• বৃহস্পতিবার, ২ ডিসেম্বর ২০২১, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

সাহিত্য

আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ

কবিতায় চিত্ত যাঁর

  • প্রকাশিত ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১

নাজমুল মৃধা

 

সকলেই কবি নয়। কেউ কেউ কবি; কবি— কেননা তাদরে হূদয়ে কল্পনার এবং কল্পনার ভিতরে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার স্বতন্ত্র সারবত্তা রয়েছে এবং তাদের পশ্চাতে অনেক বিগত শতাব্দী ধরে এবং তাদের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক জগতের নব নব কাব্য বিকিরণ তাদের সাহায্য করছে।— জীবনানন্দ দাশের এই কথাগুলোর গভীর চেতনাপ্রবাহ যেন আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর হূদয়জুড়ে বিরাজমান ছিল। তাঁর অগ্রজ দুই প্রজন্মের পূর্ববঙ্গের অনেক কবিদের মধ্যে ছিল পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা। তিনি ছিলেন এদেশের তৃতীয় প্রজন্মের কবি। কিন্তু তৃতীয় প্রজন্ম ছিল আধুনিকতা ও নব জগতের বাসনায় আকুল। তাঁর সমসাময়িক  ও অগ্রজ অনেক কবির কবিতা ছিল ঋদ্ধ কিন্তু দুর্বোধ্য। তিনি দুর্বোধ্যতায় হাটেননি। সহজ-সরল ছন্দের বাঁধনে তাঁর কবিতার শরীর হয়ে উঠেছিল সজীব। ছড়াছন্দে লালিত তাঁর কবিতার সরল গিট সহজেই খুলে ফেলতেন এদেশের কাব্যপ্রেমীরা।

পঞ্চাশের দশকে বাংলা কাব্য আন্দোলন এক নতুন মোড় নিয়েছে। দেশবিভাগের মত্ততায় তখন উত্তাল ভারতবর্ষ। নব্যস্বাধীন পাকিস্তান স্বাধীন হলেও হয়নি পাকিস্তানের পূর্ব অংশ। জাতি, সংস্কৃতি, চেতনা দুই খণ্ডের মধ্যে এতটাই আলাদা যে ধর্মের এঁটেল মাটি দিয়ে কেবল তা টিকিয়ে রাখা হয়েছিল। উর্দুভাষী পাকিস্তানকে তিনি তাঁর মধ্যে লালন করতে পারেননি। তিনি বরং তাঁর মা, মাটির সাথে মিশে গিয়ে পূর্ববঙ্গের প্রকৃতি ও মানুষকে বারবার খুঁজে ফিরেছেন। তাঁর কর্মজীবন ছিল বর্ণাঢ্য। সিভিল সার্ভিস থেকে শুরু করে অধ্যাপনা এমনকি মন্ত্রিত্ব পর্যন্ত তিনি গ্রহণ করেন। তবু তাঁর কবিচেতনা ছিল তীব্র দাবানলে ভস্মীভূত জঙ্গলের ধোঁয়ার কুণ্ডলীর মতো। বিশেষ করে বাংলা ভাষা নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানিদের নির্মমতা ও হঠকারিতা এ প্রজন্মের কবিদের করে তুলেছিল অতিশয় বিক্ষুব্ধ। প্রবল দেশাত্মবোধে আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ তখন জাগ্রত। পূর্ব বাংলার মাটির সাথে পাকিস্তানিদের প্রবল দৌরাত্ম্য ও গুন্ডামি কবিমনকে আঘাত করেছিল নির্দয়ভাবে। পাকিস্তান সরকারের আওতায় চাকরি করতেন বলে হয়তো সরাসরি তাদের আক্রমণ করে কোনো কিছু লেখেননি। তবে তাঁর সত্তা জুড়ে ছিল পূর্ব বাংলার প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও মানুষ। ’৫৪-র নির্বাচন, ’৫২-র ভাষা আন্দোলনে পাকিস্তান সরকারের নির্দয়তার সাক্ষী হয়েছিলেন নীরবেই। ভাষা আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন, নির্মমতার সাক্ষ্য হয়েছিলেন স্বচক্ষেই। হয়তো প্রিয় বঙ্গের ভালোবাসা হারাবেন শীঘ্রই এমন আতঙ্কই বরং বঙ্গকন্যা, লতা-পাতা, মাঠঘাটকে বেশি করে মনে করিয়ে দিয়েছে। সাতনরী হারে’র ‘কুঁচবরণ কন্যে’ কবিতায় তিনি বলেন— কে বলেছে? কে বলেছে? /শালুক বলেছে,/ এলো খোঁপা বাঁধতে গিয়ে কন্যে কেঁদেছে।/ কে শুনেছে কে শুনেছে?/ কেউ তো শুনেছে, /সোনার কাঁকন খুঁজতে মেয়ে জলে ডুবেছে।

১৯৫৫ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম কাব্য সাতনরী হার’ ছিল কবিতায় প্রথম পদার্পণ। তিনি তখনই বোঝাতে পেরেছিলেন লম্বা সময় ধরেই থাকতে এসেছেন কাব্যভুবনে। দেশভাগের সময় আবুল হোসেন, ফররুখ আহমদ, আহসান হাবীবদের মতো প্রতিষ্ঠিত কবিদের রাজত্বেও তিনি শক্ত হয়ে দাঁড়াতে পেরেছিলেন। তাঁর এই পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। এসব অগ্রজ কবিদের চিন্তাধারা ও চেতনার বিপরীত ছিলেন তিনি। বাঙালি চেতনাকে সুপ্ত অবস্থায় রেখে পাকিস্তানে যদিও বেশ কয়েকবছর কর্মজীবন কাটিয়েছেন তবু তিনি মা, মাটির শ্বাশত গুণমুগ্ধতায় আচ্ছন্ন ছিলেন। সমাজ, প্রকৃতি এমনকি রাজনৈতিক জীবনেও তিনি সোচ্চার ছিলেন। ছড়া ও গাথা কবিতা দিয়ে তিনি নতুন বাংলা কবিতার জগৎ গড়ে তোলেন। যেখানে লোকায়ত ও লোকজ গ্রামীণ সত্তার পরিবেশ প্রতিফলিত হয়।

লোকজ ঐতিহ্যকে ধারণ করলেও আধুনিক মননের জগতকে তিনি এড়িয়ে যাননি। তাঁর দ্বৈতসত্তার জন্য অনেকেই কবি সিমাস হিনি, হুইটম্যান ও রবার্ট ফ্রস্টের সঙ্গে তাঁকে তুলনা করতে চেয়েছেন। তাঁর দ্বিতীয় কাব্য প্রায় পনের বছর পর প্রকাশিত হয়। তাঁর কাব্যচর্চার এই দীর্ঘবিরতির কারণটির ব্যাপারে অনেকেই এক মত যে, পাকিস্তান সরকারের দপ্তরে চাকরির কারণে কিছুটা চুপ করে ছিলেন। তবে পর্যায়ক্রমে পরের কাব্য ‘কখনো রং কখনো সুর’ (১৯৭০), ‘কমলের চোখ’ (১৯৭৪), অধিক আলোচিত ‘আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি’ (১৯৮১) তাকে কবি হিসেবে শিখরের সুউচ্চ আসনে বসিয়েছে। এই গ্রন্থগুলোতে তিনি যেন পরাধীন বাংলায় পনের বছর চুপ করে থাকার রসদ একবারে ঢেলে দিলেন। নিজস্ব কাব্যভঙ্গিতে সরল নিটোল অথচ কি সত্যভাষায় তিনি উচ্চারণ করলেন— “আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি/আমি আমার পূর্ব পুরুষের কথা বলছি/আমি বিচলিত স্নেহের কথা বলছি/গর্ভবতী বোনের মৃত্যুর কথা বলছি/আমি আমার ভালোবাসার কথা বলছি/ভালোবাসা দিলে মা মরে যায়/যুদ্ধ আসে ভালোবেসে/মায়ের ছেলেরা চলে যায়।

কবির এই চরণগুলো যেন পরাধীনতার শিকল ভেঙে মুক্ত স্বাধীন আকাশে ভেসে বেড়ানো পাখির সুখের তীব্র আর্তনাদের স্মৃতিচারণ। ‘কমলের চোখ’ কবিতায় কবি যেন আরও বিক্ষুব্ধ ও মর্মাহত। পাকিস্তানিদের শোষণ-বঞ্চনায় নিগ্রহী পুত্রের করুণ দশা মায়ের মুখ দিয়ে সাবলীল ঘৃণাভরে তুলেছিলেন তিনি। তিনি বলছেন— “কমলকে চেন তুমি/ সুন্দর সুঠাম দেহ, প্রদীপ্ত চোখ/দুপুর রোদের মতো তীব্র প্রখর। একটা বুলেট/কমলের ডান চোখ/ ছিঁড়ে নিয়ে গেছে।”

লোকজ ঐতিহ্যে ছড়া গাথায় তাঁর কবিতার বন্ধন বাঁধা থাকলেও তিনি ছিলেন আধুনিক চেতনাপ্রবণ মানুষ। বাঙালি ও বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাকালীন যাতনায় তার হূদয় সর্বদায় ব্যাকুল ছিল। প্রতিবাদের শান্ত ভাষা ভেতরের বেদনাকে উগড়ে দেয় আমাদের সামনে। তাঁর অন্যান্য কাব্যগ্রন্থও সমাদৃত। সর্বদায় বিভিন্ন সরকারের দায়িত্বে থাকলেও তিনি সত্য ও সাহসী ভূমিকায় কবিতা লিখতে কার্পণ্য করেননি। কবিতাতেই  যেন তাঁর চিত্ত বাঁধা। 

কবি আসাদ চৌধুরীর মন্তব্য, ‘আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ  এমনই একজন কবি, যিনি ধান বা গমক্ষেতের দিকে তাকিয়ে বলে দিতে পারতেন এই জমি থেকে কত মণ ধান বা গম হবে’। তিনি কবিতা লিখেছেন প্রচলিত ভাষায়। তাঁর কবিতা প্রবহমান নদীর মতো।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads