• বৃহস্পতিবার, ২ ডিসেম্বর ২০২১, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

সাহিত্য

কবিতার সৌমিত্র

  • মামুন মুস্তাফা
  • প্রকাশিত ২৮ নভেম্বর ২০২০

‘কবিতা আমি লেখার কে? না। কবিতা আমার দ্বারা লিখিত হয়’— এমনই কবিতার মানুষ ছিলেন জনমানুষের অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। তিনি আসলে কী? চলচ্চিত্র অভিনেতা, মঞ্চের লোক, কবি, আবৃত্তিকার, সমালোচক, অনুবাদক— কোন অভিধায় তিনি অভিসিক্ত হবেন? মুখ্যত সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন একজর শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির মানুষ। তাঁর কণ্ঠ, উচ্চারণে আজো বিভোর বাঙালি। এককথায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় নিজেই নিজের তুলনা। তিনি কার্যত বাংলা ও বাঙালির জীবনে অপরিহার্য ‘যুগ পুরুষ’ হিশেবে নিজেকে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছিলেন।

বাঙালির জীবনমঞ্চ থেকে গত ১৫ নভেম্বর অকস্মাৎ বিদায় নিলেন বাঙালির শিল্প-সাহিত্যের কার্নিভাল কবি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। পশ্চিমবঙ্গের আনন্দবাজার থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর কবিতাসমগ্র। স্ত্রী দীপা চট্টোপাধ্যায়কে একসময় চিঠির বদলে কবিতা দিতেন সৌমিত্র। পুরোপুরি রোম্যান্টিক সম্পৃক্ততা যাকে বলে! কৈশোরে প্রেমে পড়েই প্রথম কবিতা লিখতে শুরু করেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। তাঁর কথায়, ‘আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহ! সেই আমিকে প্রকাশ করতে গিয়েই কবিতা। কবিতা সমগ্রের ভূমিকায় তিনি বলেন, ‘আমি কবিতা লিখতে শুরু করেছিলাম কৈশোরের নতুন জন্মানো প্রেমাকাঙ্ক্ষার আন্দোলনে...। পরবর্তীকালে অবশ্য একটু একটু করে প্রকৃতি, সমাজ, বেঁচে থাকার অপরিহার্য অভিজ্ঞতাও কবিতার মধ্যে ফুটে উঠতে শুরু হলো। কোনো বড় ভাব বা আদর্শের প্রভাবে আমার লেখা শুরু হয়নি।’ আমরা যারা তাঁর পাঠক তারাও হয়তো তাঁর কবিতায় উচ্চমার্গের দর্শন তালাশ করিনি; কিন্তু জীবনাভিজ্ঞতার নানা কারুকার্য কবিতার ঠাসবুননে উপভোগ করেছি। সৌমিত্র নিজেই বলেন, স্ত্রী দীপাকে তিনি কখনো চিঠির ফর্মে কখনো-বা সেই অনুভূতিগুলো কবিতার আকারে পড়ে শুনিয়েছেন। আর স্ত্রী দীপা বরাবরই তার কবিতার বড় শ্রোতা ছিলেন। এ জন্যেই বোধকরি বাংলা সাহিত্য কবি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে অস্বীকার করতে পারেনি।

সৌমিত্রকে কবিতা লেখায় সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণা দিয়েছেন কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়। সৌমিত্রর ভাষ্য, ‘শক্তির জন্যই তো আমার প্রথম কাব্য জলপ্রপাতের ধারে দাঁড়াব বলে প্রকাশিত হয়।’ কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় কবি সৌমিত্রের কবিতার ছিলেন একনিষ্ঠ সমালোচক। শক্তি যখনই বলতেন, কবিতাটিতে রবীন্দ্রনাথের ছায়া আছে, অমনি সৌমিত্র সেই কবিতা বাতিল করে দিতেন। সৌমিত্র বলেছেন, ‘আসলে তখন আমাদের প্রভাবিত করছে জীবনানন্দ দাশ, সুভাষ মুখোপাধ্যায়রা। লেখায় রবীন্দ্রনাথের প্রভাব থাকুক আমরা চাইতাম না। সেটা থাকুক জীবনে।’

অভিনয়ের পাশাপাশি কিশোর বয়স থেকে কবিতা লিখে আসছেন সৌমিত্র। ফলে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের শুটিংয়ে দুটো শটের মাঝখানেও কবিতা লিখতে পিছ-পা হননি তিনি। পরে বাড়িতে ফিরে রাতে সেটিকে মেজে-ঘষে ঠিক করেন সৌমিত্র। অনেক সময় সারাদিন মাথায় নানা কাজের ফাঁকে ঘুরঘুর করা কবিতার একটা দু’টো লাইন সঙ্গী করে বাড়ি ফিরে রাতে জন্ম দিয়েছেন একটা গোটা কবিতার। আবার কখনো কোনো ইমেজ বা চিত্রকল্পকে কবিতার ভাষায় রূপ দিয়েছেন কবি সৌমিত্র। কখনও-বা একটা কবিতাই দু-চারদিন ধরে কাটাকুটি সংশোধন করে তৈরি হয় পূর্ণ কবিতা। বিভিন্ন সময় কবিতার যে মূল ভাবনাগুলো আসে, সেগুলোকে রক্ষার চেষ্টায় সৌমিত্র সংরক্ষণ করতেন একটি লাল খাতা। মনে আসা ভাবনাগুলো তাতে টুকে নিয়ে বাকিটা সম্পন্ন করতেন রাতের নির্জনে। একজন সম্পূর্ণ কবির এই তো কাজ।

আনন্দবাজার যখন তাঁর কবিতাসমগ্র প্রকাশ করে, সেই তখন কবি হিশেবে সৌমিত্র বলেছিলেন, ‘পরবর্তীকালে কবি হিসেবে যদি কেউ আমাকে বিচার করতে চান, তাহলে তার একটা সামগ্রিক চিত্র এই বইয়ে ধরা থাকবে। হয়তো কিছু পাঠক পাব।’ কিন্তু কিছু নয়, দুই বাংলায় আজ কবি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অগণিত পাঠক তাঁকে স্মরণ করছে ভারাক্রান্ত হূদয়ে।

বাংলা চলচ্চিত্রের এই মহীরূহকে পশ্চিমবঙ্গের তথা বাংলা ভাষার যশস্বী কবি জয় গোস্বামী প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আপনি তো অভিনয়ের মধ্য দিয়ে, সিনেমায় এবং নাটকে, দুভাবেই নিজের সত্তাকে প্রকাশ করতে পারেন। তা করেও চলেছেন অব্যাহতভাবে। তা হলে আবার আপনার কবিতা লেখার দরকার হয় কেন? কবিতা তো মানুষ নিজেকে প্রকাশ করার জন্যই লেখে। আপনি তো অভিনয়ের মধ্যে দিয়ে সেই প্রকাশ সম্ভব করতে পারছেন। তা হলে কবিতা কেন?’

উত্তরে কবি বলেছিলেন, ‘অভিনয়ের সময় কী হয় জানো, আমি কোনো একটা চরিত্রের অন্তরালে আত্মগোপন করি। বলা যায়, চরিত্রটিকে সামনে রেখে তার পেছনে লুকিয়ে পড়ি বা উবু হয়ে বসে থাকি। চরিত্রটিই তখন আমার আড়াল। এবার সেই চরিত্রের সত্তার সঙ্গে নিজেকে অল্প অল্প করে মিশিয়ে চরিত্রটিকে ফুটিয়ে তোলার কাজটা শুরু হয় আমার মধ্যে। কিন্তু কবিতা লেখার চেষ্টা যখন করি তখন ব্যাপারটা হয়ে যায় একেবারে অন্যরকম। তখন কোনো চরিত্রের মধ্যে ঢুকে আমাকে কথা বলতে হচ্ছে না আর। এই আমি, মানে আমার যা সারাংশ, তাকেই আমি সরাসরি কবিতায় বলতে পারছি। এই নিজের সারাংশকে বলার চেষ্টা আমার কলেজ-জীবন থেকেই সঙ্গে থেকে গেছে।’

এভাবেই নিজের সত্তাকে প্রকাশ করে চলার পথে সচল থেকেছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় মূলত কবি হিশেবেই। একের পর এক কবিতার বই বেরিয়েছে তাঁর। জলপ্রপাতের ধারে দাঁড়াব বলে, শব্দরা আমার বাগানে, হে সায়াহ্নকাল, পদ্মবীজের মালা— কাব্যসমূহ কবিতামুখী করে তুলেছে বারবার। তিনি অনুবাদ করেছেন খলিল জিব্রানকে। এ থেকেই বোঝা যায় কবিতায় জীবনদর্শনকে প্রাধান্য দিয়েছেন সৌমিত্র। কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যাক :

 

ক. পথে আজ বড় বেশি লোক/ মিছিলে কী খুঁজে পাবে হারানো বালক?

খ. ঘোষণা করে দাও/ অনুশোচনার মৃত্যু হয়েছে গতকাল...অশ্রুর নবজন্ম হয়েছে গতকাল...। 

গ. তুমি শীতার্তদের জন্য/এবার একটা ম্যানিফেস্টো রচনা করো/পাতাঝরার গর্জন থাক তার মধ্যে/তোমার গিটারে যে আগুন/তারই প্রতিশ্রুতি থাক/তোমার ম্যানিফেস্টোয়।

 

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়— এই নামটি বাঙালির জীবনে কতটা জুড়ে আছে, তা কয়েকটি শব্দে ধরা কঠিন। তিনি এক বিশাল বটবৃক্ষ। তাঁর প্রকাণ্ড ঠান্ডা ছায়ায় বাংলা সিনেমার কয়েক পুরুষ যেমন ধীরে ধীরে লালিত হয়েছে, তেমনি হয়েছে কবিতাপ্রেমী প্রতিটি মানুষও। শুধু কি সিনেমা, কবিতা? বাংলার নাট্যচর্চা জগতেও তিনি এক প্রতিভূ। আর এসবের বাইরে গিয়ে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় একজন অনন্য সাধারণ বাচিকশিল্পী। মঞ্চে বহুবার উচ্চারণ করেছেন রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে আজকের নবীন কোনো কবির কবিতা।

যদিও বাংলা ভাষাভাষির কাছে তিনি একজন ভারতীয় বাঙালি চলচ্চিত্র অভিনেতা। অভিনেতা হিসেবে তিনি কিংবদন্তী, তবে আবৃত্তি শিল্পী হিসেবেও তার নাম অত্যন্ত শ্রদ্ধাভরে স্মরণযোগ্য। একাধারে কবি এবং অনুবাদকও। সবকিছু ছাপিয়ে ‘হায় চিরজল’-এর কবিকেই খুঁজে ফিরি পৃথিবীর এই দুঃসময়ে। যে ‘চিরজল’-এ তিনি নিজেকে ভাসিয়ে দিয়েছেন অনন্ত শান্তিনিবাসের খোঁজে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads