• মঙ্গলবার, ৭ ডিসেম্বর ২০২১, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

সাহিত্য

আমি এবং রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প

  • প্রকাশিত ০৮ আগস্ট ২০২১

প্রশান্ত মৃধা

 

 

কোনো পরিবর্তনকে কি ঠিক নির্দিষ্ট করে মেপে বলা যায়? সাহিত্যে শুধু মোটাদাগে কিছু জায়গা শনাক্ত করা যায় বড়জোর। সময়ের পরিবর্তনে গল্পের পরিবর্তন তো ঘটেছেই। পরিবর্তন তো বিভিন্ন কারণে ঘটে। সময় একটা বড় বিষয় আগেই বলা হয়েছে। তার সঙ্গে মিলেমিশে পরিবেশ প্রতিবেশ মানুষ তাদের রুচিবোধ আর ভাষা সবটাই বদলে গেছে। ফলে, এখন কেউ চাইলেই ‘রবীন্দ্রনাথের মতো’ গল্প লিখতে পারবেন না। রবীন্দ্রনাথ নিজেও পারতেন না। পূর্ব বাংলা বা বাংলাদেশের যে অঞ্চল নিয়ে রবীন্দ্রনাথের গল্পের সবচেয়ে ফলবান ভূগোল— আজ এখানে এলে তিনি নিজেই এর সামগ্রিক পরিবর্তনে যে গল্প লিখতেন, তার বিষয়, ভাষা ও মানুষ আপসেই সেদিনের চেয়ে অনেক বদলে যেত।

রবীন্দ্র-পরবর্তীকাল বলতে কি বোঝানো হয়েছে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পরের কাল? যদি তা-ই হয়, সেদিক থেকে তার মৃত্যুর পরের কাল কেন, রবীন্দ্রনাথ তার নিজেই গল্প রচনায় নিজেকে বদলে নিয়েছেন। যখন তিনি ‘ল্যাবরেটরি’ লিখছেন তখন তো তাঁর পক্ষে আর লেখা সম্ভব নয় ‘সমাপ্তি’। সে কলম তিনি অনেক আগেই বদলে ফেলেছেন। একইভাবে তার জীবৎকালেই বাংলা ভাষার যে প্রধান গল্প লেখকেরা লিখতে এসেছেন তাদের হাতে তখনই গল্পে নানাপ্রকার পরিবর্তন ঘটতে দেখা গেছে। পরে ঘটেছে আরও বিস্তর। আর সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে তারপর থেকে বাঙালির তো কম পরিবর্তন হয়নি। ফলে গল্প বদলে গেছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে। ভাষায় বা বিষয়ে ছাড়াও একই সঙ্গে সে প্রবেশ করেছে এমন সব জায়গায় যেখানে রবীন্দ্রনাথের কালে যাওয়া সম্ভব ছিল না। কারণ বিষয় হিসেবে সেগুলো তখন সামনেই ছিল না। পাশাপাশি ফর্ম বা লেখন কৌশলেও পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়েছে বিভিন্ন প্রকার। কেউ কেউ খুব সফলও হয়েছেন। সব মিলে বাংলা গল্প সময় ও সমাজের আর দশটা পরিবর্তনের মতো পরিবর্তনগুলো সঙ্গে নিয়েই চলমান।

রবীন্দ্র ছোটগল্পের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক— এর বিষয়, ভাষা ও চরিত্রের বহুমুখিতা। হয়তো কোথাও ভাষা বেশ কাব্যিক মনে হয়, আবার বাংলার যে ভূগোলের প্রান্তর-ডাঙা-জল ও মানুষ নিয়ে এই গল্প, সেখানে এই কাব্য আর কোমলতা বেশ খাপও খেয়ে যায়। কিন্তু গল্পের চরিত্রের চোখের ভেতরে যখন আর দরদ থাকে না, কোথাও যখন আর কোমলতা থাকে না, মানুষের হূদয়ের গহীনে সেখানে ওই ভাষা মুহূর্তে বেশ শক্ত হয়ে ওঠে। আবার যেখানে মানুষে মানুষে সম্পর্কের সজীবতা, সেখানে খুব সহজে কোমল ঘাস গজায়। পাশাপাশি এও সত্যি যে— এই বিষয়, এই ভাষা, এই বিভিন্ন মানুষজন তা নিয়েই তাঁর গল্প। একটার সঙ্গে একটা মেলে না। মনেই হয় না, এগুলো প্রত্যেকটি মাত্র এক মাসের ব্যবধানে লেখা। তাঁর দেখার চোখটিই তাই খুব শক্তিশালী। এতটাই যে বাংলা গল্পের এখনও শ্রেষ্ঠ কারিগর তিনি। এক হাতেই এটাকে প্রায় কুটিরশিল্পের পর্যায়ে নামিয়ে এনেছেন।

নিজের লেখা নিয়ে আমি কোনও কথা কইতে অপারগ। রবীন্দ্রনাথ দ্বারা প্রভাবিত কিনা সেটা নিয়ে বলা যায় : তার গল্প বাতাসের মতো, দেখি না অথচ নিঃশ্বাস নিই, না নিলে দম বন্ধ হয়ে আসে। গল্প রচনার ক্ষেত্রে এই নিঃশ্বাস নেয়ার মতো বিষয় যদি প্রভাব হয়, তো সে প্রভাবের বাইরে যাওয়ার সাধ্যি কই! রবীন্দ্রনাথের অনেক গল্পই ভালো লাগে। এর মাঝে হয়ত একটু বিশেষভাবে ভালো লাগে পোস্টমাস্টার, খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন, মেঘ ও রৌদ্র, একরাত্রি, সমাপ্তি, কাবুলিওয়ালা, জীবিত ও মৃত, শাস্তি, স্ত্রীর পত্র, মধ্যবর্তিনী ইত্যাদি।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads