• মঙ্গলবার, ৭ ডিসেম্বর ২০২১, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

সাহিত্য

জাহানার ইমাম : আমাদের আলোর দিশারী

  • প্রকাশিত ২৯ জুন ২০২১

রুবিনা হোসেন

 

যুগে যুগে পৃথিবীতে অনেক মহীয়সী নারীর আগমন ঘটেছে, যাঁরা তাঁদের কাজের মাধ্যমে স্বীয় দেশ ও জাতিকে সঠিক পথের দিশা দেখিয়ে নিজেরা হয়েছেন মহিমান্বিত। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ‘শহীদ জননী’ হিসেবে আখ্যায়িত এক মহীয়সী নারী এদেশের তরুণ প্রজন্মের মনে স্বমহিমায় সার্বজনীন মাতৃরূপে স্থান করে নিয়েছেন। তিনি হলেন সবার প্রিয় ‘আম্মা’ শহীদ জননী জাহানারা ইমাম, জন্ম ১৯২৯ সালের ৩ মে অবিভক্ত বাংলার মুর্শিদাবাদ জেলার সুন্দরপুর গ্রামে। তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পিতা সৈয়দ আবদুল আলীর তত্ত্বাবধানে তিনি আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হন। ১৯৪৮ সালে তিনি প্রকৌশলী শরীফুল আলম ইমাম আহমেদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।  ১৯৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এম. এ. ডিগ্রি লাভ করেন। শিক্ষকতাকেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। ১৯৫২ থেকে ৬০ সাল পর্যন্ত তিনি সিদ্ধেশ্বরী গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন। ১৯৬৪ সালে ফুলব্রাইট স্কলার হিসেবে আমেরিকা হতে উচ্চশিক্ষা নিয়ে জাহানারা ইমাম ১৯৬৬ সালে ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন এবং দু’বছর কর্মরত ছিলেন। প্রথম পর্যায়ে শিশু-সাহিত্যিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে ছোটগল্প, উপন্যাস, স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থ এবং সমসাময়িক বিষয় নিয়ে প্রবন্ধ লিখেছেন। 

জাহানারা ইমামের জীবনচরিত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৭০ সাল পর্যন্ত অন্য দশজন সাধারণ নারীর মতোই ছিল তাঁর জীবনধারা— একজন স্নেহময়ী মা, আদর্শ পুত্রবধূ ও স্ত্রী। কিন্তু তাঁর প্রখর ব্যক্তিত্ব, রুচি ও পরিমিতিবোধ এবং সর্বোপরি জীবনদর্শন প্রথম পর্যায় থেকেই তাঁকে অন্য সবার চেয়ে স্বতন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। অতুলনীয় সৌন্দর্যের অধিকারী জাহানারা ইমামের বিয়ের সাজ ছিল ব্যতিক্রমী। জীবনের এই বিশেষ দিনটিতে তিনি নিজ সিদ্ধান্তে শুভ্র সালোয়ার-কামিজ-ওড়না এবং বেলী ফুলের অলংকারে সজ্জিত হয়েছিলেন। বিবাহিত জীবনে ছিলেন দু’পুত্র সন্তানের জননী। স্বামী-স্ত্রী মিলে পুত্রদের  উপযুক্ত শিক্ষা দিয়েছিলেন। শ্বশুরের সাথে ছিল পিতা-কন্যার সম্পর্ক। তাঁর মধ্যে ছিল বাঙালির ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি, সামাজিক আচার-আচরণ, রুচি এবং আধুনিক জীবনের এক অপূর্ব সমন্বয়। চিন্তায় ও চেতনায় অসাম্প্রদায়িক জাহানারা ইমামের আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব, চমৎকার বাচনভঙ্গী, অপার সৌন্দর্য এবং অমায়িক ব্যবহারের মাধ্যমে নিমিষেই পরকে আপন করে নেয়ার একটা সহজাত ক্ষমতা ছিল।  শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বয়োজ্যেষ্ঠ মহল— সর্বত্রই ছিল তাঁর সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা। ব্যক্তি জীবনে ছিলেন নিরহংকারী, নম্র, বিনয়ী এবং শৃঙ্খলা, নিয়মানুবর্তিতা, সময়ানুবর্তিতা ও অধ্যবসায়ের এক মূর্ত প্রতীক। এসব ছিল তাঁর চারিত্রিক অলংকার।

১৯৭১ সালে তাঁর সাধারণ জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তাঁর চরিত্রের অসাধারণ দিকগুলো প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠে। শুধু তা-ই নয়, এক অনন্য মহিমায় মহিমান্বিত ছিল তাঁর জীবনের শেষাংশ। মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে তাঁর পুরো পরিবার মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। জ্যেষ্ঠ পুত্র রুমী আমেরিকায় ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে যাওয়ার সুযোগ ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। অবরুদ্ধ ঢাকা শহরে অবস্থান করে তিনি এবং স্বামী শরীফ ইমাম মুক্তিযোদ্ধাদের সক্রিয় সহযোগিতা প্রদান করতে থাকেন। ২৯ আগস্ট রুমী পাক-বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে শহীদ হয় এবং বিজয়ের মাত্র তিনদিন আগে শরীফ ইমাম হূদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তরুণ মুক্তিযোদ্ধা পুত্রের মৃত্যু এবং স্বামীর অকাল জীবনাবসান তাঁকে নিঃসঙ্গ করে ফেললেও প্রবল জীবনবাদের কারণেই তিনি ভেঙ্গে পড়েননি। ধীরে ধীরে সাহিত্যাঙ্গন ও বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে নিজেকে নিয়োজিত করেন। স্বাধীনতা-উত্তর এই মা বাংলাদেশে হয়ে ওঠেন মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা।

আশি দশকের শুরুতে ক্যানসারে আক্রান্ত হলে শুরু হয় তাঁর আরেক সংগ্রামী জীবন। রচনা করেন ঘাতক ব্যাধি ও এর চিকিৎসা সংক্রান্ত অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ অসামান্য গ্রন্থ ক্যানসারের সাথে বসবাস। মৃত্যু অবধারিত জেনেও এক আশ্চর্য নির্লিপ্ততায় বর্ণনা করেছেন প্রতিনিয়ত ক্যান্সারের সঙ্গে তাঁর যুদ্ধের কথা যা অনেক ক্যানসার আক্রান্ত মানুষকে দিয়েছে মানসিক প্রশান্ত্তি। ১৯৮৬ সালে প্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় তাঁর অনন্য সৃষ্টি মুক্তিযুদ্ধের অসামান্য দলিল একাত্তরের দিনগুলি। জাহানারা ইমামের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হচ্ছে—  অন্যজীবন, বীরশ্রেষ্ঠ, বুকের ভিতর আগুন, নিঃসঙ্গ পাইন, নাটকের অবসানে, দুই মেরু। এছাড়াও আরো অনেক গ্রন্থের রচয়িতা তিনি। 

জাহানারা ইমাম ছিলেন অনন্যসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী। মরণব্যাধিতে আক্রান্ত কোনো মানুষের পক্ষে দৃঢ় মনোবল নিয়ে যাবতীয় কর্তব্য সুসম্পন্ন করা, রুচি, সৃজনীশক্তি ও পরিমিতিবোধ অটুট রাখা সম্ভবপর নয়। কিন্তু জাহানারা ইমাম সেই অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন। রোগের দুঃসহতার ভেতরেও ক্রমাগত মননচর্চায় নিয়োজিত থেকে একটির পর একটি বই লিখে যাওয়া এবং দেশের ভয়াবহ রাজনৈতিক দুঃসময় ও নৈতিক অবক্ষয়ে গর্জে ওঠার মধ্য দিয়ে জাহানারা ইমামের অন্তর্নিহিত শক্তির প্রচণ্ডতা প্রকাশ পায়। কাজেই বলার অবকাশ রাখে না যে, তিনি কোন মাপের মানুষ ছিলেন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে সক্রিয় অবদান রাখা এবং একজন শহীদ জননী হওয়ার চেয়েও বেশি গৌরবের ছিল তাঁর জীবনের শেষ আড়াই বছর। এ সময় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং তাদেরকে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে নির্মূল করার জন্য জাহানারা ইমাম যে আন্দোলন শুরু করেছিলেন তার উদাহরণ পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। জাহানারা ইমাম বিশ্বাস করতেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগ্রত করা গেলে এদেশের কল্যাণের জন্য ত্যাগ স্বীকারের মানুষের অভাব হবে না। সে লক্ষ্যেই তিনি এই প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তাই শুধু সাহিত্যের ওপর নির্ভর না করে যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তি বিধানের দৃঢ় সংকল্প নিয়ে তিনি হাজির হয়েছিলেন জনগণের সামনে, পরবর্তী প্রজন্মের সামনে। নিজের তরুণ সন্তান হারানোর শোককে শক্তিতে পরিণত করে সেই শক্তি ব্যবহার করেছেন একাত্তরের পরাজিত শত্রুদের প্রতি। ষাটোর্ধ্ব বয়সে দেহে ক্যানসার নিয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে একাত্তরের ঘাতক-দালালদের প্রকৃত চেহারা উন্মোচন করে গিয়েছেন, তাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত করে গিয়েছেন। দুঃসাধ্য এই কাজটি তিনি যেভাবে করে গিয়েছেন তা জানার জন্য আমাদের পেছনের দিকে তাকাতে হবে।

একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের দাবিতে ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে দেশের ১০১ জন বরেণ্য বিশিষ্ট নাগরিকের উদ্যোগে গঠিত হয়েছিল ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’। এরই ধারাবাহিকতায় গণআদালতে যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের প্রতীকী বিচারের জন্য মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল রাজনৈতিক দল এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক, পেশাজীবী, মুক্তিযোদ্ধা সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি’। সর্বসম্মতিক্রমে দুই সংগঠনেরই আহ্বায়ক নির্বাচিত হন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। কমিটি ২৬ মার্চ ’৯২ তারিখে ‘গণআদালত’-এর মাধ্যমে ঘাতক গোলাম আযমের বিরুদ্ধে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঐতিহাসিক বিচার অনুষ্ঠান করে। শহীদ জননীর সভাপতিত্বে লাখ লাখ জনতার উপস্থিতিতে গোলাম আযমের প্রতীকী বিচার করা হয়। তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত ১০টি নির্দিষ্ট অভিযোগের প্রত্যেকটিতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় গোলাম আযমের মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করা হয়। তিনি গণআদালতের এই রায় কার্যকর করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান এবং পরবর্তীকালে জনসভা, সংসদ অভিমুখে যাত্রা, হরতাল, অবস্থান ধর্মঘট, মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে রায় কার্যকরের জন্য সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। কয়েক দফা অস্ত্রোপচার এবং শারীরিক দুর্গতি বেড়ে যাওয়া সত্ত্বেও তিনি দেশের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত ছুটে বেড়িয়েছেন। এক কথায় বলা যেতে পারে, জীবনের শেষ বছরগুলো তিনি উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন আন্দোলনের স্বার্থে।

১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ গণআদালতে জামায়াতের আমির গোলাম আযমের প্রতীকী বিচারের প্রায় ২১ বছর পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রথম রায়ে যুদ্ধাপরাধী আবুল কালাম আযাদের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়া হয় এবং ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর রাতে এই রায় কার্যকর করা হয়। এ বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই যে, চলমান যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া এবং রায়ের বাস্তবায়ন শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের ফসল। কিন্তু শরীরের প্রতি এই অবহেলার চরম মূল্য তাঁকে দিতে হয়েছিল; নতুবা চিকিৎসকের পরামর্শ এবং পূর্ণ বিশ্রামে থাকলে হয়তো আরও কিছু বছর আমাদের মাঝে থাকতে পারতেন। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন এই মহীয়সী নারী।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবির মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে কলংকমুক্ত করার জন্য সত্যিকার অর্থে আপন বুকের পাঁজর জ্বালিয়ে তিনি জাতিকে দেখিয়ে গিয়েছিলেন মুক্তিপথের দিশা। মৃত্যুর কিছুদিন আগে কাঁপা কাঁপা হাতে দেশবাসীর উদ্দেশে লিখে রেখে গিয়েছিলেন এই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার আহ্বান। ১৯৯৪ সালের ২৬ জুন চিরবিদায় নিলেও তিনি রয়ে গেছেন সব প্রজন্মের প্রিয় ‘আম্মা’ হয়ে, তাদের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ২৭তম মৃত্যুবার্ষিকীতে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads