• শুক্রবার, ১৯ আগস্ট ২০২২, ৪ ভাদ্র ১৪২৯

বিবিধ

পঞ্চাশ পেরিয়ে দেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল

  • মামুন রশীদ
  • প্রকাশিত ৩০ এপ্রিল ২০২২

আমাদের বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তীতে পাকিস্তানের অর্থনীতিবিদ ও পাকিস্তানের প্র্রধানমন্ত্রীর ইনস্টিটিউশনাল রিফর্মস অ্যান্ড অস্টারিটি উপদেষ্টা ইশরাত হুসাইন আমাদের এগিয়ে থাকাকে দ্বিধাহীন ভাষায় উল্লেখ করেছিলেন। গত বছর পাকিস্তানের প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য ডনে প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের জাতীয় আয় বেড়েছে ৫০ গুণ আর মাথাপিছু আয় বেড়েছে ২৫ গুণ, যা ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে বেশি। দেশটির খাদ্য উৎপাদনও বেড়েছে চারগুণ। রপ্তানি বেড়েছে শতগুণ। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশে ৬০ শতাংশ দারিদ্র্য ছিল। তা কমে এখন ২০ শতাংশে নেমেছে। গড় আয়ু বেড়ে ৭২ বছর হয়েছে। অধিকাংশ সামাজিক সূচক শ্রীলঙ্কা ছাড়া আঞ্চলিক দেশগুলোর তুলনায় বেশ ভালো। দেশটির মানব উন্নয়ন সূচকের মান বেড়েছে ৬০ শতাংশ।’

এই উদাহরণটি আমাদের কোনো রাজনৈতিক নেতার, রাজনৈতিক জনসভার বক্তৃতা নয়। গত পঞ্চাশ বছরে আমাদের এগিয়ে চলা, আমাদের সাফল্য যে ঈর্ষনীয় তা আর অস্পষ্ট নয় কোথাও। হংকং সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশন-এইচএসবিসির সর্বশেষ গ্লোবাল রিসার্চেও উঠে এসেছে আমাদের অগ্রগতির প্রসঙ্গ। সংস্থাটির গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) নিরিখে বিশ্বের ২৬তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। যেখানে আমাদের বর্তমান অবস্থান ৪২তম। এই গবেষণায় অর্থনৈতিক দিক থেকে আমাদের ১৬ ধাপে উন্নীত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। যা অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় অনেক বেশি। বর্তমান সরকারের হাত ধরে আমাদের এই যে এগিয়ে চলা, প্রতিনিয়ত আমাদের অবস্থানের পরিবর্তন, তার শুরু স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের হাত ধরে। স্বাধীনতার পর সরকারের দায়িত্ব নিয়েই বঙ্গবন্ধু খাদ্যোৎপাদন বাড়ানোসহ কৃষিনির্ভর অর্থনীতির ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন। সরকারের সে সিদ্ধান্ত আমাদের জন্য আজ আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে আমরা খাদ্যোৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছি। আমাদের খাদ্যশস্যে আজ ঘাটতি নেই, টান পড়ে না। উদ্বৃত্ত থেকে যায়, বরং এক্ষেত্রটিও আজ রপ্তানিমুখী।

স্বাধীনতা অর্জনের পাঁচ দশক আমরা পেরিয়ে এসেছি। এই পাঁচ দশকে সমাজদর্শন, রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, শিল্প ও সংস্কৃতি বিষয়ে আমাদের অগ্রগতি হয়েছে। সেই অগ্রগতিকে দেখা হচ্ছে উল্লেখযোগ্য হিসেবেই। এবং তা সবারই মনোযোগ আকর্ষণ করছে। স্বাধীনতার পরপরই যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ হিসেবে আমাদের যে আর্থিক দুর্দিন ছিল, আমাদের যে দুরবস্থার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে, আশার কথা খুব অল্প সময়েই সে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে ঘুরে দাঁড়াতে কী পরিমাণ সংগ্রাম করতে হয়েছে, তা সে সময়ে আমাদের সম্পর্কে বলা একটি উক্তি থেকেই বোঝা সহজ হবে। আমাদের আর্থিক সংকট ও সমস্যার যে সহজ সমাধান হবে না, আমাদের উৎপাদনমুখী হতে যে অনিশ্চিত সময় পার করতে হবে, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতেই যেন সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার সদ্য স্বাধীন দেশটিকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বা ‘বাস্কেট কেস’ বলে অভিহিত করেছিলেন। তার ও সে সময়ের বিশ্বের অনুমান যে সঠিক ছিল না, তাদের সেই অসম্মানজক উক্তি যে বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য ছিল না, খুব দ্রুততম সময়েই তার জবাব দেওয়া সম্ভব হয়েছে। আমাদের বর্তমান দক্ষ সরকারের সফল রাষ্ট্র পরিচালনার ফলেই বাংলাদেশ আজ ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মুখ দেখেছে। যে কারণে তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোলমডেল হিসেবে বিশ্বে পরিচিত। শুধু তা-ই নয়, যে পাকিস্তানি শোষণ ও শাসন থেকে আমরা মুক্তি চেয়েছিলাম, আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছিলাম, আজ পঞ্চাশ পরে এসে একথাও স্পষ্ট যে, সেই পাকিস্তানের চেয়েও নানা ক্ষেত্রে আমরা এগিয়ে। এগিয়ে থাকার এই বিষয়টি শুধু আমাদের তরফ থেকেই বলা হচ্ছে এমন না, বরং পাকিস্তানিদের তরফ থেকেও গত কয়েক বছরে বিষয়টি নিয়ে নানা পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে— নিবন্ধের শুরুতেই সে উদাহরণ হাজির করেছি। সত্যিকার অর্থে রাজনৈতিক সভাসমাবেশের বাইরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন এবং অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মন্তব্যেও আমাদের এই এগিয়ে থাকা স্পষ্টভাবে চিহ্নিত।

গত পঞ্চাশ বছরে আমাদের যেসব রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সমস্যা দেখা দিয়েছে, বর্তমান সরকারের হাত ধরে  তার সমাধানও এসেছে। ফলে জীবনের জড়ত্ব ভেঙ্গে এই এগিয়ে চলা সম্ভব হয়েছে, নিশ্চিত হয়েছে। এখন এই অর্জনকে ধরে রাখতে, কাঠামোগত উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে আত্মিক উন্নয়নের দিকেও নজর দিতে হবে। সেক্ষেত্রে প্রথম এবং প্রধান হাতিয়ার হতে পারে শিক্ষা। এক প্রবন্ধে অর্থনীতিবিদ অম্লান দত্ত বলেছিলেন, ‘ভারতের এই পূর্ব কোণে আধুনিক শিক্ষার প্রথম আবির্ভাব রামমোহনের দিনে। সেই বাংলা আজ অশিক্ষায় অগ্রণী হতে চলেছে।... এটা লজ্জার কথা। আমরা শিক্ষার চেয়ে রাজনীতিকে, মানুষ তৈরির কাজের চেয়ে ক্ষমতার কাড়াকাড়িটাকে বড় ভেবে নিয়ে দিনে দিনে ডুবছি।’ তিনি কথাটি বলেছিলেন ‘আমরা দেশ গড়বো কবে?’ প্রবন্ধে, ভারতের প্রসঙ্গে। কথাটি এখানেও অপ্রাসঙ্গিক নয় বলেই উদ্ধৃত করে বলতে চাই, বর্তমান সরকারের হাত ধরে দেশ গড়ার যে মহোৎসব শুরু হয়েছে, সেই আনন্দযজ্ঞে সকলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারে শুধু শিক্ষা। উন্নয়নের এই ধারাবাহিকতাও ধরে রাখতে পারে শুধু শিক্ষাক্ষেত্রের অগ্রগতি। আমাদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ছিল, সেই আকাঙ্ক্ষার পেছনে কাজ করেছে সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন। বাঙালিকে যা দেখিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেই স্বপ্ন এখন বাস্তব। এখন এই বাস্তবতাকে ধারণ করে আমাদের এগিয়ে যাওয়া যেন কোনভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয় সেদিকে নজর দিতে শিক্ষার কাঠামোকে এমনভাবে গড়ে তোলা দরকার, যাতে দেশ ও দশের উন্নতিই প্রধান বিবেচ্য হয়। শিক্ষার উদ্দেশ্য কোনোভাবেই বিফল না হয়, মানুষে মানুষে ব্যক্তিগত সম্পর্ক নষ্ট না হয়, মানবিক সম্পর্ক নষ্ট না হয়। তাহলেই আজকের এই অবকাঠামোগত উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রও সত্যিকার অর্থেই কল্যাণরাষ্ট্র হয়ে উঠবে। সততা ও অসততার বিরোধে অসততাকে পরাজিত করবে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads