই থেকে যাচ্ছেন।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ৯৪ লাখ ৫০ হাজারের মতো পশু কোরবানি হয়েছে। তার মধ্যে অনলাইনে কোরবানির পশু বিক্রি হয়েছে প্রায় ৭০ হাজার। গতবারের চেয়ে এবার করোনা পরিস্থিতি খারাপ। তাই অনলাইনে কোরবানির পশু বিক্রি কয়েকগুণ বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে, অবাক করা বিষয় হলো, অনলাইনে কোরবানি পশু বিক্রির দিক থেকে ঢাকার চেয়েও এগিয়ে রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ। অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ৭ জুলাই পর্যন্ত এই বিভাগে ৫১ হাজার ৬৪৯টি গবাদিপশুর তথ্য অনলাইনে আপলোড করা হয়েছে। তার মধ্যে ১১১ কোটি টাকায় ১৫ হাজার ৭৫টি পশু কেনাবেচা হয়েছে। পশু বিক্রিতে দ্বিতীয় স্থানে ঢাকা এবং তৃতীয় স্থানে রয়েছে রাজশাহী বিভাগ।

চলতি বছর কোরবানিযোগ্য মোট গবাদিপশুর সংখ্যা ১ কোটি ১৯ লাখ। তার মধ্যে গরু-মহিষ ৪৫ লাখ ৪৭ হাজার, ছাগল-ভেড়া ৭৩ লাখ ৬৫ হাজার এবং অন্যান্য ৪ হাজার ৭৬৫টি। কোরবানিযোগ্য গবাদিপশুর মধ্যে গৃহপালিত গবাদিপশুর সংখ্যা ৫৬ লাখ ৮০ হাজার ৪৫২টি। খামারে পালন ৬২ লাখ ৩৬ হাজার। এসব কোরবানিযোগ্য পশু উৎপাদনের খামারির সংখ্যা ৬ লাখ ৯৮ হাজার।

অনলাইনে কোরবানির পশু বিক্রির কার্যক্রম কীভাবে নজরদারির বিষয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (খামার) জিনাত সুলতানা জানান, ‘খামারিরা আমাদের কাছে আসছেন অথবা খামারিদের নিজস্ব ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইটসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফরমে তারা পশুর তথ্য আপলোড করছেন। সারা দেশে আমাদের কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন। তাদের মাধ্যমে খামারির আপলোড করা পশুর সুস্থতা, ওজন, দাম নজরদারি করছি। কেউ অসুস্থ পশু বা ভুল তথ্য দিলে তা সরিয়ে দিচ্ছি।’

এদিকে, অধিকাংশ ডিজিটাল হাটেই পশুর মূল্য ‘একদাম’ হিসেবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন বিক্রেতারা। ফলে এখানে হাটের মতো দামাদামি করার সুযোগ নেই ওয়েবসাইটে। এ ছাড়াও, বেশিরভাগ পশুর ক্ষেত্রে উল্লেখ করা ওজনটি আনুমানিক। একারণে অনেকেই অনলাইন হাটের ওপর এখনো আস্থা রাখতে পারছেন না। রাজধানী বাড্ডা এলাকার বাসিন্দা আব্দুল ওদুদ বলেন,  ‘প্রথমত, হাটে গিয়ে দেখেশুনে পশু কেনার সুযোগ রয়েছে। কারণ, কোরবানিটা মূলত ধর্মীয় অনুশাসন মেনে করার বিষয়। কোনো পশুর রোগবালাই কিংবা খুঁত আছে কিনা তা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বোঝার সুযোগ নেই। দ্বিতীয়ত, অনলাইনে কেনাকাটার বিষয়টি আমাদের কাছে কিছুটা দুর্বোধ্য।’

তবে কোরবানির পশুর রোগবালাই বা অন্য কোনো ত্রুটি থাকা প্রসঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে  দেওয়া নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, ‘বিক্রেতার ডেলিভারিকৃত পশুটি যদি ত্রুটিযুক্ত হয়, যে পশু অর্ডার করা হয়েছে তার সাথে মিল না থাকে, পশুর ওজনের ক্ষেত্রে বেশি অসামঞ্জস্য (১০% এর বেশি থাকে) অথবা অন্য কোনো যৌক্তিক কারণে পশুটি ক্রেতা গ্রহণ করতে অপারগতা প্রকাশ করেন সেক্ষেত্রে বিক্রেতা তাৎক্ষণিক সম-মূল্যের/সম-ওজনের আরেকটি সমজাতীয় পশু ক্রেতাকে যথাসময়ে দিতে বাধ্য থাকবেন’।

এছাড়া, বিক্রেতা/মার্কেটপ্লেস যথাসময়ে ক্রেতার অথবা স্লটারিং হাউসে কোরবানির পশু সরবরাহ করতে ব্যর্থ হলে বিক্রেতা/মার্কেটপ্লেস পশুর সমপরিমাণ মূল্যের দ্বিগুণ অর্থ পরিশোধ দিতে বাধ্য থাকবে বলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশিকায় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

 

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads