• শুক্রবার, ১২ আগস্ট ২০২২, ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯

সাহিত্য

সাক্ষাৎকার

আগামীর জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি সংরক্ষণ জরুরি : মামুন রশীদ

  • প্রকাশিত ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২

মামুন রশীদ, শূন্য দশকের গুরুত্বপূর্ণ কবি হিশেবে নিজেকে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত তাঁর কলাম ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছে তাঁর কলমের শক্তির অকাট্য ধারকে। আর এ কারণেই পশ্চিমবঙ্গের বহুল প্রচারিত ও পাঠকনন্দিত কাগজ ‘আনন্দবাজার’ও প্রকাশ করতে বাধ্য হয়েছে মামুন রশীদের কলাম। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে, নিভৃতচারী এসব শক্তিমান লেখক ও লেখনীশক্তিকে বাংলাদেশের সাহিত-সংস্কৃতির জগৎ খুঁজে নিতে চায় না। অতিকথন ও ঠাঁটবাজারি সাহিত্য আমাদের সৃজন ও মননশীল সাহিত্যে ধসের সৃষ্টি করেছে। আর তাই পেশায় সাংবাদিক কবি মামুন রশীদ রাজধানীকে বিদায় জানিয়ে পিতৃভূমি বগুড়ায় নীরব জীবনযাপন করছেন। কিন্তু থেমে নেই নিরলস সাহিত্যচর্চা, সম্পাদনা করছেন ‘সংক্রান্তি’ নামের ওয়েব ম্যাগাজিনসহ ঋতুভিত্তিক ত্রৈমাসিক সাহিত্য-সংস্কৃতির পত্রিকা ‘নক্ষত্র’। এছাড়াও ২০০১ সাল থেকে ‘দ্বিবাচ্য’ নামের একটি গদ্যবিষয়ক ছোটকাগজও সম্পাদনা করেন। মামুন রশীদের প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা পঁচিশ। যেখানে রয়েছে কবিতাসহ প্রবন্ধ, শিশুতোষগ্রন্থ, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক কিশোর উপন্যাস এবং বিদেশী ভাষার কবিতার অনুবাদগ্রন্থ। এর বাইরেও তিনি দেশ-বিদেশের খ্যাতিমানদের জীবনীগ্রন্থও রচনা করেছেন। এই খ্যাতিমান কবি ও কলাম লেখক সাহিত্যের নানা বিষয় নিয়ে একান্ত আলাপে অংশ নেন বাংলাদেশের খবর-এর ‘সাহিত্য ও সংস্কৃতির খবর’-এর সঙ্গে।

 

প্রশ্ন : আপনার কবিতা লেখা কবে থেকে শুরু? কবি জীবন বেছে নেওয়ার কারণ কী?

মামুন রশীদ : প্রথম কবিতা লেখার চেষ্টা করি নবম বা দশম শ্রেণিতে পড়ার সময়। এরপর দীর্ঘ বিরতি। অনার্স পড়ার সময়ে আবার চেষ্টা করি। মাঝে কবিতা লেখার চেষ্টা করিনি। তবে পত্র-পত্রিকায় চিঠিপত্রসহ নানা বিষয়ে লিখেছি। লেখালেখির আগ্রহ কলেজে পড়ার সময়েই। নব্বইয়ের দশকে আমাদের দৈনিক পত্রিকাগুলোতে একটি বড় পরিবর্তন আসে। সংবাদপত্রের নিয়মিত পাঠক হিসেবে সেই পরিবর্তন আমাকে উৎসাহী করে লেখায়। তখন দৈনিক পত্রিকায় স্বনামে কলাম ছাপা শুরু হয়। বিখ্যাত সাংবাদিকসহ নানা পেশার বিশেষজ্ঞজনেরা কলাম লেখা শুরু করেন। খুব মনোযোগ দিয়ে তাদের লেখা পড়তাম। সংবাদপত্রে প্রকাশিত কলামগুলোর মাঝে যেগুলো আমাকে বেশি আলোড়িত করতো, তার প্রতিক্রিয়া লিখে পাঠাতাম চিঠিপত্র বিভাগে। আমাকে অবাক করে সেগুলোর কোনো কোনোটি প্রকাশও হতো। নিয়মিত সেসব চিঠি প্রকাশ পাওয়ায় আমাকে লেখার জগতে ধরে রাখে।

আর কবিতা? বাংলায় অনার্সে ভর্তির পর, শুরুতে ক্লাশ করতে মন চাইতো না। ক্লাশে তেমন যেতামও না। ক্লাশরুমে দেখতাম, অবসর সময়ে বা ক্লাশে স্যার আসার আগে আগে অনেকে ডায়াসে উঠে কবিতা পড়তো। দরবারি আসরের মতো, সেসব কবিতা শুনে সবাই মারহাবা মারহাবা রব তুলতো। মেয়েদের অনেকে সেসব কবিতা, তাদের ডায়েরিতেও তুলে নিতো। কিন্তু কবিতা বলতে আমি যা বুঝতাম, তার সঙ্গে মেলাতে পারতাম না।

ছেলেবেলা থেকেই কবিতা আমার প্রিয়। স্কুলে পড়ার সময়েই পাঠ্যবইয়ের সব কবিতা, যেগুলো ভালো লাগতো, সেগুলো আমার কণ্ঠস্থ ছিল। এমনকি আমি এও মনে করতাম, এসব কবিতা আমারই লেখার কথা ছিল, কিন্তু আমার আগেই এগুলো লেখা হয়ে গেছে। পরীক্ষায় পাশের জন্য চর্যাপদ, মধ্যযুগের কবিতা পড়েছি। কিন্তু পরীক্ষায় পাশ করবো, সে চিন্তার চেয়ে এ সময় আমাকে মুগ্ধ করে বৈষ্ণব কবিতা। বৈষ্ণব কবিদের রসের ধারা, আমাকে উস্কে দিতে থাকে বাংলা কবিতার ভুবনে প্রবেশের। সত্যিকার অর্থেই আমি বৈষ্ণব কবিদের আমন্ত্রণেই সচেতনভাবে কবিতার ভুবনে প্রবেশ করি।

প্রশ্ন : এবারের মেলায় আপনার কি বই আসছে? বই সম্পর্কে আপনার ভাবনার কথা বলুন।

মামুন রশীদ : আমার বই বের হবে, তবে মেলায় সম্ভবত না। বছরজুড়েই আমার লেখালেখি। তা থেকেই, প্রকাশকের আগ্রহে বই হয়ে বের হয়। সেও মেলায় না, বছরের যে কোনো সময়েই। বছরের শুরুতেই একটি বই এসেছে, সম্পাদনা। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বেশ কয়েকটি কাজ জমা আছে প্রকাশকের হাতে। তাদের সুবিধাজনক সময়ে সেগুলো আলোর মুখ দেখবে।

লেখালেখির শুরুতে মেলায় বই প্রকাশ পাবে কি-না এ নিয়ে শঙ্কা ও আগ্রহ দুই-ই আমার ছিল। কিন্তু দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এ আগ্রহ কমে গেছে, এখন নেই-ই বলতে গেলে। কারণ, আমার যে ধরনের লেখা নিয়ে বই বের হয়, তা সাধারণত মেলাকেন্দ্রিক না। মেলাকে উপলক্ষ করে আমার স্পেশাল কোনো কাজও নেই, করিও না। তবে বই মেলার জন্য আমি আগ্রহ নিয়েই অপেক্ষা করি। কারণ, আড্ডা। মেলা উপলক্ষে সবাই মেলা চত্বরে আসেন, পরিচিত এত প্রিয় মুখের সঙ্গে দেখা হয়, অপরিচিত এত মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়, বইমেলাই সে সুযোগ করে দেয়। মেলায় এটা আমার বড় প্রাপ্তি। তাছাড়া মেলায় পাঠক-ক্রেতার— রুচি সম্পর্কে সরাসরি ধারণা তৈরি হয়। নিজের রুচি ও জানা-বোঝাকেও মিলিয়ে নেয়ার সুযোগ মেলে। এটাও বড় প্রাপ্তি।

প্রশ্ন : বই মেলায় প্রতি বছর প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার বই প্রকাশ পায়। এই যে এত বইয়ের প্রকাশ, এটাকে  আপনি কেমন চোখে দেখেন?

মামুন রশীদ : আমাদের প্রকাশকরা বইমেলা উপলক্ষে যতো বই প্রকাশ করেন, বা তাদের যেমন সাজ সাজ রব থাকে, তাদের অধিকাংশই সারা বছর বই প্রকাশে এমন আগ্রহী নন। এজন্য আমাদের বইগুলোর অধিকাংশই প্রকাশ পায় ফেব্রুয়ারি মাসকে কেন্দ্র করে। প্রতি মেলায় কমপক্ষে ৪ থেকে ৫ হাজার বই প্রকাশ অবশ্যই বড় ঘটনা। এমন উদ্যোগ ও উদ্যমকে ভালো চোখে না দেখার কোনো কারণ নেই। বই প্রকাশ পাক, ভালো বই বের হোক, বইয়ের বাজার তৈরি হোক-এটা প্রত্যেক লেখকেরই চাওয়া। তবে মেলায় যেসব বই আসে, তার একটি বড় অংশের পেছনে লেখকের ব্যক্তিগত ভালোলাগা ভালোবাসা থাকলেও, তাতে সাহিত্যের ভালো-মন্দ জড়িয়ে নেই। সেখানে প্রকাশকেরও লাভের অংশ রয়েছে। কিন্তু সাহিত্যের লাভ নেই। এই যে কয়েক হাজার বই, প্রতিবছর, তা কিন্তু প্রতিবার একই লেখকের নয়। অনেক সৌখিন লেখক রয়েছেন, অনেক পয়সাওয়ালা মানুষ রয়েছেন- ‘বই, সে আমিও লিখেছি, আমার ঘরেও আছে’ এরকম ভাবনা থেকে যারা বই প্রকাশের জন্য এগিয়ে আসেন, মেলায় তাদেরকেই টার্গেট হিসেবে ধরেন অনেক প্রকাশক। তাদের বইগুলো প্রকাশকের পকেট ভারি করলেও সাহিত্যের করে না। প্রকাশনার এই দিকটিতে আমাদের নজর দেওয়া উচিত। যেন তেন ভাবে, সম্পাদনা ছাড়া বই বেরুলে তা যেমন প্রশ্নের উদ্রেক করে, তেমনি পেশাদারিত্বের জায়গাতেও প্রভাব ফেলে।

আরও একটি বিষয় লক্ষ্য করবেন, যাদের খোঁজখবর আপনি কখনো জানেননি, যাদের লেখা কোনো সাময়িকী বা সাহিত্যপত্রে পড়ার সুযোগ হয়নি, তাদের বই প্রকাশ পাবার পর, আমাদের নানা নামে-বেনামের অনলাইনগুলোতে সেসব বইয়ের নিউজ প্রকাশ পাচ্ছে। প্রচারেই প্রসার তত্ত্বকে কাজে লাগিয়ে এসব বইয়ের হরেক বিজ্ঞাপন অনলাইনগুলোতে ছড়িয়ে পড়ছে। এ থেকেও লেখা এবং লেখক সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা তৈরি হয়।

প্রশ্ন : আপনার তো মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে বেশ কয়েকটি কাজ ইতোমধ্যে বই হয়ে বেরিয়েছে। মুুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজের আগ্রহ কীভাবে?

মামুন রশীদ : মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানার আগ্রহ আমার ছাত্রজীবন থেকেই। যখন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আলোচনা করতেও অনেকে ভয় পেতেন, দ্বিধা কাজ করতো, সে সময়েও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আলোচনার পরিবেশের মধ্যে আমি বড় হয়েছি। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পড়ার সুযোগ হয়েছে। তবে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমার চিন্তার জায়গাটিতে পরিবর্তন আসে আমার একসময়ের সহকর্মী, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও কথাসাহিত্যিক সাইফুল ইসলামের সাহচর্যে। আমাদের আড্ডার বড় এবং প্রধান অংশ জুড়ে ছিল মুক্তিযুদ্ধ। তিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশাসনের কথা বলতেন। সে বিষয়টি শুরুতে না বুঝলেও, এখন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পড়ালেখা, অন্যের সঙ্গে ভাবনা বিনিময়ের সুযোগসহ নানাভাবে এরকম অনেক বিষয়ে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লেখা, তার চর্চা প্রায় সম্পন্ন। অথচ মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক ইতিহাস সংরক্ষণে আমরা এখনও অনেক পেছনে। আরও একটি বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি সংরক্ষণ। যা প্রায় হয়নি বললেই চলে। আমাদের আলোচনা ঘিরে থাকতো এ বিষয়কে কেন্দ্র করে। শুধু আলোচনা না, আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজও করার ইচ্ছে নিয়ে শুরু করি স্মৃতিসংরক্ষণ। তারই ধারাবাহিকতায় গত বছর বেরুলো চলনবিল পাড়ের বীর মুক্তিযোদ্ধা শ. ম. আব্দুল ওয়াহাবের আত্মজৈবনিক গদ্যের বইটি। বইয়ের কাজটি করেছিলাম ২০১৬ সালে। বীর মুক্তিযোদ্ধা ও কথাসাহিত্যিক সাইফুল ইসলাম বইটির অনুলিখন করেন, পরে আমি লেখাটি সম্পাদনার পাশাপাশি একটি ভূমিকা লিখি এবং পরিশিষ্ট অংশে কিছু টিকা যোগ করি। সেসবের মিলিত প্রয়াস শ. ম. আব্দুল ওয়াহাবের মুক্তিযুদ্ধ চলনবিলের পাড়ে।

প্রশ্ন : মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর পরে এসে মুক্তিযুদ্ধের গবেষণা বা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজের সুযোগ কতোটুকু রয়েছে বলে মনে করেন?

মামুন রশীদ : আমরা গত বছর উদ্যাপন করলাম আমাদের গৌরবময় স্বাধীনতা ও বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী। একটি জাতির স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্তি উৎসব উদ্যাপনের আনন্দ ও গর্বের তুলনা হয় না। কিন্তু এ বিজয়ের পেছনে আমাদের অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। আমরা হারিয়েছি অসংখ্য তাজা প্রাণ। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত অমাদের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রচুর কাজের সুযোগ রয়েছে। আমাদের আঞ্চলিক পর্যায়ের ইতিহাসের অপূর্ণতা পূরণ করা জরুরি। সময়ের নিয়মেই এক সময় আমাদের জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের আর আমাদের সঙ্গে পাবো না। ইতোমধ্যে অনেকেই চলে গেছেন। বয়সের কারণে অনেকের স্মৃতি আগের মতো সক্রিয় না। তাই এখন আমাদের প্রত্যেকের জায়গা থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি সংরক্ষণের কাজটি করা জরুরি। যতো বেশিসংখ্যক মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতিকথা আমরা সংরক্ষণ করতে সক্ষম হবো, আগামীর জন্য ততো বেশি সহায়ক হবে।

 

প্রশ্ন : সমকালীন সাহিত্য নিয়ে আপনার ভাবনার কথা জানতে চাই।

মামুন রশীদ : পড়তে ভালো লাগে। নানা বিষয়ের লেখা পড়ি। তবে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে রুচি তৈরি হয় প্রত্যেক মানুষের, সেইসঙ্গে সীমাবদ্ধতাও। যতো দিন এগুচ্ছে, সময় ততো কমছে। সেই সঙ্গে চোখও চাপ নিতে পারে না। তাই ইচ্ছে থাকলেও সব কিছু তো পড়া সম্ভব না। হয়ও না। সমকালের চেয়ে পেছনে ফেলে আসা সময়ের লেখকদের প্রতিই আমার আগ্রহ বেশি। কারণ, ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি অনেকক্ষেত্রেই আমরা তাদের উতরে যেতে পারিনি। তাই তাদের লেখাগুলোর প্রতি মুগ্ধতা, আগ্রহ, ভালোবাসা একটু বেশি। সঙ্গে নতুনদের লেখাও আমি পড়তে চেষ্টা করি। আমার সমসাময়িক যারা, আমার পরের যারা, তারা কী লিখছেন, কী ভাবছেন—একজন লেখকের জন্য এটা জানা-বোঝা জরুরি। সেই জরুরি কাজটুকুও আমি করি ভিড়ের হূদয় এড়িয়ে। খোঁজখবর রাখি। এবং সমসাময়িক বা পরের লেখকদের অনেকের প্রসঙ্গে আমি নিজের মত লিখে জানাতেও চেষ্টা করি। সবসময় তা হয়ে ওঠে না। আর এখন তো প্রকাশের মাধ্যম অনেক। নানাভাবে একজন লেখকের লেখা, ভাবনা সামনে চলে আসে। ফলে কাউকেই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ভিড়ের বাইরে এসে—সমকালীনতার মধ্য থেকেও যারা আমাকে নাড়িয়ে দেন, তাদের লেখাও গুপ্তপুঁথির মতো আমি দরদের সঙ্গে পাঠ করি। বুঝে নিতে চাই তাদের ভাবনার জগৎ।

প্রশ্ন : এদেশে সমালোচনা সাহিত্য সেভাবে দাঁড়াতে পারেনি কেন?

মামুন রশীদ : আমরা অন্যের সমালোচনা করি, কিন্তু নিজের সমালোচনা মেনে নিতে রাজি না। এরকম ভাবনা যদি আমরা প্রত্যেকে লালন করি, তাহলে সমালোচনা সাহিত্যের পথ খুঁজে নেওয়া কঠিন। সেই কঠিন অধ্যায়টিই আজ স্থায়ী আসন গাড়ছে। আমাদের এখানে তাই সমালোচনা সাহিত্যের চেয়ে সাহিত্যের আলোচনা বেশি। আমরা বই নিয়ে, সাহিত্য নিয়ে আলোচনা লিখি, কিন্তু সমালোচনা করি না। লেখার ভুলত্রুটিগুলো দেখানোর চেষ্টা করি না। আমরা তো নিজের লেখা অন্যকে সম্পাদনা করতে দিতেও রাজি না। আমরা মনে করি, আমার লেখা সম্পাদনা করার কি আছে? বা লেখা সম্পাদনার জন্য আমরা কাউকে যোগ্যই মনে করি না। তেমনি আমরা সমালোচনাও শুনতে রাজি না। আর তাই ওপথে না হেঁটে আমরা বই আলোচনার দিকে, শুধু প্রশংসাবাক্যের মাধ্যমে বাহ্্বা দিতেই উৎসাহী। ফলে আমাদের সমালোচনা সাহিত্যের ধারাটিরও যথাযথ বিকাশ নেই।

প্রশ্ন : আপনি তো অনেকের জীবনী লিখেছেন— ডিরোজিও, নেলসন ম্যান্ডেলা, মাদার তেরেসা, বেগম রোকেয়া, হিটলার, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান— এই মহৎ মানুষদের জীবনী নিয়ে কাজ করার পেছনের কারণ জানতে চাই।

মামুন রশীদ : গদ্য এবং পদ্য দু’মাধ্যমেই আমি কাজ করি। দু’মাধ্যমেই আমি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। যখন গদ্য লিখতে ক্লান্ত বোধ করি, তখন কবিতা আমাকে তৃপ্তি দেয়। সংবাদমাধ্যমে কাজ করার সুবাদে আমাকে নানা ধরনের গদ্য লিখতে হয়েছে। যে কোনো বিষয়ে যদি পড়ালেখা যথেষ্ট থাকে, তাহলে আমি মোটামুটি নিজের মতো করে বিষয়টি গুছিয়ে লিখতে পারি, স্কুলে পড়ার সময় থেকেই। আর ছেলেবেলা থেকেই বিখ্যাত মানুষদের জীবনী পড়তে আমি পছন্দ করি। পরবর্তীতে আমার পাঠে পছন্দের তালিকায় যোগ হয় সাক্ষাৎকার, আত্মজীবনী এবং ইতিহাস। বিখ্যাত মানুষের জীবনী আমি পড়ার চেষ্টা করি। আমার পছন্দের তালিকায় এ ধরনের বই, লেখাগুলো থাকে সামনের সারিতে। আপনি যে বইগুলোর কথা উল্লেখ করে জানতে চাইলেন, তার পেছনে আমার প্রকাশক বন্ধুদের আগ্রহ ও আমন্ত্রণ যেমন আছে, তেমনি আছে আমার ভালোলাগা, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা এবং সর্বোপরি তাদের সম্পর্কে জানার আগ্রহ। যাদের নিয়ে কাজ করেছি, এই কাজ করার সুবাদে তাদের নিয়ে লেখা বিভিন্নজনের বই পাঠের সুযোগ হয়েছে। অজানা তথ্য যেমন জেনেছি, তেমনি জেনেছি একজন মানুষের বড় হয়ে ওঠা, আদর্শ হয়ে ওঠার পেছনে তাদের শিক্ষা, ত্যাগ, মানুষের জন্য ভালোবাসাও।

প্রশ্ন : সাহিত্যে গোষ্ঠীবদ্ধতা বা দলবাজিকে আপনি কোন চোখে দেখেন?

মামুন রশীদ : সাহিত্যে গোষ্ঠী বা দলবাজিকে অস্বীকার করার উপায় নেই। এটা প্রায় সবকালেই ছিল, আছে এবং থাকবে। ছোটোরাই দল বাঁধে, জোট বাঁধে। এই দল বাঁধা বা জোট বাঁধার মধ্য দিয়েই তারা বড় হতে চায়। এটা দোষের না। বিদ্যাপতি, লালন শাহ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নজরুল ইসলামের মতো সর্বগ্রাসী প্রতিভা সবসময় আসেন না। এজন্য অপেক্ষা করতে হয়। সেই অপেক্ষার সময়ে নিজেকে জানান দিতে ছোটদের দলবদ্ধ হওয়া, এতে ক্ষতি নেই। তবে এই জোট বাঁধা যদি কাজের উদ্দেশ্যে না হয়ে, অন্যকে ঘায়েল করার জন্য হয়, তবে তা ক্ষতিকর, দোষের ও নিন্দনীয়।

প্রশ্ন : আপনার লেখার কি পাঠক রয়েছে? নির্দিষ্ট পাঠক কি তৈরি হয়েছে বলে আপনি মনে করেন? পাঠকের সঙ্গে আপনি কি করে সেতু নির্মাণ করেন?

মামুন রশীদ : প্রতিটি ফুলের যেমন রয়েছে নিজস্ব সৌরভ। ঠিক তেমনি প্রতিটি সম্পর্কেরও রয়েছে নিজস্ব ধরন। যা শুধু দুটি সম্পর্কের সেতুই তৈরি করে না, পারস্পরিক বোঝাপড়ার ক্ষেত্রও তৈরি করে। একজন অন্যজনকে বোঝার ভেতর দিয়েই গড়ে ওঠে এই সেতু। লেখকের সঙ্গেও পাঠকের একটি সেতু আছে। সম্পর্কের ধরন অনুযায়ী সেই সেতু তৈরি হয়। অন্যান্য সম্পর্কের মতো এখানেও দুই পক্ষকেই এগিয়ে আসতে হয়। কেন লিখি? এই প্রশ্নটির উত্তর প্রত্যেক লেখকের জন্যই জরুরি। লেখক কেন লেখেন, সেই উত্তরের ভেতের দিয়েই মূলত পাঠকের সঙ্গে সেতু তৈরি হয়। লেখা ছাড়া যখন কোনভাবেই নিজেকে প্রকাশের উপায় থাকে না, নিজেকে জানানোর উপায় থাকে না, একসঙ্গে অনেকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ থাকে না—সেই প্রকাশ, সেই জানানোর ইচ্ছে থেকেই নিজের ভেতরের কথামালাকে সাজিয়ে তোলেন লেখক। আর লেখকের মনের অলিন্দে ঘোরা কথামালার রেশ ধরেই সম্পর্কের সেতু তৈরি করেন পাঠক। লেখকের কথার ভেতর থেকেই প্রত্যেকটি পাঠক তার নিজস্ব জগৎকে খুঁজে পান, তার চিন্তাকে মিলিয়ে দেখতে পারেন। যে লেখকের সঙ্গে পাঠকের চিন্তার মিল হয়, যে লেখকের ভাবনার সঙ্গে পাঠক নিজেকে মিলিয়ে নিতে পারেন, তার প্রতি পাঠকের আগ্রহ বাড়তে থাকে।

এখন আমার পাঠকের কথা বলি। সন্দেহ করি রয়েছেন। না হলে প্রকাশক বই প্রকাশ করবেন কেন? শুরুতে অন্য অনেকের মতো আমাকেও বই প্রকাশের জন্য বিনিয়োগ করতে হয়েছে। যদিও তার কোন অংশই ফেরত আসেনি। আশাও করিনি। সুখের কথা, এখন নিজেকে বিনিয়োগ করতে হয় না, প্রকাশকই এ কাজটি করেন। তাই, সন্দেহ করি, কোথাও না কোথাও তারা রয়েছেন। তবে নির্দিষ্ট কোনো পাঠক  হয়তো নয়। বেশ কয়েক বছর আগে, বাসে সহযাত্রী একজনের সঙ্গে হঠাৎই আলাপ। নানান কথার ফাঁকে কি করি, তাও জেনে নেবার পর, বেশ উপদেশও পেলাম। বাস থেকে যখন নেমে যাবো, তখন নাম জানতে চাইলেন, বলার পর, আমাকে অবাক করে তার কদিন আগে একটি কাগজে আমার প্রকাশিত একটি লেখার কথা বলে  জানতে চাইলেন, সেটি আমার ছিল কি-না। হ্যাঁ সূচক জবাব দিতে দিতেই বাস নির্ধারিত স্টপেজে থেমে যায়। আমি নেমে পড়ি। যোগাযোগের সেতু তৈরি হয় না।

প্রতিটি বই যেমন নতুন, তেমনি প্রত্যেক পাঠকও নতুন। এই নতুন সম্পর্কগুলো ততক্ষণই সজীব থাকে, সতেজ থাকে—যতক্ষণ পর্যন্ত উভয়ে উভয়ের চিন্তার জগৎকে নাড়া দিতে পারেন। কারণ লেখক এবং পাঠকের সম্পর্ক তৈরি হয় তাদের চিন্তার জগতকে কেন্দ্র করে। এক্ষেত্রে বাসস্টপেজে হঠাৎ নেমে যাবার মতোই উহ্য থাকে ব্যক্তি সম্পর্ক।

প্রশ্ন : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ সময় দেওয়ার জন্য।

মামুন রশীদ : আপনার মাধ্যমে বাংলাদেশের খবরের পাঠকদের প্রতি রইলো শুভকামনা।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads