• বৃহস্পতিবার, ২ ডিসেম্বর ২০২১, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

সাহিত্য

বিশেষ রচনা

কিরণরেখার পত্রপুট

  • প্রকাশিত ০৪ জুলাই ২০২১

শহীদ ইকবাল

 

পর্ব ১৬

 

এ শহর তো শৈশবের সুখের শহর নয়। এখানে খুব দ্রুত বদলায় কতো কিছু। বস্তু জাতীয় জিনিসগুলো যেমন বদলায় তেমনি মানুষের শরীর আর মনও বদলায়। কখনো মেঘ কখনো রোদ্দুর। তো এসব পেরিয়ে মন বোঝা, মেজাজ বোঝা কঠিন। আরও কঠিন কোনো পরিবারের মন বোঝা। যে ভোরের সকালে রাত জেগে ঢাকা পৌঁছই তখন আড়মোড়া জাগা শীত ছিল। সূর্য উঠি উঠি। সদ্য লাগানো সোডিয়াম বাতিতে অচেনা নিজেকে বেশি আলাদা করে ফেলি। কী যে এক ব্যস্তসমস্ত ঘটনা-রটনার পালা সেখানে! বাস টার্মিনালে নানারকম মানুষ থাকে, সেখানে ভিড় অনেক, চুরি-প্রতারণা, কালোবাজারি সব ভ্যানভ্যান করছে। এসব দেখা যায় না! কিন্তু যখন শৈশবের সুতো থেকে আলাদা হয়েছি, আলাদা মানুষে অভ্যস্ত হওয়ারই পরীক্ষা তখন। এটা না পারলে— ব্যর্থ। কিন্তু পরপর ব্যর্থই হচ্ছিলাম। ছানাবড়া চোখে কোন বাসে কোথায় যাবো— সেটা ধরা মুশকিল হলো। দৌড় দিয়ে একটা পাবলিক বাসে জুড়ে বসতেই, হুড়মুড় করে প্রতিযোগিতার ভাপে বহু লোক এক সেকেন্ডে উঠে বসে। তারপর একটু সামনে চলার পর বলে, গাড়ি যাইবো না। নাইমা লন। কিচ্ছু না বলে সবাই অসহায়ের মতো নেমে পড়ে। এমনটাও কি হয়! কতো যে এমন, কতো কিছু যে হয় কে জানে! ক্ষুধার উঁকি খুব তীব্র হচ্ছিল। তারপর অন্য বাসে উঠে সেই সাতসকালে মালিবাগ, অতঃপর রাজারবাগ পুলিশ লাইন। লক্ষ্য, ওই পরম যত্নের চিরকুটের ঠিকানা। ৩৭০ আউটার সার্কুলার রোড। সেখানে একটা কুকুর আছে। উল্টোদিকে বিশাল বড় পাঁচটা বিল্ডিং। রাজারবাগ পুলিশ লাইনের সামনের বড় রাস্তার বিপরীতে ঠিক কাকদের সারিতে অতি তুচ্ছ আমি দাঁড়ানো তখন। সাত-সকালে কাকরা খাবার ভক্ষণ করছে। আমার ভাগও তো সেখানে নেই! বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে একবার কাক দেখি অন্যবার পুলিশ লাইনের বিল্ডিং গুনে চলি। ওরা প্যারেড করছে। কঠিন শীত উপেক্ষা করেই চটচট ওর্ডার মেনে সারিবদ্ধভাবে শৃঙ্খলার নিয়মে এক তালে ট্রেনিং করে চলছে। এতো সুন্দর নান্দনিক সে দৃশ্য! মনে আসে : সবুজ নালি ঘাস/এখানে মেঘেরা চরে— নাকি মানুষ চরে, জীবন চরে বা অসহায় কেউ কীভাবে থাকে— কবি শক্তি কী জানে? তখনও শক্তিবাবু বেঁচে। কোনো সময় শখ করে কেনা দেশ-পত্রিকায় তাঁর নাম দেখেছিলুম। নতুন আসা ক্যাসেটের ফিতায় বড় দোকানে এসব পড়া হয়। সেই গ্রামফোনও তেমন শেষ হয়ে যায়নি। ঠিক কলিং বেল খুঁজে পাওয়া দুষ্কর আর তখনই দ্বিধা পেরুনোর উপায় এলো। যখন এ বাড়ির কোনো রমণী স্লিভলেস ব্লাউজে সদ্য বিছানা পরিত্যক্ত হয়ে, ট্রাউজারসমেত সমবয়সী স্বামীর সঙ্গে হাঁটতে শুরু করবেন বলে গেটটা খুলে শটাশট হাওয়া উড়িয়ে তাদের বেরিয়ে যাওয়া! অসহায় আমি তখন একটু এসেন্স বুঝে নিই। কী তার বনেদী রমরমা উৎকটত্ব— সেটাই পাথেয় হয়ে ওঠে। বৃথাই মনে হলো, দেখিস— একদিন আমরাও! এসব শ্রেণিগত জেলাসি, ঈর্ষার ন্যূনতম যোগ্যও তখন আমি নই। তাই ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে গেট পেরিয়ে এবার তিনতলা বাড়ির কোন্তলা সন্ধান করবো সে পরীক্ষা। এক অপেশাদার দারোয়ান অনেক পরে এলে আমি নাম দিয়ে প্রশ্ন করলে সে তাচ্ছিল্যভরে দোতলা দেখিয়ে দেয়। তারপর ব্রীড়ানতমুখে সেই পানে নিজেকে অবমুক্ত করবার উন্মুখ প্রচেষ্টা। এসব কোনোটাই আনন্দের তো নয়ই, তার সাথে যতো নিরানন্দ কিছু যুক্ত করা যায়, ততোই সুখ। কে তোমাকে মুক্তি দেবে হে পথিক। পথই তোমার এখন অবলম্বন। আমি ঢুকে পড়ি। কে একজন ভেতরে শরীরচর্চা করে। টেবিলে বসে ব্রেকফাস্ট করে। উঠে এসে পরিচয় চায়। আমার তো তখন কোনো পরিচয় নেই। আমি গ্রাম থেকে এসেছি— এই মোর পরিচয়। সে পরিচয়ে কাজ হলে, ভেতরের একটি রুমে চলে আসি। সেখানে প্রচুর শো-পীসে ভরা, কেমন করা এসেন্সের গন্ধ আর সারাক্ষণ একটা ধিকধিক শব্দের তাড়া। কী করবো বুঝে ওঠার আগেই নামধারী ব্যক্তিটি সম্মুখে আসেন। তিনি ঢাকা শহরে আসার কারণ ও অন্যান্য বিষয় জানতে চান। তখন আমেরিকা-প্রবাসী তার ভাই খুব উদার মন নিয়ে আমাকে গ্রহণ করেন। আমার নিঃসংকোচ স্বরূপ প্রত্যাশা করে। নেচে ওঠে মন। পূর্ব-ধারণা অবসিত হয়ে সমস্ত আলো আমার হূদয়ে প্রবেশ করে। ফুলগুলো ফুটে ওঠে। পাতাবাহারে ভরে যায় গোটা পৃথিবী। তবুও বিনয় আর ভদ্রতার পাশে লজ্জার সরবত্ব আমাকে অনেক কিছুর মতো সমীহটাও পাইয়ে দেয়। ভদ্রলোক বলেন, আজ তোমার কী কাজ। আমি বলি ইউনিভার্সিটিতে যাবো। সে বলে— আমিও যাবো। তখন সংকুচিত হয়ে জেরার মতো করে বলি, আমি তো কিছু চিনি না। তিনি বললেন, আমরা চিনে নেব। তুমি ফ্রেশ হও। তারপর বেরুব।

ফ্রেশ হও— এটাও তো বোঝা কঠিন হয়। ক্রমে আলো আসিতেছে। অভাব দূর হয়। পাখিসব করে রব— তখন ওয়াশ রুম থেকে শুরু করে আর সব কাজ সহজ হয়। আমাকে কে যেন অবমুক্তি দিল। সিরিয়াস হয়ে সব কাজ শেষ করে, একটু ক্ষুধা গোপন রেখেই নাশ্তা সেরে সেই ঘরে ফিরে— পড়ার প্রকল্প শুরু করতেই— ওই ভদ্রলোক পুনর্বার আদেশ করেন— তখন আনন্দে এক কাঠি সরেস হয়ে বেরিয়ে পড়ি। তারপর কোলাহলের শহরে সব সুন্দর হয়ে ওঠে। ভিখিরি যেন হয়ে ওঠে রাজার মতোন। যা ছিল অপূর্ণ তা হয়ে ওঠে পূর্ণ। ভুলে যাই, ছিপছিপে রোদের গন্ধ, পানাপুকুরের জল, নিমফুলের ঘ্রাণ। তখন ভয়হীন ভয় পেয়ে বসে— প্রচুর আলোবাতাসের ঘ্যানঘ্যান প্যানপ্যান স্বরে। হায়রে সুখ! বস্তুত এই ভদ্রলোককে আমার আর কোনোদিন পাওয়া হয়নি। তিনি থাকেন ক্যালিফোর্নিয়ায়। মোটা ভারী শরীর আর উন্মাদ হাসিভরা মুখ, ঝাঁকড়াচুলের আলুথালু বসন, তৃপ্তিময় হূদয়। এ পাওয়া যায় না! লোকটা আমাকে ঘোরের ঘরে নিয়ে চলে। আমার ভেতরে স্নায়ুতে প্রচুর বদল ঝরিয়ে দেয়। অনেক পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত করেন আমাকে। কতো জীবন— আর মানুষ যে কতো ভীষণ আলোময়— সেটা পৃথিবীর সব মানুষকে মুখোমুখি করার মতো সেও আমাকে উন্মুক্ত করে পরোক্ষ রকম আবাসন তৈরি করে দেয়। লোকটি হারিয়ে গেছে কিন্তু আমার কাছে তিনি চিররূপময় হয়ে রয়ে গেছেন, প্রচুর ক্ষণ আর লগ্ন তিনি আমার হয়ে কেড়ে নিয়েছেন। সেটি চোখ ভরা জলে— ওই হতাশ কৃষ্ণচূড়ার তলে দাঁড়িয়ে পরে ভেবেছি। আহা! এই তো সেদিনের দিন! আর তো ফিরে পাওয়া যাবে না! মানুষটা কী আর কখনো ফিরবে না? তবে এখানে কী সেই সহায় আর অসহায় আসলে কিছু আছে? ভদ্রলোককে এখন আর একবার পেলে কেমন হতো, হলের সামনে বসে আমি ভেবেছি— ভাবার যখন কিনারা নাই তখন সেঁধিয়ে গিয়ে ভীষণ ভয়ে লুকিয়ে ফেলি নিজেকে। তারপর কই আর তো কিছু মনে নেই। তড়িৎ একটা পেছন থেকে আওয়াজ আসে। কে আমার নাম ধরে ডাকে? ফিরে তাকিয়ে দেখি পরিচিত জন, ফর্সা— শুদ্ধশব্দের তীক্ষ রূপসী— বলেন, চল তো দেখি— তুমি, হুম— কোথায় থাক? আমি সকলকে রেখে আমার অগোছালো, পরিত্যক্ত রুমটার দিকে হাঁটা দেই। কিন্তু সেখানে পৌঁছে দেখি— তা কেন যেন বন্ধ। বুঝে উঠতে পারি না। ইতস্তত করে অন্যদের ডাকতে চাই। পরে তিনিই বলে ফেলেন, ভেতরে তো কেউ আছে! ঠিক জানি না। অনেক টানাটানির পরও তা খোলে না। কোনো সাড়াও নেই। অপেক্ষার আনুষ্ঠানিকতা সেরে আমরা নেমে আসি। আমার নিরুত্তর মন তিনি জেনে যান। বলেন ওঁর পরিচয় কী? আমি ঠিক বলতে না পারায় বলেন, কাল বিকেলে রোকেয়া হলের গেটে দেখা করিও। তখনকার রোকেয়া হল, ক্যামন করা মৌজের অনুভূতি। তাতেই এখনকার বিব্রতকাল হয়ে কিছুটা হারিয়ে যায়। বুঝি ছন্দে-গন্ধে, সুখে-দুখে, আনন্দে-বিষাদেও এই পরম মেলা ঠিক রৌদ্র আর মেঘের ছায়ার মতো। দৌড় দৌড় দৌড়।  

 

 

ছয়

 

এতোক্ষণ যে হঠাৎ করে ‘আমি’ সর্বনামে যা বলেছি— তা এক অর্থে আমাদেরই কথা। আমাদের সবার কথা। সব আমিই তো এক অর্থে আমরা। তাতে পার্থক্য কী! আমরা পার্থক্য দেখি নাই। এ এমন এক সময়— ওই বয়েসে কারো পার্থক্য ধরা পড়ে না। ফলে পরদিন রোকেয়া হলে যাওয়ার নেমন্তন্ন-সংবাদটা আমিই সকলকে দিই। ওরা আমাকে টন্ট কাটে, শিশটি দেয়। তবুও মেনে নিই। সবাই তখন রোকেয়া হলের সম্মুখে ছোট্টকালের বইয়ের ফরিদের সেই ফুড়ুৎ সমাচার হয়ে বসে থাকি। এদিকে ওদিকে মেয়েদের বা অন্য জুটিধরা ছেলেদের সম্পর্ক দেখি। খুনসুটির বেলোয়ারি আওয়াজ ইন্দ্রিয়কে উচ্ছল করে তুলি। তপ্ত হাওয়াটা যেমনটা বাইরে তার চেয়ে তা আরও বেশি ভেতরে। ভেতরের ভাপে এক সময় স্লিপ দিতে দিতে ক্লান্তি এলেও নগদ আর কাউকে দেখা যায়নি। তবে কি কোনো অপরাধ? এর মাঝে টিএসসি, ডাকসু ভবনের দিকে কিংবা হাকিম চত্বরে বিপ্লবী স্লোগান শুরু হয়। সড়কদ্বীপে তখন নাটক চলে। ক্রমেই অন্ধকার ঘনিয়ে এলে, সব ছেড়ে দিয়ে, বজলুর রহমান সাহেবের খোঁজে টিএসসির ভেতরের মাঠে চলাফেরা শুরু করি। তখন একটা গান কেবল নতুন ডিস্কে ভেসে চলছে : ‘ফার্স্ট ইয়ার কেটে যায় টিএসির ওই বারান্দায়/সেকেন্ড ইয়ার কাটে কিছু ক্লাসে...’— এসব মুগ্ধ গানের স্বরে চেতনায় আলাদা বীট তৈরি হয়। আলোকিত পৃথিবীর জীবনটা চলে আসে হাতের মুঠোয়। কী এক অপূর্ব পুলকে জীবনের আস্বাদ অমিয় হয়ে ওঠে। টিএসসির স্থাপত্য চোখে রঙ খেলায়, লাল ইটের মসৃণ বারান্দাটা আর আধুনিক ক্যাফেটারিয়া কী এক উষ্ণ কটিদেশ হয়ে ঘুমোবার ভাগ বাড়িয়ে তোলে— তখন তবে আমরা কি ভর্তি হতে এসেছি নাকি পুরোদস্তুর ছাত্র হয়ে গেছি!   

 

চলবে       

 

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads