• বৃহস্পতিবার, ২ ডিসেম্বর ২০২১, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

সাহিত্য

শিকড় মানে ঠিকানা

  • আফরোজা পারভীন
  • প্রকাশিত ১৯ ডিসেম্বর ২০২০

জানালার পর্দাটা একটু সরে গেছে। ডাক্তার বলেছেন শরীরে সকালের রোদ লাগাতে। ভিটামিন ডি-র বড় অভাব। সারা বাড়ির মধ্যে এই একটা জানালা দিয়েই সকালে সামান্য সময়ের জন্য রোদ আসে। সেই রোদ গায়ে মাখতেই পর্দাটা একটু সরানো হয়েছিল। সরাসরি রোদ আসার পথ করে দেয়ার জন্য খানিকটা জায়গা ফাঁকা করা হয়েছিল। সেই ফাঁকা দিয়েই চোখ গেল শাম্মির সামনের বাড়িটার ছাদের ওপর গজিয়ে ওঠা একটা বটের চারার ওপর। প্রতিদিনই ওই বাড়ির ছাদে লোক ওঠানামা করে। কিন্তু কেন তারা বটগাছটা উপড়ে ফেলে না সেটা একটা প্রশ্ন। এটা তো সবারই জানা গাঁথনির মাঝে গাছপালা হলে বিল্ডিংয়ে ফাটল ধরে। বিশেষ করে বটগাছ মারাত্মক। শিকড়-বাকড় বহুদূর ছড়ায়। শাম্মির মনে পড়ে একবার কলকাতার সদর স্ট্রিট দিয়ে যাওয়ার সময় একটা বাড়ির দোতলার দেয়ালের মধ্য দিয়ে বের হওয়া ডালপালাঅলা বেশ বড় একটা বটগাছ দেখে ভীষণ অবাক হয়েছিল সে। গাছের শিকড়-বাকড় গাঁথনির মধ্য দিয়ে বহুদূর ছড়িয়ে ছিল তা দেখা যাচ্ছিল স্পষ্ট। ওর কেবলই মনে হচ্ছিল, যে কোনো সময় দেয়ালটা ভেঙে পড়তে পারে। মানুষ মারা যেতে পারে। এ বাড়ির লোকজনের কী সে খেয়াল নেই! এত বড় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা বাস করছে! আর একদিন ঢাকার গ্রিনরোড দিয়ে রিকশায় যেতে যেতে পুরোনো একটা দোতলা বাড়ির দেয়াল ফুঁড়ে বের হওয়া এমনই এক গাছ দেখেছিল। সে বাড়িটা শাম্মির বাসার কাছে। খোঁজ নিয়ে শাম্মি জেনেছিল ওই বাড়ির মালিকানা নিয়ে ভাইয়ে ভাইয়ে মহাসমস্যা। তাই কোনো ভাই-ই বাড়ি সারাই করে না। তখন শাম্মির মনে হয়েছিল তাহলে কলকাতার ব্যাপারটাও হয়তো এমন। শাম্মি প্রথম যেদিন সামনের ছাদের গাছটা দেখেছিল  ভেবেছিল, আহা গাছটা যদি সে পেত, টবে লাগাতো। বারান্দায় কতগুলো টব খালি পড়ে আছে। সেই গাছটা এই দু’তিন মাসে এত বড় হয়ে গেছে। কী সুন্দর সবুজ সতেজ আর ঝাপটানো তার পাতাগুলো। শাম্মি গাছের উপর থেকে নিচ, নিচ থেকে উপরে গুনতে থাকে। বেশ বড় বড় আটটা পাতা। 

দুটো বড় বালিশ আর তার উপর দুটো কুশন রেখে আধশোয়া শাম্মি ভাবে, এভাবেই যদি গাছ বড় হতে থাকে বছর খানেকের মধ্যে বিশাল গাছ হয়ে যাবে। এই এতবড় গাছ কি ও বাসার কারো চোখে পড়ছে না! আর তখনই উত্তরটা খুঁজে পায়। ওটা কারো একক বাড়ি না, হাসপাতাল । হাসপাতালের ছাদে গাছ বড় হলে কার কি! এসব ভাবনার মধ্যেই হঠাৎ একটা পাখি এসে একটা পাতায় বসে। দূর থেকেও পাখিটার হলুদ-কালো রঙের জাফরিকাটা চেহারা চোখে পড়ে শাম্মির। বড় সুন্দর পাখিটা! কী নাম পাখিটার? ঢাকা শহরে এত সুন্দর একটা পাখি কোথা থেকে এলো।

এ পাখিটার কোনো ঘর আছে কি না জানে না শাম্মি। বাবুই ঘর বাঁধে, চড়ুই ঘর বাঁধে, কোকিল ঘর বাঁধে। এই নাম না-জানা পাখিটা কি বাঁধে! হয়তো বাঁধে, হয়তো দরকার হয় না। ডালে ডালে পাতায় পাতায় ওড়ে, বিশ্রাম নেয়, ঘুমায়। ওই ডাল-পাতাই ওর ঘর-বাড়ি, ওর শিকড়। আর শাম্মির মতো ওর-ও দেশ বাংলাদেশ। 

পাখিটা এবার পাতায় পাতায় উড়তে থাকে। এক  পাতা থেকে আরেক পাতা, সে পাতা থেকে আরেক পাতা। আটটা পাতায় ঘুরে ঘুরে উড়তে থাকে পাখিটা। শাম্মি দু’চোখ মেলে তন্ময় হয়ে দেখে। আর দেখতে দেখতেই ওর মনের চোখ উধাও হয় পঞ্চাশ বছর আগের এক গ্রামের ধুলোওড়া পথের পাশের বড় একটা বটগাছের নিচে।

 

দুই

এ গাঁয়ের পথে ধুলো তেমন ওড়ে না। যদি কখনো অনেকগুলো গরু একসাথে যায় বা প্রখর রোদে শুষ্কতর রাস্তায় গরুর গাড়ি যায় তখন খানিকটা ধুলো ওড়ে। সে খুব সামান্য। কিন্তু আজ উড়ছে। চারদিক ধুলোময়। কদিন ধরে সকাল সন্ধ্যা ছাড়িয়ে গহিন রাত পার করে আরেক সকাল পর্যন্ত অবিরাম এ পথে চলেছে রাজধানী থেকে আসা মানুষ। মাইলখানেক দূরের নদীপাড়ে নৌকা লঞ্চ ডোঙা থেকে যে যেমন পেরেছে নেমে ছুটেছে এই গ্রামের দিকে। সে ছোটার বিরাম নেই। কেউ এসেছে আত্মীয় বাড়ি, কেউ চেনা পরিচিত লোকের বাড়ি। যাদের চেনা-জানা কেউ নেই তারাও এসেছে মানুষের পিছু পিছু। আকাঙ্ক্ষা যদি একটু ঠাঁই মেলে অনেকের সাথে। আর তাও যদি না মেলে গাছতলা তো আছে। সেখানে অন্তত আর্মির গুলি খেয়ে মরতে হবে না বা ইজ্জত হারাতে হবে না।

সেদিন রাতে গভীর ঘুমে তলিয়ে ছিল শাম্মি। তার গায়ের ওপর একটা হাত রেখে ঘুমাচ্ছিল পরশ। আগের কয়েক রাত ঘুম হয়নি। মার্চ মাসের শুরু থেকেই তুমুল উত্তেজনায় ছেয়ে আছে দেশ। ৭ মার্চের পর তা বেড়েছে। পর পর কয়েক রাতের না ঘুমানো যুগল আজ গভীর সুষুপ্তিতে মগ্ন। কিন্তু আচমকা ঘুম ভেঙে গেল দিগ্বিদিক ছিন্ন করা একটানা গুলির শব্দে। যেন ইসরাফিল শিঙায় ফুঁ দিয়েছে। সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে এখনই। ধড়মড় করে উঠে বসল ওরা বিছানায়। দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল। অনেক পর গুটি গুটি পায়ে বিছানা থেকে নেমে নিজে পানি খেল পরশ, শাম্মির জন্য এক গ্লাস আনল। পানি খেতে খেতে ফিসফিস করে বলল,

: কী হয়েছে জানি না। কিন্তু সকালেই ঢাকা ছাড়তে হবে।

 এত আস্তে বলল যেন নিজেই শুনতে না পায়। তবু শুনতে পেল শাম্মি। সেও ফিসফিস করে বলল,

: কোথায় যাব, তোমার-আমার কারো যে গ্রামের সাথে সম্পর্ক নেই!

পরদিন সকালে দরজায় তালা লাগিয়ে ওরা গ্রামের দিকে ছুটল। কিন্তু কোথায় যাবে! গ্রামের সাথে যে কোনো যোগাযোগ নেই পরশের। পরশের ছেলেবেলায় ওদের গ্রামের লোকজন অনেক চেষ্টা করেছে যোগাযোগ করতে, যোগাযোগ রাখতে। পরশের বাবা তা করেননি। ওর মায়েরও তেমন গা ছিল না। বাবা-মা মারা গেছেন অনেকদিন। বাবা মারা যাওয়ার পর বড় চাচা চেয়েছিলেন বাবার দাফন গ্রামে হোক। সেটাও হয়নি। তারাও আর বহু বছর যোগাযোগ রাখেন না। শুধু গ্রামের নাম আর বড় চাচার নামটুকুই জানে পরশ। আজ সেই নামদুটো সম্বল করে যাত্রা করল পরশ, শাম্মি।

ওরা যখন গ্রামে পৌঁছালো তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে। ক্ষুধা তেষ্টায় দুজনেই কাতর। গা কাঁপছে ওদের। নৌকা থেকে নেমে এক দোকানদারকে চাচার নাম বলল পরশ। জানতে চাইল তার চাচার বাড়িটা কোনদিকে। দোকানদার বলল, এ গ্রামে চারজন জব্বার। তিনজনই মারা গেছে। তার মধ্যে দুজন আবার একই পদবির। আরো দুএকজনের নাম বললে হয়তো চিনতাম।

অনেককেই জিজ্ঞাস করল পরশ। কিন্তু আত্মীয়ের বাড়ির খোঁজ মিলল না। দু’একজন ভর্ৎসনাও করল। ‘সুখের দিনে গ্রামের আত্মীয়দের খোঁজ নেননি, এখন বিপদে পড়ে খোঁজ করছেন। নামটাও ঠিকমতো বলতে পারছেন না। কেমন মানুষ আপনি!’

কথা তো সত্যি। এ কথার প্রতিবাদ করার তো কিছু নেই। হতাশ পরশ একটা দোকানের বেঞ্চিতে শাম্মিকে বসিয়ে রেখে গ্রামে ঢুকে পড়ল। অনেক জায়গায় খোঁজ করল। দু-চারজন বয়স্ক মানুষের কাছেও গেল। বাবার নাম বলল। কিন্তু লাভ হলো না। তখন পরশের মনে হতে থাকল, সে বুঝি ভুল গ্রামে এসেছে। এক নামে তো একাধিক গ্রাম থাকে। কিন্তু এখন তো আর করার কিছু নেই। 

শহর থেকে গ্রামে আসা মানুষদের থাকার জন্য কিছু দয়ালু মানুষ জায়গা দিচ্ছে। সেসব জায়গায় গিয়েও পরশ দেখল মানুষ গিজ গিজ করছে। উঠানে বিছানা পেতে বসেছে মানুষ। শরণার্থীদের জন্য গ্রামে খোলা লঙ্গরখানায় খাচ্ছে আর যেমন পারছে থাকছে।

এভাবে থাকা-খাওয়া কোনোটারই অভ্যাস নেই পরশ, শাম্মির। কিন্তু উপায়ও তো নেই। পরশ শাম্মির কাছে ফিরে এলো। অধীর উৎকণ্ঠায় শাম্মি ছুটে গিয়ে বলল,

: পেলে? খোঁজ মিলল?

: না

: তাহলে?

: উঠে আসো। চলো।

: কোথায়?

পরশ শাম্মির হাত ধরল। ওরা উদ্দেশ্যবিহীনভাবে হাঁটতে থাকল। যেতে যেতে পরশ বলল,

: উঠোনে গাদাগাদি করে শুয়ে আছে মানুষ। যারা আগে এসেছে তারা ঘরে জায়গা পেয়েছে। ওভাবে কোনো উঠোনে রাতটা কাটানো যায়। কাল সকালে না হয় আবার খোঁজ করব।

বলতে বলতে থমকে দাঁড়ায় পরশ। সামনে ডালাপালা ছড়ানো বিশাল এক বটগাছ।

: দাঁড়ালে যে?

: ভাবছি উঠোনও যা, গাছতলাও তাই। এখানে বরং খোলা হাওয়া আছে। দেখেছ কি ফুরফুরে হাওয়া দিচ্ছে। এখানেই থাকি

: কিন্তু একদম খোলা জায়গায়। আমি মেয়েমানুষ। ঘুমিয়ে গেলে-

: কিচ্ছু হবে না। এ গ্রামে আছে হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা। এখানে কেউ তোমার দিকে তাকাবেও না।

ওরা দুজন বটগাছে হেলান দিয়ে হাত পা ছড়িয়ে বসে। পরশ শাম্মির হাতটা কোলের ওপর রাখে।

: ভয় পেও না শাম্মি। এ রাত ভোর হবে। কাল রাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ চলেছে ঢাকায়। আমরা তো এখন সেই সার্চলাইটের আওতার বাইরে মুক্ত আকাশের নিচে এসেছি। মাথার ওপর আছে শতায়ু বট। ভয় পেও না।

টুকটাক কথা বলতে বলতে ওরা ঘুমিয়ে যায়। কতক্ষণ ঘুমিয়েছে জানে না শাম্মি। হঠাৎ ওর ঘুম ভেঙে যায় স্বপ্ন দেখে। বটগাছের ডালে বসে একজোড়া ব্যাঙ্গোমা-ব্যাঙ্গোমি শাম্মিকে বলছে, ‘শিকড় ছাড়তে নেইরে, ছাড়তে নেই। বাপ-দাদার ভিটে ছাড়তে নেই।’ শাম্মি ধড়মড় করে উঠে বসে। ও চোখের দৃষ্টি এক করে গাছের ডালে ব্যাঙ্গোমা-ব্যাঙ্গোমিকে খুঁজে পায় না।

আর তখনই দুজন লোক এসে দাঁড়ায় ওদের পাশে। টর্চের আলো ফেলে। শাম্মি সিঁটকে ওঠে ভয়ে। জড়িয়ে ধরে পরশকে। উঠে বসে পরশ।

: একি আপনারা এখানে কেন, খোলা আকাশের নিচে, গাছতলায়, সাথে মহিলা?

: ঢাকা থেকে এসেছি। থাকার জায়গা পাইনি।

: তা বলে গাছতলায়। আসুন আসুন।

: কোথায়?

: আপনাদের থাকার জায়গা দেব।

: এ গ্রামে আব্দুল জব্বার নামে আমার একজন আত্মীয় আছে।

: ও, আব্দুল জব্বারের কথা বাদ দিন। আব্দুল জব্বার ছিল আপনার শিকড়। উপড়ে ফেলেছেন। আপনাদের শিকড় নেই। কিন্তু পরবর্তী প্রজন্মও যেন আপনাদের মতো শিকড়চ্যুত না হয় সেটা অন্তত দেখবেন।

পরশ অপরাধীর মতো বলে-

: ঠিকই বলেছেন।

: আপনার কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই। নেই স্থায়ী বাড়ি ঘর। কিন্তু একটা জিনিস আছে, দেশ। যে স্বাধীন দেশের জন্য আমরা লড়ছি। আসুন।

 

তিন

শাম্মি লম্বা একটা শ্বাস টেনে বাস্তবে ফিরে আসে। পাশের ছাদে পাখিটা তখনো নেচে নেচে চলেছে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads