• বৃহস্পতিবার, ২ ডিসেম্বর ২০২১, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

সাহিত্য

স্মরণ

মওলবী আবদুল হাকিম একজন কিংবদন্তি

  • প্রকাশিত ২৯ জুন ২০২১

মাহফুজ রিপন

 

মওলবী আবদুল হাকিম গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুর উপজেলার নগর সুন্দরদী গ্রামে সম্ভ্রান্ত মিয়া পরিবারে ১৮৭৭ সালের ১৪ মে জন্মগ্রহণ করেণ। শৈশব থেকে মেধাবী এই মানুষটি ইংরেজি, বাংলা এবং আরবি ভাষায় অপরিসীম দক্ষ ছিলেন। গোপালগঞ্জের কাশিয়ানি স্কুল থেকে এন্ট্রাস পর্যন্ত পড়াশোনা করে জীবিকার সন্ধানে তিনি কলকাতা চলে যান। সেখানে গিয়ে ক্রমান্বয়ে রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, এ কে ফজলুল হকসহ কলকাতার বিখ্যাত মানুষদের সংস্পর্শে এসে তাঁর জীবনের গতিধারা পাল্টে যায়। মওলবী আবদুল হাকিম ১৯৪০ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। তিনি কলকাতা থেকে প্রকাশিত বিখ্যাত হানাফী, মোসলেম, হিতৈশী, ইসলাম দর্শন পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। এছাড়া মওলবী আবদুল হাকিম ১৯৩০ সালে অবিভক্ত বাংলার মুসলিম সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

মওলবী আবদুল হাকিম একজন নামকরা ঔপন্যাসিক, কবি, সাংবাদিক ও কোরআণের সফল অনুবাদক। পুঁথি রচনায়ও তিনি প্রচুর সুনাম অর্জন করেছিলেন। এছাড়া তিনি একজন সফল রাজনীতিবিদ, সমাজ সেবক এবং সংস্কারক ছিলেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে বিষাদ লহরী, পল্লী সংস্কার, মিলন, এস কে গোলজার, প্রতিদান, প্রতিশোধন এবং আল কোরআন-এর সফল বাংলা অনুবাদ অন্যতম। তাঁর বংশধরদের থেকে জানা যায়, ফুরফুরা শরীফের বড় পীর হযরত আবু বক্কর ছিদ্দিকী (রহ.) সাহেবের সঙ্গে সখ্যের কারণে এবং তাঁরই অনুপ্রেরণায় মওলবী আবদুল হাকিম জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ কাজ পবিত্র ‘কোরআন’ শরীফের বিশুদ্ধ তফসিরসহ বাংলা অনুবাদে হাত দেন। দীর্ঘ পনের বছর ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করে ২০ নভেম্বর ১৯৩৮ সালে তৎকালীন পিছিয়ে পড়া মুসলিম সমাজকে উপহার দেন ৩০ পারা পবিত্র কোরআনের সর্বোত্তম এবং বিশুদ্ধ তফসিরসহ বাংলা অনুবাদ, যা তৎকালীন ইসলামী বিজ্ঞজন কতৃক ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। তার সমস্ত বইগুলো এখন দুষ্প্রাপ্য, কেবল মওলবী আবদুল হাকিম এবং মানিকগঞ্জ অধিবাসী মোহাম্মদ আলী হাসানের সম্মিলিত প্রয়াস পবিত্র কোরআন শরিফের বঙ্গানুবাদের কপি বর্তমানে বাংলা একাডেমির গ্রন্থাগারে পাওয়া যায়। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মুহম্মদ আবদুল হাই ‘পবিত্র কোরআন শরিফের বিশুদ্ধ তফসিরসহ বাংলা অনুবাদ’ গ্রন্থ সম্পর্কে বলেন— ‘হাকিম ও হাসানের অনুবাদটি এ যাবৎ প্রকাশিত কোরআন শরিফের বাংলা অনুবাদগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ।’ (তথ্য : বাংলা সাহিত্য ইতিবৃত্ত- ১৩৮১ বঙ্গাব্দ, পৃষ্ঠা : ১৪৩)

মওলবী আবদুল হাকিম কলকাতার রিপন স্ট্রিটে ১০ কাঠা জমি কিনে বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন এবং মোসলেম প্রিন্টিং প্রেস নামক একটি প্রেস প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৯৪৬ সালে কলকাতায় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা চরমে পৌঁছে গেলে প্রাণ বাঁচাতে অবিভক্ত বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সার্বিক সহযোগিতায় জীবনের অর্জিত সবকিছু ফেলে রেখে সপরিবারে গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুরে ফিরে আসেন। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর সম্পত্তি ফিরে পাওয়ার আশা নিয়ে তিনি আবার কলকাতায় গিয়েছিলেন, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁর আবেদন প্রত্যাখান করলে সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে চিরদিনের জন্য প্রিয় জন্মভূমি নগর সুন্দরদী গ্রামে চলে আসেন। বাকী জীবনটা তিনি সুন্দরদী গ্রামেই কাটিয়ে দিয়েছেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমীন, এ কে ফজলুল হক, আবদুস সালাম খানসহ অনেক প্রথিতযশা নেতারা তাঁকে ঢাকায় যেতে বলেছিলেন। কিন্তু তিনি নিজ গ্রাম ছেড়ে আর কোনো দিন শহরে যাননি। 

বর্তমানে গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুর পৌরসভা তাঁর বাড়ির সামনের রাস্তাটি এই মহীরুহের নামে নামকরণ করেছে। এছাড়া ২০১৯ সালে থেকে মুকসুদপুর সাহিত্য পরিষদ ‘হাকিম— রমেশ’ নামে একটি সাহিত্য পুরস্কার চালু করেছে। পরিবার থেকে জানা যায় মওলবী আবদুল হাকিমের ১০ থেকে ১৫টি পাণ্ডুলিপি প্রকাশের অপেক্ষায় ছিলো। কিন্তু পরিবারের মানুষের অসচেতনতার কারণে সেসব আজ অন্ধকারে নিমজ্জিত। এমনকি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, এ কে ফজলুল হক ছাড়াও ওই সময়ের ভারতের জ্ঞানী, গুণী ব্যক্তিদের হাতে লেখা পোস্টকার্ডগুলোও সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। অথচ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মওলবী আবদুল হাকিম অমর হয়ে আছেন।

১৯৫৭ সালের ৮ জানুয়ারি রোজ মঙ্গলবার উপমহাদেশের প্রখ্যাত সাহিত্যিক মওলবী আবদুল হাকিম নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার সুন্দরদী গ্রামে নিজ বাড়ির সামনে তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads