• মঙ্গলবার, ৭ ডিসেম্বর ২০২১, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭
আমাদের মনোবিশ্বের শঙ্খ ঘোষ

সংগৃহীত ছবি

সাহিত্য

আমাদের মনোবিশ্বের শঙ্খ ঘোষ

  • অর্বাক আদিত্য
  • প্রকাশিত ০১ মে ২০২১

‘আমার দুঃখের দিন তথাগত/আমার সুখের দিন ভাসমান/এমন বৃষ্টির দিন পথে পথে/আমার মৃত্যুর দিন মনে পড়ে’। প্রকৃত বাঙালি কবি শঙ্খ ঘোষ; কেবলি চলে গেলেন। কিন্তু আমরা যারা নতুন লিখতে এসেছি বা পাঠে সুখ পাই, অনবরত জীবন খুঁজে চলি, সময়কে সংসারকে প্রাত্যহিক জীবনের ভেতর থেকে কী করে কবিতা, সাহিত্য, একটা বোধ বা দর্শন জন্ম নেয় তারই অন্বেষণ করি, তাদের ভেতর শঙ্খ ঘোষ থেকে যাবেন, সেখান থেকে তাঁর চলে যাওয়া কখনোই হবে না। শঙ্খ ঘোষের কবিতার সাথে পরিচয় অনেক পরে, বাংলা সাহিত্যে পড়তে এসে যখন ডুবে যাচ্ছি জীবনানন্দ, সুধীনদত্ত, বুদ্ধদেব, রবীন্দ্রনাথ, আল মাহমুদ, আবুল হাসান কিংবা শক্তির ভেতরে তখন শঙ্খ ঘোষের কবিতা পড়ার তুমুল আগ্রহ জাগিয়ে তোলেন আমাদের শিক্ষক, কবি ও প্রাবন্ধিক সৌভিক রেজা। প্রথম পরিচয় হয় ‘রাতগুলি দিনগুলি’তে, তারপর জেঁকে বসে সমগ্র পড়ার অভিলাষ। এমনও হয়েছে শঙ্খ ঘোষের সাথেই রাত কেটেছে ভোর হয়েছে দুপুর বিকেল সন্ধ্যা আবার রাত নেমেছে— আর নেশার মতো, মাতালের মতো ডুবে আছি শঙ্খ ঘোষের কবিতায়। যারা কবিতা পড়ে বা ভালোবাসে তাদের অনেকটা আটকিয়ে কবিতা শুনিয়েছি। এসব কথা বলার কোনো অর্থ হয় না; বলছি এজন্য যে, যেভাবে শঙ্খ ঘোষ, অলোকরঞ্জন কিংবা শক্তিকে বুঝতে পারি, মনে হয় হূদয়ের সাথে কিংবা হয়তো সেই সময় নিজেই শঙ্খ ঘোষ বা শক্তি হয়ে যতোটা কবিতার ভেতর দিয়ে জার্নি করতে পারি, ততোটা লিখতে বা বলতে পারি না।  শঙ্খ ঘোষ, মানসিকতা ও জীবনদর্শনের দিক থেকে ভিন্ন; যদিও প্রত্যেকেই এক্ষেত্রে ভিন্ন। কিন্তু বোঝানোর মতো অন্য কোনো বাক্য বা শব্দ আমার নেই তাই আপাত এই সহজ ও অতিপ্রচলন বাক্যই অবলম্বন। তিনি যা বলেন, কবিতা আর তাই নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় কবিতার। সহজ অথচ গভীর। মনে হয় এমন করে কবিতা হয়? পরক্ষণেই আবার মনে হয় তাহলে কবিতা কী? ভাবতে ভাবতে সহজটা আর সহজ থাকে না। ক্রমাগত গভীরে প্রবেশ করে, চিন্তার পাতাল অব্দি যা পরিব্যাপ্ত। তাঁর সমাজ যেখানে প্রাণবন্ত, বাস্তব; প্রতিবাদ সহজাত। তাঁর কবিতার স্বতন্ত্র ভাষারীতি, শব্দচয়ন, চিত্রকল্প, ছন্দময়তা, প্রয়োগনৈপুণ্য, যেন কবির শিল্পীসত্তার সঙ্গে তাঁর নির্মাণশৈলীর সৌকর্যকে বারবার প্রতিধ্বনিত করে। সৃজন-মননের এতো চমৎকার সমন্বয়। কবিতা টেকনিক। মনে হয় তিনি ভাষারাজ্যের অধিপতি, শব্দ তার শাসনাধীন, যা কমান্ড করেন, যেভাবে করেন সেটিই উৎকর্ষতা পায়। ‘মাটির প্রবল বুকে মিশে যাও তৃণের মতন’ এমন করেই মিশে যান তাঁর ভাবনার ভেতর। যেখানে একজন শিল্পীর সাথে একজন সচেতন নির্মাতাকে আমরা খুঁজে পাই। মার্জিত রুচির সাথে ভাষাকে একাকার করে দেন তিনি। হেতু গড়ে ওঠে বস্তুপৃথিবীর ওপর ভর করে শিল্পঅন্বিষ্ট কাব্যভুবন।

‘মনের মধ্যে ভাবনাগুলো ধুলোর মতো ছোটে/যে কথাটা বলব সেটা কাঁপতে থাকে ঠোঁটে/বলা হয় না কিছু’ এই অনুভূতি যেন আমাদেরও হয়। আমাদের কথা, সর্বময় করে তোলা। আমরা যা বলতে চাই সেটি কখনো বলতে পারি না। তার ভেতরও যা বলি সেটি ট্রান্সলেট হয়ে আমার বলাটা আর হয়ে ওঠে না। যেমন প্রেম বুঝি তেমন প্রেম হয় না, যেমন ব্যথা বুঝি তেমন ব্যথা হয় না, যেমন মানুষ বুঝি তেমন মানুষ হয় না। ‘না হওয়ার’ বা অপূর্ণতার কাঙ্ক্ষা তাড়িত করে। তখন আত্মজিজ্ঞাসার দারস্থ হই, সেখানে উচ্চারিত হয় ‘বেঁচে থাকব সুখে থাকব সে কি কঠিন ভারি/সকালও যার মুখ দেখে না বিকেল করে আড়ি’ এই দহন নিয়ে বেঁচে থাকতে হয়।  দেশছাড়া মানুষের ব্যথাগুলো অন্যরকম। যেখানে শৈশব পড়ে থাকে কৈশোর পড়ে থাকে বা পড়ে থাকে স্মৃতির একটা দেশ, হাজারো গল্প। হাসান আজিজুল হকের লেখায় যেমনভাবে ডুকরে কেঁদে ওঠে সেই দেশছাড়া মানুষের আর্তস্বর, তেমনি শঙ্খর তাই। বাংলাদেশ তাঁর বিস্ময়; স্মৃতির স্বদেশ। বাংলাদেশের আবহমানতা তাকে অস্থির করে তোলে। তিনি লেখেন ‘মাঠের কিনার ঘিরে কেঁপে ওঠা বনবাসী হাওয়া/যাই পিতৃপুরুষের প্রদীপ বসানো দুঃখ, আর/ঠাকুমা যেমন ঠিক দশমীর চোখে জল/যাই পাকা সুপুরির রঙেধরা গোধুলির দেশে’। বাংলাদেশই তার প্রাণ, বাংলাভাষার প্রাণ। সেই পঞ্চাশে শুরু, যখন সময়টা বদলের; পরিবর্তন ঘটেছে মানুষের রুচিবোধে ভাষায় চিন্তায় স্বকীয়তায়। সেই সময় থেকে যাত্রারম্ভ। রাজনীতি বদলেছে, সমাজ বদলেছে। মানুষের দুঃখ ব্যথা আনন্দ বিষাও বদলেছে— এতো বদলের ভেতর দিয়ে শঙ্খ ঘোষ আমাদের জন্য সময়কে, তার মননশীল জীবনবোধকে তুলে দিয়েছেন। তাঁর ভান্ডার অজস্র। শব্দের ভান্ডার, নৈঃশব্দ্যের ভান্ডার। রবীন্দ্রনাথের মতোন তিনিও ত্রাতা আমাদের সংকটের, উত্তরণের। গলির কোণে দাঁড়িয়ে আমরা শঙ্খ ঘোষকে এখনো খুঁজে পাই। যিনি বিজ্ঞাপনের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি বলেছিলেন ভালোবাসা তার সর্বনাশ করে দিয়েছে। আমরা এমন সর্বনাশী ভালোবাসার একজন শঙ্খ ঘোষকে পেয়ে সৌভাগ্যবোধ করি। তাঁর কবিতা দিয়েই তাকে প্রণাম জানাই— ‘কবি তুমি যেয়ো না যেয়ো না/বেদনার শাদা ফুলে আকাশ নিবিড় হবে/আকাশে ভরে যাবে প্রাণ।’ ৎ 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads