• বৃহস্পতিবার, ২ ডিসেম্বর ২০২১, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

সাহিত্য

বিশেষ রচনা

কিরণরেখার পত্রপুট

  • প্রকাশিত ০১ আগস্ট ২০২১

শহীদ ইকবাল

 

পর্ব ১৮

 

সন্ধ্যার আগেই জনতার চলাফেরার তরঙ্গ পাল্টাতে থাকে। একটু থিতু, কাঠবেরালির ডানায় ছন্দ নেই। ওতে নির্ঘুম বাঁশরির আওয়াজ। সূর্যসেন হলের গেটের জটলাাঁ ঠিক ঘূর্ণিপাকানো ঊর্মির মতো। জমে, ঘোরে, আবার তলায় কোথায় তলিয়ে যায়। প্রকৃতির ভারি টান লেগেছে ওখানে যেন। গুড়ুম গুড়ুম আওয়াজ কোথায়! ওকি কাঁটাবনের রাস্তার মোড়ে নাকি মুজিব হলের কোনায় শাহবাগের দিকে— ঠিক বোঝা যায় না। হতে পারে এই ক্যাম্পাসে বা পেছনের মুহসীন হলের দিকে। রাতে যেমনটা ছিল। রাতের আঁধারকে ঘিরে দপদপ করে জ্বলে উঠেছিল নানামাপের কানফাাঁনো শব্দ। আর হুল্লোড়ে ভরা করুণ চিৎকার। এখন তা নেই। কিন্তু পরিবেশটা ঘনায়মনান ভয়ধরা। কোন ক্ষণে কী হবে যখন কিছুই জানা যায় না, তখন আমরা নিরাপত্তা চাই। নৈঃশব্দ্যের গাত্রে কোনো এক নিঃসহায় ছোট্ট প্রান্তিক সংখ্যালঘু প্রাণীর//// বাঁচার আকুতি থাকে থাকে। কে বাঁচাবে, কার নির্বিকার সহায় তোমাকে রক্ষা করবে— কে জানে। আমরা সূর্যসেন হলের সিঁড়ি বেয়ে ঘুরে ঘুরে পাঁচতলায় উঠি। অন্ধকার ছায়া মনকে— অন্ধকার করে রাখে। আমরা বাসি ফুলের করুণা জানি। অবহেলায় নস্যি সময়ের কথা চিনি। তবে ওসব কখনো আমাদের স্পর্শ করে না। যে স্পর্শ ছিল নতুনের, হাওয়া বদলের, রূপান্তরকে বোঝার। অচেনা এক অনাহারি পৃথিবীর গৎবাঁধা একইরকম মানুষের চেনাশোনা আওয়াজ চিনেই ছিল পথচলা। আমরা তরুলতার ছায়া আর কণ্টকিত খেজুর ডালের সুখ ও শান্তি দেখেছি, কোনো এক নতুন ধরনের আমের ডগায় ঘন কমলারঙের ডালিম ফুলের লাল করা সুমিষ্ট আহ্বানে নিজেকে ছেনে মেখে নিয়েছি কিংবা উঁচু তালবনের ধারে প্রচুর ঢেউগোনা জলের আরশিতে মুখ ডুবিয়ে নিজেই নিজেতে মাতিয়ে তুলেছি। কিন্তু এরকম ঘুণধরা ভারী ভাপের অন্ধকার আমরা কখনো দেখিনি। কেন এমনটা নতুন লাগে? বুঝি এই ঢাকা শহর এমনই। কারণ এখানে শায়েস্তা খান, পরীবিবি, নবাববাড়ি আর সদরঘাটের পানশি আছে, আছে ইসলাম খাঁর অতীত আর ভিক্টোরিয়ার শহীদ সেপাইদের ছিন্ন জীবনের গল্প। এসব গল্পের বারামখানা কাঁপিয়ে দেয় আমাদের মন। মনে করিয়ে দেয়, রামকৃষ্ণ মিশনের ঘণ্টা, হোসেনি দালানের কেমন করা সুবাস আর মুখ থুবড়ে পড়া জান দেওয়া রফিক জব্বারের হত্যাজীবনের সংবাদ। ফলে তাইতো এর বাতাস অনেক ভয়ঙ্কও ও তলছাড়া ভারি ওজনের ভর। ফলে, সূর্যসেন হলের সেই সিঙ্গেলরুমে শুয়েই আমাদের চোখে পানি চলে আসে। পাঁচতলা থেকে নিচে তাকালে শিরায়-সঞ্চালন কমে যায়, মস্তিষ্কের সেরিব্রামে যেন ধূম লেগেছে। কথা আর কবিতারা পালিয়ে গেছে। জীবনের ভেতর থেকে মায়াভরা জলকেলির মৃদুমন্দ ভেরী হাসগুলো কবেই ফিরে গেছে কোণার ছোট্ট শীতল গৃহে! ওদের গৃহ আছে কিন্তু আমাদের কোনো গৃহ নেই। মায়াহীন এইসব কক্ষে ইস্পাতকঠিন জীবনের ছায়াপাত। ফলে আর বুঝি ফেরা হবে না। অলৌকিক মৃত্যুই ভাগ্যে জড়ানো এইসব আত্মা হামলে পড়া শকুনের খাবার এখন আমরা। তাই হাওয়া না বদলিয়ে তা যেন আরও দৃঢ় হয়। আমরা শেষ মুহূর্তের ভয় আর ক্রন্দনকে সেবন করে চলি। বুঝি চলে যাই কোনো অচেনা ফ্যাকাশে তারার দেশে।

 

সাত

 

এরকম ভয় প্রথমদিকে অন্যরকম ছিল। তখন পালানোর আর হারানোর ভয় নয়। নিরাপত্তার ভয়। এখন যখন পালিয়ে আশ্রয় নেওয়ার ভয়, তখন আপন-পর ছোট-বড় নেই। আমাদের টেনে নেন তখন কক্সবাজার নিবাসী চৌধুরী সিরাজুল ইসলাম। মার্কেটিং বিভাগের ভালো ছাত্র তিনি। তিনি বলেন, ওসব কিছু নয়। আমরা এখানেই আছি, তোমরাও থাকো। ওগুলো পলিটিক্যাল ব্যাপার। তবে ক্রসফায়ারে যেও না। তখন সমস্যা। এখানেই থাক। বলামাত্রই প্রচুর গুলিবর্ষণ শুরু হলো। কোথায় কেমন শব্দ তা আর মনে নেই। সব চেতনার বাইরে চলে যায়। পৃথিবীর সব ভার যেন আমাদের মাথার ওপর তখন। খুব ছায়ার মতো পিটিপিটি তখন এগিয়ে আসে কোন এক সকালে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে জিয়া নিহত হওয়ার খবর। আমাদের তো তখন কোনো শত্রু ছিল না। তবু এখন শত্রু পরিবেষ্টিত হয়ে এখন এই হলের কক্ষে যখন বন্দি তখন সেই লাথি মারার আওয়াজ, পটপট গুলির শব্দ আর সুবেহ সাদেকে বৃষ্টির ভেতর আততায়ী আগমনসূচক বার্তা আমাদের চিত্তে ভয় ধরিয়ে তোলে। তবে স্থান আর পরিবেশ আলাদা। সময় এখন রাত ১০টা। এটা যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস! তখন ঘোরের মতো ছায়ামূর্তি হয়ে দাঁড়ান কুড়িগ্রামের সন্তান রাউফুন বসুনিয়া। জয়নাল, জাফর দিপালীদের নাম তখনও জানা হয় নাই। বসুনিয়া স্মৃতিস্তম্ভের রাস্তায় চলাচলের সূত্রে মুহসীন হলের ছায়াঘেরা মাঠ পেরিয়ে অনেকবার আমরা জীবনের স্বপ্ন বুনে হেঁটে চলি। সোনালি স্বপ্নগুলো থরে থরে সাজিয়ে রক্তমাংসে স্থির থেকে সবটুকু আকাশের সবুজ ভেলায় ভাসিয়ে দিই। তবু সেই কৈশোরের জিয়া মৃত্যুর স্মৃতি আর আজগার রিফিউজির দোকানে ওই মৃত্যুর পর থ্রিব্যান্ড রেডিওতে সুর করে পড়া আল্লাহু আল্লাহু ধ্বনি আমাদের শরীরে জমে থাকা ভয়কে আরও দীর্ঘস্থায়ী করে। মৃত্যুভয় যেন শ্মশানের নৈঃশব্দ্যকে আহ্বানের হাওয়া দেয়। তখনই সুবেহ সাদেকের বৃষ্টি, সার্কিট হাউজের দরজা আর গুলির শব্দে ঐকতান এক হয়ে ধরা দেয়। ধীরে ধীরে রাঙ্গুনিয়া, ফটিকছড়ি আয় আয় বলে ডাকতে থাকে। একসময় সমস্তমনের রৌদ্রজুড়ে বিরাট ব্যানারহেড তৈরি হয় ‘প্রেসিডেন্ট জিয়া চট্টগ্রামে নিহত’। কৈশোরের এই নিউজ আমরা দেখেছিলাম ঠিক শান্ত-সুশীতল অপাপবিদ্ধ কাঁঠাল গাছটার পাশে দাদার আমলের বুড়ো কাঠের চেয়ারে বসে। কাগজটা বুঝি ইত্তেফাক! যদিও সেদিন রহমান হকার কী কারণে আসেননি। পরের দিন অবজার্ভারের হেডলাইন শুনিয়ে তিনি বলেন : মানুষের লাশ আর জিয়ার লাশ একই স্যার। দেহেন পোঁঁটলার মতো কই ফেলাইয়া রাখছে! সেই স্মরণের মুখশ্রীতে ভয় গলে পচা লাশের গন্ধ আর অন্ধকার কবরের বিরামহীন শাস্তি যখন করোটির অবচেতন দুয়ারে হুহু হাওয়া তুলে দিয়েছিল ঠিক তখনই কে যেন এসে দরোজায় টোকা মারে। ভয় আরও শীতল করা শরীরে যেন বরফ নামিয়ে দেয়। এ ভয় জীবনের জন্যই শুধু নয়, সমস্ত মুখস্থ স্মৃতি অস্বীকারের ভয়। মায়ের নরোম আঁচলে পড়ে থাকা নরোম জ্যোৎস্নার মুখ লুকানো অশান্তি। তখন সব দূরে ঠেলে— কে যেন বলে, আমি বজলু। অর্থাৎ বজলুর রহমান সাহেব। পল্লবপত্রে তখন তবুও ফুটেছে হাস্নাহেনা। ফুলের বনে যার পাশে যাই তারেই লাগে ভালো। দরজা খুলতেই তিনি বলেন, আজ রাতে এখানে থাকা যাবে না। তোমরা ৫২৭এ থাকবে। আমি বলে রেখেছি। আজ আর দেখা হবে না। কাল বিকেলে আল্লাহওয়ালা বিল্ডিংয়ে চলে এসো। হ, চলে এসো— আমরা সঙ্গে সঙ্গে তালা মেরে নির্ধারিত কক্ষে চলে যেতে প্রস্তুতি নেই। তখন যাবার বেলা চৌধুরী সিরাজুল ইসলাম বলেন, তোমরা এখানেও থাকতে পারো। তখন সবটা ছায়া মাড়িয়ে এক চাঁদমারি চেতনায় অন্ধকার ঠেলে অনেক পথ ঘুরে ৫২৭ খুঁজে বের করা গেলে, সেখানকার গণ-পরিবেশে সুৎসাৎ ঢুকে পড়ি। কিন্তু আমাদের ঠিক ভালো লাগে না। ওই রুমের সিলেটের এক সঙ্গী আমাদের নানা কথাবার্তায় মিশিয়ে— নিজের মতো করে জড়িয়ে নেন। তবুও কেমন একটা সরগরমভাবে ওখানে সকলেই রয়ে যায়। ততোক্ষণে আবার খবর আসে মুহসীন হলে একজন ছাত্র মারা গেছে।

মিছিলে মিছিলে তখন অন্ধকারে অনেক মানুষ দেখে চলি। মানুষে মানুষে শত্রুতা দেখি। মিত্রতাও তো কম নয়। ভালো-মন্দ যা-ই হোক, আমরা ক্যাম্পাসকে মাতৃমঙ্গল উপাসনালয়ই থেকে যাই। তাই ডাকসু ভবন, লাইব্রেরি চত্বর, হাকিম চত্বর পেরিয়ে লাশ লাশ জীবনের মায়া ছাড়িয়ে পরের সকালে আধ-ঘুম তাড়িয়ে লাইব্রেরির দিকে এগিয়ে একসময় ক্যান্টিনে কিছু খেয়ে শাহবাগ থেকে মতিঝিলে চলে যাই। সেখানে বজলুর রহমান সাহেব একদম চুটিয়ে আড্ডা মারছিলেন। তিনি আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন। পরিচয়ের মুখে গত রাত্রের ভয়ভীতির কান্নাজড়ানো বিমর্ষতাকে টুটে দিয়ে তিনি সহজে বলেন, আজ তোদের নাঁক দেখাবো— চল। তিনি সোজা হাতঘড়ি দেখে মহিলা সমিতির দিকে নিয়ে যান। এমন মানুষ, কী যে প্রাণশক্তি ভরা অতুল্য ঔদার্য— আর জীবনে দেখা মেলে নাই। আমরা সোল্লাসে মহিলা সমিতিতে ঢুকে পড়ি। নাটকের নাম ‘ঈর্ষা’। এই নাটকেই আমরা যুবরাজ খালেদ খানকে চিনে ফেলি। কী যে অনর্গল সংলাপ প্রক্ষেপণের ভঙ্গি সেটি দেখে আশ্চর্য হওয়াই শুধু নয়, মানুষের অপিরমেয় তুলনাহীন শক্তির প্রমাণ পেয়ে যাই। যুবরাজ খালেদ খানকে পরে আরও বহুবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখেছি। কিন্তু মঞ্চের সেই যুবরাজ আমাদের ভীতু ভরা পালে যেন অপার আনন্দ এনে দেন। কাব্য করা কৌশলে এর অনিন্দ্যসুন্দর ডায়ালগ, আর প্রেম-শরীর মন ও মজ্জার দ্বন্দ্ব মঞ্চের আলোয় স্বর্গীয় সুধা এনে দেয়। এ যেন শাহানা-বন্দিস। এক ফেরার ঘুরে-ফিরে কী এক রগরগে প্রেমের কথা বলে। তাতে যৌনতার চেয়ে কী এক মিষ্টি প্লাবন ধূন তোলে। ফিরিয়ে আনে যাবতীয় জৌলুস। আমরা ভয়ের রাতের কথা ভুলে যাই। মোহগ্রস্ত হয়ে দেড়ঘণ্টা জীবনকে কোথায় এক বৃষ্টিভরা মৌসুমে ফেলে দেই। মনে মনে গাই : কীতনা হাসি হ্যা মওছুম/ কীতনা হাসি সফর হ্যা/ সাথি হ্যা খুব সুরত ইয়ে মওছুম ক্যভি খবর হ্যা...। বাচুপানের কেচ্ছা ফুরিয়ে যায়! আমরা তখন কী এক জৌলুসে পরিশুদ্ধ হয়ে উঠি। বুঝি সবটুকুই সতেজ হয়ে ওঠে। কোমল রমণীয় ও উন্মাদ হাওয়া ছুটে আসে বেলিরোডের বারান্দাজুড়ে। ছায়াগুলো বদলে অন্য মায়ায় দুলে ওঠে। আমরা একে অপরের হয়ে যাই। ভুলে যাই খুনঝরা রাতের লৌহজং অভিজ্ঞতার কথা। পালাবদল এতোই ঘন ও অনির্বাণ! জানা হয় না।        

 

চলবে

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads